Main Story

‘ইশান্ত’ এর বন্ধুদের আঁকা ছবির প্রদর্শনী

নাবীল

‘তারে জমিন পার’এর সেই ছোট্ট ইশান্তের কথা তোমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে? সে ছিলো অটিস্টিক, কিন্তু তার বাবা-মা তাকে বোঝার কোনো চেষ্টাই করতেন না। তাকে সাহায্য করার বদলে কেবল শাসনই করতেন। কিন্তু কি অসাধারণ ছবিই না ইশান্ত আঁকতো! মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকার মতো ইশান্তের এই ছবি আঁকার প্রতিভা সম্পর্কে একসময় সবাই জানতে পারলো। বাংলাদেশেও সম্প্রতি ইশান্তের মতোই কিছু শিশুর আঁকা ছবি নিয়ে দৃক গ্যালারিতে হয়ে গেলো একটি প্রদর্শনী। ১৬ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত আয়োজিত এ প্রদর্শনীটির শিরোনাম ‘ইমার্জড ফ্রম আননোন- টু’; আয়োজিত হয়েছিলো হ্যান্স নামের একটি সংগঠনের সহায়তায়। এসব খবর তো কিডজ এর খবরাখবরে তোমরা আগেই পেয়ে গেছো। এবারে চলো আমরা কেমন হলো সেই প্রদর্শনী, সেসম্পর্কে শুনি।

অটিস্টিক শিশুদের জন্য আমাদের দেশে কিছু আলাদা স্কুল আছে। এই স্কুলগুলোতে কেবল তারাই পড়াশুনা করতে পারে। এখানে অনেক আদর-যত্ন করে তবেই তাদেরকে পড়ানো হয়। এমনি কয়েকটি স্কুলের নাম হলো- স্কুল ফর গিফটেড চিল্ড্রেন, কেয়ারিং গ্লোরি, সুইড(SWID) বাংলাদেশ, সোয়াক (SWAC), অটিজম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন আর বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন। সেইসব স্কুলেরই মোটমাট ৪৪ জন ছেলেমেয়ের আঁকা ৬০টি আঁকা ছবি নিয়েই এই প্রদর্শনী হয়েছিলো। যাদের ছবি নিয়ে প্রদর্শনীটি হলো তাদের বয়স কতো! বলতে পারবে? সবচে ছোট আঁকিয়েটির বয়স ছিলো মাত্র ৭ বছর। অবশ্য তার চেয়ে বড়ো আঁকিয়ের ছবিও সেখানে ছিলো।

কেমন এঁকেছে ওরা? যারা খবরাখবরে খবর পেয়ে প্রদর্শনীটি দেখতে গিয়েছিলে, তারা তো জানোই। আর যারা যাও নি, তাদের জন্য বলছি, এক কথায় দ‚র্দান্ত। এমনকি কয়েকজন তো রীতিমতো অসাধারণ ছবি এঁকেছে। একেকটা ছবির গল্পও ছিলো অসম্ভব সুন্দর। একজনের ছবির গল্পে কেবলই তার বাবা-মা। দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে মিষ্টি করে হাসছেন। আবার আরেকজনের ছবিতে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর সেই মুক্তিযুদ্ধের গল্প ফুটে উঠছে। মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ জয় করার গল্পও এঁকেছে একজন। বাংলাদেশের পতাকা তো আমরা অনেকই আঁকি, তাই না! কিন্তু পতাকা আঁকলেও যে সবার থেকে আলাদাভাবে, সুন্দরভাবে তা আঁকা যায়, সেটিও দেখিয়ে দিয়েছে একজন। আর কয়েকজন তো আমাদের মহান স্মৃতিসৌধের ছবিই এঁকেছে এক বুক ভালোবাসা নিয়েই।

গ্রামের ছবি আঁকতেও বাদ রাখেনি তারা। একেকজন গ্রামের একেকটা গল্প তাদের ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছে। একজন এঁকেছে মাছ ধরার ছবি। আরেকজন এঁকেছে, ঝড়ের রাতে মাঝিদের হেঁইয়ো হেঁইয়ো বলে বীর বিক্রমে নদী পার হওয়ার ছবি। ধানের ক্ষেতের পাশে সব ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে খেলার ছবিও এঁকেছে একজন। আছে গ্রামের মেলার ছবি, আর সে মেলায় বিশাল এক নাগরদোলাও আছে। কোন  ছবিতে আবার দেখা গেছে রেললাইনের একপাশে পাহাড়। আর রেললাইনের মাঝখান দিয়ে এদিক থেকে ওদিকে চলে গেছে পাহাড় থেকে নেমে আসা মাটির রাস্তা। নদীর ছবি, নৌকার ছবি, হাঁসের সাঁতার কাটার ছবি, আঁকাবাকা মেঠোপথের ছবি, সুন্দর সুন্দর আরো অনেক গ্রামের ছবিই দেখা গেছে এই প্রদর্শনীতে।

এ তো গেলো গ্রামের ছবি। শহরের ছবিও কিন্তু আঁকিয়েরা আঁকতে বাদ রাখেনি। শহরের কথা বললেই কোন জিনিষটা সবার আগে চোখের সামনে ভাসতে থাকে বলো তো? ঠিক ধরেছো, ট্রাফিক জ্যাম। আর এখানেও তাই আঁকিয়েরা জ্যামের ছবিও এঁকেছে। এছাড়াও গাড়ির ছবি, প্লেনের ছবি, প্রিয় স্কুলের ছবি, কোন কিছুরই ছবি আঁকতে বাদ রাখেনি এইসব খুদে আঁকিয়েরা। আর স্কুলের ছবিতে তো তারা লিখেই দিয়েছে ‘আমরা করবো জয়’।

ফুল তো সবাই ভালোবাসে। তাই এই প্রদর্শনীর আঁকিয়েরা ফুলের ছবিও এঁকেছে অনেকগুলো। সেগুলোও যে কতোটা সুন্দর তা না দেখলে বোঝানো প্রায় অসম্ভব। আর কয়েকজন তো কম্পোজিশন এঁকেছে। এখন নিশ্চয়ই প্রশ্ন করবে- কম্পোজিশন কি? এতে কোনো গল্প থাকে না, কয়েকটা রং বা কয়েকটা জিনিস একসঙ্গে এঁকে কম্পোজিশন করা হয়। কম্পোজিশন ভালো হলে, দেখতে অসম্ভব সুন্দর লাগে! এই কম্পোজিশনগুলোও কিন্তু দারুণ সুন্দর হয়েছে। একজন তো মাত্র চারটা রং- লাল, হলুদ, সবুজ আর নীল রং দিয়ে এত্তো সুন্দর কম্পোজিশন করেছে, দেখলে শুধু তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছে করে।

নিশ্চয়ই তোমাদের অনেকেরই ইচ্ছে করছে নিজের কাছে ছবিগুলোর একটা রাখতে। সে ব্যবস্থাও কিন্তু এখানে ছিলো। তোমরা চাইলে তোমাদের বাবা-মার কাছ থেকে ছবি কিনে নিতেও পারতে। কোনো বাঁধা-ধরা নিয়মও ছিলো না ছবি কেনার ব্যাপারে। একেকটা ছবির দামও তেমন বেশি ছিলো না, ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। আর ছবি বিক্রিটাও কিন্তু খারাপ হয়নি। প্রথম তিনদিনেই ৩ টি ছবি বিক্রি হয়ে গিয়েছিলো। তবে ছবি বিক্রির টাকাটা অবশ্য এখনো ক্ষুদে আঁকিয়েরা পায়নি। ৬ আগস্ট আগারগাঁওয়ের এলজিইডি ভবনে ‘শেয়ার উইথ ইনোসেন্স- ফাইভ’ শিরোনামে আরেকটি অনুষ্ঠান হবে। সেখানেই সবার সামনে আঁকিয়েদেরকে তাদের ছবির মূল্য দেয়া হবে।

সত্যি সত্যিই এই অটিস্টিক শিশুরা কিন্তু কারোর চেয়েই কোনো দিক দিয়েই কম না। প্রদর্শনীতে গেলেই দেখতে ওখানে কতো সুন্দর করে সে কথা লেখা আছে। সেখানে লেখা ছিলো, ‘অটিজম কোনো রোগ নয়, অটিজম হলো প্রতিভা আর আবেগ বেশি থাকা’। লেখাটা যে একেবারেই ঠিক, সেটা তোমরা যারা প্রদর্শনীটা দেখেছো তারা সবাই নিশ্চই বুঝেছো। কারণ কারো প্রতিভা না থাকলে অমন সুন্দর ছবি আঁকা যায় না। আর এরকম ছবির জন্য সুন্দর সুন্দর বিষয় বাছতে হলে আঁকিয়ের আবেগও ভালো হতে হয়। শুধু তাই নয়, আঁকিয়েদের কল্পনাও কিন্তু খুব সুন্দর। কাজেই আবেগ এবং প্রতিভা আছে বলেই তারাও ভালো কিছু করে দেখাতে পারে নিমিষেই।



বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/নাবীল/শুভ/এইচআর/জুলাই ২৪/১০