Main Story

জলদস্যু ব্ল্যাকবিয়ার্ড (৩য় পর্ব)

ইমরান খান

এক সময় সারা দুনিয়া দাপিয়ে বেড়িয়েছে জলদস্যুরা। বাণিজ্য জাহাজ, যাত্রী জাহাজ কারও নিস্তার ছিল না এসব জলদস্যুদের হাত থেকে। লুটে নিত বণিক-সওদাগর আর নিরীহ যাত্রীদের ধন সম্পদ। এমন কি সুযোগ পেলে এক দল দস্যু অন্য দলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। সেই সব মুর্তমান আতঙ্ক, কিংবদন্তী জলদস্যুদের সত্যি ঘটনা নিয়ে এ সিরিজটি চলবে। তোমাদের সঙ্গে থাকবে দুর্দান্ত সাহসী রগচটা রোজার আর তার বন্ধু ইতিহাসের পণ্ডিত ফ্রায়ার মিল। তারাই তোমাদের নিয়ে যাবে ইতিহাসের সেই সব কুখ্যাত জলদস্যুদের কাছে। এবারের পর্ব ভয়ঙ্কর জলদস্যু ব্ল্যাক বিয়ার্ডকে নিয়ে।

পাঁচ
নভেম্বর ২৮, ১৭১৭।

স্বাভাবিকভাবেই ব্ল্যাকবিয়ার্ড সর্দার হয়েছে। খবর এসেছে হর্নিগোল্ড বাহামার গভর্নর উডস রোজার্সের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমা নিয়েছে। সুতরাং এখন ব্ল্যাক বিয়ার্ড আর হর্নিগোল্ডের রাস্তা আলাদা। নিজের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে হলে ব্ল্যাক বিয়ার্ডকে আরও অনেক কঠোর হতে হবে। ডেকে বসে এসবই ভাবছিল এডওয়ার্ড টেচ।

এ সময় হাওয়ার্ড এসে খবর দেয়-

-সেইন্ট ভিনসেন্ট উপকূলের কাছে একটা ফরাসী বাণিজ্য জাহাজ এসেছে।

ব্ল্যাকবিয়ার্ড- অতএব, দুটি জাহাজ নিয়ে চলো সে দিকে গাধা।

ক্যাপ্টেনের সিদ্ধান্ত মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে দস্যুদের মধ্যে। সবাই প্রস্তুত। দুটি জাহাজ নিয়ে সেইন্ট ভিনসেন্টের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায় দস্যুদল। দেখতে দেখতে দুরন্ত জাহাজ দুটি পৌঁছে যায় সেখানে। হাওয়ার্ডের খবর ছিল অভ্রান্ত। অতর্কিতে তারা জাহাজটিতে আক্রমণ করে। যুদ্ধে কুলিয়ে উঠতে পারে না বণিক জাহাজের ক্যাপ্টেন। ব্ল্যাকবিয়ার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে সে। জাহাজটা ছিল দাসে বোঝাই। তাদের মাঝখান থেকে শক্তিশালী কয়েকজনকে নিজের দলে ভিড়িয়ে নেয় টেচ। আর বাকি সবাইকে নির্জন দ্বীপে ফেলে রেখে চলে জাহাজটি নিয়ে। জাহাজটির নাম ছিল লা কনকর্ড। পরে টেচ এর সংস্কার করে নাম দেয় কুইন এন’স রিভেঞ্জ। জাহাজে সে চল্লিশটি বন্দুক বসায়।

এর পর আর দুর্ধর্ষ টেচ থেমে থাকে নি। একের পর এক আক্রমণ করে চলে বণিক জাহাজ। এর মধ্যে সে গ্রেট এলেন নামের আরেকটি জাহাজে আক্রমণ করে। মালামাল সব লুটে নিয়ে আগুন ধরিয়ে ডুবিয়ে দেয় জাহাজটি।

ছয়.
 
লেফটেন্যান্ট মেইনার্ডের জাহাজ।

মুখ খুলে লেফটেন্যান্ট রবার্ট মেইনার্ড- ব্ল্যাক বিয়ার্ডকে গ্রেপ্তার করার জন্য আমাকে ডেকেছেন ভার্জিনিয়ার গভর্নর আলেকজান্ডার স্পটসউড।

রবার্ট মেইনার্ড যেমন দুঃসাহসী তেমনি অভিজ্ঞ। রোজার আর ফ্রায়ার মিল তার পাশে এসে দাঁড়ায়। তাদের চোখ সমুদ্রের দিকে। শান্ত গতিতে ছুটে চলেছে তাদের জাহাজ। দুইদিন ধরে চলছে তাদের জাহাজ। আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে চলে গিয়েছিল ওরা একটা জলদস্যু দলকে ধাওয়া করে। তাদের বারোটা বাজানোর পরই একটা সরকারি খবর এসেছে মেইনার্ডের কাছে। কিন্তু এ দুইদিনে একবারও মুখ খোলে নি সে। এটাই তার স্বভাব। আজও হয়তো তেমন কিছুই বলবে না। তবে নাবিকরা বুঝতে পারল কেন তারা ভার্জিনিয়াতে যাচ্ছে।  

রোজার- ব্ল্যাক বিয়ার্ড মানে এ সময়ের দুনিয়া কাঁপানো জলদস্যু!

রগচটা হিসেবে বেশ কুখ্যাতি আছে রোজারের। সবাই তাকে বেশ সমঝে চলে। এমন কি প্রিয় বন্ধু ফ্রায়ার মিল পর্যন্ত মাঝে মাঝে তাকে সমীহই করে। ও যখন কথা বলে তখন জাহাজে যেন ভূমিকম্প হয়।

ফ্রায়ার মিল- হ্যা, ওর আসল নাম এডওয়ার্ড টেচ।

ফ্রায়ার মিল ইতিহাসে পণ্ডিত। যে কোনো ঘটনার সাল তারিখ সব তার মুখস্থ। তার এই জ্ঞানের জন্যই অন্য নাবিকরা তাকে ডাকে ফ্রায়ার।

মেইনার্ড- অনেকে কিন্তু বলে ওর নাম এডওয়ার্ড ডারমন্ড।

ফ্রায়ার মিল- হুম কিন্তু সে ব্যাপারে কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। ব্রিটেনের ব্রিস্টলে, সম্ভবত ১৬৮০ সালের দিকে একটা ধনী পরিবারে ওর জন্ম। ১৬৯৯ সালের দিকে একটা বাণিজ্য জাহাজে আরও সঠিক ভাবে বললে সম্ভবত এক দাস জাহাজে করে ও ক্যারিবিয়াতে এসেছিল। ক্যারিবিয়াতে যে দ্বীপে ও নামে, তার নাম জ্যামাইকা।

রোজার  বাধা দিয়ে বলে- মিল তোমার এই সাল তারিখের ক্যাচক্যাচানি বন্ধ করবে! এমনিতেই মেজাজ খিচড়ে আছে। তোমার এই সাল তারিখ শুনে আমার মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে।
 
ফ্রায়ার মিল- আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। আর সাল তারিখ বলব না। আঠারোশ শতাব্দীতে..

রোজার- মিল! আমরা জানি এটা আঠারোশ শতাব্দী।

সবাই হেসে উঠে।

মিল- দুঃখিত। লেখক জনসন লিখেছেন টেচ মানে ব্ল্যাক বিয়ার্ড রাণী এনের যুদ্ধের সময় জ্যামাইকাতে একটা প্রাইভেটিয়ারে নাবিক হিসেবে কাজ করতো। রাণী এন সেই টেচের প্রাইভেটিয়ারকে ফরাসী আর স্প্যানিশ জাহাজ আক্রমণ করার আর লুণ্ঠিত মালামাল নিজের কাছে রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন। এটা স্প্যানিশ বিপ্লবের সময়কার ঘটনা।

মেইনার্ড- পরে যুদ্ধ শেষ হলে টেচ হয়ে ওঠে এক অভিজ্ঞ জলদস্যু। প্রাইভেটিয়ারে থাকাকালীনই সে ডাকাতিতে অনেক দক্ষ হয়ে উঠেছিল। সে আর ভাল মানুষ হয় নি, ভিড়ে যায় ক্যাপ্টেন বেঞ্জামিন হর্নিগোল্ডের দলে।

রোজার- ক্যাপ্টেন বেঞ্জামিন হর্নিগোল্ড! মানে নিউ প্রভিডেন্সের সেই কুখ্যাত ডাকাত! কিছুদিন আগে যে সাধারণ ক্ষমা গ্রহণ করল?

মিল- হ্যা ১৭১৮ সালের জুন মাসে হাভানার গভর্নর উডস রজার্সের কাছে।

রোজার- মিল আমি কিন্তু এবারে সত্যি ক্ষেপে যাবো।

মিল- আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত রোজার। কিন্তু সাল তারিখ ছাড়া আমি কথাই বলতে পারি না তাতো তুমি জানোই। যা হোক, সম্ভবত আটরেচট চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই টেচ জ্যামাইকা ছেড়ে নিউ প্রভিডেন্সে চলে আসে। আসলে এটা যে সব প্রাইভেটিয়াররা পরে জলদস্যু হয়ে গিয়েছিল তাদের সবার জন্যই নিরাপদ আস্তানা হয়ে উঠেছিল। সম্ভবত ১৭১৬ সালে টেচ হর্নিগোল্ড এর দলে যোগ দেয়।

রোজার- বাচাল তোতাপাখি মিল, আমি তোমাকে কিন্তু জ্যান্ত খেয়ে ফেলব।

মিল থতমত খায়।

মেইনার্ড- আচ্ছা থামো তোমরা। একটু ওয়াইন গেলা যাক।

মিল- হ্যা এটা কিন্তু ভাল প্রস্তাব। আঠারোশ...

মেইনার্ড- মিল!

মিল বুঝতে পারে এর পরে আরও কথা বললে খবর আছে।




বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/ইমরান/এসএ/এইচবি/নভেম্বর ০৪/১০