Main Story

শীতের পিঠার রূপকথা

অদ্বিতী

ছয়টি ঋতুর মায়ায় ভরা আমাদের এই বাংলাদেশ। আর এই ছয়টি ঋতুই আসে তার নিজেদের ভিন্ন আমেজ নিয়ে। ঠিক সেভাবেই যে চলে এসেছে শীত। এই শীতের কুয়াশার আড়ালেই প্রকৃতি তৈরি হচ্ছে বসন্তের জন্য। তবে কি জানো, শীতের সঙ্গে উৎসবের কিন্তু একটা গভীর সম্পর্কও রয়েছে। শীত আসলেই আমাদের এই ছোট্ট দেশের শহর কি গ্রাম সব জায়গাতেই উৎসবের ধুম পড়ে যায়। কারণ এই সময়টাতেই যে গ্রামের ঘরে ঘরে নতুন ধান ওঠে। সেই ধান দিয়ে হয় উৎসব। আর শীতের উৎসবের প্রধান আকর্ষণই হলো পিঠা-পুলি। পিঠা ছাড়া শীতের যে কোনো উৎসবের আনন্দই যেন মাটি হয়ে যায়। ঘরে ঘরে পিঠা বানানো হয়। চালের গুড়ো, গুড়, নারিকেল, দুধ, খেজুরের রস সব দিয়ে কত বাহারি ধরনের পিঠাই না বানানো হয়!

আমাদের দেশে ১৫০ রকমেরও বেশি পিঠা বানানো হয়ে থাকে। তবে এর মধ্যে ৩০ রকমের পিঠা বেশি জনপ্রিয়। আবার দেশের অঞ্চল ভেদেও পিঠার রকমফের হয়ে থাকে। অর্থাৎ একেক জায়গার পিঠা একেক রকম হয়ে থাকে। আজ চলো, তোমাদেরকে শোনাই এই শীতের পিঠার গল্প।

শীতে গ্রামের পরিবেশটাই থাকে আলাদা। ফসলের মাঠ জুড়ে থাকে কুয়াশা। আর বাড়িতে তখন চুলার পাশে বসে গরম গরম পিঠা খাওয়া- আহা, সে এক স্বর্গীয় ব্যাপারই বটে। তোমরা যারা শীতকালে গ্রামে বেড়াতে গিয়েছো তারা তো জানো ভালো করেই। আর যারা যাওনি তারা সময় করে একবার ঘুরে এসো। দেখবে বারবার যেতে মন চাইবে।  হাড় কাঁপানো শীতে চুলার পাশে বসে গরম গরম ভাপা পিঠা খাবার মজাই যে আলাদা।

 

চুলা থেকে সদ্য নামানো গরম গরম ধোঁয়া ওঠা চিতই পিঠার স্বাদও কিন্তু অসাধারণ। আর তার সঙ্গে যদি ধনেপাতার চাটনি বা মাংসের ঝোল হয় তাহলে তো সোনায় সোহাগা। মনে হবে সারাদিন আর অন্য কোনো খাবারের দরকারই নেই।


এই চিতই পিঠাই আবার সারা রাত দুধ আর গুড়ের রসে ডুবিয়ে রেখে বানানো হয় দুধ চিতই বা রস পিঠা। সারা রাত রসে ডুবে একেকটা পিঠা ফুলে রসে টসটসে হয়ে যায়। সকালবেলা এ পিঠার এক টুকরো মুখে ভরলেই পুরো মুখ মিস্টি রসে ভরে যায়। কি যে দারুণ এর স্বাদ তা না খেলে লিখে ঠিক বোঝানো যাবে না!

 

আরো একটি অসাধারণ পিঠা হলো পাটিসাপটা। এই পিঠা অবশ্য বেশ জনপ্রিয়। সব জায়গাতেই পাওয়া যায়। এমনকি দোকানেও। কিন্তু শীতকালে নতুন চালের গুড়ো দিয়ে বাড়িতে বানানো পাটিসাপটা পিঠার ব্যাপারটা যে সত্যি আলাদা। মনে করে একবার খেয়ে দেখো কিন্তু।

আমাদের দেশের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী পিঠা হলো- পুলি পিঠা। একে অনেকে চন্দ্রপুলিও বলে। কারণ এর আকৃতিটা দেখতে আধখানা চাঁদের মতোই। এই পুলি পিঠাও দুধে ভিজানো হয় সারা রাত ধরে। আর রাতভর দুধে ভিজে একেকটা পিঠা হয়ে থাকে একেকটা অমৃত।

আরেক ধরনের পুলি পিঠা আছে যা সবজি পুলি হিসাবে পরিচিত। মিষ্টি খেতে ভালো না লাগলে এটি চেখে দেখতে পারো। এর ভিতরে পুর হিসাবে নারিকেল আর গুড় না দিয়ে সবজি দেয়া হয়।

পিঠা যদিও বেশিরভাগই বানানো হয় মিষ্টি দিয়ে তারপরও কিন্তু ঝাল পিঠার সংখ্যাও কম নয়। কাজেই যাদের মিষ্টি একেবারেই পছন্দ নয়, তাদেরও চিন্তার কিছু নেই। কারণ তাদের জন্যও রয়েছে হরেক রকম পিঠা।

 

আরও একটি মজার পিঠা হলো তেল পিঠা। এই পিঠা বানানো সবচে সহজ। চালের গুড়োর সঙ্গে গুড় মিশিয়ে পানিতে গুলে তা গরম তেলে ছেড়ে দিলেই ফুলে ওঠে। এজন্যই একে বলা হয় তেল পিঠা। গরম গরম মুচমুচে তেলের পিঠা খেতে ভারি মজা।


পিঠা আসলে আমাদের দেশের  ‘কেক’। গ্রামাঞ্চলে এক ধরনের পিঠা বানানো হয় যার নাম বিক্কই পিঠা। এই পিঠা মূলত উত্তর বঙ্গেই বেশি প্রচলিত। এ পিঠা বানানোটাও খুব মজার। সাধারণত পিঠা বানানোর ক্ষেত্রে শুধু নিচেই আগুন দেয়া হয়। কিন্তু এ পিঠা বানানোর সময় উপরে নিচে দুই দিকেই আগুন দেয়া হয়। আবার আকারে আকৃতিতে এ পিঠা অনেকটা কেকের মতই হয়।

আমাদের দেশের শহরে বা গ্রামে বহুল প্রচলিত কিছু পিঠার কথা তো শুনলে এতক্ষণ। এছাড়াও আছে নকশি পিঠা, মাল পোয়া, ডিম চিতই, দোল পিঠা, চুটকি পিঠা, পাকন পিঠা, জামদানি পিঠা, হাড়ি পিঠা, চাপটি পিঠা, গোকুল পিঠা, ছিট পিঠা, চাপড়ি পিঠা, মুঠি পিঠা, কাটা পিঠা, ক্ষীর পিঠা, হাতকুলি পিঠা, চই পিঠা, ভেজা পিঠা, ঝুরি পিঠা আরও কতো কি। পিঠার কতো মজার আর অদ্ভূত রং বেরঙের সব নাম, তাই না? নিশ্চয়ই ভাবছো এগুলো খেতে কি মজাটাই না হবে। কাজেই যদি কখনও সুযোগ পেয়ে যাও তাহলে হাতছাড়া করো না।

 

বাংলার পিঠার ঐতিহ্য অনেক অনেক পুরোনো। তোমার আমার এমন কি আমাদের মা-বাবা, দাদা-দাদীর জন্মেরও ঢের আগে থেকেই এদেশে পিঠা বানানোর প্রচলন। ধারণা করা হয়, মোঘল আমল থেকে এই পিঠা সংস্কৃতির উৎপত্তি। আর এখনও অব্দি এ সংস্কৃতি বহাল তবিয়তেই বেঁচে-বর্তে আছে।

শুনলে তো আমাদের পিঠার কথা। শীত পালিয়ে যাবার আগেই তাই এবার ঠিক করে ফেলো কোন কোন নামের কতোগুলো পিঠা খাবে। আর তা কোথায় গিয়ে খাবে!

 

বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/অদ্বিতী/এসএ/সাগর/এইচআর/জানুয়ারি ১৩/১১