Main Story

মায়ের ভালবাসার দিন

মেহেদী বাবু

পৃথিবীতে সবচেয়ে মধুরতম ডাক হচ্ছে- মা, তাই না? মা শব্দটি যেমন আমাদের সবচেয়ে প্রিয়, তেমনি মাও আমাদের সবচাইতে কাছের মানুষ, সবচাইতে প্রিয় মানুষ। কেননা, মা আমাদের জন্য যে কষ্ট আর ত্যাগ স্বীকার করেন তা কী আর কেউ করতে পারবে? পারবে না। মায়ের কাছে আমাদের যে ঋণ, তাও কখনো শোধ করা সম্ভব নয়। তবে আমরা তো চাইলে তাকে জীবনভর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা দিতে পারি, নাকি? সে জন্য কিন্তু প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে একটি বিশেষ দিনই আলাদা করে রাখা হয়েছে। এই দিনটি শুধুই মায়েদের জন্য। এই দিনটির নাম হচ্ছে ‘মা দিবস’। মায়ের জন্য এই দিনটি কবে? মে মাসের ২য় রবিবার। মানে এ বছরের ‘মা দিবস’ হচ্ছে ৮ই মে। সেদিন আমরাও আমাদের দেশে খুব করে ‘মা দিবস’ পালন করবো। আমাদের মা’কে তো আমরা খুবই ভালোবাসি, সেদিন আমাদের ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে তাকে দেবো একটি বিশেষ উপহার, কেমন? প্রতিবছর এই দিনটি পালন করা হয় শুধুই মায়ের জন্য। কিন্তু জানো কি, কীভাবে সূচনা হলো এই মা দিবসের? তবে এই দিনটি নিয়ে কিন্তু একটা মজার ব্যাপার আছে, সারা বিশ্বে কিন্তু একই দিনে মা দিবস পালন করা হয় না। আর বিভিন্ন দেশে দিনটি উৎযাপনের ধরণ-ধারণও আলাদা। তাহলে চলো বন্ধুরা, জেনে আসি মা দিবসের ইতিবৃত্ত।

মা দিবস পালন কিন্তু আজকে থেকে শুরু হয়নি। শুনলে অবাক হবে যে, প্রায় ৬০০০ বছর আগেও মানুষ মাকে দেবী হিসেবে পূজা করতো। তবে প্রাচীন সেই পূজার সাথে আজকের মা দিবস পালনের কোনো মিলই খুঁজে পাবেনা তুমি।

প্রাচীন গ্রীকরা ‘সিবেল’ এর জন্য উৎসব পালন করতো। আর এই সিবেল কে জানো? সিবেল হচ্ছে, সকল দেব-দেবীদের মা। প্রাচীন রোমানরাও মা ‘সিবেল’এর পূজা করতো। তবে একসময় রোমানদের মনে ভয় ঢুকল যে, একই দেবীর পূজা করায় তাদের আর গ্রীকদের সংস্কৃতি গুলিয়ে যেতে পারে। তখন তারা করলো কি, ‘সিবেল’-র রূপ বদলে তৈরি করলো তাদের একান্ত নিজস্ব এক ‘মা’ দেবী- ‘ম্যাটার আইডায়িয়া’।

‘সিবেল’এর সেই উৎসবের সাথে মিল রেখেই খ্রিস্টানরা পালন করতো ‘মাদারিং সানডে’। এই উৎসবে তারা সম্মান জানাতো মা মেরীকে। ভালো কথা, মা মেরী কে জানো তো? তিনি হচ্ছেন যীশু খ্রিস্টের মা।

সবাই মা দিবস পালন করলেও সবাই কিন্তু একই দিনে মা দিবস পালন করে না। সে তো আগেই বলেছি। তোমার মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে, কেনো একই দিনে পালন করে না? তাই তো! কেনো সবাই একই দিনে মা দিবস পালন করে না! বিভিন্ন দেশে তাদের মায়েদের কোন কাহিনীকে সম্মান জানাতে সবার সঙ্গে মা দিবস পালন না করে অন্য একটি দিনে মা দিবস পালন করে। আবার ধর্মীয় কারণেও অনেকে অন্যদিনে মা দিবস পালন করে। যেমন ধরো, ক্যাথলিক খ্রিস্টান দেশগুলোতে মা দিবস পালন করা হয় মাতা মেরীর জন্মদিনে। আর মুসলিম দেশগুলোতে দিনটি উৎযাপন করা হয় মহানবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর কন্যা ফাতেমা’র জন্মদিন অনুসারে। আবার বলিভিয়াতে সে দেশের নারীদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের একটি বিশেষ দিনে পালন করা হয় মা দিবস। তবে মা দিবস যেদিনই পালন করা হোক না কেন, সবাই-ই কিন্তু তাদের মাকে ঠিকই খুব বেশি ভালোবাসে। আর সেটা যার যার মা দিবসে সবাই তাদের মা’কে সেটা খুব করে বুঝিয়েও দেয়।

আরব দেশে
আরব দেশগুলোকে চিনেছো তো? মানচিত্রে খুঁজে দেখো, আফ্রিকা আর এশিয়ার মাঝের জায়গাটায় একটা সাগর আছে, নাম- আরব সাগর। ঐ সাগরের আশেপাশের দেশগুলোর প্রায় সবগুলোতেই বেশিরভাগ মানুষই মুসলমান। ঐ দেশগুলোকে বলা হয় আরব দেশ। এই আরব দেশগুলোতে মা দিবস পালন করা হয় মার্চ মাসের ২১ তারিখ। আর এই মা দিবস পালনের কথা সর্বপ্রথম বলেন মুস্তফা আমিন নামের এক সাংবাদিক। তিনি ছিলেন মিশরের নাগরিক। এই মা দিবসের পিছনে একটি ছোট্ট গল্পও আছে। একবার মুস্তফা আমিন শুনলেন যে, এক বিধবা মা তার জীবনের সবকিছু উৎসর্গ করেছেন তার ছেলেকে ডাক্তার বানানোর জন্য। অথচ যেই না সে ডাক্তার হলো, অমনি ছেলে এক ফুটফুটে মেয়েকে বিয়ে করে মাকে ছেড়ে চলে গেলো! এটি সেই ১৯৪৩ সালের কথা। তখন থেকেই তিনি মায়েদের সম্মানে একটি দিন পালনের চিন্তাভাবনা করতে শুরু করেন। এরপর সরকারিভাবে ১৯৫৬ সালের ২১ মার্চ প্রথম মা দিবস পালন শুরু করা হয়। তাদের দেখাদেখি অন্যান্য আরব দেশগুলোও একই দিনে দিবসটি উৎযাপন করতে শুরু করে।

অস্ট্রেলিয়া
আমাদের দেশে যেমন মা দিবস পালন করা হয় মে মাসের ২য় রবিবার, তেমনি অস্ট্রেলিয়াতেও দিবসটি পালন করা হয় একই দিনে। আর মা দিবসে মায়েদের উপহার দেয়ার প্রথাটা কিন্তু চালু হয় এই অস্ট্রেলিয়াতেই। এই উপহার দেয়ার পিছনেও কিন্তু একটা গল্প আছে। জেনেট হেইডেন নামে অস্ট্রেলিয়াতে এক মহিলা ডাক্তার ছিলেন। তিনি একবার এক মহিলা আশ্রমে গেলেন রোগী দেখতে। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন কি, অনেক দুখী মহিলা। তারা তিল তিল করে তাদের ছেলেমেয়েদেরকে বড়ো করেছেন। আর বড়ো হয়ে সেই ছেলেমেয়েরাই কিনা তাদেরকে ভুলে গেছে! সেইসব মায়েদের চেয়ে বড়ো অভাগা আর কে আছে বলো। তাদেরকে আনন্দ দেয়ার জন্য তিনি একটা বুদ্ধি বের করলেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্থ সংগ্রহ করে স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে দিয়ে সেই মায়েদেরকে উপহার দেয়ালেন। একবার চিন্তা করো, তখন সেইসব মায়েদের কী ভালোই না লেগেছিলো! ধীরে ধীরে এই উপহার দেয়াটা আরও বাড়তে লাগলো। আর এখন তো মাকে উপহার না দিলে মা দিবস যেনো হয়-ই না।

বলিভিয়া
বলিভিয়াতে মা দিবস পালন করা হয় মে মাসের ২৭ তারিখ। ভাবছো, মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বাদ দিয়ে এই দিনে কেনো? এর পেছনে একটা কাহিনী আছে। তবে সেই কাহিনীটা কিন্তু খুবই কষ্টের। বলিভিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, ১৮১২ সালের ২৭ মে করনিলা নামক এক জায়গায় এক ভীষণ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। আর সেই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল বলিভিয়ার অনেক বীর নারীও। আর যুদ্ধে সেই নারীদেরকে স্প্যানিশরা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। ভাবছো, বলিভিয়ানদের স্বাধীনতা যুদ্ধে স্প্যানিশরা আসলো কোত্থেকে? আগে বলিভিয়া তো স্প্যানিশদের উপনিবেশ ছিলো, আমরা যেরকম ছিলাম বৃটিশদের উপনিবেশ। বৃটিশদের মতো স্প্যানিশরাও ওদেরকে শোষণ করতো। আর সেই বীর নারীদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে বলিভিয়ানরা এই দিনটিকে পালন করে ‘মা দিবস’ হিসেবে।

নেপাল
নেপালে মা দিবস উৎযাপনের ধরণটা আবার একদমই আলাদা। সেখানে একদিন-দুইদিন না, টানা  ১৫ দিন চলে মায়ের জন্য উৎসব। মা বলে কথা, সেই উৎসব কি আর একদিন-দুইদিনে হয়? আর এ উৎসবের নাম একটা খুব সুন্দর নামও আছে- ‘মাতা তীর্থ অনসি’। বৈশাখ মাসের অমাবস্যার ১৫ দিন এই উৎসব চলে। আর সেদিনগুলোতে খুব করে মায়েদের উদ্দেশ্যে পূজা করা হয়। শুধু পূজা করেই ওরা ক্ষান্ত হয় না, সেই সঙ্গে তাদেরকে দেয় নানা উপহারও।

নেপালিদের এই উৎসবের পিছনে কিন্তু একটি প্রাচীন কিংবদন্তী আছে। শোনা যায়, একবার প্রভু কৃষ্ণের মা দেবকী ঘুরতে বেড়িয়েছিলেন। নানা জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে তার বাড়ি ফিরতে দেরী হয়ে গেলো। এদিকে প্রভু কৃষ্ণ তো মাকে দেখতে না পেয়ে একদম অস্থির হয়ে গেছেন।তাই তিনি মাকে খুঁজতে বেড়োলেন। এখানে খোঁজেন, ওখানে খোঁজেন, কিন্তু কোথাও আর মা’কে খুঁজে পান না। শেষমেশ ‘মাতা তীর্থ কুন্ড’র কাছে এসে দেখেন কী, তার মা একটি পুকুরে গোসল করছেন। প্রভু কৃষ্ণ মাকে খুঁজে পেয়ে তো খুবই খুশি। আর তার মা দেবকীও খুব খুশি। খুশি হয়ে দেবকী বললেন যে, এখন থেকে এই জায়গাটিতে এলে সন্তানেরা তাদের মৃত মায়ের সাক্ষাৎ পাবে। তখন থেকেই এই পুকুরকে ঘিরে নাচ গান করে পালন করা হয় ‘মাতা তীর্থ অনসি’, অর্থাৎ নেপালিদের মা দিবস।

মা দিবস যে দেশে, যেভাবে আর যে দিনই পালন করা হোক না কেনো, তাতে তো আর মায়ের প্রতি আমাদের ভালবাসার কোনো পরিবর্তন হবে না, কি বলো, বন্ধুরা? কেননা মা যেভাবে কষ্ট করে আর ভালবাসা দিয়ে সন্তানদের বড় করে তোলেন, কোনো সন্তানের পক্ষে কি তা সারাজীবনেও ভোলা সম্ভব! তাইতো মায়ের প্রতি ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই উদযাপন করা হয় মা দিবস। আর তাই এবারের মা দিবসে তুমি তোমার মাকে এমন কিছু উপহার দাও, যেন সে এত্তো খুশি হয়, এত্তো খুশি হয়, যেমন আর কখনোই হয়নি। তবে শুধু মা দিবসেই নয়, বছরের প্রতিটি দিনই আমরা এমনি করে ভালবেসে যাবো মাকে। মায়ের জন্য তো আর ভালোবাসার কমতি হবে না কখনো!



বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/বাবু/এনজে/এইচআর/মে ৪/১১