Main Story

বই পাগল একজন

মানিক চন্দ্র দাস

Books1206g

 

১৮৬০ সালের কথা আমেরিকার নিউ ইয়র্কের ছোট্ট এক শহর জেফারসন কাউন্টি। মেলভিল ডিউইই নামে এক ছেলে থাকতো এই ছোট্ট শহরে। তখন তার বয়স ছিলো বারো বছর। ওই সময় এ বয়সী বেশির ভাগ ছেলেই স্কুলে যাওয়ার পাশাপাশি কাজ করতো টাকা পয়সা রোজগারের জন্য। আমাদের ডিউইও তাই করতো। ট্রেন ডিপো থেকে মালপত্র টানাটানির কাজ, কাঠ কাটা এই সব কাজ করতো সে। মাঝে মাঝে তার বাবাকে দোকানে সাহায্য করতে হতো তাকে। অনেকক্ষণ কাজ করে হয়তো কয়েকটা পেন্স রোজগার হতো।

Books1206a মেলভিল ডিউই তার রোজগারের টাকা অন্য বাচ্চাদের মতো খেলনা, চকলেট কিনে নষ্ট করতো না। সে টাকাগুলো জমিয়ে রাখতো। প্রথম যেদিন তার জমানো অর্থের পরিমাণ দশ ডলার হলো সেদিন সে ওয়েবস্টারস আনঅ্যাব্রিজড ডিকশনারি কিনে বাড়িতে ফিরে এলো। এই ডিকশনারিতে আসলে যে কোন শব্দের বিস্তারিত ব্যাখা থাকে। তাহলে বুঝতেই পারছো ডিকশনারিটার আকারটা কেমন হবে। যাই হোক, আসার সময়ও তার মুখ গম্ভীর। কারণ হাত ভর্তি ইট সাইজের কিছু বই।

 

আমাদের মেলভিল ডিউই পরবর্তী জীবনে একজন শিক্ষক হয়েছিলো। সে তার ছাত্রদের উপহার হিসেবে কিনে দিতো আনঅ্যাব্রিজড ডিকশনারি। নিজের কাছেও বেশ কয়েক সেট পাহাড় প্রমাণ এই বই ছিলো। যখন তখন ডিকশনারি খুলে শব্দার্থ দেখার একটা অভ্যাস তার ছিলো।

Books1206d

 

ডিউই পড়তে ভালোবাসতেন, জিনিসপত্র খুটিয়ে দেখার একটা অভ্যাসও তার ছিলো। এই সব জিনিষপত্রের মধ্যে তিনি নিজেও ছিলেন। তিনি তার পঞ্চদশ জন্মবার্ষিকীতে ডায়েরিতে লিখেছিলেন, “আজ আমার বয়স পনেরো হলো। আমার ভর মাপলাম। আমার ভর হচ্ছে একশো পঁচিশ পাউন্ড, আমার উচ্চতা পাঁচফুট সোয়া পাঁচ ইঞ্চি। আমার ব্যক্তিগত যেসব মালামাল আছে তার অর্থ মূল্য একশো পঁচিশ ডলার।”

 

Books1206b কৈশোরে দীর্ঘদিন চিন্তাভাবনা করে তিনি ভবিষ্যতে কী করতে চান তা ঠিক করলেন। তিনি ঠিক করলেন, মরার আগে দুনিয়াটাকে আরেকটু সভ্য আর বাসযোগ্য করে যাবেন। লোকজনের বিভিন্ন বাজে অভ্যাস দূর করার চেষ্টা করবেন। এই সংস্কার চেষ্টা বা রিফর্ম করা হলো তার জীবনের লক্ষ্য। লক্ষ্য থেকে যাতে বিচ্যূত হতে না হন, সে জন্যে তিনি দুটো বড় বড় লোহার ‘আর’ অক্ষর বানিয়ে ঘরের দেয়ালে আর বাড়ির দরজায় লাগিয়ে দিয়েছিলেন। বুঝতেই পারছো ‘আর’ অক্ষরের মানে হচ্ছে রিফর্ম বা সংস্কার করা।

সময়ের অপচয় আর দুচোখের বিষ ছিলো, সময়ের অপচয় কী করে রোধ করা যায় সেটাও ছিলো তার একটা লক্ষ্য। এ কারণে তিনি লেখার ক্ষেত্রে নতুন ধরনের বানান রীতি প্রবর্তনের চেষ্টা করেন। যেমন- school এর জায়গায় skool, hiney এর জায়গায় hony, through এর জায়গায় thru। মানে যেসব শব্দ সহজে অন্য অক্ষর দিয়ে লেখা যায় তা কেন বেশি অক্ষর ব্যবহার করে জটিল করা হবে। এ ছিলো ডিউই-এর প্রশ্ন। লাখ টাকার প্রশ্ন।

ডিউই আরও বিশ্বাস করতেন প্রচলিত পরিমাপ পদ্ধতি পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। সবার মুক্ত বায়ুতে ব্যায়াম করা উচিৎ, প্রত্যেকের আজীবন শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। তিনি বলতেন, “নদী যখন চলা বন্ধ করে তখন তাতে কাদা জমে। নদী মরে যায়। মানুষ ও সেরকম নদীর মতো।”

Books1206e ডিউই এর বয়স যত বাড়ছিলো বই এর প্রতি তার ভালোবাসা বাড়ছিলো সমান হারে। বলতে গেলে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালবাসতো সে বইকে। একদিন তার ক্লাশরুমে আগুন ধরে যায়। তিনি আর কিছু না, শুধু বই বাঁচানোর জন্য পাগল হয়ে গেলেন, একসময় পুরো বিল্ডিংয়ে আগুন ছড়িয়ে গেল। তিনি সেই আগুনের মধ্য থেকে বই বের করতে আনার চেষ্টা করলেন। শেষ মেষ সব বই বাঁচানোর পর তিনি ঢলে পড়লেন। কারণ প্রচুর ধোঁয়া তার ফুসফুসে ঢুকে গেছে। ডাক্তাররা তাকে কষ্ট করে বাঁচালেন ঠিকই, কিন্তু বলেন দিলেন, দু বছরের বেশি তিনি বাঁচবেন না। ডাক্তারের কথা ভুল প্রমাণ করে তিনি দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন।

দীর্ঘদিন এই বেঁচে থাকার সময়টাতে সাফল্য এসে ধরা দিলো- সেটা অবশ্যই বই সংক্রান্ত এক সাফল্য। একদিন আর্মহাস্ট কলেজের লাইব্রেরিতে ঢুকেছিলেন ডিউই। লাইব্রেরিতে বই সাজানো, কিন্তু বইগুলো সাজানো ছিলো রঙ আর আকার অনুসারে। কোন কার্ড ক্যাটালগ কিছুই নেই। বই খুঁজে পেতে হলে লাইব্রেরিয়ানকে নিয়ে সব আলমারির তাকে খুঁজতে হয়। ভাগ্য ভালো থাকলে তবে বই পাওয়া যায়। ম্যালা ঝামেলা। কখনও কখনও বই খুঁজতে ঘন্টার পর ঘন্টা লেগে যেতো। নষ্ট হতো অনেক মূল্যবান সময়।

Books1206fএতে হতাশ হলেন ডিউই। বই খুঁজতে এতো সময় গেলে লোকে পড়বে কখন? সমস্যা সমাধানে তিনি রাত-দিন ভাবতে লাগলেন। তিনি জানতেন, লেগে থাকলে সব সমস্যারই সমাধান হয়। এরপর দীর্ঘ ভাবনার পর কোন এক রোববার তার মাথায় সমাধান এলো। সময়টার ব্যাপারে স্মৃতি রোমন'ন করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, “চেয়ারের মধ্যেই আমি লাফিয়ে উঠেছিলাম। চিৎকার করে উঠলাম, ইউরেকা! ডেসিমেল পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।”

বই সাজানোর ব্যাপারে তার দেয়া তত্ত্বটি হচ্ছে, “প্রথমে বইটি কোন বিষয়ের তা জানতে হবে।”
তার তত্ত্বানুযায়ী সব বইকে দশটি মূল ভাগে ভাগ করা হয়। মূল ভাগের মধ্যে আবার দশটি উপভাগ, উপভাগের ভেতর আরও ভাগ। একই বিষয়ে নতুন আসা সব বই থাকবে পাশাপাশি, আলমারির একই তাকে।

Books1206c

 

১৮৭৬ সালে ডিউই তার এই তত্ত্ব প্রকাশ করেন। তার তত্ত্বের নাম ডিউই ডেসিম্যাল সিস্টেম অফ ক্ল্যাসিফিকেশন। ডেসিম্যাল শব্দের অর্থ হলো দশ ভিত্তিক ব্যবস্থা।

এর পর সারা পৃথিবীর লাইব্রেরিগুলো ডিউই এর তত্ত্বানুযায়ী বই সাজানো শুরু করে। আজ এই বিশ্বে ডিউই এর তত্ত্ব বিশটিরও বেশি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। সেই বইও আছে লাইব্রেরিতে।

মেলডিল ডিউই তার বইয়ের নেশার কারনে বই সাজানোতে লাইব্রেরীতে চিরদিনের জন্যে অমর হয়ে গেলেন।


বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/মানিক চন্দ্র দাস/এবি/এমআইআর/০৪ ডিসেম্বর