Main Story

বুড়ো ‌'রিপ ভ্যান উইংকেল'

রকিবুল হক

পাহাড়ের মনোরম পরিবেশে ঘুমাচ্ছিল এক বুড়ো। পুরো মুখে তার দাড়ি গোঁফে ভরা। ঘুম ভাঙ্গার পর বেশ একটা আড়মোড়া ভাঙলো সে, ভাবলো, ‘বাপরে, আমি কি সারারাত এই পাহাড়ে গাছতলায় ঘুমালাম নাকি?’ কিন্তু সে তখনও জানতো না সবমিলিয়ে সে সর্বমোট ২০ বছর একটানা ঘুমিয়ে কাটিয়েছে।
বুড়োটার নাম রিপ ভ্যান উইংকেল।

ripVanWinkle.jpgবুড়োটা ছিল খুবই অলস, তার একটা খামার ছিল কিন্তু আলসেমি করে সে তার কোন যত্নই করত না। একারনে সে প্রায়ই তার বউ-এর ঝাড়ি খেত। আলসেমি করলেও সে তার বউকে ভয়ও পেত বেশ। এই আজব বুড়োটা কেন এতদিন ঘুমালো, ঘুমানোর পর তার কি দশা হল- এই কাহিনী লিখে বিখ্যাত হয়েছিলেন আমেরিকান লেখক ওয়াশিংটন আর্ভিং। তিনি ১৮১৯ সালে ‘রিপ ভ্যান উইংকেল’ লিখেছিলেন। এছাড়াও তিনি আরো একটি গল্প লিখে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন, সেটার নাম হচ্ছে ‘ দ্যা লিজেন্ড অফ স্লিপি হলো’।

এই আমেরিকান বিখ্যাত লেখকটির জন্ম ১৭৮৩ সালের এপ্রিলের ৩ তারিখে। বেঁচে থাকলে এই মাসের ৩ তারিখে তার জন্মদিন হতো ১২৬ বছর। কিন্তু তিনি মারা গেছেন ১৮৫৯ সালের নভেম্বরের ২৮ তারিখে। এই বিখ্যাত লেখক এবং তার অমর সৃষ্টি ‘রিপ ভ্যান উইংকেল’-কে নিয়ে এবারের কিডজের বিশেষ রচনা। 

192.jpgআর্ভিং-এর শৈশব- তিনি জন্মগ্রহণ করেন এক ব্যবসায়ী পরিবারে। ব্যবসার কারণে তার পরিবার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে  বেড়াত। তাই আর্ভিং-এরও বেশ কিছু জায়গা ঘুরে বেড়ান হয়। তবে ব্যবসা করলেও আর্ভিং-এর বাবা, ভাই কিন্তু ছিলেন বেশ সাহিত্যমনা, সে কারণে পড়ার বই বাদ দিয়ে গোয়েন্দা উপন্যাস, থ্রিলার বই- এসব পড়তে তার কোন বাধা ছিল না। আর বড় হবার পরে তো তিনি পেশা হিসেবে লেখালেখিটাকেই বেছে নেন, সেটাও তার পরিবারের কাছ থেকে সহায়তা পেয়ে।
পনের বছর বয়সে তিনি ‘হলুদ জ্বরে’ আক্রান্ত হন। তখন আরোগ্য লাভের জন্য তাকে পাঠানো হয় নিউইয়র্কের এক গ্রামে, নাম ‘স্লিপি হলো’। সেখানে তিনি গ্রামীণ পরিবেশে মুগ্ধ হন, তাকে সবথেকে বেশি আক্রষ্ট করে সেখানকার বেশকিছু প্রাচীন রূপকথা, সেগুলো একেবারে তার মাথায় গেঁথে থাকে। পরে অবশ্য তিনি সেগুলো নিয়ে একটা গল্পই লিখে ফেলেন।

IrvingIrvPl.jpg১৮০২ সালে, উনিশ বছর বয়সে আর্ভিং প্রথম লেখালেখি শুরু করেন। তার প্রথম লেখা ‘দ্যা মর্নিং ক্রনিকল’ ছাপা হবার পরই বেশ সারা ফেলে। সেটা নিয়ে তৈরি করা হয় নাটক। তিনিও তাড়াতাড়ি পেয়ে যান খ্যাতি।
তিনি তার জীবনে বহু ছোটগল্প, ইতিহাস, জীবনী লিখেছেন। তার কীর্তিতে আমেরিকাবাসী মুগ্ধ হয়ে নিউইয়র্কের একটি ছোট্ট শহরের নাম দেয়া হয় আর্ভিংটন, সেখানে রাখা হয়েছে তার আবক্ষ মূর্তি।

 

k.jpgএবার তার অমর কীর্তি ‘রিপ ভ্যান উইংকেল’ নিয়ে কিছু কথা বলি।  আগেই বলেছি বুড়োটা ছিল খুবই অলস, যখন তখন ঘুমিয়ে পড়তো। দেখা গেল সে গেছে খামারে কাজ করতে, সেখানে গিয়ে দিব্যি খড়ের আটি জরিয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। এভাবে সে প্রায়ই কাজে ফাঁকি দিত। এই নিয়ে তার বউ ( বউ-এর নাম ড্যাম ভ্যান উইংকেল) খুবই মেজাজ করত। তার আবার এমনিতেই মেজাজ ছিল খুব খারাপ, এরপর যদি দেখে যে তার জামাই কাজ না করে ঘুমাচ্ছে, তাহলে তো আরো ক্ষেপার কথা। প্রায়ই সে রিপ ভ্যান উইংকেলকে বকাঝকা করত, কোন কোন সময় দু-চারটা চড়-থাপড়ও মারতো। এত কড়া শাসন রিপের ভালো লাগতো না, তাই সে ভাবলো একদিন পালিয়ে যাবে। একদিন ঠিকই সে পালালো, চলে গেল দুরের ক্যাটস্কিল পাহাড়ে।
of_Rip_van_Win.jpgসেখানে গিয়ে তার দেখা হলো অদ্ভুত জামা পরা এক লোকের সঙ্গে। সেই লোক তাকে খেতে দিল এক আজব পানীয়। সেটা খেতে একটু ঝাঝ হলেও রিপ পুরোটাই খেয়ে ফেলল। খাওয়ার পরই তার প্রচন্ড ঘুম ধরল। এমনিতেই সে বড্ড ঘুমকাতুরে, তার পরে যদি আবার সঙ্গে যোগ হয় পানীয়- তবে তো কথাই নেই।

তবে ঘুম থেকে উঠার পরে তার খুব মেজাজ খারাপ লাগলো, কেননা সে একেবারে গাছতলায় ময়লার মধ্যে ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু রাগ শেষ হবার পর আসে অবাক হবার পালা, তার সবকিছু পুরানো হয়ে গেছে। পরে টের পায় সে বিশটা বছর ঘুমিয়ে কাটিয়ে ছিল।
405px-Ripvanwinkle.jpgপাহাড় থেকে নেমে এসে তার বাড়িতে গিয়ে দেখে তার বউটা মরে গেছে। সংসার চালায় তার মেয়ে। তার সব বন্ধুও মরে গেছে। কি আর করা, রিপ তখন তার স্বভাবমতো ঘুমিয়েই কাটায়, আর কেউ এলে তাকে তার ঘুমের কাহিনী শুনায়।

ripbookSM.jpgরিপ ভ্যান উইংকেল নিয়ে পরবর্তীতে অনেক মঞ্চনাটক, নাটক, সিনেমা তৈরি হয়েছিল। ১৮৯৬ সালে সর্বপ্রথম মঞ্চনাটিকা তৈরি করা হয়, তখনকার বেশ নামকরা অভিনেতা জোসেফ জেফারসন বুড়ো রিপের ভূমিকায় খুবই ভালো অভিনয় করে ‘রিপ ভ্যান উইংকেল’-কে আরো জনপ্রিয় করে তোলেন।

যাই হোক, বেশি ঘুমানো কিন্তু মোটেই ভালো কথা নয়। তারপর যদি টানা বিশ বছর কেউ ঘুমায়, তাহলে তো সর্বনাশ! পড়ালেখা করবে কে?