Main Story

ছুঁতে চাই অনন্ত আকাশ

ইমন শিকদার

জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি পৃথিবীর সর্বপ্রথম অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল টেলিস্কোপটিতে চোখ রেখে মহাকাশে প্রথম উঁকি দেন চারশো বছর আগে! এরপর দিন গেছে, বেড়েছে টেলিস্কোপের সংখ্যা, বেড়েছে আকাশদর্শীর সংখ্যা, বেড়েছে জানার পরিধি! অনুসন্ধানী মানুষ এখন অনন্তের যাত্রী, খুঁজছে সৃষ্টির সূচনা-মুহূর্ত, মহাবিশ্বের সীমানা!

AAKASHDORSHEE-_Star_Party_0.jpgজ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলির অবদানকে শ্রদ্ধা জানাতে এবং ‘টেলিস্কোপ’ যন্ত্রের বয়স ৪০০ বছর পূর্ণ হওয়ায়জ্জ‘আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংঘ’ ও ‘ইউনেস্কো’ ২০০৯ সালকে ঘোষণা করেছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার অব অ্যাস্ট্রোনমি’ বা ‘আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বর্ষ’! পৃথিবীর দেশে দেশে তাই ২০০৯ সালের পুরোটা জুড়েই চলছে আকাশ দেখার রকমারি সব আয়োজন! এমনই এক কর্মসূচিজ্জ ‘হানড্রেড আওয়ার্স অব অ্যাস্ট্রোনমি’ অর্থ্যাৎ একশ ঘন্টা আকাশ দেখা। এপ্রিলের ২ থেকে ৫ তারিখের একটানা ‘একশো ঘন্টা’- হাজারও টেলিস্কোপে চোখ রেখে মহাকাশে উঁকি দিয়েছে ১৩০টি দেশের প্রায় ১০ লাখ ‘আকাশদর্শী’! মর্ত্যের অগুণতি মানুষকে মহাকাশ দেখার এই আয়োজন ছিল এককথায় অনন্য ! সে আয়োজনে শরীক হতেই বাংলাদেশের ‘আকাশদর্শী স্পেস এক্সপ্লোরার সোসাইটি’ গত ৪ এপ্রিল শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকার বর্ধিত পল্লবীর ‘ছায়ানীড়’ আবাসিক এলাকায় আয়োজন করে ‘স্টার পার্টি’!

DSC00048.jpg‘হানড্রেড আওয়ার্স অব অ্যাস্ট্রোনমি’ কর্মসূচির বিষয়বস' বিশ্বের ২৫টি ভাষায় রূপান্তর করা হয়েছে! বাকি ছিল বাংলা ভাষা! ‘আকাশদর্শী স্পেস এক্সপ্লোরার সোসাইটি’ বাংলায় অনুবাদ করেছে- ‘শত ঘন্টার দৃষ্টিছোঁয়ায় ছুঁতে চাই অনন্ত আকাশ’! বাংলায় রচিত এই ‘প্রতিপাদ্য’ ঠাঁই পেয়েছে ‘স্টার পার্টি’র ব্যানারে, আকাশদর্শীদের টি-শার্টে এবং ভিডিও ও স্থিরচিত্রে- যা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৌছে গেছে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আকাশপ্রেমীর কাছে!

phoca_thumb_l_DSC00005.jpgবহুতল বাড়ির ছাদে লোডশেডিঙের অন্ধকারে অনুষ্ঠিত এই স্টার পার্টিতে অংশ নিয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আকাশপ্রেমী। বিশেষ করে সদ্য স্কুলে ভর্তি হওয়া ক্ষুদে আকাশদর্শীদের প্রাণোচ্ছ্বল অংশগ্রহণের ফলে আনুষ্ঠানিকতার মাত্রা ছাপিয়ে স্টার পার্টি পরিণত হয় আনন্দঘন উৎসবে! অরিয়ন ইন্টেলস্কোপ ডবসোনিয়ান টেলিস্কোপ-এর সাহায্যে, সবাই বিস্ময়ের আনন্দ নিয়ে দেখেছে ২ লাখ ৪০ হাজার মাইল দূরে থাকা চাঁদের আসল চেহারা! দেখেছে দূরবর্তী তারাদের ঝিকিমিকি! শনির বলয়টা ভালো করে দেখার ইচ্ছে থাকলেও, বাঁধ সেধেছে মেঘলা আকাশ! দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর জন্য আয়োজকেরা ল্যাপটপের স্ক্রিনে দেখিয়েছেন মহাকাশ সম্পর্কিত মনকাড়া প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টারি নাইট’! অনলাইনে ছিল ‘আকাশদর্শী স্পেস এক্সপ্লোরার সোসাইটি’র ওয়েবসাইট এবং ‘স্টার পার্টি’র অবস্থান পর্যবেক্ষণেরও আয়োজন। খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন আর অংশগ্রহণকারীদের ‘মুক্ত আলোচনা’র পাশাপাশি হৈ-হুল্লোড় আর ছবি তোলা- ভিন্ন মাত্রা এনেছে অনুষ্ঠানে!

phoca_thumb_l_DSC00054.jpgস্কুল-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অভিভাবকও! সম্মিলিত আলোচনায় একমত হলেন সবাই- বিশ্বে ‘অ্যাস্ট্রোনমি’র বা জ্যোতির্বিদ্যা চর্চা এখন আর কোনো সৌখিনতার বিষয় নয়। আমাদেরও উচিত এই বিষয়টিকে আরো বোধগম্য করে নেয়া। তা না হলে আমরা এ ক্ষেত্রটিতে পিছিয়েই থাকবো।
‘স্টার পার্টি’র আয়োজকরা জানালেন- বছরের বারো মাসেই মহাকাশ সংক্রান্ত ইভেন্টের অভাব নেই কোন। ফলে শহরাঞ্চলের বহুতল ভবনের ছাদ, গ্রামের খোলা মাঠ, বেড়িবাঁধ সংলগ্ন ফাঁকা জায়গা, নদীর উঁচু পাড়, পার্বত্য এলাকার পাহাড়-টিলা, সমুদ্রসৈকত এবং সুবিধাজনক যে কোন জায়গায় নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতে পারে ‘স্টার পার্টি’। এ-জন্য শুধু প্রয়োজন আকাশ দেখার উপযোগী একটি স্বল্পমূল্যের ‘টেলিস্কোপ’। টেলিস্কোপকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হতে পারে অসংখ্য ‘স্টার পার্টি’ বা আকাশ দেখার উৎসবময় আয়োজন। এর মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা সম্ভব একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যারা জয় করবে মহাকাশের অজানাকে। শহুরে জীবনের বাঁধা ছকে আটকে পড়া বাসিন্দাদের জন্যও তৈরি হবে আনন্দঘন নির্মল বিনোদনের সুযোগ!

phoca_thumb_l_DSC09941.jpgস্বল্পমূল্যে টেলিস্কোপ তৈরি ও তা বিপণনের বিষয় নিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার অব অ্যাস্ট্রোনমি’র আওতায় ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল নোড’। মাত্র ১৫ ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই টেলিস্কোপের নাম দেয়া হয়েছে ‘গ্যালিলিওস্কোপ’- যা দিয়ে শনি গ্রহের বলয়, বৃহস্পতির মেঘ পর্যন্ত দেখা যাবে। আগামী ২২ জুলাইয়ের পূর্ণ সূর্যগ্রহণকে উপলক্ষ্য করে এই স্বল্পমূল্যের টেলিস্কোপ বিশ্বব্যাপী প্রায় এক কোটি মানুষের কাছে পোঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্বল্পমূল্যের টেলিস্কোপের দেশীয় সংস্করণ তৈরিতে আমাদের দেশের তরুণ উদ্ভাবকেরা এখন থেকেই যদি উদ্যোগী ভুমিকা নেন, তাহলে আকাশ পর্যবেক্ষণে আমাদের অনগ্রসর অবস্থানে একটা গুণগত ও মৌলিক পরিবর্তন আসতে পারে।