Main Story

আমাদের যতো নৌকা

অদ্বিতী ডি. কস্তা

তুমি জানো, আমিও জানি, সবাই জানে এদেশ নদীমাতৃক দেশ। আর যেহেতু নদীমাতৃক দেশ কাজেই এদেশে নৌকাও থাকবে বেশি, এটাই তো হবার কথা। ঠিক তাই। আমাদের দেশে নদীর বুকে ঢেউ এর সঙ্গে দোল খেতে খেতে চলে অসংখ্য নৌকা। কখনো কি ভেবে দেখেছো, যে দেশে এতো নদী সে দেশে কতো ধরনের নৌকা রয়েছে? ভাবছো, নৌকা তো নৌকাই, এর আবার ধরন কি! কিন্তু না, কতো ধরনের নৌকাই যে আছে বাংলাদেশে তার কোন ইয়ত্তা নেই। কি অবাক হচ্ছো? আজ তোমাদের বাংলাদেশের নৌকার গল্পই শোনাবো।

বাংলাদেশের একেক অঞ্চলে একেক ধরনের নৌকার দেখা মেলে। তাদের যেমন আলাদা গঠন তেমনি আলাদা তাদের ধারণ করার ক্ষমতাও। কিন্তু দুঃখের কথা কি জানো, এই নৌকাগুলোর অধিকাংশই আজ বিলুপ্তির খাতায় ঠাঁই পেয়েছে। মানে, আমরা চাইলেও আর এখন সেই নৌকাগুলো দেখতে পারবো না।

আগের দিনে বড় বড় গাছের গুঁড়ির মাঝখানটা খোদাই করে নৌকা বানানো হত। পরে বাঁশ, বেত দিয়েও নৌকা বানানো হতো। শেষ পযর্ন্ত অবশ্য কাঠ দিয়েই নৌকা বানানোর শুরু হয়, তবে খোদাই করে নয়, কাঠের তক্তা দিয়ে। নৌকা কি দিয়ে বানানো হয় তা তো জানলাম। এবারে তবে চলো বাংলাদেশের নৌকার গল্প শুনি।

 

 BishesRochona_sampan.jpg

সাম্পান
সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে বেড়ায় সাম্পান। চিটাগাং, কুতুবদিয়া এসব এলাকায় বেশ সাম্পান নৌকার দেখা মেলে। এই নৌকাগুলোর সামনের দিকটা উঁচু আর বাঁকানো হয়, পিছনটা থাকে সোজা। প্রয়োজনে এর সঙ্গে পাল থাকে আবার কখনও থাকে না। এর মাঝির সংখ্যাও কম। এক মাঝিচালিত এই নৌকাটি যাত্রী পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি ল¤^ায় হয় ৫.৪০-৬.১০ মিটার এবং চওড়া হয় ১.৪০-১.৫৫ মিটার পর্যন্ত। একসময় বড় আকারেরও সাম্পান দেখা যেতো কুতুবদিয়া অঞ্চলে যা এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই সাম্পান গুলোর দৈর্ঘ্য ১২.৮০ থেকে ১৪.৬৫ মিটার পর্যন্ত হতো এবং প্রস্থ ছিলো ৪.৬০ থেকে ৫.২০ মিটার। সাত জন করে মাঝি থাকতো আর থাকতো তিনকোণা আকারের তিনটি করে পাল। এই সাম্পানগুলো ব্যবহৃত হতো মাল পরিবহনের জন্য।

BishesRochona_goyna.jpg
গয়না
এই নৌকাটির নাম কিন্তু মজার, গয়না। দুঃখজনক হলেও সত্যি এই নৌকাটিও নাম লিখিয়েছে বিলুপ্তির খাতায়। গয়নার নৌকাটি আকৃতিতে মাঝারি ধরণের, দৈর্ঘ্যে ৭.৬০ থেকে ১২.৮০ মিটার পর্যন্ত হতো আর প্রস্থে হতো ১.৮০ থেকে ৩.০ পর্যন্ত। এদের দেখা মিলতো কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে। মূলত যাত্রী পারাপারের কাজেই এদের ব্যবহার করা হতো। একবারে প্রায় ২৫-৩৫ জন পর্যন্ত যাত্রী বহন করার ক্ষমতা ছিলো এই নৌকাটির। আবার রাজশাহী অঞ্চলে এর থেকেও বড় আকারের গয়না নৌকার দেখা মিলতো। এদের দৈর্ঘ্য ছিলো প্রায় ১৪.৬০-১৮.২০ মিটার। এরা আকারে যেমন বড়ো তেমনি এ নৌকায় বেশী সংখ্যক যাত্রীও উঠতে পারতো। এতে যাত্রী উঠতে পারতো প্রায় ৪০-৫০জন। ছোট খাটো একটা বাসের সমান, তাই না?

 BishesRochona_bojra.jpg

বজরা
আগের দিনে ধনী লোকেরা শখ করে নৌকা ভ্রমণে যেতেন। তাদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিলো বজরা নামের নৌকাগুলো। বজরাতে তারা একরকম প্রায় তাদের ঘরবাড়ি বানিয়ে নিতেন। ফলে এতে খাবারদাবার থেকে শুরু করে সব ধরনের সুযোগ সুবিধাই থাকতো। বজরাতে থাকতো ঘর, আবার তাতে জানালাও থাকতো। মজার ব্যাপার তাই না? ঠিক যেন ভেসে বেড়ানো একটি বাড়ি। কোনটিতে আবার পালও থাকতো। এতে থাকতো চারজন করে মাঝি। এর দৈর্ঘ্য ছিলো ১৩.৭২ থেকে ১৪.৬৫ মিটার পর্যন্ত আর প্রস্থ ২.২৫ থেকে ৩.২০ মিটার পর্যন্ত। বজরা মূলত সিরাজগঞ্জ ও পাবনা অঞ্চলে দেখা যেতো।

BishesRochona_baich.jpg

বাইচ
নৌকা বাইচ দেখেছো কখনও? এটি কিন্তু আমাদের দেশের একটি জনপ্রিয় খেলা। আগে দেশের অনেক জায়গাতেই বাইচের নৌকা ছিলো। এখনও কিছু কিছু অঞ্চলে এর দেখা মেলে। বাইচের নৌকা লম্বায় ১৫০ থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত হয়। অনেক বড়, তাই না? প্রতিযোগিতার সময় এতে ২৫ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত মাঝি থাকতে পারে। আগে নবাব-বাদশাহরা বাইচের আয়োজন করতেন। এসব বাইচের নৌকার সুন্দর সুন্দর নাম দেয়া হতো। যেমন, পক্সখীরাজ, ঝড়ের পাখি, দ্বীপরাজ, সোনারতরী আরো কতো কি! কিশোরগঞ্জ, পাবনা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, নোয়াখালি, কুমিল্লা ইত্যাদি অঞ্চলে এসব নৌকার দেখা মিলবে।

BishesRochona_joranouka.gif

জোড়া নৌকা
পাশাপাশি একসঙ্গে দুটি নৌকা ভাসতে দেখেছো কখনও? মানে দুটি নৌকা মিলে একটি নৌকা। এলোমেলো লাগছে ঠিক না! কখনও যদি রাজশাহীতে গিয়ে চোখকান খোলা রাখো তাহলে হয়তো দেখতেও পারো এ ধরনের নৌকা। পাশাপাশি দুটো নৌকা জোড়া লাগিয়ে এই নৌকা বানানো হয়। এগুলি ল¤^ায় প্রায় ১৩.৭০ থেকে ১৬.৭৫ মিটার হয়ে থাকে আর চওড়া হয় ৫.৫০ থেকে ৬.১০ মিটার পর্যন্ত। এ নৌকায় মাঝি থাকে ৫-৬ জন। এটি মূলত মালবাহী নৌকা।

BiseshRochona_mayurpankhi.jpg

ময়ূরপঙ্ক্ষী
রূপকথার গল্পে তো ময়ূরপঙ্ক্ষী নাও এর কথা শুনেছো, তাই না? বর্তমানে খুব কম হলেও বাস্তবেও কিন্তু এই নৌকাটি দেখা যায়। এই নৌকাটিও রাজা বাদশাহদের সৌখিন বস্তু ছিলো। এর সামনের দিকটা দেখতে ময়ূরের মতো বলে এর নাম দেয়া হয়েছে ময়ূরপঙ্ক্ষী। এ নৌকাগুলি দৈর্ঘ্যে ১১.৪০ থেকে ১৩.৭৫ মিটার পর্যন্ত হয় আর প্রস্থে ২.৭৫ থেকে ৩.০ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এ নৌকা চালাতে চার জন মাঝি প্রয়োজন। এই নৌকায় থাকতো দুটো করে পাল।
BishesRochona_massdhora.jpg
মাছ ধরার নৌকা
মাছ ধরার নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এর বৈশিষ্ট্যটা কি। জেলেরা এ নৌকাগুলোতে ভেসে ভেসে দূর নদীর বুকে মাছ ধরে। কিন্তু জানো এই অতি সাধারণ মাছ ধরার নৌকারও আবার রকমফের আছে। কোনোগুলো আকারে হয় ছোট আবার কোনোগুলো হয় বড়ো।
যেমন বরিশাল অঞ্চলের নদীতে মাঝারি আকারের এক ধরনের মাঝ ধরার নৌকার দেখা পাওয়া যায়। এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭.৩৯ থেকে ৯.১০ মিটার হয়। এতে ৩ জন মাঝি বা জেলে থাকে। আবার চাঁদপুরে আরেক ধরনের মাছ ধরার নৌকা দেখা যেতো। এগুলির দৈর্ঘ্য ছিলো ৯.১৫ থেকে ১১.৪৫ মিটার পর্যন্ত। যদিও এখন আর এই নৌকাগুলো দেখা যায় না। এতে মাঝি থাকতো ৮-১০জন করে। উপক‚লীয় চট্টগ্রাম অঞ্চলে বড় আকারের মাছ ধরার নৌকার দেখা মিলবে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে ভেসে এগুলো মাছ ধরে। এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫.২৫ থেকে ১৮.৫ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
BishesRochona_dingee.jpg
ডিঙ্গি
গ্রাম বাংলার সবচে পরিচিত নৌকাটির নাম হচ্ছে ডিঙ্গি। নদীর তীরে যারা বসবাস করেন তাদের সকলেই প্রায় এ নৌকাটি ব্যবহার করেন নদী পারাপার বা অন্যান্য কাজে। আকারে ছোট বলে এই নৌকাটি চালাতে একজন মাঝিই যথেষ্ট। যদিও একজন মাঝিই চালাতে পারে কিন্তু মাঝে মাঝে এতে পালও লাগানো হয়।
BishesRochona_balar.jpg
বালার
নদীমাতৃক আমাদের এই দেশে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মালামাল পাঠানো বা যাতায়াতের জন্য নদী একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ব্যবসা ও বাণিজ্যের জন্য সেই আগেকার সময় থেকে এখনো পর্যন্ত নৌকা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কুষ্টিয়া অঞ্চলে তেমনি এক প্রকার নৌকার দেখা মেলে। এদের নাম বালার। এগুলো আকারে অনেক বড় হয় আর প্রায় ১২-৫৬ টন পর্যন্ত মালামাল বহন করতে পারে। এরা দৈর্ঘ্যে ১২-১৮ মিটার হয়ে থাকে আর বৈঠা বায় ১০-১২ জন মাঝি এবং পাল থাকে দুটো করে। ভাবো একবার, কি বিশাল ব্যাপার!

BishesRochona_batnai-podi.jpg

বাতনাই বা পদি

বালারের মতো খুলনা অঞ্চলে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য যে নৌকা ব্যবহৃত হতো এদের নাম হলো বাতনাই বা পদি। বালারের বর্ণনা শুনে যদি অবাক হয়ে থাকো তবে আরও অবাক হবার মতো কথা এখন বলবো। কারণ, এই নৌকাগুলি চালাতে ১৭-১৮ জন মাঝি লাগতো আর এগুলো দৈর্ঘ্যে হতো প্রায় ১৫.২৫-২১.৩৫ মিটার পর্যন্ত। এতে করে ১৪০-১৬০ টন মাল বহন করা যেতো আর ছিলো বিশাল আকারের চারকোণা একটি পাল। কিন্তু এখন এই দৈত্যাকৃতির নৌকাটি আর দেখা যায় না।


আমাদের এই ছোট সুন্দর বাংলাদেশের নদীতে এক সময় বিভিন্ন ধরনের নৌকা ভেসে বেড়াতো। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো দিন দিন এর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অনেক নৌকার নামই চলে গেছে বিলুপ্তির খাতায়। এই নামগুলো এখন শুধু গল্পে বা বইতেই পাওয়া যায়। আমাদের দেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে নৌকার এই বিচিত্র ভিন্নতার কিন্তু গভীর একটা সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এখন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাবার পথেই এই ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্যর কথা স্মরণ করে রাখতেই যেন সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে বিলুপ্তপ্রায় ৫০ টি নৌকা নিয়ে একটি চমৎকার প্রদর্শনী হচ্ছে। এই প্রদর্শনীটি চলবে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত। কাজেই বাঙালী হিসেবে আমাদের অবশ্যই এই নৌকাগুলো দেখে আসা উচিত। তবে চলো পড়ার পর্ব তো শেষ এবারে সবাই মিলে গিয়ে একবার দেখে আসি আমাদের সেই ঐতিহ্য।

 

 

বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/অদ্বিতী/শুভ/এইচআর/এপ্রিল ১৩/১০