ঈশানপুরের অপুর কান্ড

সুমন কায়সার

সকাল থেকেই মন খারাপ রায়হানের। ছুটির দিনের ভোরটায় অবশ্য বেশ ফুরফুরে মন নিয়েই হাঁটতে বেরিয়েছিল। ঠিক করেছিল অনেক দূর হেঁটে গিয়ে নদীর বাঁকে একটা খালি নৌকায় শুয়ে শুয়ে চিলদের ওড়াউড়ি দেখবে। আবার পাশেই এদিক-ওদিক পোতা বাঁশের খুঁটির মাথায় ঝিম মেরে বসে থাকা মাছরাঙার হঠাৎ ডাইভ দেখতেও দারুণ আনন্দ তার। কখনো দু’একটা নিঃসঙ্গ পানকৌড়ির মাছের সঙ্গে ডুবসাঁতারের পাল্লা। ঘন্টার পর ঘন্টা এসব দেখেও ক্লান্ত লাগে না ওর।

রায়হানের বাবা তার এই অভ্যাস জানেন। কাজেই ছুটির দিন সকালে হাঁটতে বেরিয়ে অনেক বেলা করে ফিরলেও দুঃশ্চিন্তা করেননা। জানেন, তার এই ক্লাস নাইনে পড়া ক্ষুদে প্রকৃতিপ্রেমিক ছেলেটা এমনই। পড়াশোনায় সে খারাপ করেনা কখনোই। বাজে ছেলেদের সঙ্গে মেশা বা অন্য কোনো দুষ্টুমিতেও নেই সে।

তো, সকালে নদীর বাঁকটার কাছে পৌঁছতেই রায়হান দেখে কালু হাজীর মাঠে ইয়াবড়ো এক গাড়ি। এই মাঠেই ওরা খেলে। বৈশাখী মেলা, ঈদ পুনমির্লনীর ফুটবল ম্যাচ আর ইদানিংকালের ক্রিকেট টুর্নামেন্টের বড়ো আয়োজন এখানেই হয়।

মাঠের এক দিকে ছোটাছুটি করছে কয়েকটি ছেলেমেয়ে। জীপমতো বড়ো গাড়িটার পাশেই একটা পিক আপ ভ্যান। তা থেকে ধরাধরি করে মস্ত একটা সাইনবোর্ড নামাচ্ছিলো কয়েকটা লোক। ঘাড় কাত করে সাইন বোর্ডটা পড়েও ফেললো রায়হান- ইডেন ভ্যালি হাউজিং। যা ভেবেছিল তাই। আরো এক সবুজখেকো কোম্পানি।

khelar-math

ছুটোছুটি করা বাচ্চাগুলোর একটু দূরে শতরঞ্জি বিছিয়ে ঘাসের ওপর বসেছেন এক ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা। ওদের বাবা-মা হবেন নিশ্চয়ই। একটা বেতের ঝুড়ি খুলে নানা খাবার-দাবার বের করছেন তারা। কাজের পাশাপাশি ছোটখাটো পারিবারিক পিকনিকেরও আয়োজন মনে হচ্ছে। গাড়ি নিয়ে হাওয়া খেতে এরকম আরো অনেকেই আসে। তবে তাদের সঙ্গে এদের তফাত হচ্ছে, এরা এসেছে এই সবুজ ধ্বংস করে ইট-সিমেন্টের জঙ্গল বানাতে।

এ এলাকার ধানের ক্ষেত,শাপলা আর কলমীর দামে ছাওয়া বিল রাতারাতি বুজিয়ে একের পর এক পৱ্লট বেচার ব্যবসা যারা খুলছে, অপু ভাই তাদের নাম দিয়েছে সবুজখেকো।

রায়হান আর তার বন্ধু-বান্ধবদের খুবই প্রিয় মানুষ অপু ভাই। ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। জানে না হেন বিষয় নেই। ওদের এক বন্ধু তার নাম দিয়েছে পেন ড্রাইভ। কারণ, যতো খটোমটো প্রশ্নই হোক, মুহূর্তের মধ্যেই উত্তর মিলবে অপু ভাইয়ের কাছ থেকে। এত জানে, কিন্তু অহঙ্কার নেই মোটেই। পাড়ার সবার বিপদ আপদে সবার আগে দৌড়ে যায়। এজন্য ঈশানপুরে একনামে চেনে তাকে।


ঢাকার একপ্রান্তের এই আধা গ্রাম আধা শহর ঈশানপুরে এখনো মানুষ পড়শির খোঁজ রাখার চেষ্টা করে। তেমন সাহায্য করতে পার্বক আর নাই পার্বক, অন্তত ‘কী খবর’, ‘কেমন আছেন’ এই প্রশ্নটা করে। রায়হানরা যখন ধানমন্ডির কাছে থাকতো তখন এমনকি পাশের ফ্ল্যাটের লোকদের সঙ্গেও জানাশোনা ছিল না ওদের। ফ্ল্যাটবাড়িতে এমনই হয়। তবে মূলত ঢাকার রাস্তাঘাটের ভয়ানক যানজটের জন্যই তিতিবিরক্ত হয়ে ওর বাবা বছর তিনেক আগে ঈশানপুরে চলে আসেন।

যাই হোক, ফেরার পথেই অপু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো।  সাইকেল থামিয়ে বাজার মোড়ের স্টেশনারি দোকান থেকে কিছু একটা কিনছিল ও। স্বাস্থ্যের জন্য ভালো বলে অপু ভাই এলাকায় বা কাছাকাছি চলাফেরা সাইকেলেই করে। যাক ভালোই হলো। ব্যাপারটা তাকে না জানানো পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলো না রায়হান।

ব্যাপার শুনে মহা মুখভার অপু ভাইয়ের।

“বিরাট ঝামেলা রে, রায়হান। এতোদিন একটু দূরে দূরেই ছিলো। এবার যে আমাদের ঘাড়ের ওপরই এসে পড়লো জমিখেকোরা। ওদের তো অনেক জোর। টাকার জোর, বড়ো বড়ো লোকের সঙ্গে খাতিরের জোর।”

“তবে ঘাবড়ে গেলে চলবে না। একটা কিছু করতেই হবে” কাঁধে হাত রেখে ওকে ভরসা দেওয়ার চেষ্টা করলো অপু ভাই।

ঠিক হলো, বিকেলে খেলতে গিয়ে সবাইকে জানাতে হবে বিষয়টা। সবাই যার যার বাবা-মাকে বলবে। আর পরদিন স্কুলে গিয়ে হেডমাস্টার স্যারকে বলে তার পরামর্শ চাইবে। তবে অপু ভাই বললো, এলাকার নেতাদের কারো কাছে তারা যাবে না। কারণ এদের অনেকে নিজেই খাল-বিল দখল আর বেচাকেনার ব্যবসা করে। এ নিয়ে মারামারিও হয় তাদের মধ্যে। আবার একজনকে ডাকলে আরেকজন ভাববে ওরা ওর দলের লোক। ব্যস, লোকজনকে দুই দলে ভাগ করে গোটা ব্যাপারটাকেই মাটি করবে তারা।

পরদিন ছুটির ঘন্টা বাজামাত্রই ছুট লাগালো রায়হান। তাড়াতাড়ি করার কারণ, অপু ভাইয়ের সঙ্গে
শান্তিতে একাই কথা বলতে চায় ও। পেছনে আরো কেউ জুটলে হয় এখন অঙ্ক বুঝিয়ে দেওয়া বা গল্পের বই ধার দেওয়ার বায়না মেটাতে হবে। ও এমনিতে বন্ধুদের সবসময়ই সাহায্য করে। কিন্তু এখন আর কোনোদিকেই মন নেই। ওর এতোদিনের একটুকরো পৃথিবীটা সবুজখেকোদের পেটে যেতে বসেছে যে!

ঝড়ের মতোই উড়তে উড়তে পথটা পেরোলো রায়হান। ভাবছিলো, ও নিশ্চয়ই আগে এসেছে। অপু ভাইয়ের কতোক্ষণ লাগবে কে জানে। কিন্তু একী! ও-ই যে আগে এসে বসে আছে! আরো বড়ো চমক তার পাশেই ঘাসের ওপর বসা তারই বয়সী ছেলেটা। আরে, এ সেই ছেলেটা না? সেই সাইনবোর্ড নিয়ে আসা পার্টি! হ্যাঁ, তাইতো। ও এখানে কী চায়? অপু ভাইয়ের ভাবে তো মনে হচ্ছে বেশ আলাপ জমিয়ে ফেলেছে। ব্যাপারটা মাথায় ঢুকছিল না রায়হানের।

কথা বলতে বলতে ঘাড় ফেরাতেই ওকে দেখে ফেললো অপু ভাই। দেখেই সোৎসাহে হাত নেড়ে ডাক, “এসে গেছিস! আয়, দ্যাখ কে এসেছে।”

পরিচয় হলো আরশাদের সঙ্গে। ওর বাবা বোরহান আহমেদই ইডেন ভ্যালি হাউজিং এর মালিক। আরশাদের নাকি সেদিন জায়গাটা দেখে খুব ভালো লেগে গেছে। ব্যস্ত ঢাকার এত কাছে এমন একটা গ্রাম গ্রাম জায়গা আছে তা ভাবতেই পারেনি কখনো। রাস্তায় জ্যাম না থাকলে ওদের গুলশানের বাড়ি থেকে বিশ মিনিটও না। তাই বড়ো ভাই ফারহানকে অনেক সেধে রাজি করে আজ আবার এসেছে। ওর ভাইয়ের অবশ্য এসবে তেমন আগ্রহ নেই। সে তার ল্যাপটপে গেম খেলছে গাড়িতে বসে।

অপু ভাই খুলে বললো ব্যাপারটা- “জানিস, আমি এসে দেখি আরশাদ একটা ফড়িংয়ের পেছনে ছুটছে বাচ্চাদের মতো। তখনি বুঝলাম ছেলেটা অন্যরকম। জীবনে গ্রাম না দেখা ফ্ল্যাটের খাঁচায় বড়ো হওয়া বাচ্চাগুলোর মতো নয়। তখন আমি ওকে বললাম, এই যে ফড়িংয়ের পেছনে ছুটছো, আর মাত্র ক’দিন। তারপরই এখানে হয়তো থাকবে এক সারি ফাস্টফুড আর স্টেশনারী দোকান।

আরশাদ একটু অপরাধী অপরাধী ভাব করে তাকালো রায়হানের দিকে। বললো, “জানো আমার মায়েরও না, জায়গাটা খুব পছন্দ হয়েছে। উনি বলেছেন, ‘এখানে যদি অ্যাপার্টমেন্ট না হয়ে আমাদের নিজেদের একটা বাংলো মতো বাগান বাড়ি করা যেতো তাহলে বেশ হতো।’ আমাদের তো গ্রামে বাড়ি নেই। আত্মীয়দের সবাই ঢাকা না হয় বিদেশে থাকে। কিন্তু বাবা এখানে বানাতে চান অ্যাপার্টমেন্ট। বিদেশি একটা পার্টি নাকি গলফ কোর্সেরও টাকা দিতে চায়। ওনার কোম্পানিটা অনেক বড়ো তো।”

রাগে পিত্তি জ্বলে গেলো রায়হানের।  দুনিয়ায় কোটি কোটি লোক খেতে পায়না, আবার গল্‌ফ কোর্স! যাদের ধানক্ষেত বুজিয়ে ওই গল্‌ফ কোর্স হবে তারা জীবনে ওখানে ঢুকতে পারবে একবারও?

তবে ওর মনে হলো এই ছেলেটার তো কোনো দোষ নেই। ও তো নিজে থেকেই এসে এসব বলছে। আর ব্যবহারও করছে বন্ধুরই মতো। ‘সান্টা মনিকা বিচ’ বা ‘আই লাভ নিউ ইয়র্ক’ টি শার্ট পরা অন্য কিছু বড়োলোকের ছেলে যারা বিদেশিদের মতো করে বাংলা বলে সেরকম নয়।

রায়হান বললো, “দ্যাখো আরশাদ, আমরা তো সবাই এই মাঠটায় খেলি। দু’তিনটা পাড়ার ছেলেরা এখানেই খেলে। আর এলাকায় মেলা বা কোনো বড়ো কিছু হলে এখানেই হয়। পাশের এই বিলে কিন্তু অনেক মাছ আছে। এলাকার অনেক পরিবার এ বিলের মাছ ধরে বা শাপলার মতো শাক-পাতা তুলেই চলে।

“তুমি হয়তো বলবে, যার জমি সে বেচে দিচ্ছে, এতে কী করার আছে? কিন্তু আমি বাবার কাছে শুনেছি, জমির মালিক কালু হাজী মারা যাবার আগে এই মাঠটা এলাকার মানুষের জন্য দান করে গেছেন। কিন্তু তার ছেলেরা মানতে চাইছেন না। হাজীসাহেব নাকি মুখে মুখে বলেছিলেন দানের ব্যাপারটা।

“আর হ্যাঁ, বিলটাও চাইলেই ভরা যাবে না। অপু ভাই বলেছে, সরকারি আইন আছে জলাভূমি ভরা যাবে না যখন তখন। আজকাল অবশ্য সবাই জানে এসব। এ বিলের সঙ্গে তো তুরাগ না বালু নদীর যোগ আছে। শহরের সব বাড়তি পানি আর ময়লা তো এদিক দিয়েই নদীতে পড়ে। এটা বন্ধ করা যাবেই না। এলাকার কেউ মানবে না।”

আরশাদ মন দিয়েই শুনছিলো। সে অবশ্য রায়হানের কিছু কথা বুঝতে পারছিলো না। ওকে থামিয়ে জিজ্ঞেসও করছিল তার অর্থ। যেমন ‘পাড়া’ শব্দটা সে ভালো করে বোঝেনি। রায়হান ওকে জানালো ঢাকার লোকজন যাকে মহলৱা বলে তাই হচ্ছে পাড়া। ‘বিল’ আর ‘জলা’-ও আরশাদ শোনেনি কখনো।

এই বাঙালি হয়ে বাংলা বুঝতে না পারাটা কী যে খারাপ লাগে রায়হানের। ইংরেজরা কী কখনো বলে আমি ইংরেজি ঠিক বুঝি না! বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’ বইটা পড়তে দেবো নাকি ছেলেটাকে, মনে মনে ভাবলো রায়হান। সব বুঝুক না বুঝুক কিছু ধারণা তো হবে বাংলার গ্রাম আর প্রকৃতি নিয়ে। রায়হান নিজেই কি বইটার সব বুঝেছে নাকি! পড়তে পড়তে শিখবে।

আরশাদ জানালো তার বাবা খুব খুশি জায়গাটা কিনতে পেরে। সেদিন নাকি বলছিলেন, এখানে ফ্ল্যাট বিক্রি হয়ে যাবে মাটি ভরাটের আগেই। নদীর কাছে দার্বণ লোকেশনের ছবি দিয়ে টিভিতে আর পত্রিকায় সমানে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন।

তবে রায়হানদের চোখে হতাশা দেখে ভরসা দিলো সে।

“আমি আব্বুকে বলতে পারি, তোমাদের কথা। আব্বু আমাকে খুবই আদর করেন। কিছু চাওয়ার আগেই সেটা  কিনে দেন। কিন্তু একটু ভয় হচ্ছে, বকা লাগাবেন বড়োদের ব্যাপারে নাক গলাচ্ছি বলে। উনি..”

রায়হান মাঝখানে কিছু একটা বলতে চাইছিল কিন্তু তাকে থামিয়ে দিলো অপু ভাই। আরশাদকে জিজ্ঞেস করলো, ওর বাবা এমনিতে তার সব কথা রাখে কীনা।
 
-হ্যাঁ, বললামই তো, আরশাদের ঝটপট জবাব।

-আচ্ছা, আমরা যদি এটা নিয়ে সবাই তোমার বাবার কাছে যাই তুমি আমাদের পক্ষে একটু বলতে পারবে তো?

একটু ভেবে জবাব দেয় আরশাদ, “আচ্ছা আমি মাঠটার ব্যাপারে বলবো। আর জায়গাটার মালিক যে সেটা দান করেছিলেন তা-ও বলবো।

“তাহলেই হবে” খুশি দেখালো অপু ভাইকে।

নিশ্চয়ই কিছু একটা উপায় ভেবে বের করেছে ও, ভাবলো রায়হান। আদরের ছোটো ছেলের আবদারে বাবা গলে যাবেন। কিন্তু এতোই কী সোজা হবে? নাকি আরো কিছু বুদ্ধি আছে অপু ভাইয়ের মাথায়? দেখা যাক। এখন তো আরশাদের সামনে আর কিছু বলবে না বোধহয়। অপেক্ষা করাই ভালো।

বড়ো ভাই ফারহান গাড়ি থেকে ডাকাডাকি শুর্ব করায় উঠে পড়লো আরশাদ। যাওয়ার আগে বলে গেলো, অপুরা যা ঠিক করবে সেটা তাকে জানাতে। বড়ো ভাইয়ের মোবাইল ফোন নাম্বারটা দিলো ও। অনুরোধ করলেই ওকে ডেকে ফোনটা দেবে ফারহান।

“ভেবো না। আমি তোমাদের পক্ষে আছি। একটা উপায় হবে। তোমরা তো একটা ভালো কাজই করতে চাও। আব্বু হয়তো বুঝবেন”, ওদের সাহস দেওয়ার চেষ্টা করলো আরশাদ।

গাড়িটা মোড়ের আড়ালে যেতেই লম্বা একটা হাসি দেখা দিলো অপু ভাইয়ের মুখে।

-দারুণ একটা বুদ্ধি বের করেছি রে রায়হান, এতে কাজ না হয়ে যায় না।

-কী সেটা বলে ফেলো না। আমার আর তর সইছে না।

-আমি গত ক’দিন ধরেই ভাবছিলাম। এখন আরশাদের সঙ্গে কথা বলে ব্যাপারটা ফাইনাল করে ফেললাম। শোন তা হলে...

অপু ভাইয়ের পরিকল্পনা শুনে রায়হানেরও মনে হলো এতে কাজ হবে। তবে খুব হিসেবমতো করতে না পারলে সব গুবলেটও হতে পারে।

khelar-math

 

প্ল্যানটা হলো: এলাকার শিশু-কিশোরদের নিয়ে একটা আন্দোলন করতে হবে। ব্যানার-প্লাকার্ড নিয়ে মিছিল হবে যাতে সবাই জেনে যায় মাঠ দখল হয়ে যাচ্ছে। তারপর সবাই একদিন সকাল থেকে মাঠে গিয়ে বসে থাকবে। স্কুল ফাঁকি দেওয়া যাবে না। কাজেই এটা হবে ছুটির দিনে। তবে মাঠে বসার ব্যাপারটা আগে থেকে বলা হবে না। তাহলে কেউ না কেউ বাগড়া দিতে পারে। বলা হবে আগের দিন বিকেলে খেলার সময়।

তো, মাঠে গিয়ে ছেলেরা ঘোষণা দেবে, এই মাঠটা থাকবে বড়োরা এটা না বলা পর্যন্ত তারা কেউ বাড়ি ফিরবে না। যারা একটু বড়ো তারা কিছু খাবেও না সারাদিন। অনশন ধর্মঘট। ছোট ছোট বাচ্চারা না খেয়ে থাকবে এটা কেউ সইতে পারবেনা। কাজ হবেই হবে।

অপু ভাই বললো, “বুঝলি, আমার কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধু আছে। ওদের সঙ্গে কথা বলেছি। ওরা বলেছে, শিশুরা এমন কিছু করলে চারদিকে সাড়া পড়ে যাবে। টিভিতে দেখালে  হৈচৈ পড়ে যাবে। কে জানে হয়তো প্রধানমন্ত্রীর কানে উঠে যাবে। তারপর আর ঠেকায় কে!”

অপু ভাই শিওর, আরশাদকে দিয়ে ভালো কাজ হবে। বাচ্চাদের আন্দোলন আর ও একটু শক্ত করে ধরলে বোরহান সাহেব মত না বদলে পারবেন না। কীভাবে কি বলতে হবে ওকে ভালো করে বোঝানোর দায়িত্ব নিলো অপু ভাই। একদিন ফোন করে আরশাদের বাড়ির কাছে গিয়ে কথা বলে আসবে সে।

ঠিক হলো, পরের শুক্রবারই মাঠে হবে শিশু-কিশোর জমায়েত।

হাতে আছে প্রায় এক সপ্তাহ। সবাই সবার চেনা। মুখে মুখে ব্যাপারটা ছড়িয়ে দেওয়া ব্যাপারই না। হলোও তাই। তিনদিনের মাথায়ই পুরো তলৱাটে রাষ্ট্র হয়ে গেল, ঈশানপুর মাঠ আর থাকছে না। সেখানে উঠতে যাচ্ছে ফ্ল্যাটবাড়ি।

‘মাঠ কেড়ে নেওয়া চলবে না’, ‘বিল ভরাট বন্ধ কর’ এসব লেখা প্লাকার্ড নিয়ে মিছিল করলো ছোটরা। মনে হলো বড়োরা বিশেষ পাত্তা দিচ্ছে না। তা বোঝা গেলো তাদের মুখের হাসি দেখেই।

শেষ পর্যন্ত এসে গেলো শুক্রবার। যথারীতি সবার আগে মাঠে এসে উপস্থিত রায়হান আর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা। কারো কারো বাবা-মা ঝামেলার ভয়ে ছেলে-মেয়েদের কড়া করে মানা করে দিয়েছিলেন সেদিন মাঠের ত্রিসীমানায় ভিড়তে। অপুদের অনেক চেষ্টার পরও তাদের মাঠে সভা করার পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেছে।

কিন্তু কতোক্ষণ আর পাহারা দিয়ে থাকা যায়। যারা একটু বড়ো তারা ঠিকই নানা কায়দায় মায়ের চোখ এড়িয়ে মাঠে এসে হাজির। আর নাকি কান্না থামাতে না পেরে কাউকে কাউকে নিয়ে হাজির হলো বড়োরাই। বেলা বাড়তে বাড়তে মাঠ রীতিমত শিশুসমুদ্র।

কথায় বলে খবর বাতাসের আগে ছোটে। আর সাংবাদিকরা খবরের গন্ধ পায় শিকারী কুকুরের মতোই। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাঠের এক ধারে জমে উঠলো তাদের মোটর সাইকেল আর মাইক্রোবাসের ভিড়। সাংবাদিকদের ঘিরে ধরলো ক্ষুদে আন্দোলনকারীরা। টিভি দেখে দেখে সবাই ব্যাপারটা শিখে গেছে। সবার মুখে এক কথা। ‘আমরা মাঠ চাই। নদী চাই। খেলতে চাই।’ বেশি ছোটোরা কেউ ক্যামেরা দেখে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললো। কেউবা ভাবলো তার একটা ছড়াগান গাওয়া উচিত। কয়েকজন গাইলো ‘আমার সোনার বাংলা’। সবমিলিয়ে উৎসব-উৎসব ভাব।

বড়োরা তখনো ভিড় করে মজা দেখছে। এক সময় তাদের সংখ্যাও বেড়ে শিশুদের সমান হয়ে দাঁড়ালো প্রায়। এলাকার নানা মাপের নেতাও এসে জড়ো হলেন কয়েকজন। কিন্তু তারা ঠিক কার সঙ্গে কী কথা বলা উচিত বুঝতে না পেরে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।

এরইমধ্যে ঈশানপুর হাইস্কুলের হেড মাস্টার সোবহান সাহেব হাজির হয়েছিলেন। নেতাগোছের দু’একজন তার কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন ব্যাপারটা কী। সোবহান সাহেব বললেন, “আমি না এলে ওরা কাল কেউ ক্লাসে যাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। আর দাবিটা তো ন্যায্যই। অন্যায় কিছু তো ওরা চাইছে না। এখন আপনারা এলাকার অভিভাবক, ওদের একটা ভরসা দেন। আমি বুঝিয়ে বাড়িতে পাঠাই।”

ভরসা দেওয়ার কথা শুনেই নেতাদের কয়েকজন চুপচাপ কেটে পড়লো।

হঠাৎ হাজার লোকের গুঞ্জন ছাপিয়ে শোনা গেলো বড়োসড় এক গাড়ির আওয়াজ। ভিড়কে সাবধান করতে ঘনঘন হর্ন দিচ্ছে গাড়িটা। রায়হানের গাড়িটা চিনতে ভুল হলোনা একটুও। আরশাদের বাবার গাড়ি! উনি কি খুব রেগে ওদের বকতে আসছেন?

রায়হানের মনে হাজার প্রশ্ন ঘুরতে লাগলো। আরশাদ কি বলেছে ওর বাবাকে? ওর কথা কি উনি রাখবেন? অপু ভাই রায়হানকে বলেছে আরশাদকে নিয়ে একটা চমক হবে। সেটা কিছুতেই আগেই বলতে চায়না ও। চমকটা কি? আরশাদ আসছে না কেন এখনো? ওর বাবা বাড়িতে আটকে রেখে এসেছে নাকি?

মিশমিশে কালো বিরাট ভালুকের মতো দেখতে জিপ গাড়িটা এসে থামলো ঠিক ভিড়ের সামনে। গাড়ির সঙ্গে বেমানান টিংটিংয়ে চেহারার ড্রাইভার লাফিয়ে নেমে দরজা খুলে ধরলো। গট গট করে বেরিয়ে এলেন আরশাদের বাবা। ফর্সা মুখটা লাল। নিশ্চয়ই রাগে।

ভিড়ের এদিক থেকে ওদিক একবার তাকালেন বোরহান সাহেব। যেন বুঝতে চাইলেন কতো মানুষ এখানে আর কে এসবের হোতা। তারপর হঠাৎই চেঁচিয়ে উঠলেন-

“এসব হচেছ কী আমার জমিতে, হ্যাঁ ! এই অবুঝ বাচ্চাদের কে ক্ষেপিয়ে দিয়েছে? এখানে আমি অনেক অভিভাবককেও দেখছি। তাদের অনুরোধ করছি বাচ্চাদের বুঝিয়ে বাড়ি নিয়ে যেতে।”

বোরহান সাহেব একটু থামলেন। তারপর বললেন, “আমার প্রজেক্টের কাগজপত্র সব ফাইনাল। অনুরোধ করে বলছি আপনারা সবাই এখান থেকে চলে যান। যদি না যান তাহলে পুলিশের সাহায্য চাইবো। আইন আমার পক্ষে। আমি আমার ল’ইয়ারের সঙ্গে সকালেই কথা বলেছি।”

সারা মাঠ নীরব। আইন আর পুলিশের কথা শুনেই বোধহয়। রায়হানের বুক ঢিপ ঢিপ করছে। তা হলে এভাবেই আন্দোলন শেষ? নীরবতা ভেঙে আস্তে আস্তে ভিড়ের মধ্যে শুরু হলো গুঞ্জন। গোলমালের ভয়ে বাচ্চাদের হাত ধরে মাঠ ছাড়া শুরু করলো কেউ কেউ।

ঠিক তক্ষুণি মাঠ কাঁপিয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো একটা বালক কণ্ঠের রিনরিনে চিৎকার- “কেউ যাবেন না। আমরা কেউ যাবো না। আমাদের দাবি মানতে হবে।”

রায়হানের বুকের ভেতর হৃদপিন্ডটা লাফিয়ে উঠলো যেন। আরশাদ! এটাই তবে অপু ভাইয়ের প্লান ছিল?

চিৎকারটা যেদিক থেকে এসেছে সেদিকে ঘুরে গেলো সবার মাথা। একটা রিকশা ভ্যানের ওপর দাঁড়িয়ে আরশাদ। তার পাশেই অপু ভাই! ভিড়ের মধ্যে কখন ভ্যান গাড়িটা এনে তারা ওতে উঠে দাঁড়িয়েছে কারো চোখেই পড়েনি তা।

তারপরই রায়হানের চোখ গেলো বোরহান সাহেবের দিকে। ভদ্রলোকের চোখ রীতিমত ছানাবড়া। নিজের চোখ-কানকেও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না।

“আরশাদ এটা কি হচ্ছে? তুমি এখানে কেন? তুমি না ফারহানের সঙ্গে পুল খেলতে গেলে! আমি..” বিস্ময়,রাগ আর বিরক্তি মিলে আর কিছু বলতে পারছিলেন না বোরহান সাহেব।

“আব্বু, আমি ওদের সঙ্গে কথা বলেছি। ওরা আমাকে অনুরোধ করেছে তোমাকে বুঝিয়ে বলতে। আমি তোমার কাছে আর কিছু চাইবোনা। তুমি ওদের মাঠটা ছেড়ে দাও। আর বিলটাও ভরা চলবে না। অপু ভাই আমাকে বলেছে এটা বেআইনী কাজ হবে। আরো তো কতো জমি আছে। তুমি সেখানে প্রজেক্ট করো। প্লিজ!”

বোরহান সাহেব একটু দ্বিধায় পড়ে গেলেন কি? চেহারার কঠিন ভাবটা যেন একটু কেটে গেলো। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয় সামলে নিলেন। ছেলের মুখে নিশ্চয়ই আইন-কানুনের কথা শোনার আশা করেননি।

“দ্যাখো আরশাদ, তোমার মা আমাকে কিছুটা বলেছে যে মাঠটা এলাকার ছেলেদের একমাত্র খেলার জায়গা। সেদিন তুমি আর ফারহান বেড়োতে এলে ওরা তোমাকে ওদের দাবির কথা বলেছে। কিন্তু এগুলো বড়োদের ব্যাপার। তোমার কাছে আমি আইন শিখবো? কী বলছো এসব! আর এটা আমার ব্যবসা। তোমার সব আব্দারই তো আমি রাখি তাই না? কিন্তু এটা অন্য ব্যাপার। তুমি বাসায় চলো।”

“না, তুমি কথা না দিলে আমি যাবো না” যতোটা পারে গলা শক্ত করে বললো আরশাদ।

“আরশাদ যাবে না।” চেচিয়ে উঠলো কয়েকশ’ কচিকণ্ঠ। সেৱাগান উঠলো- “আমরা মাঠ চাই। খেলার সুযোগ চাই।”

এবার বড়োদের মধ্যেও সেৱাগান দিয়ে উঠলেন অনেকে। পৱ্যাকার্ড হাতে তুলে নিলেন কয়েকজন।

বোরহান সাহেব আর কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। মুখ মেঘের মতো গম্ভীর। যেন গভীরভাবে কিছু চিন্তা করছেন। তারপর হঠাৎ পেছন ফিরে গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।

ড্রাইভার দরজা খুলে দিলে আবার গাড়িতে গিয়ে উঠলেন আরশাদের বাবা। কিন্তু গাড়িটা নড়লো না। দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই। তাহলে কি তিনি ছেলের জন্য অপেক্ষা করছেন?

সেৱাগান থেমে গিয়ে মাঠ আবার নীরব। কয়েকটা মিনিট কেটে গেলো।

হঠাৎ আবার গাড়ির দরজা খোলার শব্দে চমকে উঠলো সবাই। কিন্তু বোরহান সাহেব নন, এবার গাড়ি থেকে নামলেন এক মহিলা। শান্ত, স্নিগ্ধ চেহারা। রায়হান তাকেও চেনে। ইনি আরশাদের মা। কী আশ্চর্য! তবে এতোক্ষণ উনি গাড়িতে বসেই সব দেখেছেন?

আরশাদ মাকে দেখেই দৌড়ে এলো। মাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো ও, “প্লিজ আম্মু, আব্বুকে বুঝিয়ে বলো। এতোগুলো বাচ্চা রোদের মধ্যে সকাল থেকে বসে আছে। ওরা খুব গরিব। ওদের আর আনন্দের কিছু নেই। একটাই খেলার মাঠ।”

আরশাদের মা হেসে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,  “পাগল ছেলে, এমন কা- কেউ করে! মা গো!
শোনো আরশাদ, তোমার আব্বু রাজি হয়েছে এ প্রজেক্টটা বাদ দিতে। আমি সেদিন তোমার কাছে  শোনার পর থেকেই ওকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম। ও এমনিতেই দোটানায় ছিল। তোমাদের দাবির জোরটা বুঝতেই হয়তো এতো হুমকি-ধামকি দিয়েছে। এখন আমি আবার বলার পর বলছে, এতগুলো বাচ্চাকে কষ্ট দিতে ওর মন টানছে না। আমি গাড়িতে বসে সব দেখছিলাম। এরা কা- একটা করেছে বটে!”

আরশাদের মা জানালেন, বোরহান সাহেব বলেছেন, মাঠটা উনি কিনলেও এলাকার শিশুদের জন্য রেখে দেবেন। ছোট একটা শিশু পার্ক করবেন এর অর্ধেকটা নিয়ে।”

বলতে বলতে সমবেত লোকজনের দিকে ফিরলেন ভদ্রমহিলা।

“আরশাদের দাদার নামে এরকম কিছু একটা করার কথা উনি অনেক দিন ধরেই ভাবছিলেন। উনি শিশুদের খুব ভালোবাসতেন। নামকরা শিশু চিকিৎসক ছিলেন। পার্কটা তার নামেই হবে। তবে আরশাদের বাবার একটা শর্ত আছে। সেটা হচ্ছে, এলাকার মানুষকে এই মাঠ আর পার্ক দেখাশোনা করার দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে। যুবসমাজের পক্ষ থেকে অপু আর আপনাদের কথা দিতে হবে।”

ততোক্ষণে আরশাদের বাবা আবার গাড়ি থেকে নেমে এসে দাঁড়িয়েছেন ওদের পাশেই। এবার তার মুখে হাসি। সবাই ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারেনি দূর থেকে। রায়হান তাই দৌড়ে ভ্যান গাড়িটায় উঠে গেলো আবার।

“প্রজেক্ট হবে না, মাঠ থাকবে। আমরা জিতে গেছি”- গলা ফাটিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিলো সে। সারা মাঠ ফেটে পড়লো উলৱাসে। একদল কাঁধে তুলে নিলো আরশাদকে। ‘আরশাদ ভাই জিন্দাবাদ’ সেৱাগানও দিলো কেউ কেউ।

রায়হান খুঁজছিলো অপু ভাইকে। এই মুহূর্তে আরশাদ নায়ক হলেও কাজটা করেছে আসলে সে-ই। কিন্তু অপু ভাই কোথায়? তাকে কোথাও না পেয়ে আবার আরশাদের দিকে তাকাতেই জবাব পেয়ে গেলো সে। যার ঘাড়ে চড়ে আরশাদ বিজয়ী বীরের ভঙ্গিতে হাসছে সে-ই হচ্ছে বিখ্যাত অপু ভাই ওরফে সবার প্রিয় পেন ড্রাইভ।