নীলুর নীল চশমা

মৃত্যুঞ্জয় রায়

কল্পগল্প

chosmaএকটা সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটে গেছে। নীলু কাউকে কিছু বলতে পারছে না। আর বললেও কেউ ওর কথা বিশ্বাস করবে না। উল্টো ওকেই পাগল বলবে। পারলে পাবনায় রেখে আসবে। তবে দুদিন হল, ব্যাপারটা নীলু দারুণ উপভোগ করছে। কেউ কিছু টের পাচ্ছে না। কিন্তু নীলু ঠিকই সব টের পাচ্ছে। একটা নীল চশমা। নীলু একটা নীল চশমা পড়ে। কাল স্কুলে যাওয়ার পথে সেই নীল চশমাটা পরতেই সব কিছু কেমন যেন গোলমেলে দেখতে শুরু করে সে। কক্ষনো এ চশমাটা পড়ে ও এরকম দেখেনি। কিন্তু হঠাৎ এ কি হলো! নীল চশমাটা চোখে লাগাতেই নীলু যার দিকে তাকাচ্ছে তার সব কিছু কেমন যেন গোলমেলে লাগছে। উল্টাপাল্টা মনে হচ্ছে। এই চশমটা পড়ে নীলু মানুষের মনের ভিতরটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। যতোই দেখছে ততোই অবাক হচ্ছে নীলু। কি আশ্চর্য! মানুষের ভেতর-বাইরে এতো তফাৎ

তবে নীলু সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য হচ্ছে, এ ধরনের একটা চশমা তার কাছে এলো কি করে? এটা সত্যি যে তার একটা নীল চশমা ছিলো। কিন্তু তা দিয়ে মানুষের কেবল ওপরটাই দেখা যেত। অন্তরে কি আছে তা বোঝার উপায় ছিল না। অবিকল সেই চশমাটার মতোই এটা দেখতে। কিন্তু মোটেই এটা সাদামাটা কোনো চশমা না। কিছুতেই নীলু কোনো হিসেব মেলাতে পারছে না। হঠাৎ করে তার চশমাটা অমন অদ্ভুত একটা যন্ত্র হয়ে গেলো কি করে

নীলু আজ স্কুলে যাওয়ার সময় তার মা বললো, ফিরে এসে কিন্তু পুডিং খাবি। বানিয়ে রাখবো। নীলুর পুডিং খুব প্রিয়। নীল চশমা পড়ে দেখল, মায়ের মনের মধ্যে ধাউস এক পুডিংয়ের ছবি। একখানা গোল চাঁদের মত, ওপরটা কিসমিস, বাদাম আর চেরীর টুকরো দিয়ে সাজানো। নীলু বলল,‘মা, নিশ্চই তুমি চেরী আর কিসমিস দিয়ে ওটা সাজাবে?
হ্যাঁ, কিন্তু তুই কি করে বুঝলি?

নীলু হাসলো, ওটা যে আমার খুব পছন্দ। সেটা তুমি তো জানোই। সে জন্য ওটাই তুমি তো বানাবে।
পাগল ছেলে কোথাকার। মায়েরা ছেলেদের সব মনের কথা পড়তে পারে।
মায়ের কথা শুনে নীলু হাসলো। মনে মনে ভাবলো, নাহ্ , এখন এই চশমাটা পেয়ে মনে হচ্ছে মানুষ কখনোই মানুষের মনের কথা পড়তে পারে না। মানুষের মনটা আসলে এক বিরাট জটিল জিনিষ। বায়বীয়। অনুভব করা যায়, দেখা বা পড়া যায় না। তবে নীলু জানে, মায়ের মন আর কথা এক। স্কুল থেকে ফিরে পুডিং খাবে।

কিন্তু বাসা থেকে বেরিয়ে বিপত্তি বাধলো রিক্সায় উঠতে গিয়ে। নীল চশমার ভেতর দিয়ে দেখলো, এক মোটা সোটা রিক্সাঅলা, মুখে বিড়ি পুড়ছে, কোমরে ময়লা লাল একটা গামছা বাঁধা। সেটা কোনো বিষয় নয়। বিষয় হল, ও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে জামার তলে গামছার নীচে কোমরে একটা ছোট্ট ছুরি লুকানো রয়েছে। রিকশাঅলা বললো, ছোট সাব, আহেন আফনেরে ইশকুলে লইয়া যাই। ভাড়া যা মনে লয় তাই দিয়েন। রুজই তো যান। নেয্য ভাড়া দিয়েন। নীলু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, লোকটা ধরিবাজ। তার মনে ফন্দি রয়েছে, স্কুলের পথে বিরাট মাঠের মধ্যে রাস্তাটা ফাঁকা। সেখানে গ্যাং নিয়ে চায়ের স্টলে চা খাচ্ছে রিকশাঅলার ওস্তাদ। ও রিকশার চেইন পড়ে যাওয়ার ভান করে ওখানে দাঁড়াবে। সঙ্গে সঙ্গে এক লোক এসে তাকে সাহায্যের ভান করে নীলুকে একটা চুইংগাম খেতে দেবে। চুইংগাম চুষলেই নীলু অজ্ঞান হয়ে যাবে। তখন নীলুকে ওরা ধরে নিয়ে যাবে। নীলুকে তাগাদা দিলো তাড়াতাড়ি রিক্সায় ওঠার জন্য। নীলু তার রিকশায় না ওঠার ফন্দি খুঁজতে লাগলো। বললো, ইস্, কলমটা বাসায় ফেলে এসেছি। কলম না নিয়ে কী স্কুলে যাওয়া যায়? যাই ওই দোকান থেকে একটা কলম নিয়ে আসি। আপনি বরং অন্য প্যাসেঞ্জার দেখেন। নীলু হন হন করে হেঁটে রাস্তার ওপারে একটা দোকানের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো।

এ সময় নীলু দেখলো, একটা র‌্যাবের টহল গাড়ী আসছে। নীলু ইশারা করতেই পিকআপ গাড়িটা ঠিক রিকশার সামনে এসে দাঁড়ালো। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে একজন র‌্যাবসেনা জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কি? গাড়ি থামালে কেন? নীলু চাপা স্বরে সব খুলে বললো। রিকশাঅলা তখনো সেখানে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে অন্য যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছে। নীলু র‌্যাবকে সব কথা বলেই দোকানের ভেতরে ঢুকে পড়লো। দোকানের সামনের দরজার স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর দিয়ে সব দেখতে লাগলো। র‌্যাব চারজন পিকআপ থেকে নেমেই রিকশাঅলাকে জেরা করলো। ঠিকই রিকশাঅলার কোমরে একটা লম্বা চাকু পাওয়া গেল। আর নীলুর কথামতো একটু দূরে চায়ের স্টলে গিয়ে পাওয়া গেল কয়েকজন লোক। ওদের কাছে পাওয়া গেল পিস্তল। রিকশাঅলাকে পিটুনী দিতে সে সব স্বীকার করলো। নীলুর কথাই ঠিক। কিন্তু র‌্যাবসেনারা কিছুতেই বুঝতে পারলো না, ছোট্ট ছেলেটা এসব জানলো কেমন করে? ওরা রাস্তায় রাস্তায় টহল দিয়ে তাহলে করছেটা কী? ওরা ফিরে ছোট্ট ছেলেটাকে খোঁজার চেষ্টা করলো। কিন্তু নীলু ততক্ষণে পগাড় পার। তবে নীলুও কিছুতেই ওর আগের নীল চশমাটা খুঁজে পেলো না, কোত্থাও না। নতুন নীল চশমার রহস্য কেবলই ওর মাথায় ঘুরতে লাগলো।

২.

রাত ঠিক বারোটা। হোমওয়ার্ক অনেক জমে আছে। নীলু যে কি! কোনোদিনই দিনের সব পড়া কিছুতেই সময়মতো শেষ করতে পারে না। রাত তিনটে পর্যন্ত জাগলেও না। মাঝে মাঝে নীলুর যেন কি হয়। নিজেও বুঝতে পারে না। দরজার পর্দাটা হঠাৎ সরে গেল। ঠিক যেমন করে একজন মানুষ ঘরে ঢোকার সময় পর্দাটা হঠাৎ সরে যায়, একজন মানুষ ঘরে ঢোকার সময় পর্দাটা যেমন হাত দিয়ে সরায়, তেমনি করে। বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে। সাথে দমকা বাতাস। নীলু একটা বইয়ের মলাটের মধ্যে কিশোর ক্লাসিকের একটা বই নিয়ে পড়ছে আর মনে মনে হাসছে। পর্দা সরে যেতেই চমকে উঠলো। মা নয় তো? উফ, এক্ষুনি চুলের মুঠি ধরে দুঘা পিঠের উপর বসিয়ে দেবে। মুখ ভারী করে গলা খাঁকিয়ে বলে উঠবে হুঁ, স্কুলের বই রেখে গল্পের বই পড়া হচ্ছে? ওসবে কী পরীক্ষা পাশ হবে চট করে বইটা বন্ধ করে ভয় জড়ানো চোখে দরজার দিকে তাকালো নীলু। কই, নাতো। মা আসছে না। জানালা বন্ধ, পর্দা টানা। নীলু চেয়ার থেকে উঠে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলো। ঘর অন্ধকার, বাইরে বৃষ্টি। উঠে জানালার পর্দা সরাতেই হঠাৎ কড়কড়কড় করে বাজ পড়ল নারকেল গাছটার মাথায়। ইস কি বিকট আওয়াজ। বৃষ্টির মধ্যেও গাছটার মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো। পুড়ে গেল গাছের মাথাটা। চিড়ে ফেড়ে একাকার হয়ে গেলো। নীলু এই প্রথম চোখের সামনে বাজ পড়া দেখলো। কাল স্কুলে গিয়ে এ গল্পটা করা যাবে। এ সময় বাইরে থাকলে নির্ঘাৎ মারা পড়তাম, নীলু ভাবলো। কিন্তু ওই আলোতেই নিলুর চোখে পড়লো মুরগির ঘরের মতো কি যেন একটা! পোড়া নারকেল নয়তো? লজ্জা পেলো নীলু। যাহ্! নারকেল কোনোদিন অতোবড় হয় নাকি? আবার ভাবলো, হতেও পারে, বাজ পড়ে নারকেলের আকৃতি  হয়তো বদলে গেছে।

বিছানায় শুয়ে নীলু ওই নীল নারকেলের কথাই ভাবতে লাগলো। ইচ্ছে হলো, এক্ষুনি দরজা খুলে বাইরে গিয়ে দেখে আসি জিনিসটাকে। কিন্তু সাহস হলো না নীলুর। যদি আবার বাজ পাড়ে? নাহ, এতো লোডশেডিং যে কেন হয়? কিশোর ক্লাসিকের বইটাও শেষ করা হলো না।

কে? নীলুর মনে হলো, কে যেন নীলুর চেয়ারটায় এসে বসলো। ঘর অন্ধকার। তাই কিছু বোঝা বা দেখার উপায় নেই। নীলু ভাবল, মা এসেছে।
মা, তুমি সুইচগুলো অফ করে দিয়ে যাওনা। আমি শুয়ে পড়েছি। পট, পট। দুটো সুইস টেপার শব্দ হলো। কিন্তু মা কোনো কথা বললো না, মাথায় একটু হাত বুলিয়ে আদর করে দিয়ে গেলো না। এরকম তো হয় না!

 

nilchosma

পুঁহ হপ, পুঁহুপ! কিসের শব্দ? নীলুর ঘরটা অন্ধকার। বৃষ্টির ঝাপটা লাগছে জানালার কাঁচে। বাতাসের প্রচণ্ড গর্জনের মধ্যেও ওই মৃদু আওয়াজটা কানে এলো নীলুর। কিসের শব্দ? নীলু তাকালো ঘরটার ভেতর। ওর কোনো মোবাইল ফোন নেই। তাই কোনো টোন বাজতেই পারে না। হঠাৎ নীলুর চোখ পড়লো ক্ষুদ্র দুটুকরো আলোর উপর। টক টকে নীল আলো। জোনাকির মত জ্বলছে আর নিভছে। নীলু ভাবলো, জোনাকি টোনাকি হবে হয়তো। ধ্যেৎ! জোনাকির আলো কি অতো নীল হয় নাকি? নীলু চোখ দুটো বড়ো করে তাকালো। কিন্তু আলোক বিন্দু দুটো গেল কই? পুঁহপ পুঁহপ। আবার সেই শব্দ।

আলো দুটো কি ঘর জুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে? একবার এখানে একবার ওখানে। নীলু বিছানা থেকে উঠে সুইচ বোর্ডে হাত রাখতে গেলো। কিন্তু এ কি? ওর হাতটাকে থামিয়ে দিল কে? বরফের চেয়েও ঠাণ্ডা, মাখনের চেয়েও নরম। সাপ টাপ না তো? ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেলো নীলু। চিৎকার করে মাকে ডাকতে চাইলো। কিন্তু একি? গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হচ্ছে না কেন? ভয় পেলে বোধ হয় এ রকম হয়।
নীলু হঠাৎ খুব আস্তে মিহি গলার আওয়াজ পেলো। মনে হলো একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে ওকে যেন বলছে, ভয় পেওনা নীলু। তুমি আলো জ্বালালেই আমি মরে যাবো।
কে তুমি? কি চাও আমার কাছে’ নীলু খুব ভয়ে ভয়ে বললো কথাগুলো।
না। ভয় পেওনা নীলু। আমি কোন ভুত প্রেত না। তবে মানুষও না। আমি কোজানা।
কোজানা?
আমি তোমাদের পৃথিবীর কেউ না। আমি এসেছি অন্য গ্রহ থেকে।
বিস্মিত নীলু চোখ কচলে ওকে দেখার চেষ্টা করলো। ভাবলো, এ যে মেঘ না চাইতেই জল। মহাকাশ আর ভিন গ্রহের বইগুলো পড়ার সময় নীলু কতোবার ভেবেছে এসব নিয়ে। কখনো বিশ্বাস করেনি। উফা, সসার নিয়ে কেউ ভিন গ্রহ থেকে এ পৃথিবীতে আসতে পারে? অন্য কোথাও কি নীলুর মতো কোনো মানুষ থাকতে পারে? আর সেসব গ্রহে যদি বুদ্ধিমান কোনো প্রাণী থেকেই থাকে তাহলে সে বাংলায় নীলুর মতো কথা বলছে! নিজেকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না নীলু। উয়াও! নিজের গায়ে জোরে একটা চিমটি কেটে দেখার চেষ্টা করলো। না, জেগে আছে সে। স্বপ্ন টপ্ন নয়।
কি, খুব অবাক হচ্ছো নীলু তাই না। হ্যাঁ। সত্যিই আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না।
কাল রাতেও আমি তোমার কাছে এসেছিলাম। এই টেবিলে বেশ কিছুক্ষণ বসে থেকে চলে গেছি। তুমি তখন ঘুমুচ্ছিলে। আর শুনলেই তো। রাতের অন্ধকার ছাড়া আমি বের হতে পারি না। তোমাদের বিদ্যুতের আলো আমাকে চাবুকের মত পেটায়। অনেক্ষণ বসেছিলাম তোমার ঘরে।
কিন্তু কেন এসেছিলে?
তোমরা পৃথিবীর মানুষেরা এখনো অনেক পিছনে পড়ে আছো। তোমাদের জন্য সত্যি আমাদের খুব দুঃখ হয়। কেবল নিজেরা মারামারি করো আর মরো। তোমাদের কোন মেগা মিশন নেই। পঞ্চাশ ষাট বছর বাঁচো, খাও, ঘুমাও তারপর মরে যাও। এই পৃথিবী ছেড়ে তোমরা কোথাও কেউ কোনোদিন যেতে পারোনি। অথচ দ্যাখো, আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি মহাকাশের এখন থেকে ওখানে। এ গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে। আমরা বাঁচি কমসে কম পঁচশো বছর।
নীলুর বিস্ময় যেন বেড়ে যায়, পাঁচশো বছর! তোমরা কি মানুষ? না অন্য কিছু?
মানুষ তো তোমাদের দেয়া একটা জীবের নাম। তেমনি আর এক গ্রহে পেয়েছিলাম তোমাদের চেয়ে আর একটু বুদ্ধিমান প্রাণী-অ্যালিয়েন ওদের নাম। নাম দিয়ে কী হবে? বুদ্ধিটাই আসল। যে জগতে যে যতো বুদ্ধিমান, সে জগতের সে-ই রাজা।
কিন্তু মহাকাশের এতো জায়গা থাকতে তুমি আমার কাছে এলে কেন? নীলু জিজ্ঞেস করলো কোজানাকে।
এখন আমরা মিশন ইউ এফ ০০৬ নিয়ে কাজ করছি। এ সৌরজগত আর গ্রহ নক্ষত্র নিয়ে তোমাদের যেসব ভুল ধারণা রয়েছে সেগুলো সংশোধন করাই এ মিশনের লক্ষ্য। তোমরা অনেক কিছুই খুব কম জানো আর অন্ধভাবে অনেক ভুল বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকো।
তাই নাকি? একজন মানুষ কি সব জানতে পারে কখনো, না তা জানার চেষ্টা করা উচিত? ঠিক বলেছো। কেউ কখনো সব জানেনা। তবে যেটুকু জানে সেটুকু যেন সঠিক জানে, গোজামিল দিয়ে জানার কোনো মূল্য নেই। অথচ সবসময় তোমরা সেটাই বেশি বেশি করে করছো। ভাবতে অবাক লাগে, তোমাদের খুব অল্প মানুষই নিজেদের সত্যিকার উন্নতির জন্য চেষ্টা করে।
কোজানার কথাগুলো বড্ড বেশি হাই থটের মনে হচ্ছে নীলুর। তেমন কিছু না বুঝেই সে বললো,‘সে জন্য আমি কী করতে পারি?
তুমিও সব সত্য জানার চেষ্টা করতে পারো। যদিও সেটা খুব সহজ না। সে যাক, আমি এই মিশনে তোমাকে সাহায্য করতে চাই সেসব সত্যগুলো জানতে।
আচ্ছা আমি কী তোমার মিশনে তোমাকে কোনো সাহায্য করতে পারি? নীলু বললো।
না, তুমি নও। বরং আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি। তোমাকে আমার সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি। আর নানা গ্রহ ও গ্রহাণু সম্পর্কে তোমরা যেসব মিথ্যে কথা বলে বেড়াচ্ছো সেগুলো শুধরে দিতে পারি। তুমি নিজের চোখেই সব দেখে এসে পৃথিবীর মানুষদের কাছে সব জানাতে পারবে। রাতারাতি তোমার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। কোজানা খুব শান্তভাবে বললো কথাগুলো।
কিন্তু আমি তো এ পৃথিবী ছেড়ে কোথাও যেতে চাইনা। এই সবুজ গ্রহ আমার খুব প্রিয়।
উঁহু, নীলু সোনা। মোটেই মিথ্যে বোলোনা। আমাদের ইউনো এফ রাডার ডাটাবেজে তোমার নাম উঠেছে। মহাকাশ সম্পর্কে যাদের জানার আগ্রহ অসীম এ রকম দশজনকে আমরা এ পৃথিবীতে খুঁজে পেয়েছি। কলোরাডোর এন্ড্রু আর্টলারের নাম নিশ্চই শুনেছ? আর ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মাইক ব্রাউনের নাম? ওদেরকে আমরা সঙ্গে নিচ্ছি এ মিশনে। তবে দশ জনের সবাই যাবে আলাদা আলাদাভাবে। সো, কনগ্রাচুলেশন মিস্টার নীলু। স্বাগতম। নীলু কোজানার কথাগুলো শুনছিলো তন্ময় হয়ে। কিন্তু কে কথা বলছে তা তো দেখাই হলো না। ওর সাথে যেতে হবে, এ পৃথিবী ছেড়ে অনেক দূরে। আচ্ছা, সাত আসমান পেরিয়ে দোজখ বেহেশতটাও কি দেখা যাবে? এসব কথা ভেবে ভয়ে কেঁপে উঠল নীলু।
না, না। তোমার ভয়ের কিছু নেই নীলু। আজই তো তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি না। জাস্ট তোমাকে দাওয়াতটা দিতে এলাম। সাল বিল হাকাং।
বুঝলাম না।
ও তুমি বুঝবে না। ওটা আমাদের নিজস্ব ভাষা। ওর অর্থ হল আমাদের ভূবনে স্বাগতম। কলমের মত একটা মলিঙ আছে আমার কাছে। আমি তো তোমার ভাষা জানি না। আমি মাউথ ফোনে আমার ভাষায় এতক্ষণ কথা বলেছি। মলিঙ তা ট্রান্সফার করেছে তোমার ভাষায়। নানা গ্রহে আমাদের ঘুরতে হয়। সবার ভাষা তো বুঝতে পারিনা। তাই এই মিলিও লিঙ্গুয়াল মলিঙটা আমরা উদ্ভাবন করেছি। অন্ততঃ এক মিলিয়ন ভাষাকে ও কনভার্ট করতে পারে, এক বিলিয়ন সিম্বলকে ডিকোড করতে পারে মলিঙ। কোজানা বললো। পিট পিট করে নীল ঠাণ্ডা আলো জ্বলছে মলিঙটায়। বেশ মজার তো।
হ্যাঁ, এ রকম আরও অনেক মজার জিনিষ তুমি দেখতে পাবে আমার সাথে গেলে।
কিন্তু ..., তুমি কি করে টের পেলে যে আমি ভিনগ্রহ নিয়ে এতো ভাবছি? নীলু প্রশ্ন করলো কোজানাকে।
কেন, কাল রাতে তো তুমি সেই স্বপ্নই দেখছিলে। একটা স্পেস শীপে চড়ে তুমি হাজার দিনের সফরে বেরিয়েছো মহাকাশে। এ গ্রহ থেকে ও গ্রহে তুমি ও তোমার বন্ধু দিলু ঘুরে বেড়াচ্ছো আর খুঁজে বেড়াচ্ছো তোমার অ্যালিলোকে। দুধখেকো কালো বেড়ালটাকেও সঙ্গে নিতে তুমি ভুলে যাওনি। আর মিসিসিপির পাড়ে কুড়িয়ে পাওয়া সেই ট্রেকিং ওয়াচ, ওটাও তোমার সঙ্গে ছিলো। অন্য গ্রহের মানুষদের জন্য তুমি সঙ্গে নিয়েছিলে একশ’ ডেনড্রোবিয়াম আর ক্যাটেলিয়া অর্কিড ফুল। কি, ঠিক বলিনি? কোজানা নীলুকে জিজ্ঞেস করলো।

কি আশ্চর্য! হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি তো এ রকম একটা স্বপ্নই দেখেছিলাম কাল রাতে। হুবহু মিলে যাচ্ছে তোমার বর্ণনা। কারো স্বপ্নের কথা অন্য কেউ কি কখনো জানতে পারে?
নীলু রীতিমত থ! অদ্ভুত কাণ্ড তো! কি করে হলো?
আচ্ছা, তোমার কাছে কি স্বপ্ন ট্রেস করার কোনো যন্ত্র আছে? বাইনোকুলার?
বাইনোকুলার? সেটা আবার কি?
না, ওটা দিয়ে আমরা দূরের জিনিষকে কাছে এনে দেখি।

‘ওঃ! না সেরকম কিছু নেই। তবে কাল ভুল করে টেবিল থেকে আমি তোমার চশমাটা নিয়ে গেছি। আর আমার নীল চশমাটা রেখে গেছি। দেখতে ঠিক একই রকম কিনা। ওটা চোখে দিয়ে কারো দিকে তাকালে তার মনের সব কিছু দেখা যায়। কাল তুমি যখন ঘুমুচ্ছিলে তখন ওটা দিয়ে আমি তোমার স্বপ্নটা দেখতে পেয়েছিলাম।’ নীলুর এবার মনে পড়লো। সকালে ঘুম থেকে উঠে নীলু টেবিলের উপর এক জোড়া নীল চশমা পেয়েছিলো। হুবহু তার চশমার মতো। কিন্তু চোখে দিয়েই সব উল্টা পাল্টা দেখতে শুরু করে।

‘আমি তো ভেবেই পাচ্ছিলাম না যে আমার চশমাটা হঠাৎ এ রকম করছে কেন?’ নীলু বলল, ‘তুমি কি ওটা ফেরত নিয়ে যাবে?’
অপূর্ব জলতরঙ্গের মতো একটা হাসির শব্দ শুনতে পেল নীলু। থির থির করে কাঁপছে ঘরের বাতাস। যেন ঘরের এক কোনে বসে কেউ পিয়ানোর রিডগুলোয় এক দমকা আঙুল টেনে দিলো।

‘ওটা আমাদের কাছে এক অতি সাধারণ চশমা। যেমন তোমরা তোমাদের কম্পিউটারে সবাই ইউএসবি পেন ড্রাইভ ব্যবহার করো, ওটা আমাদের কাছে অনেকটা তেমনই মামুলি এক যন্ত্র। অনেকটা তোমাদের গগলসের মত। তবে তোমাদের কাছে ওটা এক অভাবনীয় আবিস্কার বটে। ইচ্ছে করলে তুমি এটা ব্যবহার করতে পারো। তবে খুব সাবধান। নীল চশমাটাকে সব সময় ভালো ও সৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে। ওটা দিয়ে খারাপ কিছু করলে সাথে সাথে লেন্স ফেটে তোমার দুচোখে ঢুকে যাবে। তুমি চির জীবনের মত অন্ধ হয়ে যাবে।

আঁতকে উঠল নীলু কোজানোর কথা শুনে।
‘আবার আসব আমি’ বলে কোজানা দ্রুত নীলুর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। নীলুও তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু নারকেল গাছের তলায় সেই নীল বলটাকে আর দেখতে পেল না। কোনো শব্দও শুনতে পেল না সে।

ঘরে এসে বাতির সুইচ অন করলো নীলু। ফ্যানের রেগুলেটর ঘুরিয়ে নবটা পাঁচে উঠিয়ে দিল। রীতিমত ঘামছে ও। টেবিলের কাছে চেয়ারটাতে ধপাস করে বসে পড়ল নীলু। কি ঘটে গেলো আজ রাতে! বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটছে না। ঘড়িতে তখন দুটো দশ। হঠাৎ টেবিলের উপর চোখ পড়ল নীলুর। টেবিলের উপর পড়ে আছে অদ্ভুত সুন্দর একটা নীল কলম। এটা তো নীলুর কলম নয়। তাহলে কোজানা যে এসেছিল এটা হাণ্ড্রেড পার্সেন্ট সত্যি। কাল ভুলে রেখে গেছে নীল চশমা। আজ রেখে গেছে নীল কলম।

৩.

সকাল ন‘টা। অনেক ডাকাডাকির পর নীলুর ঘুম ভাঙলো। ঝড় বৃষ্টি কিচ্ছু নেই। ঝকঝকে সোনা রোদে চারদিক ফকফক করছে। ঘুম থেকে উঠেই নীলু জানালা দিয়ে তাকালো নারকেল গাছতলায়। কাঁচা জামশুদ্ধ একটা ডাল ভেঙ্গে পড়ে আছে সেখানে। আর কিছু নেই। এখনো ঠিক নীলুর বিশ্বাস হচ্ছে না। কাল রাতের ঘটনা। তবে নীল কলমটা নীলুর দারুণ পছন্দ হয়েছে। ভাবলো, কোজানা নিশ্চই ভুল করে কাল রাতে ওটা রেখে গেছে। আবার এলে ফেরত দিয়ে দেবে।

নীলু টেবিল থেকে নীল কলমটা তুলে নিয়ে ভালো করে দেখতে লাগলো। একটা ফাউন্টেন পেনের মতই। মনে হয় কোন ধাতুর তৈরি। চকচকে নীল। কিন্তু অদ্ভুত নরম। কলমটাকে যে কোন দিকে বাঁকানো যায়, আবার সোজা করা যায়। নীলু কলমটাকে হাতের তালুতে নিয়ে রাবারের মত দুমড়ে মুচড়ে নাড়– বানিয়ে ফেলল। কিছুক্ষণ পর ওটা আবার পেন্সিলের মতো সোজা হয়ে গেল। একটা সুন্দর সোনালী নিব আছে কলমটাতে। নীলু ভালোভাবে লক্ষ্য করলো, নিবের গোড়ায় অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়েকটা বোতামের মতো সাজানো। কলমটা থেকে কেমন যেন ঘোড়ার ডাকের মত চিহি চিঁহি শব্দ বেরুচ্ছে। খুব আস্তে। কানের কাছে না আনলে বোঝাই যায় না।

নীলুর সন্দেহ হল। এটা কি আসলে কলম, না কোন যন্ত্র? সন্দেহ ঘোচাতে নীলু ওর ছোট মামাকে একটা চিঠি লিখতে বসলো। নীলু ভাবলো, এ দুদিনের ঘটনা কোনভাবে কাউকে কিচ্ছু বলা যাবে না। কেউ এসব বিশ্বাস করবে না। সবাই নীলুকে পাগল বলবে। মামাকে আসতে বলে নীলু চিঠি লিখতে বসলো। চমৎকার। কলমটায় সুন্দর চিকন দাগ পড়ছে। কালির রঙটা নীল। হোকগে। নীল রঙটাও খারাপ কিছু না। কিন্তু এ কি! কলমটা কাগজের উপর ধরতেই ওটা হিজি বিজি কি সব আপনা আপনি লিখে চলেছে! কিচ্ছু সংকেত ধরনের। নাহ, কিছুই বুঝছে না নিলু। ধ্যেৎ, পৃথিবীতে কত্তো ভাষা রয়েছে। নীলু কি সেসব জানে না কি? হবে কোনো একটা। কিন্তু যে ভাষাই হোক, নীলুর যেন কিছুই লিখতে হচ্ছে না। নীলু শুধু কাগজের উপর কলমটা ধরে আছে। যা লেখার নীল কলমই লিখে চলছে আপনা আপনি।

নীলু খুব বিরক্ত হল। রেগে কলমটার ঘাড় মটাক দিল। এতে নিবের কাছে থাকা নবগুলো এক পাঁক ঘুরে গেল। আচ্ছা, লেখা না হয় হলো না। একটা ছবি আঁকলে কেমন হয়? আবার নীল কলম আর কাগজ নিয়ে বসল নীলু। অপূর্ব! একটু ফুটফুটে সুন্দর বাচ্চা মেয়ের ছবি এঁকে দিল কলমটা। একটা পৃথিবীর মতো গ্লোব নিয়ে শিশুটি খেলছে। খুব হাসছে। শিশুটির পিছনে অসীম মহা বিশ্বের ছবি। কালো আকাশে অসংখ্য তাঁরা মিটমিট করে জ্বলছে। মূহূর্তেই স্কেচ থেকে ছবিটা রঙিন হয়ে গেল। এরপরই ছবির শিশুটা সচল হয়ে উঠলো। একটুকরো কাগজের বুকে এত্তো সুন্দর ছবি! মূহূর্তেই নীলু দেখলো, ছবি আঁকার সময় নীল কলমটা কাগজের উপর শুধু এপাশ থেকে ওপাশে মাকুর মত দৌড়াদৌড়ি করছে। দশ সেকেন্ড মাত্র। এরই মধ্যে এতো সুন্দর একটা ছবি এঁকে ফেলল নীল কলমটা! অবাক হয়ে গেল নীলু। আরও বেশি অবাক হলো, কাল রাতে ওর ঘরে যে কোজানা এসেছিল, তার কথা আর কণ্ঠস্বর শুনে ওর চেহারাটা নীলু অবিকল এ রকমই কল্পনা করেছিলো। হয়তো তা সত্যি নয়। নীলুর সন্দেহ হলো, আসলে কি এটা কলম না একটা প্রিন্টার? আধুনিক কোনো কম্পিউটার প্রিন্টার?

৪.

nilchosmaআজ শুক্রবার। স্কুল বন্ধ। কোনো টিচারও বাসায় আসবে না। তাই বলে লেখাপড়া তো বন্ধ রাখা যাবে না। মা বাবার পিটুনি খেতে হবে। কিন্তু নীলু আশ্চর্য হলো, এতো বেলা হলো, কিন্তু বাড়ির কেউ নীলুকে এখনো ডাকেনি। নীলু আস্তে আস্তে উঠে নাস্তার টেবিলে গেলো। টেবিল ফাঁকা। নাস্তা নেই। মা কোথায়? নীলু জোরে ডাক দিলো, ‘মা। মা। আমার খিদে লেগেছে তো। খেতে দাও।’ কিন্তু নীলু মায়ের দেখা পেলো না। নিশ্চয়ই মা কিচেনে বসে কাজ করছে। পা টিপে টিপে কিচেনে ঢুকল নীলু। নাহ, মা নেই। কাজের মেয়ে ছবি কি যেন বাঁধছে। নীলুকে দেখেই ছবি আঁৎকে উঠল, ‘হায় আল্লাহ। নীলু ভাইয়ার তো অহনও খাওন হয় নাই। কই আছিলেন এতখুন?’ নীলু সে কথার কোন জবাব না দিয়ে শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলো, ‘মা কোথায় রে?’
‘ক্যান, আফনে কই আছিলেন? খালা এহন ক্যামুন আছে?’
‘কেমন আছে মানে? মা কোথায়?’

‘মায়েরে তো হেই মাঝ রাইতেই কিলিনিকে লইয়া গেছে। আফনে লগে যান নাই?’
নীলুর মাথায় যেন বাজ পড়লো, মা ক্লিনিকে! কি হয়েছে মায়ের? বাড়ির সবাই তাহলে এখন নিশ্চই মায়ের কাছে আছে। কিন্তু নীলু এখন কিভাবে বুঝবে যে তার মা কোথায় আছে কেমন আছে। ছটফট করতে লাগলো নীলু। কাল রাতের কথা মনে পড়ে বুকের মধ্যে খুব কষ্ট হলো নীলুর। মাকে নিয়ে যাওয়ার সময় মা নিশ্চই নীলুকে একবার দেখতে চেয়েছিলো। কিন্তু ও তো কাল কোজানার কবলে পড়েছিলো। তাই ঘরে থেকেও ঠিক বুঝতে পারেনি কিছুই। অস্থির হয়ে সে দরজা আর সিঁড়ি করতে লাগলো। এমন সময হঠাৎ বাড়ির ফোনটা বেজে উঠলো।

নীলুর মায়ের জ্ঞান ফিরছে না। অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে। ডাক্তাররা ঠিক অসুখটা ধরতে পারছে না। নীলুর মায়ের ফর্সা মুখ খুব আস্তে আস্তে নীলচে হয়ে যাচ্ছে। ডাক্তারদের অনুমান, তাকে হয় সাপে কেটেছে নয়তো তিনি বিষ খেয়েছেন। পাঁচ ছবার রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু রক্তকণায় কোনো রকম বিষের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না। রাত থেকেই তিনি অজ্ঞান। নীলুর বাবার চোখ মুখ ভয়ে রক্তশূণ্য হয়ে উঠেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তিনি রীতিমত আতংকিত। নীলু কেবিনে ঢুকতেই তার আব্বু নীলুকে জড়িয়ে ধরলো, ‘আয়, দেখবি তোর মায়ের কি দশা হয়েছে। আধ রাতের মধ্যেই এখন আর তাকে চেনা যাচ্ছে না।’
‘আব্বু। কি হয়েছে মায়ের?’
‘জানিনা। ডাক্তাররাও রোগটা ধরতে পারছে না।’
‘আমি কি মাকে একটু দেখতে পারি?’ নীলু ওর আব্বুকে জিজ্ঞেস করল। নীলুর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়।
নীলুর আব্বা নীলুকে নিয়ে গেলো কেবিনের ভেতর। সাদা ধবধবে বিছানায় শুয়ে আছে তার মা। গলা পর্যন্ত একটা চাদরে ঢাকা। মুখে লাল রঙের একটা অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। চোখ বুজে যেন ঘুমিয়ে আছে নীলুর মা। মুখটা আকাশের মতো নীল।

‘মা, মা।’ নীলু ডাকলো। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। মায়ের কপালে হাত দিলো নীলু। বরফের মত ঠাণ্ডা, অথচ বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরছে। ডাক্তাররা বলেছে, তিনি কোমায় আছেন। যে কোনো সময় তার মৃত্যু হতে পারে। তাই মানসিকভাবে সবাইকে তৈরি থাকতে বলেছেন।

নীলুর মনে হলো, একটা সুন্দর ফুটফুটে ছোট্ট মেয়ে। তুলতুলে নরম পায়ে পৃথিবী নামক গ্রহটাকে লাথি মেরে যেন ফুটবল খেলছে। মহাশূন্যটা যেন একটা বিরাট মাঠ। পৃথিবীটা একবার এদিকে আর একবার ওদিকে গড়াচ্ছে। সে পৃথিবী থেকে নীলুর মা ছিটকে পড়ে যাচ্ছে মহাশূন্যে। না, নীলু আর ভাবতে পারছে না। মাকে ছাড়া সে এই পৃথিবীতে কি করে বাঁচবে?’ নীলুর বুকের ভেতরে খুব কষ্ট হচ্ছে। বাঁ হাতে বুকটা চেপে ধরল নীলু। কান্না আসছে না। খুব বেশি কষ্ট হলে চোখের জলগুলো বোধহয় শুকিয়ে যায়। নীলুর পকেটে সেই নীল কলমটা রয়েছে। নীলু আঁতকে উঠল। নীল চশমা, নীল কলম। মায়ের নীল হয়ে ওঠা- সব বিষ। সব অলক্ষুণে। এক্ষুণি ওকে ফেলে দিতে হবে। কোজানা তার কাছে এক অভিশপ্ত প্রাণী। ভিনগ্রহ থেকে এসে নীলুর জীবনটা ওলট পালট করে দিতে চাইছে।

নীলু একটু কাঁদতে চায়। নীলু ওর মাকে বাঁচাতে চায়। নীলু এই নীল কলমটা ফেলে দিতে চায়। মায়ের পাশ থেকে উঠে নীলু ধীরে ধীরে কেবিনের বাথরুমে ঢুকল। দরজা  বন্ধ করে পকেট থেকে আস্তে আস্তে বের করল নীল কলমটা।

লোড শেডিং। বাথরুমের ভেতরটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল। আর তখনি নীলু দেখতে পেল, কলমের ডগা থেকে নীল রঙের সূতোর মত কেমন যেন একটা রশ্মি বের হচ্ছে। কেঁপে কেঁপে সে রশ্মি বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। নীল কলমের গা হঠাৎ আলোকিত হয়ে উঠল, অনেকটা রাউণ্ড শেপ এলসিডি মনিটরের মত। ক্ষুদে স্ক্রীন। তবু তাতে সে স্পষ্ট দেখতে পেল একটি মেসেজ, বাংলায় লেখা, ‘নীলু, আমি সত্যিই খুব দুঃখিত। তোমার মায়ের এ অবস্থার জন্য আমিই দায়ী। কিভাবে হলো সে কথা তোমাকে আমি আর একদিন বলব। এখন যা বলছি মন দিয়ে শোন। তুমি যদি তোমার মাকে বাঁচাতে চাও তাহলে এক্ষুণি কলমটা দিয়ে কাগজের উপর তুমি দাগ দিতে শুরু করো। কাগজে যে নির্দেশ পাবে সেই মতো তোমার মায়ের চিকিৎসা করবে। ইতি কোজানা।’ হতভম্ব হয়ে গেল নীলু। নীল কলমের গা থেকে মেসেজ মুছে গেল। নিবের ডগা থেকে কোনো নীল আলোও আর বের হচেছ না।

বাথরুম থেকে ফিরে এসে মায়ের পাশে এসে বসলো নীলু। আব্বু ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি করছে। নীল কলমটা দিয়ে একটা সাদা কাগজে খস খস করে লিখতে শুরু করল। ও লিখবে কি? কাগজের উপরে কলমটা ধরতেই আপনা আপনিই কিছু নির্দেশনা প্রিন্ট হতে লাগল- ....:০০১৩.....ইএফ৭-বিডি.নীলু.কম তোমার মায়ের অক্সিজেন মাস্কটা এখন কার্বন ডাই অক্সাইডের একটা ডেলিভারী সিলিণ্ডারে লাগিয়ে দাও। তোমার মায়ের রেসপিরেটরী সিস্টেমটা উল্টে গেছে। তোমার মা এখন অক্সিজেন ছাড়ছে, দরকার কার্বন ডাই অক্সাইড। দ্রুত মাস্ক খুলে ফেলো। নির্দেশনায় কিছু ঔষধের নামও লেখা হলো। আর বলা হলো, নীলুর মা আর মাত্র বারো মিনিট বাঁচবে। যা করার এর মধ্যেই করতে হবে।

নীলু প্রিন্ট আউটটা নিয়ে দ্রুত ছুটে গেল ডাক্তারের কাছে। পড়ে ডাক্তার কিছুতেই তা করতে রাজী নন। পাগলটা বলে কি? কার্বন ডাই অক্সাইড তো মানুষকে মেরে ফেলে। ওটা করলে তো তিনি মারা যাবেন এক্ষুনি। কিন্তু নীলু নাছোড়বান্দা। যে করে হোক, দ্রুত এখন ওটার ব্যবস্থা করতে হবে। বললেই তো হয় না। হসপিটালে অক্সিজেন সিলিন্ডার থাকে। কার্বন ডাই অক্সাইড সিলিণ্ডার কি থাকে? অগত্যা কি করা। একটা বণ্ডে নীলুর সই নিয়ে ডাক্তার ক্লিনিকের দেয়ালে ঝোলানো অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রটাকেই সে কাজে লাগালেন। আর কি আশ্চর্য! এক মিনিটের মধ্যেই নীলুর মা চোখ খুললেন, হাসলেন। ধীরে ধীরে  মুখের সব নীল রঙ মুছে যেতে লাগলো। বারো মিনিটের মধ্যেই নীলুর মা পুরো সুস্থ্য হয়ে উঠলেন। নীলুর বাবা কেবিনে ঢুকেই দেখেন নীলুর মা নীলুর সাথে খিল খিল করে হেসে গল্প করছে। সেই সব নীল রঙও মুখে নেই।

‘ওহ ডক্টর, রিয়্যালী য়ূ আর গ্রেট। নীলুর মাকে আপনি এক অজানা কঠিন রোগ থেকে বাঁচিয়ে তুলেলেন। থ্যাংকস এ লট। ডাক্তার, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।’ নীলুর বাবা যেন একদমে কথাগুলো বলে গেলেন। ডাক্তার মুচকি হেসে নীলুর প্রেসক্রিপশনটা নীলুর বাবার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘উঁহু, ধন্যবাদ আমাকে নয়। ধন্যবাদ দিন আপনার ছেলে নীলুকে যাকে আপনারা এতো বড় ডাক্তার বানিয়েছেন। রোগটা ও না হলে তো আমরা ধরতেই পারতাম না। নির্ঘাৎ মারা যেতেন নীলুর মা। কিন্তু সত্যি আমিও খুব অবাক হচ্ছি। আমার মেডিকেল সায়েন্সে জীবনে কখনো এরকম কোনো সমস্যার কথা শুনিনি। পড়িওনি। নীলুকে আপনারা কোথায় পড়িয়েছেন? ও নিশ্চই স্টেটসে থাকে। প্রেসক্রিপশনের ওষুধগুলোর সবই কিন্তু স্টেটসের। ভাল কথা, এরপর থেকে ওষুধগুলো ঠিকমত খাওয়াবেন।’
নীলুর বাবা আমতা আমতা করতে লাগল, ‘নী-লু। ডাক্তারি। নীলু। ডাক্তার! ডাক্তার কি পাগল হয়ে গেল? একটা কিশোর ছেলেকে দেখেও বুঝলেন না যে নীলুর কোন ভাবেই এ বয়সে একজন ডাক্তার হওয়া সম্ভব নয়।’
নীলুর মা জিজ্ঞেস করলো, ‘আচ্ছা তোমাদের কথাবার্তা তো কিছুই বুঝছি না। কি হয়েছিল আমার?’
নীলুর বাবা বলল, ‘সত্যি বড্ডো ভুল হয়ে গেছে। তোমার একটা ফটো তুলে রাখা হোলোনা। তাহলে ফটো দেখেই বুঝতে যে তোমার কি হয়েছিল।’
সবাই হো হো হেসে উঠল। নীলু তার নীল কলমটাকে সযত্নে বুক পকেটে রেখে দিল, না জানি আরও কত কাজে লাগে ওটা। ধন্যবাদ কোজানা। ধন্যবাদ নীল কলম।

৫.

নীলু আজ খুব সুন্দর একটা ড্রেস পড়েছে। ক্রীম গ্যাবার্ডিনের উপর ডোরা কাটা নীল কালো লিনেন শার্ট। ভ্যাপসা গরমে বেশ আরাম লাগছে। সকালেই ছোট মামা এসেছে কাকিনা থেকে। দুজন মিলে আজ যাবে নভোথিয়েটারে। সন্ধ্যায় সেখানে অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি আয়োজন করেছে ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের মহাকাশ দেখা প্রতিযোগিতা। টেলিলেন্সের মাধ্যমে রাতের আকাশে জ্বলতে থাকা সব গ্রহ নক্ষত্রদের প্রথমে চেনানো হবে। তারপর নভোথিয়েটারে দেখানো হবে তার উপর একটা প্রামাণ্য চিত্র। মহাজগতের সৃষ্টিরহস্য ও গ্রহ আবর্তন। ভীষণ মজা হবে। নীলুর স্কুল থেকে নীলু আর পিনুকে মনোনীত করা হয়েছে এ প্রতিযোগিতার প্রতিযোগী হিসেবে। ঢাকার প্রায় শ‘দুয়েক ছাত্র ছাত্রী আজ অংশ নেবে সেখানে। নভোথিয়েটারে সব দেখার পর হবে কুইজ প্রতিযোগিতা। সেরা বিজয়ীর জন্য আছে একটা ল্যাপটপ পুরস্কার।

ছোটো মামা নীলুকে সঙ্গে নিয়ে একটু আগেই বেলা থাকতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো। নীলু বুক পকেটে হাত দিয়ে দেখল, হ্যাঁ নীল কলমটা আছে। আর নীল চশমাটা আনতেও ভোলেনি সে। ওটা রেখেছে স্কুল ব্যাগে।

 

nilchosma

‘এ্যাই, এ্যাই সিএনজি।’ নীলু একটা বেবী টেক্সিকে ডাক দিলো। থামলো না। আর একটাকে। সেটাও যাবে না। অগত্যা কি আর করা। দুজনে হাঁটতে শুরু করলো। কিছু দূর যেতেই একটা ট্যাক্সি ক্যাব পেয়ে গেলো। রওনা হল ওরা নভোথিয়েটারের দিকে। পৌঁছে দেখে নভোথিয়েটারের বাইরে বিশাল দুটো টেলিস্কোপ বসানো হয়েছে। একে একে শিশু কিশোররা চোখ লাগিয়ে দেখছে রাতের আকাশ। ক্যাসেটে ধারা বর্ণনা বাজছে, ‘ওটা হলো বৃহস্পতি। তোমরা যে সন্ধ্যা তারা দেখো, ওটা হলো তাই। একটু ডানে দেখো মঙ্গল, লাল তারার মতো জ্বলছে। তবে তোমরা পৃথিবী খোঁজার চেষ্টা কোরোনা। কেননা ওটা এখন তোমাদের পায়ের নীচে। তবে হ্যাঁ, সপ্তর্ষিমন্ডল আর ছায়াপথটা ভালো করে দেখে নাও। গুনে দেখো তো মঙ্গলের কটা চাঁদ?’ ইত্যাদি ইত্যাদি। নীলু জানে, এ কথাগুলো সব পই পই করে মনে রাখতে হবে। যে করে হোক, প্রতিযোগিতায় জিততে হবে। শুনলে কোজানা খুব খুশি হবে। ছোট মামা জীবনে কখনো নভোথিয়েটার তথা তারামন্ডল দেখেনি। মাথার উপর ছাদে দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যে হলো। কৃষ্ণ কালো আকাশের উপর ধীরে ধীরে ফুটে উঠল সহস্র তাঁরার আলো। একদম সত্যি আকাশের মতো। তারপর বিগ ব্যাং। প্রচন্ড আর্তনাদে ফেটে পড়লো নভোথিয়েটারের ছাদ। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের খাদ মাড়িয়ে মিসিসিপি নদী আর আমাজানের জঙ্গল ঘুরিয়ে দৃশ্যগুলো এসে থামলো সাহারা মরুভূমিতে। উফ। কি রোমাঞ্চকর! লাল নীল গোলাপী চাঁদ, ধুলি ঝড়, বরফের দেয়াল, গ্রহের চারপাশে ভাসমান লক্ষ লক্ষ অগ্নিকণা, অগ্ন্যুৎপাত, ডাইনোসর। কি করে যে একটা ঘন্টা রুদ্ধশ্বাস মহাশূণ্য ভ্রমণে কেটে গেল কিছুই বোঝা গেলো না। এণ্ড্রোমিডা আর জিউসকে ঠিক চেনা গেলো না। সব কিছু এতো দ্রুত ঘটে গেলো যে অনেক কিছুই নীলুর রয়ে গেল ঘোলাটে, না বোঝার মধ্যে। মনে হলো নীলু এতোক্ষণ আলোর চেয়েও দ্রুতবেগে ঘুরে এলো বিশাল মহা জগতে। সত্যি শ্বাসরুদ্ধকর! আ জার্নি টু দ্য ইউনিভার্স! শো শেষ হতেই নীলু দেখলো, ওর পাশে বসে ছোটো মামা নাক ডাকছে, ঘুমুচ্ছে।

নভোথিয়েটারের হল ঘরের বাইরে বিশাল লবি জুড়ে তখন শুরু হয়ে গেছে প্রতিযোগিতা। নীলু নীল চশমাটা চোখে দিয়ে ক্যুইজের কাগজের প্যাকেটের দিকে তাকালো। ভেতরের সব প্রশ্ন নীলু পড়তে পারছে। প্রশ্ন রয়েছে সৌরজগতে গ্রহের সংখ্যা কয়টি, মঙ্গলের চাঁদ কয়টি, পৃথিবী থেকে মঙ্গলের দূরত্ব কতো, সূর্য আর কতদিন বাঁচবে ইত্যাদি ইত্যাদি। না, আর তাকিয়ে থাকা ঠিক হবে না। ওটা নকল করা হয়ে যাবে। ওটা খারাপ কাজ। একটা ফরমে নীলু তার নাম আর প্রতিযোগীর কোড নম্বর লিখলো। ভিতরে বক্সে বক্সে প্রশ্ন। উত্তর দিতে হবে। নীলু কলম বের করলো- নীল কলম। কাগজে ছোঁয়াতেই নীল কলম পঁচিশটা প্রশ্নের উত্তর লিখে দিল পঁিচশ সেকেন্ডেই। কি অবিশ্বাস্য! সময় এক ঘন্টা। এখনই জমা দেয়া কি ঠিক হবে? ওরা কি ঠিক বিশ্বাস করবে? সবগুলো উত্তর কি ঠিক আছে? জমা দেয়ার আগে একটু পড়ে নিল নীলু। ইস কি কঠিন ক‘টা প্রশ্ন রে বাবা? নীলু কিছুতেই সেগুলো পারতো না। পড়ে অবাক হয়ে গেল, তার জানা উত্তরের সবগুলোই একদম ঠিক লিখেছে নীল কলমটা। একটা জায়গায় শুধু খটকা লাগলো। আমাদের সৌরজগতে মোট কটা গ্রহ আছে। একসময় বলা হতো নয় নবগ্রহ। এখন প্লুটো বাদ, সুতরাং আটটি। এটা কার না জানা? কিন্তু নীল কলমটা লিখেছে আশিটা। গ্রহের সংখ্যা আশি?’ নিশ্চই একটা শুণ্য ভুল লিখেছে নীল কলমটা। ফসফস করে লিখতে গিয়ে শূণ্যটা বেশি লিখে ফেলেছে। কিন্তু উত্তরপত্রে কাটাকাটি করা নিষেধ। অগত্যা তাই রেখে দিলো নীলু। তারপরও দশ মিনিটেই উত্তরপত্র জমা দেয়ায় সবাই তো অবাক। নিশ্চই কিছু লিখতে পারেনি ছেলেটা। কিন্তু না। সবাইকে তাক লাগিয়ে নীলু প্রতিযোগিতায় সেরা ক্ষুদে মহাকাশ জ্ঞানীর পুরস্কারটা জিতে নিলো। একটা উত্তর ভুল, আমাদের সৌরজগতে গ্রহের সংখ্যাটা নীলু ঠিক লেখেনি। অতো সহজ প্রশ্নটার উত্তরই ভুল লিখলো?
‘অভিনন্দন। অভিনন্দন নীলু।’ স্কুলের আকরাম স্যার এগিয়ে এসে নীলুকে জড়িয়ে ধরলেন। নীলুও খুব খুশী হলো পুরস্কারটা জিতে। তবে পুরস্কার তো নীলু জেতেনি, জিতেছে নীল চশমা আর নীল কলম। কিন্তু এসব কথা তো কেউ বিশ্বাস করবে না!