ভালোবাসার সবুজ গাছ

ইমরুল ইউসুফ

গাছটির আজই প্রথম গাড়িতে ওঠা। এর আগে কখনো কোনো গাড়িতে চড়া হয়নি তার। এ জন্য গাড়িতে উঠেই গাছটির মনে হলো দম আটকে যাচ্ছে। গাড়ির এসির ঠান্ডা বাতাসে একটু শীত শীত লাগছে। গলাটা কেমন জানি খুশ খুশ করছে। কিন্তু কিছুই করার নেই। এখন শুধু বসে থাকা। আর গাড়ির কাঁচের ভিতর থেকে এটা সেটা দেখা।

গাছটি দেখতে থাকে। রাস্তায় কতো মানুষ। কতো গাড়ি। কতো বাড়ি। সব কিছু সরে সরে যাচ্ছে। কেবলই পিছন দিকে চলে যাচ্ছে। সে এখন যাচ্ছে কোথায়? ভাবতে থাকে। হঠাৎ গাড়ি ব্রেক করলো। গাছটির মাথা গিয়ে ঠেকলো গাড়ির সিটে। আবার ফিরে এলো জায়গা মতো। ফিরে এলো তাকে ধরে রাখা মানুষটির হাতে।

ValobasharShobujGach01কতো মানুষ যে তার গায়ে হাত রেখেছে। মুখে মাথায় শরীরে হাত বুলিয়েছে। গোড়ায় পানি দিয়েছে। মাটি দিয়েছে। কিন্তু এমন করে কোলের মধ্যে নেয়নি কেউ। এমন করে বুকের মধ্যে নেয়নি কেউ। এজন্য লোকটিকে ভীষণ ভালো লাগে গাছটির। কিন্তু গাছটির ঐ লোকটিকে ভালো লাগে না, যে তাকে মাটি খুঁড়ে উঠিয়েছে। যে লোকটি তাকে বিক্রি করে দিয়েছে। যে লোকটি এসি ছেড়ে তাকে ঠান্ডা বাতাস খাইয়েছে।

খাওয়ার কথা মনে হতেই গাছটি উপলব্ধি করলো তার পেট ভরে যাচ্ছে। একটু একটু গরম লাগছে। ডালপালা একটু মেলে দিতেই সে বুঝলো সূর্যের আলো তাকে আদর করছে। সূর্যের আলো তাকে খাইয়ে দিচ্ছে। কাঁচঘেরা গাড়ি থেকে লোকটি তাকে নামিয়েছে। তাকে কোলে করে রেখেছে। কোলে থেকেই বুঝলো সে আবার চলতে শুরু করেছে।
সে আবার যেতে শুরু করেছে সামনের দিকে।

যেতে যেতে গাছটি দেখলো বিশাল একটি বাড়ি। বাড়ির সামনে সারি সারি গাছ। ফুলের বাগান। বাড়ির সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠেই দেখলো বড় একটি ঘর। ঘরে ছোট বড় অনেক মানুষ। মানুষগুলোর ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। সবাই কেবল ছুটছে। দৌড়াদৌড়ি করছে। একজন এটা নিয়ে যাচ্ছে। আরেকজন সেটা আনছে।

লোকটি একটি গাছ হাতে করে নিয়ে এসেছে। গাছটি দেখেই সবার ব্যস্ততা একমুহূর্তের  জন্য থেমে গেল। বিশেষ করে শিশুদের। শিশুরা দৌড়ে এলো লোকটির কাছে। লোকটির হাত থেকে ছোঁ মেরে গাছটি নিয়ে নিলো। তারপর আনন্দে লাফাতে লাগলো। বলতে লাগলো, এসে গেছে ক্রিসমাস ট্রি। এসে গেছে ক্রিসমাস ট্রি। আমাদের সবুজ গাছ। আমাদের ভালোবাসার সবুজ গাছ। গাছটিকে এখন আমরা মনের মতো করে সাজাবো। গাছটিকে আলোয় আলোয় ভরিয়ে তুলবো। গাছটিকে ফুলে ফলে ভরিয়ে দিব। আমাদের আজ অনেক আনন্দ হবে।

ValobasharShobujGach02 চড়ুই পাখির ছানার মনেও আজ অনেক আনন্দ। সে বুঝলো আজ উৎসবের দিন। আজ আনন্দের দিন। কিন্তু কিসের জন্য উৎসব? কেন এতো আনন্দ? ঘরের ভেন্টিলেটরে বসে এটা কিছুতেই বুঝতে পারছিলনা চড়ুই ছানা। আর গাছটিও বুঝতে পারছিলনা তাকে নিয়ে আজ এসব কী হচ্ছে? তাকে কেনই বা এমন বর্ণিল সাজে সাজানো হচ্ছে?

একই ভাবনা চড়ুই ছানাটিরও। ছানাটি তার মাকে বললো, মা, আজ এখানে কী হবে? সবাই মিলে ঐ গাছটিকে সাজাচ্ছে কেন? মা বললো, জন্মের পর থেকেই এমনটি দেখছি। আমার জন্মের পর এমন একটি দিন দেখেই আমি আমার মাকেও এই প্রশ্ন করেছিলাম। মা আমাকে বলেছিল, ঝাউ গাছের মতো দেখতে ঐ গাছটির নাম ক্রিসমাস ট্রি বা ফারগাছ। ক্রিসমাস ট্রির যাত্রা শুরু হয়েছিল জার্মানিতে, প্রোটেস্টান্ট প্রবক্তা মার্টিন লুথারের মাধ্যমে।


এক ক্রিসমাস অর্থাৎ ২৫ ডিসেম্বর রাতে মার্টিন লুথার বনের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিলেন। খুব ঝকঝকে ছিল সে রাতের আকাশ। বনের গাছপালা পাতার ভিতর দিয়েও তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন রাতের আকাশ। আকাশে তারাগুলো মিটিমিটি করে জ্বলছিল। তার তখন মনে হচ্ছিল গাছের ডালপালা, পাতায় কে যেন তারাগুলো সাজিয়ে রেখেছে।

এই দৃশ্য দেখে মার্টিন এতোই মুগ্ধ হলেন যে সৃষ্টিকর্তার সৌন্দর্য বোঝাতে গিয়ে তিনি বন থেকে একটি ফারগাছ কাটলেন। ছোট সেই ফারগাছটি নিয়ে গেলেন বাড়িতে। তারপর গাছটির ডালপালায় ছোট ছোট মোমবাতি সাজিয়ে দিলেন। মোমবাতিগুলো জ্বালিয়ে তারা ভরা রাতের সেই আকাশটাই যেন ঘরের ভিতর নামিয়ে আনলেন। ক্রিসমাস ট্রির যাত্রা সেই শুরু। পরবর্তীতে জার্মান অধিবাসীরা পৃথিবীর যেখানেই গেছেন সেখানেই নিয়ে গেছেন ফারগাছ বা ক্রিসমাস ট্রি।

ValobasharShobujGach03 মা, কতো সাল থেকে এই গাছ সাজানো শুরু হয়েছে সেটা কিন্তু বললে না! ও হ্যাঁ, ১৮৪০ সালের দিকে এর যাত্রা শুরু। ১৮৪১ সালে এরকম একটি ক্রিসমাস ট্রি জার্মানির প্রিন্স অ্যালবার্ট তার স্ত্রী ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়াকে উপহার দিয়েছিলেন। বলতে গেলে সেটিই ইংল্যান্ডে আসা প্রথম ক্রিসমাস ট্রি। ইংল্যান্ডের উইন্ডসর ক্যাসলে সেই ক্রিসমাস ট্রি সাজানো হয়েছিল মোমবাতি, ক্যান্ডি, ফল, জিনজার আর ব্রেড দিয়ে। আর এই গাছ ১৮৮২ সালেই প্রথম টুনি বাল্বের আলোয় অর্থাৎ বিদ্যুতের ছোঁয়ায় সেজেছিল।

এক মনে ক্রিসমাস ট্রির গল্প শুনছিল চড়ুই ছানা। হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচিতে লাফিয়ে উঠলো সে। মায়ের মুখ থেকে চোখ ফেরাতেই চড়ুই ছানা তো অবাক। ঘরের মধ্যে এতো আলো! এতো মানুষ! এতো কোলাহল! এতো আনন্দ! ঘরের লাইটগুলোও যেন আনন্দ করছে। বিশেষ করে ক্রিসমাস ট্রির ডালে আটকানো টুনি বাল্বগুলো। লাল নীল বাল্বগুলো এবার জ্বলছে, একবার নিভছে। লাল নীল আলোয় দেখা যাচ্ছে গাছের গায়ে বাধা ছোট ছোট ঘণ্টা। ছোট ছোট করে কাটা আপেল, বাদাম, পপকর্ন আরো কতো কী! লাল সাদা পোশাক, মাথায় লাল টুপি আর একমুখ সাদা দাড়িওয়ালা এক বুড়ো পিঠে ঝোলা নিয়ে গাছটির আশপাশে ঘুরছে। ঘুরে ঘুরে নানা ধরনের উপহার বিলি করছে।

ঐ বুড়োটা কে মা? ছোট বড়ো সবাইকে উপহার দিচ্ছে? মা বললেন, বুড়োটার নাম সান্তা কজ। পৃথিবীর সকল শিশুর কাছে তিনি ভীষণ জনপ্রিয়। তার জনপ্রিয়তা শুরু হয়েছিল ১৮৮২ সালে। নিউইয়র্কের এক সংবাদপত্র কিমেন্ট কার্কের লেখা সান্তা কজের ওপর একটি কবিতা প্রকাশ করে।  টমাস নেস্ট নামের এক শিল্পী কবিতার সঙ্গে মিলতাল করে সান্তা কজের মজার একটি ছবি আঁকেন। সেই ছবির মতো করেই সেজেছে আজকের এই সান্তা কজ। আর সবাইকে মজার মজার চকলেট, বাদাম, পপকর্ন বিলিয়ে যাচ্ছে।

গল্প শুনে চড়ুই ছানারও ভীষণ ইচ্ছে করে সান্তা কজের উপহার পেতে। ইচ্ছে করে ক্রিসমাস ট্রির ডালে বাসা বাধতে। টুনি বাল্বের লাল নীল আলোয় আলোকিত হয়ে উঠতে। চড়ুই ছানা তার এই ভাবনার কথা মাকে বলে। মা বলেন, বাছা আরো  বড়ো হও, উড়তে শেখো। তারপর আমরা ক্রিসমাস ট্রির ডালে বাসা বাধবো। ক্রিসমাস ট্রির মতো আমরাও টুনি বাল্বের লাল নীল আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবো। মায়ের কথা শুনে চড়ুই ছানা ডানা ঝাপটানোর চেষ্টা করে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আলো ঝলমলে ক্রিসমার ট্রির দিকে।