কুমড়ো দানব

অনীশ দাস অপু

অনেক অনেক বছর আগে মাঠে কুমড়ো বলে কোন সব্জি ফলত না। লোকে কোনদিন কুমড়োর তরকারি খায়নি, কুমড়োর পাইও চক্ষে দেখেনি- ওই সময় আবির্ভাব ঘটল কুমড়ো-দানবের।
পৃথিবী সৃষ্টির পরে কত কিসিমের দৈত্য দানবের যে আবির্ভাব ঘটেছে! তাদের মধ্যে খুব অল্প কটা দৈত্য বা দানব ছিল ভাল স্বভাবের। আর বেশিরভাগ এতই খারাপ যে লিখে বোঝানো যাবে না। কুমড়ো-দানবও ছিল খারাপ দৈত্যগুলোর একটা। তার নাম শুনলেই লোকে কেঁপে উঠত ভয়ে।

কুমড়ো-দানব ছিল বেজায় লজ্জা। যত লজ্জা দানবের কথা তোমাদের জানা আছে তাদের চেয়েও অনেক অনেক লজ্জা কুমড়ো-দানব। তার প্রকাণ্ড মাথাটা হলুদ রঙের, নরম এবং চকচকে। চোখগুলো বড় বড়, গোল, ভাটার মত সারাক্ষণ জ্বলজ্বল করছে। দেখলে মনে হয় মাথার মধ্যে মোম জ্বলছে। মুখখানা তার মাথার প্রায় অর্ধেক জুড়ে। মুখের মধ্যে সারি সারি দাঁত। সারাক্ষণ হাঁ হয়ে আছে।
কুমড়ো-দানব বাস করত এক প্রাসাদে। পাহাড়ের উপর প্রকাণ্ড প্রাসাদ। সামনে মস্ত উঠোন, তাতে হাড়ের স্তূপ! মানুষের হাড়গোড় বলেই সন্দেহ হয়। কুমড়ো-দানব ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে খুব পছন্দ করত। বিশেষ করে নাদুস নুদুস বাচ্চা ছেলেদের প্রতি তো তার খুবই লোভ ছিল। ওই দানবকে নিয়ে ভয় আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। এমনকি রাজাও কুমড়ো-দানবের ভয়ে থরহরিকম্প ছিলেন। রাজার অবশ্য ভয় পাবার কারণও ছিল। কারণ তাঁর একমাত্র মেয়ে, রাজকুমারী রূপালির মত মোটা মেয়ে ওই সময় পৃথিবীতে আর কেউ ছিল না। রাজকুমারী এমনই মোটা গত বার বছরে তাকে এক কদমও কেউ হাঁটতে দেখেনি। সে শুধু গড়িয়ে গড়িয়ে চলত। অবশ্য ওটা দেখার মতই একটা দৃশ্য ছিল। মাথায় ঝলমলে মুকুট, পরনে সবুজ মখমলের পোশাক, ইয়া মোটা রাজকুমারী রাজপ্রাসাদের বাগানে গড়িয়ে যাচ্ছে- এমন দৃশ্য লাখে একটা মেলে?

 Golpo_KumroDanob1304a.jpg

মেয়েকে নিয়ে সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকতেন বলে রাজা কখনোই বডিগার্ড বা দেহরক্ষী ছাড়া রাজকুমারীকে কোথাও যেতে দিতেন না। পঞ্চাশ জন সৈন্যের একদল দেহরক্ষী সারাক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখত রাজকন্যা রূপালিকে। তারপরও রাজার ভয় যায় না।
রাজার মতো তো আর পঞ্চাশ জন দেহরক্ষী রাখার সামর্থ্য প্রজাদের নেই , কাজেই যাদের ঘরে মোটাসোটা বাচ্চা ছিল সন্তানের চিন্তায় তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। এক সময় এমন অবস্থা হলো যে কুমড়ো-দানবের হামলার কারণে রাজ্যে মোটা বাচ্চাই আর বলতে গেলে কিছুই রইলো না। আরও ভয়ের কথা, কুমড়ো দানব কি একটা ওষুধ খেয়ে তার ক্ষিদেও নাকি বাড়িয়ে তুলেছিল।

কুমড়ো-দানবের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ এবং হতাশ হয়ে রাজা শেষে ঘোষণা দিলেন যদি কেউ, সে দরবারের লোক বা সাধারণ প্রজাদের যেই-ই হোক, কুমড়ো-দানবের কল্লা মানে মাথা কেটে আনতে পারবে তাকে তিনি সেনাপতি বানিয়ে দেবেন। বিশেষ কোন কাজের পুরস্কার হিসেবে রাজা সবসময় এরকম ঘোষণাই দিতেন। আর লোকেও সেনাপতি হবার স্বপ্ন দেখত।
রাজার ঘোষণা শুনে প্রজাদের মধ্যে রীতিমত চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলো। কারণ সবারই মনের গোপন বাসনা সে সেনাপতি হবে। কুমড়ো-দানব হত্যার জন্যে আগ্রহী হয়ে উঠল সকলে। তবে সমস্যা একটা ছিল : সবাই যমের মতো ডরাত কুমড়ো দানবকে। দানবের কাছে ছুরি হাতে এগিয়ে গেলেও শেষতক সত্যি সত্যি তার কল্লা কেটে আনতে পারবে কিনা এ ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসের যথেষ্ট অভাব ছিল সবার মনে।
এক গরীব লোক বাস করত কুমড়ো-দানবের প্রাসাদ থেকে খানিক দূরে। তার একখানা কুটির আর একটা আলুর মাঠ ছাড়া কিছুই ছিল না। আর ছিল বার বছরের একটি মাত্র পুত্র সন্তান। মোটার দিক থেকে সে রাজকুমারী রূপালির চেয়ে কোন অংশে কম যায় না। তবে নেহায়েতই গরীব বলে ছেলের জন্যে বডিগার্ড রাখার ক্ষমতা ছিল না লোকটির। আর কুমড়ো-দানবের প্রাসাদের কাছেই থাকে বলে ছেলের জন্যে তার ভয়ও ছিল বেশি। রাত-দিন ধুকপুক করত হৃৎপিণ্ড। না জানি কখন এসে দানব তার আদরের ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়! আর আরো অনেকের মত, কুমড়ো-দানবের কথা ভাবলেই শরীরে কাঁপুনি উঠে যেত বলে ছেলেটার মা গত দুবছর ঘরের বারই হতে পারেনি। গরীব লোকটির আলুর ক্ষেত দিয়ে কোনমতে জীবন চলত। বেশির ভাগ সময় মা আর বাবাকে অনাহারে থাকতে হতো। কারণ ক্ষেতের আলুর বেশির ভাগ খেয়ে ফেলত তাদের মোটু ছেলেটা। মোটকথা, খুবই করুণ অবস্থা ছিল পরিবারটির।
ছেলেটি বেজায় মোটা ছিল বলে তাকে সবাই ডাকত হোঁতকা বলে। তাঁর বাবার নাম রমজান আলি, মা খোদেজা খাতুন। একদিন সকালে রমজান আলি ছেলে হোঁতকাকে নিয়ে মাঠে গেছে আলু তুলতে। নতুন আলু বিক্রি করবে বাজারে। ওই সময়ের আলুগুলো এখনকার আলুর চেয়ে আকারে অনেক বড় ছিল।

রমজান আলি আর হোঁতকা মিলে এক বস্তা আলু তুলে ফেলল। অবশ্য আলু তুলতে সময় লাগছিল তাদের। কারণ স্ত্রীর মত রমজান আলীরও কুমড়ো-দানবের কথা মনে পড়লেই কাঁপুনি উঠে যেত গায়ে। আর জলহস্তির চেয়েও মোটা হোঁতকা দ্রুত কোন কাজই করতে পারে না।
বাপ-ব্যাটা মিলে আলু তুলছে, এমন সময় থরথর করে কেঁপে উঠল মাটি। রমজান আলি আর হোঁতকা চোখ তুলে দেখে কি তাদের সামনে বিকট মুখ হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে- আর কেউ নয়, স্বয়ং কুমড়ো-দানব!
‘জলদি আমার পেছনে চলে আয় রে, বাপ’! আঁতকে উঠে হোঁতকাকে উদ্দেশ্য করে বলল রমজান আলি।
হোঁতকা বাপের পেছনে চলে এল। কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হলো না। হোঁতকার চর্বি থলথলে থুতনি দিব্যি দেখা যাচ্ছিল রমজান আলির পরনের ফতুয়ার দুই পাশ থেকে।
রমজান আলি তেমন একটা সাহসী নয়। তবে বিপদে পড়লে কোত্থেকে যেন মনে ভর করে সাহস, শরীরে শক্তি। এবারও তাই ঘটল।
কুমড়ো-দানবকে প্রকাণ্ড মুখের হাঁটা আরো বড় করে লম্বা লম্বা পা ফেলে ওদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে রমজান আলি বড়সড় একটা আলু ছুঁড়ে মারল ওটার মুখ লক্ষ্য করে। সোজা হাঁ এর মধ্যে ঢুকে গেল আলুটা। আটকে গেল গলায়। শ্বাস নিতে না পেরে দাপাদাপি শুরু করে দিল কুমড়ো-দানব। কিছুক্ষণ কাটা মুরগীর মত হাত-পা ছুঁড়ে শেষ দম বন্ধ হয়ে মরে গেল।
কুমড়ো-দানব যখন গলায় আলু বিঁধে দাপাদাপি করছিল ওই সময় রমজান আলি তার ছেলেকে নিয়ে দে ছুট। এক দৌড়ে বাড়িতে। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল কুমড়ো-দানব পাগলের মত লাফাচ্ছে-ঝাঁপাচ্ছে। তারপর এক সময় পড়ে গেল মাটিতে। আর নড়াচড়া করল না। ওরা বুঝতে পারল মরে গেছে দানব। কুমড়ো-দানবের মৃত্যুর খবর শোনা মাত্র হোঁতকা’র মা’র মৃগী রোগীর মত ব্যারাম সেরে গেল। গত দুবছরের মধ্যে এই প্রথম লাফ মেরে নামল সে বিছানা থেকে। রমজান আলি রান্নাঘরের চুল্লির সাথে ঘষে শানিয়ে নিল ছুরি। তারপর তিনজন মিলে গেল আলু ক্ষেতে।

পা টিপে টিপে ওরা এগোল কুমড়ো-দানবের নিশ্চল দেহের দিকে। মনে সন্দেহ, সত্যি মরেছে তো দানবটা? নাকি মটকা মেরে পড়ে আছে? হোঁতকাকে কাছে পেলেই ‘হুম’ করে লাফিয়ে উঠবে আর ধরে খেয়ে ফেলবে। কিন্তু না, উঠল না দানব। সত্যি মারা গেছে। ধারাল ছুরি দিয়ে কুমড়ো দানবের মাথাটা কেটে ফেলল রমজান আলি। হোঁতকা খেলার দারুণ জিনিস পেয়ে গেল। কুমড়ো দানবের গোল মাথাটাকে বল বানিয়ে খেলতে লাগল সে।

Golpo_KumroDanob1304b.jpg


রাজা ওদিকে কুমড়ো-দানবের মৃত্যুর খবর শুনেছেন। শুনে মস্ত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন। খোদেজা খাতুনের মত তাঁরও মৃগী রোগ ছিল, কুমড়ো-দানবের কথা মনে পড়লেই ভয়ে কাঁপতেন। তিনিও ব্যামোটার হাত থেকে রক্ষা পেলেন। তাঁর সিংহাসনের চারপাশে খুঁটি লাগানো ছিল। যাতে কাঁপুনির চোটে সিংহাসন ভেঙে পড়ে না যান রাজা। এবারে খুঁটিগুলো সরিয়ে ফেলা হলো। রাজকন্যা রূপালি অনুমতি পেল পঞ্চাশজন বডিগার্ডের দল ছাড়াই সে বাইরে যেতে পারবে। শুনে রাজকুমারী খুব খুশি। বডিগার্ডদের জন্য সে একটুও মজা করতে পারত না। সারাক্ষণ বডিগার্ড নিয়ে চলতে কাঁহাতক ভাল্লাগে; ধরো সে লাল-সোনালি রঙের একটা প্রজাপতি ধরার চেষ্টা করছে গড়িয়ে গড়িয়ে এমন সময় বর্শা হাতে তার সামনে যদি এসে দাঁড়ায় কোন সৈন্য আর পালিয়ে যায় প্রজাপতি, মেজাজ খারাপ হয় না?

তবে রাজা কিন্তু খুশির চোটে তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ভুলে গেলেন। রমজান আলিকে সেনাপতি বানালেন না তিনি।
সেনাপতি হতে না পেরে খুবই দুঃখ পেল রমজান আলি। কষ্ট লাগল খোদেজা খাতুনের। সেনাপতির বউ হবার মজা আর সম্মানই আলাদা। তবে বাবা সেনাপতি হতে পারেনি বলে হোঁতকার মনে কোন দুঃখ কষ্ট নেই। সে কুমড়ো দানবের মাথাটাকে বল হিসেবে পেয়েই খুশি। এমন দারুণ একটা জিনিসের মালিক হোঁতকা, প্রতিবেশীরা ছেলের ঈর্ষায় আর বাঁচে না। তারা আলুর ক্ষেতের পাশে তোলা দেয়ালের ফাঁক ফোকর দিয়ে ইতিউতি তাকিয়ে দেখে কুমড়ো দানবের মাথাটা নিয়ে মহানন্দে খেলা করছে হোঁতকা। হোঁতকার গোঁদা পায়ের লাথির চোটে দানবের মাথাটা একসময় ফেটে চৌচির হয়ে গেল। ছড়িয়ে পড়ল সারা মাঠে।
পরের বসন্তে রমজান আলির জমিতে অদ্ভুত একটি ফল জন্মালো। কিছুদিন পর ফলটির রূপান্তর ঘটল কুমড়ো দানবের মাথায়। একটা দুটো নয়- শত শত : দেখে লোকজন ভয়ে বাঁচে না। তারা ধরেই নিল এবার অগণিত কুমড়ো দানব এসে হামলা চালাবে তাদের ওপর। ‘আগে ছিল একটা কুমড়ো দানব,’ বলাবলি করল প্রতিবেশিরা, ‘এখন একটা সেনাবাহিনীর সমান। আমাদের কপালে কি আছে কে জানে? একটা কুমড়ো দানবের ভয়েই সবার গায়ে কাঁপুনি উঠে যেত। শত শত কুমড়ো দানব এলে যে কি করব!’
দিন গেল। তবে আলুর মাঠ দিয়ে একটা কুমড়ো দানবকেও আসতে দেখা গেল না। আর মাথাগুলোরও বিকট হাঁ নিয়ে খুলে যাবার লক্ষণ নেই। তখন লোকের মনে ভয় একটু একটু কমতে লাগল। উত্তেজনাও কমে এল। রাজাও রাজকন্যা রূপালির জন্যে দেহরক্ষী তুলে নিলেন।

এদিকে হোঁতকার একটা বদভ্যাস ছিল কোন কিছু মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলেই তা তুলে নিয়ে মুখে পোরা।
আশপাশের সমস্ত অঞ্চলের সব রকম খাবারের স্বাদ নেয়া হয়ে গিয়েছিল হোঁতকার। ছেলের পেটুক স্বভাব দেখে খোদেজা খাতুন প্রতিষেধকের ওপর একটা বই কিনে রেখেছিল। হোঁতকার অসুখ হলেই বই খুলে তার টোটকা চিকিৎসা করত তার মা।

Golpo_KumroDanob1304c.jpg

হোঁতকা আশপাশের সবকিছুই খেয়ে দেখেছে কোনটার স্বাদ কি রকম। শুধু কুমড়ো দানবের মাথার স্বাদ নেয়া হয়নি। কাজেই ওগুলোর প্রতি স্বভাবতই একটা লোভ ছিল হোঁতকার। দিনরাত সে শুধু ভাবত দানবের মাথা খেতে না জানি কেমন স্বাদ। একদিন রমজান আলি কি একটা কাজে শহরে গেছে। হোঁতকা দানবের মাথার একটা অংশ কেটে মুখে পুরল। কচমচ করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলল। হোঁতকা অবশ্য ভয় পাচ্ছিল ভেবে মা ব্যাপারটা জানতে পারলেই ঘাড় ধরে কোন না কোন প্রতিষেধক খাইয়ে দেবে। হাবিজাবি খাওয়ার অভ্যাস যেহেতু হোঁতকার, তাই খোদেজা খাতুনও ‘রোগ হবার আগেই সারাও’ নীতিতে বিশ্বাস ছিল। হোঁতকা যাই খাক না কেন, তাকে ওষুধ গিলতে বাধ্য করত খোদেজা খাতুন।
দানবের মাথা খেতে বেশ লাগল হোঁতকার। ভারী মিষ্টি, চমৎকার স্বাদ। তাই মজা পেল হোঁতকা, আরেক টুকরো কেটে খেয়ে ফেলল। তারপর আরেক টুকরো। তারপর আরো এক টুকরো। দেখতে দেখতে দানবের মাথার তিন ভাগের দুইভাগ অংশ সাবাড় করে ফেলল হোঁতকা। তারপর মনে হলো এবার মার কাছে যাওয়া উচিত তার প্রতিষেধক খেতে, যদিও তার পেট ব্যথা করছিল না বা শরীরও খারাপ লাগছিল না।

‘মা,’ গড়াতে গড়াতে কুটিরের মধ্যে ঢুকে বলল হোঁতকা, ‘আমি দানবের মাথার তিন ভাগের দুই ভাগ অংশ খেয়ে ফেলেছি। আমাকে এখন প্রতিষেধক কিছু একটা খাইয়ে দাও।’
‘হায় হায় কি করেছিস বাপ!’ আঁতকে উঠল খোদেজা খাতুন। ‘ওই জিনিস তুই খেতে পারলি?’ সে দ্রুত প্রতিষেধকের বইয়ের পাতা ওল্টাতে লাগল। কিন্তু দানবের মাথা খাওয়ার জন্যে কোন চিকিৎসা বা প্রতিষেধক খুঁজে পেল না।
‘হায় হোঁতকা! আমার জানের জান!’ রীতিমত কপাল চাপড়াতে লাগল খোদেজা খাতুন। ‘দানবের মাথার কোন প্রতিষেধক বইতে নেই। এখন আমি কি করি?’
হাত-পা ছড়িয়ে বসে কান্না জুড়ে দিল হোঁতকার মা। ভয়ে তারস্বরে চেঁচাতে লাগল হোঁতকা নিজেও। খানিক বাদে রমজান আলি ফিরে এল বাড়িতে। সব শুনে বউ আর ছেলের গলা জড়িয়ে ধরে তার সে কি বিলাপ! সারা দিন তারা কাঁদতেই থাকল আর ভয়ে ভয়ে তাকাল হোঁতকার দিকে। হোঁতকা না জানি কখন পটল তোলে। কিন্তু মরল না হোঁতকা। বরং অবাক হয়ে লক্ষ করল তার শরীরটা আগের চেয়ে অনেক বেশি ভাল লাগছে।
সূর্য্যি মামা টুপ করে পশ্চিম আকাশে ডুব দেয়ার পরে মুখ তুলে চাইল হোঁতকা। ফিক করে হেসে বলল, ‘আমি মরিনি! বরং আমার শরীর আরো ভাল লাগছে। তোমরা কান্নাকাটি থামাও। আমি দানবের মাথা আরেকটু খেয়ে আসি। খিদে পেয়েছে।’
‘না না যাসনে!’ একযোগে চেঁচিয়ে উঠল হোঁতকার মা-বাবা। কিন্তু কারো বাধা মানল না হোঁতকা। এখনকার ছেলেদের মতই মা-বাবার অবাধ্য ছিল সেও। মাঠে গেল হোঁতকা। ফিরে এল দানবের আস্ত একটা মাথা বগলে পুরে।

‘দ্যাখো বাবা-মা!’ বলল সে চেঁচিয়ে। ‘আমরা সবাই এটা খেতে পারব। এর মধ্যে বিষ নেই, স্বাদও চমৎকার- আলুর চেয়েও ভাল!’
রমজান আলি আর খোদেজা খাতুন প্রথমে খানিক ইতস্তত করল। কিন্তু ওদেরও খিদে পেয়েছে। ক্ষেতে আলুর বদলে দানবের মাথা জন্মানোর পর থেকে জিনিসটার স্বাদ নিতে তাদেরও অনেক ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ভয়ে খেতে পারছিল না। আজ ছেলের কথায় কেটে গেল ভয়। দানবের মাথায় কামড় বসাল তারা।
‘খেতে ভারি মিষ্টি।’ মন্তব্য করল খোদেজা খাতুন, ‘তবে রান্না করলে বোধ হয় আরো সুস্বাদু লাগবে।’ সে একটা কড়াইতে  পানি ঢেলে আগুন জ্বালল চুল্লিতে। তারপর কড়াইটা বসাল ওর ওপর। কিছুক্ষণ পরে পানি ফুটতে শুরু করলে দানবের আধ খাওয়া মাথাটা ছেড়ে দিল কড়াইতে। ওটাকে সিদ্ধ হতে সময় দিল। শেষে খেতে বসল। ওহ্ কি স্বাদ! এমন সুস্বাদু জিনিস তারা জীবনেও খায়নি।
খোদেজা খাতুনের রান্নার হাতটা পাকা। আর নিত্যনতুন রান্নায় তার তুলনা নেই। পরদিন সে কুমড়ো দানবের মাথা দিয়ে আরেকটা পদ তৈরি করল। মাথাটাকে প্রথমে সিদ্ধ করল, তারপর ডিম, দুধ এবং মসলা মাখাল ওতে। বিস্কুটের গুঁড়োও দিল। সবগুলো মিশিয়ে চুল্লিতে দিল জিনিসটা সেঁকার জন্যে।
ফলাফল হলো অবিশ্বাস্য। এমন স্বাদের জিনিস কেউ কখনো চোখেই দেখেনি, চেখে দেখা দূরে থাক। খুশিতে লাফাতে লাগল সবাই, বিশেষ করে হোঁতকা। তারা এবার মাঠ থেকে সবগুলো দানবের মাথা তুলে আনল, জমা করে রাখল সেলার অর্থাৎ মাটির নিচের ঘরে। খোদেজা খাতুন দানবের মাথা দিয়ে প্রতিদিন নিত্য নতুন স্বাদের কেক বানাল। আর সে কেক খেয়ে তিনজনেই আহা! আহা! করতে লাগল।
একদিন সকালে রাজা বেরিয়েছেন শিকারে, ঘটনাক্রমে রমজান আলির কুটিরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন দলবল নিয়ে। ওই মুহূর্তে কেক বানাচ্ছে খোদেজা খাতুন। রান্নাঘরের দরজার ও জানালা দুটোই খোলা। গরমের জন্যে খুলে রাখা হয়েছে। সে যে কি খুশবু বেরুচ্ছিল তা আর কি বলব! মম করছিল চারদিক।
এমন সুন্দর গন্ধ আসছে কোত্থেকে? বাতাসে নাক টানলেন রাজা। এক প্রজাকে পাঠিয়ে দিলেন গন্ধ রহস্য উদঘাটনের জন্যে।
‘এক মহিলা দানবের মাথার কেক বানাচ্ছে।’ ফিরে এসে জানাল ওই লোক।
‘কি! গর্জে উঠলেন রাজা। ‘এক্ষুনি আমার জন্যে এক টুকরা কেক নিয়ে এসো।’
প্রজা একটা বড়সড় কেক নিয়ে এল রাজার জন্যে। আগে তাঁর সঙ্গীরা খেয়ে দেখল ওর মধ্যে বিষটিষ মেশানো আছে কিনা। রাজা তীক্ষ্ণ চোখে ওদেরকে লক্ষ করলেন। নাহ্ কেউ মারা যায়নি। এবার তিনি কামড় দিলেন কেকে।
রাজার মনে হলো অমৃত মুখে দিয়েছেন। এ জিনিস জীবনেও খাননি তিনি।
‘আমার জীবনেও এরচেয়ে মজার এবং উৎকৃষ্ট খাদ্য গ্রহণ করিনি আমি!’ নাটকীয় গলায় ঘোষণা করলেন রাজা। ‘এর সাথে কোন দেশের কোন খাবারের তুলনা হতে পারে না। এক্ষুনি মহিলাকে ডেকে নিয়ে এসো!’
রাজা ডাকছেন শুনে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘর থেকে বেরুল খোদেজা খাতুন। সাথে রমজান আলি এবং হোঁতকাও।
‘কি চমৎকার খাবার বানিয়েছ তুমি।’ খোদেজা খাতুনের দিকে তাকিয়ে সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলেন রাজা। ‘বলতো কিভাবে এবং কি দিয়ে এমন জিনিস পাকালে!’
রমজান আলি হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল রাজার সামনে। খুলে বলল সমস্ত ঘটনা। কুমড়ো দানবকে হত্যা করা থেকে কেক বানানো পর্যন্ত কোন কিছুই বাদ দিল না।
সব শুনে লজ্জা পেলেন রাজা। ‘আমি আসলে তোমাকে সেনাপতি বানাতে ভুলেই গেছিলাম। তুমি খুব সাহসী। আর একজন মহীয়সী নারীকেও পেয়েছ চমৎকার স্ত্রী হিসেবে।’
রাজা তখন ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়লেন। রত্নখচিত তরবারি দিয়ে রমজান আলিকে বাড়ি মেরে ঘোষণা করলেন এ লোক আজ থেকে তার একজন সেনাপতি।
রমজান আলি সেনাপতি হবার সুবাদে কুঁড়েঘর ছেড়ে সবাই গেল রাজ প্রাসাদে। রাজ বাগানের গোলাপ গাছ তুলে সেখানে রোপন করা হলো দানবের মাথা (বা কুমড়ো, পরে সবাই তাই বলত।) রাজকীয় সবগুলো পার্কেরও রূপান্তর ঘটল কুমড়ো ক্ষেতে।
রমজান আলি রাজার খাস কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত হলো। সে কুমড়ো ক্ষেতও পাহারা দেয়ার দায়িত্ব পেল। খোদেজা খাতুনকে ভার দেয়া হলো মজার মজার কুমড়োর কেক বানাবার জন্যে। সবশেষে হোঁতকার সাথে রাজকন্যা রূপালির বিয়ে দিলেন রাজা।
হোঁতকা-রূপালির বিয়ে ছিল এক হুলুস্থূল কাণ্ড। রাজ্যের সমস্ত প্রজাকে দাওয়াত দেয়া হয়েছিল বিয়েতে। দেশের সবগুলো খবরের কাগজ বলল এরকম চমৎকার দম্পতি পৃথিবীর কোথাও নেই।
কুমড়ো দানবের রাজপ্রাসাদের প্রবেশ দ্বারে রাজার প্রধান কবিকে কবিতা লেখার হুকুম দেয়া হলো। তিনি একটি কবিতা লিখলেন। পারিশ্রমিক হিসেবে পেলেন প্রতিবছর পঞ্চাশটি করে কুমড়ো। কবিতাটি ছিল এরকম :
কুমড়ো নামে এক দানব ছিল
বাস করত এখানে
দম হারিয়ে মরল যে সে
আলু ক্ষেতের বাগানে
নাদুস নুদুস বাচ্চাদের সে
গিলত ফেলে গোগ্রাসে
কুমড়ো দানব মরল যখন
নাচল সবাই আনন্দে।
কবিতাটি এখনো ওই প্রাসাদের ফটকে লেখা আছে। তোমরা গেলেই দেখতে পাবে।

 

 

বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/গল্প/শুভ/এইচআর/এপ্রিল ১৩/১০