মায়ের কাছে ফেরা

বেবী মওদুদ

ভোরবেলা আনুর ঘুম ভাঙ্গে। জানালার পাশে ডালিম গাছে একটা হলুদ পাখি টিউউ টিউউ করে ডাকছে। খুব মিষ্টি ডাকটা। আনু উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই পাখিটা উড়ে চলে গেল। মনটা খারাপ হয়ে গেল আনুর।

বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে এসে খাবার টেবিলে জগ থেকে পানি ঢেলে  খায়। বাবা চা খেতে খেতে কাগজ পড়ছে। আর আম্মা মুড়ি খাচ্ছে। তার সামনেও মগ ভর্তি চা।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি আনু চা খাবে?’
আনু  মাথা নেড়ে ‘না’ বলে। বাবাকে দু’বার আড়চোখে দেখে।
তারপর বলে, ‘বাবা আমি বাড়ি যাব আজ।’ বাবা উত্তর দিল, ‘বাড়ি যাবে মানে ? এটাই তো তোমার বাড়ি।’

আনু বলে, ‘না, মানে মায়ের কাছে যাবো।’
বাবা কোন কথা বলে না। আনু দেখে তার মুখটা ক্রমশ গম্ভীর হয়ে উঠলো। কিছুক্ষণ কেটে যায়।
আনু আবার জিজ্ঞেস করে, ‘যাবো বাবা?’

বাবা এবার গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলেন, ‘না।’ মায়ের কাছে যাওয়াটা বাবা একদম পছন্দ করে না। সেটা প্রথম দিন এবাড়িতে এলে বাবা তাকে জানিয়ে দেন।

আনু উঠে এসে বারান্দায় বসে। দক্ষিণের এই বারান্দাটা বেশ বড়। প্রচুর হাওয়া আজ। আকাশ ভরা হালকা মেঘ। কদিন থেকে এমনই আবহাওয়া। কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছে না। বৈশাখে এবার ঝড়ও তেমন হয়নি। একটু পরেই আবার রোদ ছড়াবে। ক্রমশ তেজ বাড়ছে। গরমে বেশ কষ্ট হয় ঘরে থাকতে।

সামনের মাসে ম্যাট্রিক পরীক্ষা। কদিন থেকেই মনটা কেন যেন খুব খারাপ আনুর। সেই কবে এসেছে মা’কে ছেড়ে। প্রায় তিন বছর হয়েছে। অষ্টম শ্রেণীতে ওঠার পরই ছোট মামা তাকে বাবার কাছে নিয়ে আসে। আসতে সে মোটেও চায় নি। নানা ভাই জোর করে পাঠিয়ে দিলেন। বললেন, ‘লেখাপড়ায় তুমি তো খুব ভালো। গ্রামে তো লেখাপড়া তেমন সুবিধা নাই। ঢাকায় তোমার বাবার কাছে থেকে লেখাপড়া করলে ভালো হবে। তোমার বাবাও চাইছে তোমাকে নিয়ে যেতে, আমার মনে হয় যাওয়াই ভালো।’
আসার দিন মা খুব কাঁদছিল। কোন কথা বলে নি তার সঙ্গে। মা’কে জড়িয়ে ধরে আনুও কেঁদেছিল। ফিস ফিস করে বলেছিল, ‘তুমি ভেবো না মা। আমি পরীক্ষা দিয়েই  তোমার কাছে চলে আসবো।’ মা তার কপালে চুমু খেয়েছিল। দোয়াদরুদ পড়ে বুকে ফুঁ দিয়েছিল।
golpo_baby0605a.gif
ঢাকায় এসে প্রথম কদিন খুব কষ্ট হয়েছে। এ বাড়িতে শুধু বাবা ও আম্মা। তাদের কোন ছেলেমেয়ে নেই। আটতলা বাড়ির ছয়তলায় থাকে তারা। বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আনুর যখন ছয়মাস বয়স তখন তার বাবা আমেরিকায় পিএইচডি করতে যায়। সেখানেই আবার বিয়ে করে ঢাকায় ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে। অনেক  লেখালেখি ও গবেষণার কাজ করে। বেশ বড়লোক তিনি। আনু তাকে  প্রথম দিন দেখে একেবারে পছন্দ করতে পারেনি। কিন্তু লেখাপড়া করতে হবে। ভালো  পাশ করতে হবে - এসব ভেবে  সব দু:খ কষ্ট সহ্য করেছে। মায়ের সেই কান্না, বেদনাহত মুখ তাকে বারবার মায়ের কাছে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু সে সব সহ্য করে যায়। বাবা রাগ হতে পারে, নানাভাই রাগ করতে পারে - এসব ভেবে সে নীরব থেকে যায়। মন দিয়ে লেখাপড়া করে আর ভাবে পরীক্ষা শেষ হলেই মায়ের কাছে চলে যাবে। কারও নিষেধ শুনবে না। বাবা রাগ করলেও আর বাবার কাছে থাকবে না। পরীক্ষায় ভালো করলে যে বৃত্তি পাবে তাতেই কলেজে লেখাপড়া করতে পারবে। ছোট চাচার সঙ্গে দেখা হয়েছে কয়েকবার। বলেছে, ‘চিন্তা করিস না  আনু। মন দিয়ে লেখাপড়া কর, দরকার হলে আমি তোকে টাকা দেব।’
আনু ভাবে, সবাই এতো ভালো, শুধু বাবা এতো খারাপ কেন? মায়ের কথা একদম শুনতে চায় না। অথচ মা কত শান্ত নীরবে নিভৃতে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে।

ঘরে এসে ইংরেজি বই খুলে পৃষ্ঠা ওল্টায়। চোখের তারায় অক্ষরগুলো কেমন জ্বালা ধরায়। পড়তে ইচ্ছে করে না। বই বন্ধ রেখে সে এক গ্লাস পানি খায়। তারপর শার্ট-প্যান্ট পরে নেয়। আলমারী খুলে ড্রয়ারের ভেতর থেকে একটা খাম বের করে খোলে, মায়ের একটা ছবি আছে। আর দু’শো টাকা। আসার সময় মা তাকে তিনশত টাকা  দিয়েছিল। সে একশ টাকা খরচ করেছে। এখন এই দুশো টাকা আছে। পকেটে টাকাগুলো নিয়ে ঘরের বাতি নিভিয়ে খাবার টেবিলে দেখে তার নাসতা সাজানো। দেয়াল ঘড়িতে পৌনে ন’টা বাজে। বাবা নিশ্চয় ক্লাস নিতে চলে গেছে। আনু চারদিক তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। একটু ভাবলো সে। তারপর দ্রুত হেঁটে বাইরের দরজা খুলে নীচে নামে। বুকের ভেতর দ্রুত শ্বাস উঠছে। জোর পায়ে হেঁটে গেটের বাইরে এসে সোজা চাঁনখার পুল বাস স্টপে গিয়ে দাঁড়ায়। মীরপুর ও মোহাম্মদপুরের কয়েকটা বাস চলে গেলো। মাণিকগঞ্জের শুভযাত্রা বাসের নামটা তার মনে ছিল। খুব সকাল বলেই ভিড় কম। বাসে উঠেই বসার জায়গা পেলো। বাসটা না ছাড়া পর্যন্ত একটা শংকায় সে ঘামে প্রায় ভিজে উঠলো। বাস ছাড়ার পরও তার দুশ্চিন্তা গেলো না।

বাস পলাশী-আজিমপুর-নিউমার্কেট-বত্রিশ নাম্বার সড়ক-আসাদ গেট- শ্যামলী-কল্যানপুর- গাবতলী পার হয়ে ছুটে চলেছে। মনটা এবার  শান্ত হলো আনুর। একটা খুশীর অনুরনন ছাড়িয়ে গেল। তারা হৃদয় ফুটে যেন চীৎকার করে বলতে চাইলো, ‘মা, মাগো ! আমি আসছি।’

মানিকগঞ্জ বাস স্ট্যান্ডে বাস থামতেই আনু নেমে পড়ে। একটা রিকশায় উঠে বলে, ‘বেথুয়া ঘাটে চলেন।’

পথঘাট তার সবই চেনা। ঘাটে এসে  দেখে বাজারে বেশ ভিড়। রিকশার ভাড়া নিলো কুড়ি টাকা। বাস ভাড়া নিয়েছে চল্লিশ টাকা। ফেরার টাকা আছে।

নদীর নাম কালিগঙ্গা। এই গ্রীষ্মে পানি নেই বললেই চলে। স্যান্ডেল হাতে নিয়ে, প্যান্টের পা সামান্য গুটিয়ে একরকম হেঁটে হেঁটে নদী পার হলো। নৌকাগুলো পড়ে আছে একপাশে। বর্ষা এলে তখন এই নদী ভরে যাবে। দু’টাকা দিয়ে নৌকায় নদী পার হতে হবে। ওপারে উঠে একটু দাঁড়ায়। শ্বাস নেয় বাতাসে। বুক ভরে যাচ্ছে তার ঠান্ডা বাতাসে। মনও ভরে উঠছে খুশিতে। মাটির পথটা ধরে হাঁটতে থাকে। তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে এখানে। মাটির গন্ধ তার চেনা। গাছে গাছে এখনও আম, কাঠাল ঝুলছে। মিয়া বাড়ির জাম গাছ ভর্তি পাকা জাম। মাটিতেও ছড়ানো। পাখিরা ঠুকরে কিছু খায়, কিছু ফেলে যায়। রোদ ক্রমশ তার তেজ ছড়াচ্ছে। বৈশাখের এই শেষ দিনগুলোয় প্রচন্ড গরম পড়লেও, এখানে যেন রোদ ঝলমল প্রকৃতি আর নদী থেকে ভেসে আসে প্রচুর বাতাস।

আনু হাঁটতে থাকে ধানখেতের ভেতর দিয়ে। ধান তো কাটা শেষ। এখন ঝেড়ে তোলা হচ্ছে ধান।

দূর থেকে আনু দেখতে পায় তাদের ঘরটা। বরুই আর কাঠাল গাছের ছায়ায়। তার একপাশেই নানাবাড়ি। সেখানে ধান স্তুপ করে রাখা। আনু সোজা তাদের ঘরেই গিয়ে ঢোকে। দরজা খোলা ছিল। ফুল গাছগুলো বেশ বড় হয়ে উঠেছে। বকুল ফুল ছড়ানো গাছ তলায়। গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। একপাশে পুঁই শাকের মাচা। মিষ্টি কুমড়ো ঝুলছে গাছে।
ঘরে ঢুকে দেখে মা চুপচাপ বসে আছে। আর কেউ নেই। মায়ের দু’চোখ বন্ধ। আনু পেছনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারে মা খুব রোগা হয়ে গেছে। একটা সবুজ পাড় সাদা শাড়ি পরনে। মাথা ভর্তি কালোচুল মেঝে পর্যন্ত ছড়ানো। কোনও দিন গহনা পরতে দেখেনি সে মাকে। কি ভাবছে ? তার কথা কী? আনুর সমস্ত শরীর যেন কেঁপে ওঠে। সে পেছন থেকে মাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ফেলে।

মা প্রথমে অবাক হয়। তারপর তাকে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরে। মাথায় কপালে, চোখে চুমু খায় আর বলে, ‘বাপ আমার ! কেমন আছিস বাপ!’
আনু মাকে জড়িয়ে ধরে শুধু কেঁদেই চলে। মায়ের মমতা ভরা হাত তার চোখের পানি মুছিয়ে দেয়। আনু মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে শুধু ফিস ফিস করে, ‘খুব ক্ষিধা লাগছে মা। ভাত দিবা খাইতে!’