ভৌতিক হাত

অনীশ দাস অপু
মূল গল্প: কার্ল জ্যাকবির ‘দ্য হ্যান্ড’

প্যাকেজটা এসে পৌঁছুল পনেরোই আগস্ট। মার্টিন ক্রেডের ওয়েস্ট-স্টার্লিং হাউজে বেড়াতে আসার আগে লন্ডনে আমার বাড়ির চাকরটাকে এখানকার ঠিকানাটা দিয়ে এসেছিলাম। বলেছিলাম খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনও খবর থাকলে আমাকে যেন জানায়। সন্দেহ নেই ছোকরা চাকর আমার খুবই কাজের। আসল জিনিসটা গুরুত্ব বুঝে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে। প্যাকেজটা এসেছে সাউদাম্পটনের ব্রিস্টল কোম্পানি থেকে।...

জিনিসটা ফুট তিনেক লম্বা, খুবই শক্তিশালী একটা টেলিস্কোপ। কোম্পানিকে আগেই আমি এটার জন্য বারো পাউন্ড শোধ করে দিয়েছি। প্যাকেজটার সঙ্গে ছোট্ট একটা চিরকুটও চোখে পড়ল। ওতে লেখা :


প্রিয় মি. ব্রকটন!
আমরা দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, আপনি যে ফরাসি লো মারে স্কোপ চেয়েছিলেন ওটার মজুত ইতোমধ্যে ফুরিয়ে যাওয়ায় আমরা স্যাম্পল হিসাবে একই গুণগত মানের আরেকটি টেলিস্কোপ পাঠালাম। উল্লেখ্য, এ ধরনের টেলিস্কোপ আমরা সাধারণত তৈরি করি না। এই টেলিস্কোপটির নির্মাতা হোসে আনাল্টা, লিসবনের বিখ্যাত চশমা নির্মাতা। এটি তিনি তাঁর মৃত্যুর পূর্বে তৈরি করে গেছেন। আমরা আশা করছি আমাদের এই টেলিস্কোপটি আপনার যথাযথ দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হবে।
ব্রিস্টল অপটিক্যাল কো. লিমিটেড।


মার্টিন ক্রেডের দিকে চিঠিটি এগিয়ে দিলাম আমি। সে দ্রুত কাগজটায় একবার নজর বুলিয়ে ছুঁড়ে ফেলল টেবিলের উপর। ‘এখনও আগের অভ্যাস তোমার যায়নি দেখছি, ব্রকটন? এই নিয়ে তিন ডজন টেলিস্কোপ জোগাড় করেছ তুমি। এগুলো দিয়ে আসলে কী কর তুমি?’
হাসলাম আমি। ‘সংগ্রহে রেখে দেই। অপটিকসের জগৎ আমার কাছে সত্যি খুব বিস্ময়কর মনে হয়। আর সব ধরনের প্রিজমই কিন্তু টেলিস্কোপ নয়,’ বলে চললাম আমি। ‘আমার কাছে অনেক পুরনো একজোড়া স্টোরিও প্রিজম বিনিকিউলার আছে যা একমাত্র আধুনিক বিজ্ঞানের পক্ষেই তৈরি করা সম্ভব। এ ছাড়াও আছে সপ্তদশ শতাব্দীর একটা লিপারশে।’

থেমে গেলাম আমি। মার্টিন ক্রেড শুনছে না আমার কথা। চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ক্রেড এ রকমই। আবেগহীন, আত্মকেন্দ্রিক মানুষ। লম্বা, রোগা, বাজপাখির মত মুখ ক্রেডের। চোখ দুটো দেখলেই ভয় লাগে। কেমন জানি অশুভ একটা আশঙ্কা খেলা করে ওর দুই চোখের তারায়। কারও দিকে তাকালে মনে হয় ভিতরের সবকিছু দেখে নিচ্ছে সে। ক্রেড অভদ্র প্রকৃতির লোক, জানি আমি। তাই ওর কাছে অতিথি হিসাবে তেমন কোনও সৌজন্যও আশা করি না।

গত বছর ক্রেড আমার বোন লুইজিকে বিয়ে করেছিল। সব সময় হাসিখুশি বোনটা আমার এই খা খা করা দেশটায় এসে কেমন মনমরা হয়ে পড়েছিল। শুরু থেকেই আমি এই বিয়ের বিপক্ষে ছিলাম। কিন্তু ক্রেডের প্রতি তার মোহকে একবিন্দু খর্ব করতে পারিনি। এই বাড়িতে আসার কিছুদিন পর, গত জানুয়ারিতে ক্রেড আমাকে চিঠিতে জানায় লুইজি অসুখে পড়ে হঠাৎ সবাইকে ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে।

লুইজির এই অকাল মৃত্যু প্রচণ্ড কষ্ট দিয়েছে আমায়। আগস্টের শেষের দিকে ক্রেড চিঠি লিখে জানতে চাইল আমি আবার তার ওখানে যাব কিনা তার মৃতা স্ত্রীর স্মৃতি রক্ষার্থে। রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু লন্ডন থেকে যাত্রা করার পর থেকেই কেমন খচখচ করতে লাগল মন। মনে হলো কোনও আতঙ্কের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি আমি। আগেও বার দুই এখানে এসেছি, কিন্তু এবার জায়গাটার চারদিকের বিস্তীর্ণ পতিত জমি একেবারেই হতাশ করে তুলল আমাকে।

রাতের খাবার পর ক্রেড দোতলায় আমার ঘর দেখিয়ে দিল।
‘আমার বলতে খারাপ লাগছে, ব্রকটন,’ বলল সে। ‘কিন্তু তোমাকে বোধ হয় একাই সময় কাটাতে হবে। জানই তো আমি একটু একাকিত্ব পছন্দ করি। আর মেহমানদারিতেও খুব একটা পটু নই। তবুও কোনও কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে জানাতে কুণ্ঠিত হয়ো না।’

বাড়িটার মতই আমার ঘরটাও কালো, ভারি আসবাবপত্রে বোঝাই। বদখত চেহারার জিনিসগুলো আমার কাছে ভাল ঠেকল না মোটেও। দক্ষিণ দিকে দুটো ফ্রেঞ্চ উইন্ডো, খোলা। ছোট্ট একটা ব্যালকনি চোখে পড়ল। ব্যালকনিটা দেখে তবু যা হোক একটু স্বস্তি পেলাম। টেলিস্কোপটা নিয়ে পা বাড়ালাম ওদিকে। চোখে টিউব লাগিয়ে ফোকাস করলাম।
এখনও সন্ধ্যা নামেনি। দূরে, দিগন্তের সাথে মিশে আছে ঘনগুল্মের ঝোপ। বাতাসে দোল খাচ্ছে ওগুলোর মাথা, যেন ঢেউ উঠল নদীতে। আমি অনেকক্ষণ বাড়িটার বাঁ থেকে ডানে টেলিস্কোপটা ঘোরালাম। মনে হলো যন্ত্রটার মধ্যে কোথাও একটা গোলমাল আছে। চোখ থেকে নামালাম ওটা। ৩ মিলিমিটার ব্যাসার্ধের অ্যাক্রোমেটিক এই জিনিসটা বেশ শক্তিশালী এবং পরিষ্কার, কিন্তু রেঞ্জের মধ্যে বারবার সাদাটে একটা দাগ চোখে পড়ছে কেন? গ্লাসটা মুছে আবার চোখে লাগালাম আমি, পশ্চিম থেকে দক্ষিণের দিকে ঘোরাতে শুরু করলাম যন্ত্রটাকে। এদিকটাতে শুধুই ধু ধু মরুভূমি, কিন্তু পূবে তাকাতেই বিস্ময়ের একটা ধাক্কা খেলাম। লম্বা, ধ্বংসপ্রাপ্ত একটা বিল্ডিং-এর সামনে সাদা কুয়াশার বিশাল একটা দেয়াল ঝুলে আছে। কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে গ্রামে ঢোকার সময় ওদিকটাতে এমন কিছু নজরে পড়েনি। এ রকম কোনও বিল্ডিংও যে এ গ্রামে নেই সে ব্যাপারেও আমি পুরোপুরি নিশ্চিত। মিনিট পনেরো পর ক্রেডের ঘরের দরজা খোলার শব্দ শুনলাম, নিচে নামছে ও। আমিও লাইব্রেরিতে গিয়ে ঢুকলাম। একটু আগের ঘটনাটা ওকে বলতে সে ব্যাপারটার কোনও ব্যাখ্যা দিতে পারল না।

‘পূবে, ব্রকটন? উঁহু, তুমি নিশ্চয়ই ভুল করেছ। এদিকে বাড়ি বলতে শুধু আমারটাই আছে। আর সবচে’ কাছের কোনও বিল্ডিংও স্লোভারে। সুতরাং এমন কিছু তোমার চোখে পড়তেই পারে না।’
‘ওদিকে কোনও চুনাপাহাড় কিংবা রোমানদের ধ্বংসাবশেষ নেই?’ জানতে চাইলাম আমি। ক্রেড কৌতুকের দৃষ্টিতে আমাকে লক্ষ করতে করতে মাথা নাড়ল দু’দিকে। ‘না, নেই।’

পরদিন সকালে আমি আবার টেলিস্কোপে চোখ রাখলাম। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে, তামাটে হয়ে আছে আকাশ। কিন্তু এর মধ্যেও আমি স্পষ্ট আগের দৃশ্যটা দেখতে পেলাম। গভীরভাবে লক্ষ করতে মনে হলো রঙটা একটু বদলেছে। দেয়ালটা সাদা থেকে হালকা গোলাপী রঙ ধারণ করেছে। আর ওটা যেন সামান্য একটু সামনের দিকেও এগিয়ে এসেছে। দেয়ালটাকে লক্ষ করতে গিয়ে মনে হলো ওটা যেন আস্তে আস্তে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাতাস আর বৃষ্টির ঝাপটায় বেশিক্ষণ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলো না। সরে এলাম ওখান থেকে। জামাকাপড় পরে চলে গেলাম নিচে, ডাইনিং রুমে।

আজ ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো, আসলে কেন ক্রেড আমাকে এখানে নিমন্ত্রণ করেছে। বিয়ের আগেই লুইজি হারউইচের কাছে বিশাল এক সম্পত্তির মালিকানা পেয়ে গিয়েছিল। অর্থমূল্যে সেই সম্পত্তির দাম এখন বেড়েছে কয়েকগুণ, কিন্তু অন্যান্য সম্পত্তির মতই ওটাতেও আমার যৌথ নাম রয়েছে। ক্রেড জানতে চাইল আমি আমার অংশের দাবি ছাড়তে রাজি কিনা। ক্রেডের বলার ভঙ্গি পছন্দ হলো না। সম্পত্তিটার প্রতি যে তার লোভ প্রচুর, ওর কথা শুনেই বুঝে ফেললাম সেটা। আমি ভ্রু কুঁচকে ক্রেডের বাজপাখির মত মুখের দিকে তাকালাম। অপেক্ষা করছে ক্রেড আমার জবাবের জন্য। আমিই লুইজিকে সম্পত্তিটা কেনার ব্যাপারে প্রভাবিত করেছিলাম, কিন্তু এখন আমার নেতিবাচক একটা জবাব দিতে ইচ্ছে করল। পরক্ষণে ভাবলাম কী লাভ এতে। স্বামী হিসাবে এই লোকটারও তো তার স্ত্রীর সম্পত্তির হক আছে। আর তার সেই অধিকার বরং আমার চেয়ে বেশি। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও ক্রেডকে জানালাম, আমি রাজি।

সন্তুষ্ট হাসি ফুটে উঠল ক্রেডের ঠোঁটে। ‘আমি আগেই ধারণা করেছিলাম তুমি অমত দেবে না,’ বলল সে। ‘কাল আমরা গ্রামে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে দস্তখতের ব্যাপারটা সেরে ফেলব, কী বলো?’
আর কোনও কথা না বলে উঠে পড়ল ক্রেড, ভারি একটা রেইনকোট চাপিয়ে বেরিয়ে গেল। জানালা দিয়ে ওকে লক্ষ করলাম আমি। বৃষ্টিতে ভিজে আস্তে আস্তে পূবে, স্লোভারের দিকে এগোচ্ছে সে।

বাড়িতে এখন একা আমি। দোতলায়, আমার ঘরে চললাম। দরজার ছিটকিনিতে হাত রেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ক্রেডকে এখনও বলা হয়নি এখানে আমার আসার উদ্দেশ্য লুইজির কিছু জিনিস নিয়ে যাওয়া। এর মধ্যে একটি বিশেষ জিনিস হচ্ছে একটা মূল্যবান আঙটি, সবুজ পাথরে ওতে অঙ্কিত আছে লুইজির নামের প্রথম ইংরেজি অক্ষর ‘এল’। ওটা আমিই লুইজিকে উপহার দিয়েছিলাম। সবসময় সে আঙটিটা আঙুলে পরে থাকত। বোনের স্মৃতি রক্ষার্থে এই আঙটিটা আমার বিশেষ প্রয়োজন। ক্রেডের কাছে চাইলে ও দেবে কিনা জানি না। তাই নিজেই ওটা খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
করিডোর ধরে এগিয়ে চললাম আমি। দাঁড়ালাম লুইজির ঘরের দরজার সামনে। দরজায় ডাবল তালা। ফ্রেমের গায়ে একটা শেকল জড়ানো, ওটা বাঁধা রয়েছে ভারি একটা তালার সঙ্গে। পুরো এক মিনিট আমি বিস্মিত চোখে তালাটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর ফিরে গেলাম নিজের ঘরে। চেয়ারে হেলান দিয়ে ভাবার চেষ্টা করলাম ব্যাপারটা কী?

ব্যাপারটা এভাবে সাজানো যায়- ক্রেড তার স্ত্রীর মৃত্যুতে এতই শোকাহত হয়ে পড়েছিল যে চিরদিনের জন্য লুইজির ঘর বন্ধ করে রেখেছে। কিন্তু লুইজির শেষের দিকের চিঠিগুলোর কথা মনে পড়ল আমার। তাতে ওর প্রতি ক্রেডের কোনও ভালবাসার কথা লেখা থাকত না। প্রতিটি চিঠিতেই লুইজি লিখত ক্রেড তার সঙ্গে অসম্ভব খারাপ ব্যবহার করে তার জীবনটাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি আমার ভিতর জেগে উঠল। টেলিস্কোপটা তুলে নিলাম টেবিল থেকে, যদি অন্যদিকে মনটাকে ফেরানো যায় সেই আশায়। ছোট্ট ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম। তাকালাম পূর্ব দিকে। দেয়ালটা এখনও আগের জায়গাতেই আছে, কিন্তু মনে হলো ওটার আকৃতি আগের চেয়ে দশগুণ বেড়ে গেছে। ভাল করে লক্ষ করতে আরও একটা ব্যাপার চোখে পড়ল। দেয়ালটা সম্পূর্ণ দুটো অংশে ভাগ হয়ে গেছে। একটার উপর আরেকটা, আনুভূমিকভাবে বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। দুটো জিনিসের সঙ্গেই একটা নিকট সাদৃশ্য লক্ষ করলাম। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ও দুটোকে আমার একজোড়া হাত বলে মনে হলো। টেলিস্কোপটা দ্রুত অন্যদিকে ঘোরাতেই আরেকটি দৃশ্য চোখে পড়ল। খাঁ খাঁ প্রান্তর ধরে হেঁটে আসছে মার্টিন ক্রেড। বাতাসের ধাক্কা থেকে বাঁচার জন্য কুঁজো হয়ে আছে, সোজা পায়ে হেঁটে যাচ্ছে দেয়াল দুটোর দিকে।

হঠাৎ আমার শরীরের নার্ভগুলো যেন একটা ঝাঁকি খেল। দেয়াল থেকে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়েছে ক্রেড, পেছন ফিরে চাইল। তারপর আবার পা বাড়াল সামনে, যেন ওখানে কিছুই নেই। দেয়াল দুটো তার পথে কোনও বাধার সৃষ্টি করল না। যেন ছায়ার মধ্যে ঢুকে গেল একজন মানুষ, ক্রেড সেভাবেই পার হয়ে গেল দেয়াল।
আমি ফোকাসটা ভগ্নাংশ পরিমাণ সরালাম। দেয়াল দুটো বড় হয়েই চলেছে। এত স্পষ্ট হয়ে উঠল ওগুলো যে কেঁপে উঠলাম ভয়ে। ঠাণ্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। ভারসাম্য হারিয়ে আরেকটু হলেই পড়ে যাচ্ছিলাম ব্যালকনি থেকে।

লম্বা, সরু একজোড়া মসৃণ হাত। নারীর হাত। শূন্যে ভেসে থাকল হাতজোড়া এক মুহূর্ত, তারপর বিশালকায় সরীসৃপের মত নড়ে উঠল। আঙুলগুলো বারবার খুলতে আর মুঠো হতে শুরু করল। নখগুলো চকচক করে উঠল মেঘের আড়ালে থেকে ভেসে ওঠা সূর্যের আলোয়।
অনেকক্ষণ একভাবে টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে বসে থাকলাম আমি। হাতগুলো আস্তে ধীরে নড়ছে, কিন্তু জায়গা ছেড়ে সামনে বাড়ল না। তারপর আবার ক্রেডকে দেখলাম আমি। মরুভূমির দিক থেকে আসছে। ওকে দেখেই হয়তো হাত দুটো অদৃশ্য হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।

সারা সকাল আমি কাটালাম হাতজোড়াকে নিয়ে আগডুম বাগডুম ভেবে। ভয়ও লাগছে প্রচণ্ড। এসব কী দেখলাম আমি? ওই হাতজোড়া কীসের লক্ষণ? আমার নতুন টেলিস্কোপ কি অন্য কোনও জগৎকে দেখাল? এরকম রক্তমাংসের দানবীয় হাতের অস্তিত্ব এই পৃথিবীতে থাকা কি সম্ভব? অপটিকস বিজ্ঞান কি হঠাৎই এমন জিনিস আবিষ্কার করে ফেলল যা দিয়ে ব্যাখ্যার দুঃসাধ্য দৃশ্য দেখা যায়?
টেলিস্কোপটা হাতে নিয়ে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলাম আমি। হঠাৎ কথাটা মনে পড়ল। যে প্যাকেটে গ্লাসটা ঢোকানো ছিল ওটা কি আমি ফেলে দিয়েছি- না, আছে ওটা। পেস্টবোর্ডের বাক্সটা এখনও ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটের মধ্যে আছে। কাঁপা হাতে তুলে নিলাম ওটাকে। বক্স-কভারের ভিতরে আঠা লাগানো একটা ছোট কার্ড চোখে পড়ল। হিজিবিজি হাতের লেখা। কার্ডের উপরের অংশে টেলিস্কোপ টেকনিক্যাল বর্ণনা, কী ধরনের গ্লাস, গুণগত মান কী রকম ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু শেষের অংশটা আমাকে বিমূঢ়  করে তুলল :

...চালদাবাদের হারানো শহর ইয়েজিদি নগরীর কাছে পূর্ব কুর্দিস্তান থেকে প্রাপ্ত বালি দিয়ে গ্লাসটি তৈরি করা হয়েছে। যদিও এই বালি গুণগত মানে সেরা, কিন্তু এগুলো দিয়ে স্কোপটি তৈরি করে আমি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছি।
ইয়েজিদিরা হচ্ছে এশিয়ার প্রেত-পূজারি, আর এই বালি সংগ্রহ করা হয়েছে তাদেরই মন্দিরের কাছের এক জায়গা থেকে। আমি জানি না, কিন্তু তারপরও সন্দেহ হচ্ছে কাজটা বোধহয় ঠিক হয়নি। মনে হচ্ছে, বালি সংগ্রহের ব্যাপারটা এই গ্লাসকে কেন্দ্র করে কোনও ঘটনার জন্ম দিতে পারে।
লিসবন, ২৪ মে,
... হোসে সাগাল্টা

নিচ থেকে ঘণ্টার আওয়াজ ভেসে এল। লাঞ্চের সময় হয়ে গেছে। গ্লাসটাকে এক পাশে রেখে নিচে নেমে এলাম আমি। খাওয়া-দাওয়ার পর ঘটনাটা খুলে বললাম আমি ক্রেডকে। তারপর হাতের কথা বললাম। মুখ সাদা হয়ে গেল ক্রেডের, বড় বড় হয়ে উঠল চোখ।
‘হাত, ব্লকটন?’ ভাঙা শোনাল ওর কণ্ঠ। ‘তুমি নিশ্চিত ওগুলো হাত ছিল?’

মাথা ঝাঁকালাম আমি। আমার ভুল হয়নি। স্পষ্ট দেখেছি আমি ওগুলো হাত ছিল। উঠে দাঁড়াল ক্রেড। অস্থিরভাবে পায়চারি শুরু করল ঘরের মধ্যে। হঠাৎ ঘুরল আমার দিকে। ‘আমি তোমার  গ্লাসটা একবার দেখতে চাই।’
‘অবশ্যই,’ বললাম আমি। ‘ওটা আমার ঘরে আছে। কিন্তু দৃশ্যপটটা এক ঘণ্টা আগে অদৃশ্য হয়ে গেছে।’

ভীত মনে হলো গোঁয়ার লোকটাকে। মাথার চুল খামচে ধরল, ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাতে লাগল। তারপর ঘুরে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। আমি বিস্মিত দৃষ্টিতে ওর অপসৃয়মান শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। একটা ভয় জেগে উঠল আমার মধ্যেও। তাড়াতাড়ি এগোলাম লাইব্রেরি ঘরের দিকে। বিশাল ঘরটার ছায়াছায়া অন্ধকার আর নীরবতায় কেমন ছমছম করে উঠল গা। বুক শেলফগুলোর দিকে অন্যমনস্কভাবে তাকাতে লাগলাম। বইগুলোর প্রতি কোনও আগ্রহ অনুভব করছি না, মনে হচ্ছে লাইব্রেরির ছাদটা যেন ক্রমশ নেমে আসছে আমার দিকে, চেপে ধরতে চাইছে। চেয়ার টেবিলগুলোকে ধূসর আলোয় ভৌতিক ঠেকল।

নিচের দিকের শেলফ থেকে অন্যমনস্কভাবে একটা বই টেনে নিলাম আমি। বইটা চামড়ায় মোড়ানো, ক্রেডের হাতের লেখায় বোঝাই। তাড়াতাড়ি ওটা আগের জায়গায় রাখতে গিয়ে বইটার প্রচ্ছদ খুলে গেল, নজর কেড়ে নিল পেন্সিলে লেখা কয়েকটা লাইন।

‘সোমবার, ডিসেম্বর ৬। আমি জানি ও এখনও আমাকে কোনো রকম সন্দেহ করেনি। অবশ্য সেই সুযোগও আমি ওকে দেইনি। তরুণ ব্লে স্টুয়ার্ট  যেদিন আমাদের বাড়িতে এল সেদিনই টের পেলাম ও প্রেমে পড়েছে ছোকরার। গভীর প্রেম চলছে দু’জনের মধ্যে। স্টুয়ার্ট বয়সে আমার চেয়ে অনেক ছোট, কিন্তু একটা গাধা। আমি নজর রাখছি ব্যাপারটা কতদূর গড়ায় তার ওপর।’
বার দুই লেখাটা পড়লাম আমি। কৌত‚হল, সেই সঙ্গে একটা সন্দেহ জাগল মনে। নিজেকে সামলাতে না পেরে পরের লেখাগুলোও পড়ে চললাম।

‘১২ ডিসেম্বর। স্টুয়ার্ট আজ আবার আমাদের দাওয়াত করেছে। সে আমার রাইফেল নেয়ার কথা বলে আসলেও আমি ভাল করেই জানি ওটা একটা অজুহাত। যে মুহূর্তে আমি ঘর থেকে বেরিয়েছি, আমি নিশ্চিত, লুইজি ছোকরার কোলে গিয়ে সেঁধিয়েছে; ওদের প্রেম আমার কল্পনার চেয়েও দ্রুতগতিতে বাড়ছে। কিন্তু ব্যাপারটা যে আমি টের পেয়েছি লুইজিকে সেটা বুঝতেই দিইনি। ও এখনও আমার হাতের মুঠোয় আছে।

১৭ ডিসেম্বর। স্টুয়ার্ট আজ সকালে লন্ডন গেল। দেখা যাক এটা লুইজির ওপর কেমন প্রভাব ফেলে। আমি খুব সতর্কতার সাথে খেয়াল রাখব...।’
টের পেলাম ঠাণ্ডা ঘাম ফুটে উঠেছে আমার কপালে। আমি দ্রুত পৃষ্ঠা ওল্টাতে লাগলাম।

‘২৪ ডিসেম্বর। ভোলেনি সে ওকে। সারাদিন সে নিজের ঘরে বসে থাকে। রাতের পর রাত শুধু চিঠি লেখে। ছোকরাকে চিঠি লিখছে।

২৭ ডিসেম্বর। লুইজি আমার সঙ্গে এখন কথাই বলে না বলতে গেলে। ওর একটা চিঠি আজ লুকিয়ে পড়লাম। ছোকরার সঙ্গে ভেগে যাওয়ার তাল করেছে ও। ঠিক আছে, আমিও প্রস্তুত। আমিও ওকে ছাড়ব না। আমি ওকে খুন করবই।’

আর কিছু লেখা নেই। যন্ত্রচালিতের মত বইটা  বন্ধ করলাম আমি। রেখে দিলাম আগের জায়গায়। কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ যেন বিস্ফোরণের মত বাজতে লাগল কানে। এক সময় যেন চেতনা ফিরল আমার। ধীর পায়ে এগিয়ে চললাম নিজের ঘরে। ঘরে ঢুকে আড়ষ্টভাবে বসে থাকলাম চেয়ারে, ঠায় তাকিয়ে রইলাম টেবিলের উপর টেলিস্কোপটার দিকে। জানি না কেন ওটা তুলে নিলাম হাতে, আচ্ছন্নের মত হেঁটে গেলাম ব্যালকনির দিকে।

হাত দুটো আগের জায়গাতেই আছে, দুলছে বাতাসে। অনেকক্ষণ হাতজোড়ার দিকে তাকিয়ে থাকলাম আমি। আঙুলের গোলাপী ত্বক পর্যন্ত এবার স্পষ্ট ধরা পড়ল চোখে। শরীরহীন অঙ্গগুলোর মধ্যে ভয়াবহ একটা ব্যাপার আছে যা ধরতে পারছি না আমি। হঠাৎ ওগুলো ধীরে, কাছে আসতে শুরু করল। পুরো গ্লাস জুড়ে এখন আমি ওদের দেখতে পাচ্ছি। আমার শরীরের কোথাও যেন অনুভূতি নেই, শুধু টের পেলাম হাতুড়ির বাড়ি পড়ছে বুকে। হাত দুটো ক্রমশ আরও এগিয়ে এল। পেছনের জঙ্গল মুছে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, যেন সম্মোহন করা হয়েছে আমাকে; পলকহীন চোখে তাকিয়েই রইলাম।

হঠাৎ আমার মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠল। প্রবল একটা আন্দোলন লক্ষ করলাম হাত দুটোতে। আঙুলগুলো আঁকশির মত বাঁকা হয়ে গেছে, মুঠো করছে, খুলছে। যেন টের পেয়ে গেছে ওদের সীমানায় কারও অনুপ্রবেশ ঘটেছে। সুযোগ পেলেই হামলা চালাবে তার উপর।
অকস্মাৎ একটা ঝাঁকি খেল কব্জি দুটো, আঙুলগুলো লাফিয়ে পড়ল সামনে, বাঁকা হয়ে গেছে...থাবা মারল যেন...

একই সঙ্গে বাড়িটার দেয়ালে বাতাস চিরে প্রতিধ্বনি তুলল কার যেন মরণ আর্তনাদ। চিৎকার করছে মার্টিন ক্রেড। আবারও আর্তনাদটা শোনা গেল, করিডোরের প্রতিটি কোণে ধাক্কা খেল ওর ভয়ঙ্কর গোঙানি।
টেলিস্কোপটা ফেলে দিলাম আমি। দরজা খুলে দৌড়ে গেলাম হলঘরে। ক্রেডের ঘরের দরজা খুললাম সশব্দে। নেই সে এখানে। আবারও দৌড়ালাম আমি। লুইজির ঘরের উদ্দেশে। এই ঘরের দরজা হাট করে খোলা। ভিতরে পা বাড়ালাম। সঙ্গে সঙ্গে জমে গেলাম দৃশ্যটা দেখে।

ঘরের মাঝখানে, একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে পড়ে আছে মার্টিন ক্রেড। ওর মাথাটা কে যেন প্রবল শক্তিতে মুচড়ে ধরে আছে পেছন দিকে, চোখ দুটো বিস্ফারিত। তাকিয়ে আছে ছাদের দিকে। হাতজোড়া অসহায়ভাবে ঝুলছে শরীরের দুই পাশে। দেখেই বুঝলাম মারা গেছে মার্টিন ক্রেড।
শরীরের কোথাও কোনও ক্ষত চোখে পড়ল না। অস্ত্র কিংবা কোনও ব্যক্তিকে দেখলাম না। সমস্ত ঘরে চোখ বুলিয়ে আতঙ্ক গ্রাস করল আমাকে। কাঁপতে কাঁপতে এগোলাম সামনের দিকে।
কাছে আসতেই ব্যাপারটা চোখে পড়ল আমার। ক্রেডের গলায় বৃত্তাকার একটা দাগ। দাগটা আঙুলের। কে যেন গভীর আক্রোশে ওকে গলা টিপে হত্যা করেছে। ভাল করে লক্ষ করতেই বুঝতে পারলাম দাগটা কোনও মহিলার আঙুলের। তবে দাগটায় অনামিকার ছাপ গাঢ়ভাবে ফুটে উঠেছে, গলার ওই জায়গাটার ত্বক বিবর্ণ হয়ে গেছে। ছাপটার দিকে ভাল করে তাকাতেই অজান্তে আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল, বেরিয়ে এল চিৎকার।

ছাপটা লুইজির আংটির, গোল এবং সমতল, স্পষ্ট ফুটে উঠেছে ইংরেজি অক্ষর ‘এল’।