বৃষ্টি তুমি এসো না

অনীশ দাশ অপু
মূল রচনা: আইজাক আসিমভ

‘ওই যে সে আবার,’ জানালার খড়খড়ি দিয়ে কৌতূহলী চোখে তাকাল লিলিয়ান রাইট। ‘সেই মহিলা, জর্জ।’
‘কার কথা বলছ?’ জিজ্ঞেস করল তার স্বামী। টিভির চ্যানেল অ্যাডজাস্ট করার চেষ্টা করছে। খেলা দেখবে।
‘মিসেস সাক্কারো,’ বলল লিলিয়ান। ‘আমাদের নতুন প্রতিবেশী।’
‘আচ্ছা।’

‘সান বাথ করছে। সব সময় দেখি সান বাথে ব্যস্ত। মহিলার ছেলেটাকে আজ অবশ্য দেখতে পাচ্ছি না। এরকম ঝলমলে দিনে প্রায়ই দেখি ওদের উঠোনে দাঁড়িয়ে বল খেলছে। ছেলেটাকে কখনও দেখেছ, জর্জ?’
‘ওর গল্প শুনেছি। সারাক্ষণই নাকি বাড়ির দেয়াল লক্ষ্য করে বল ছোঁড়ার প্রাকটিস করে।’
‘ছেলেটা ভারী চমৎকার। শান্তশিষ্ট। ভদ্র। টমি ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতালে মন্দ হয় না। ছেলেটার বয়স টমির মতই। দশ-টশ হবে।’
‘টমি সেধে কারও সাথে আলাপ জমাতে যায় না, জানোই তো।’
‘অবশ্য সাক্কারোরা একটু রিজার্ভ টাইপের। নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখতেই বোধহয় পছন্দ করেন। মি. সাক্কারো কি করেন জানিও না।’
‘জানার দরকার কি? যা খুশি করুক।’
‘লোকটাকে কখনও বাইরে যেতে দেখিনি, জানো। বেকার নাকি?’
‘আমাকেও তো কেউ বাইরে যেতে দেখে না।’
‘বারে! তুমি তো লেখক। বাড়িতে বসে লেখো। কিন্তু ওই লোক আসলে করেটা কি!’
‘আমার ধারণা মিসেস সাক্কারোও জানেন না তাঁর স্বামী কি করেন! আর আমি কি কাজ করি তা জানেন না বলে তাঁর পেটের ভাতও নিশ্চয়ই হজম হচ্ছে না।’

‘ওহ, জর্জ,’ জানালার কাছ থেকে চলে এল লিলিয়ান। বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকাল টিভির দিকে (স্কোনডিয়েনসট ব্যাট করছেন।)
‘আমাদের একবার চেষ্টা করা উচিত; প্রতিবেশীদেরও উচিত।’
‘কিসের চেষ্টা?’ সোফায় নড়ে-চড়ে আরাম করে বসল জর্জ, হাতে কোকের পেল্লায় ক্যান। এইমাত্র খুলেছে ক্যানটা। গায়ে স্বেদ বিন্দু।
‘ওদের সাথে দেখা করব।’
‘তুমি না মহিলার সঙ্গে কথা বলেছ?’
‘সে তো শুধু “হ্যালো” বলেছি। দু’মাস হলো ওরা এসেছে। এর মাঝে হাই-হ্যালো ছাড়া কোন কথা হয়নি আমাদের। আসলে মহিলা খুব অদ্ভুত।’
‘কেন?’

‘সারাক্ষণ দেখি তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। আকাশে সামান্য মেঘ জমলেই হয়েছে। মহিলা ঘর ছেড়েই বেরুবে না। একবার ছেলেটা বাইরে খেলছে, হঠাৎ মহিলা ব্যাকুল হয়ে ডাকতে শুরু করল তার ছেলেকে। বলল বৃষ্টি আসবে। ছেলে মায়ের কথা শুনে এক দৌড়ে ঘরে। অথচ তখন ফকফকা রোদ। আকাশের এক কোণে অল্প মেঘ জমেছে মাত্র।’
‘বৃষ্টি হয়েছিল?’
‘আরে না। খামোকাই উঠনে দৌড়ে গেছি আমি।’
লিলিয়ান রান্নাঘরে যাচ্ছে, পেছন থেকে ডাক দিল জর্জ। ‘ওরা অ্যারিজোনা থেকে এসেছে তো। তাই কখন বৃষ্টি হবে বুঝতে পারে না। মেঘ দেখলেই ভাবে বৃষ্টি নামবে।’
ঘুরে দাঁড়াল লিলিয়ান। ‘ওরা কোত্থেকে এসেছে বললে?’
‘অ্যারিজোনা। টমি বলেছে।’
‘টমি জানল কি করে?’
‘ওদের ছেলেটার সঙ্গে ওর কথা হয়েছে। বল খেলছিল দু’জনে এক সাথে। ছেলেটা টমিকে বলেছে ওরা অ্যারিজোনা থেকে এসেছে। টমি এটুকুই শুনেছে। এরপর ছেলেটার মা তাকে ভেতরে ডেকে নিয়ে যায়। তবে জায়গাটা আলাবামাও হতে পারে। কারণ তোমার ছেলের স্মরণশক্তির বহর জানোই। কিছুই মনে রাখতে পারে না। তবে বৃষ্টি নিয়ে ওদের এত দুশ্চিন্তার কথা শুনে মনে হচ্ছে ওরা অ্যারিজোনা থেকেই এসেছে। ওখানে তো বৃষ্টি-টৃষ্টি কম হয়।’

‘এ কথা তুমি আমাকে আগে বললে না কেন?’
‘কারণ টমি খরবটা আজকেই আমাকে দিয়েছে। ভেবেছি তোমাকেও বলেছে।’
আবার জানালার দিকে পা বাড়াল লিলিয়ান। ‘মহিলার আসল পরিচয় আমাকে জানতেই হবে।’ সে খড়খড়িতে চোখ রাখল। যা ভেবেছে তাই। মহিলা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে উদ্বেগ নিয়ে।
দিন দুইয়ের জন্যে লাইব্রেরীতে গিয়েছিল জর্জ রেফারেন্স বই ঘাঁটতে। বাড়ি ফিরল বইয়ের পাহাড় নিয়ে। লিলিয়ান হাসতে হাসতে দরজা খুলে দিল। বলল, ‘কাল তুমি কিছুই করছ না।’

‘কথাটা যেন ঘোষণার মত শোনাচ্ছে!’
‘ঘোষণাই। কাল আমরা সাক্কারোদের নিয়ে মার্ফি পার্কে যাচ্ছি।’
‘কাদের নিয়ে?’
‘আমাদের প্রতিবেশীদের নিয়ে। আশ্চর্য, সাক্কারোদের নাম এরমধ্যে ভুলে গেছ?’
‘ভুলো মন তো। যাক, কিভাবে ম্যানেজ করলে ওদেরকে?’
‘আজ সকালে ওদের বাসায় গিয়েছিলাম। বেল টিপলাম।’
‘তারপর?’
‘বেল টিপে ধরেই আছি। দরজা খোলে না। মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় দরজা খুলে গেল।’
‘মহিলা তোমাকে ভাগিয়ে দেয়নি?’
‘আরে না। মহিলা খুব ভাল। আমাকে ভেতরে যেতে বলল। জানে তো আমি কে। বলল তার বাসায় এসেছি বলে সে খুব খুশি।’
‘তারপর তুমি মার্ফি পার্কে যাবার পরামর্শ দিলে?’
‘ঠিক ধরেছ। ভাবলাম বাচ্চারা মজা পায় এমন কোথাও যাবার কথা বললে মহিলার সাথে সখ্য গড়ে উঠতে সময় লাগবে না। মহিলা তো তার ছেলেকে নিয়ে বেরুতেই চায় না।’
‘কোন কোন মা অমনই হয়। সন্তানকে নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তা করে।’
‘মহিলার বাসা যদি তুমি দেখতে! এমন ঝকঝকে তকতকে রান্নাঘর আমি জীবনে দেখিনি।’
‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ। দেখে মনেই হয় না এই রান্নাঘরে মহিলা কোনদিন রান্না করেছে। আমি পানি খেতে চাইলাম। ট্যাপ থেকে পানি এনে দিল মহিলা। এত সাবধানে গ্লাস ভরল যে এক ফোঁটা পানিও পড়ল না গ্লাসের বাইরে। তারপর পরিষ্কার ন্যাপকিন দিয়ে গ্লাস পেঁচিয়ে আমাকে পানি দিল।’

‘তুমি বলা মাত্র মহিলা রাজি হয়ে গেল পার্কে যেতে?’
‘না। সাথে সাথে রাজি হয়নি। স্বামীকে ডেকে জানতে চাইল আবহাওয়ার খবর। স্বামী বলল সবগুলো খবরের কাগজে সে পড়েছে কাল আবহাওয়া ভাল থাকবে। তবে সে রেডিওর সর্বশেষ আবহাওয়া বার্তাও শুনবে।’
‘সব কাগজে তাই লিখেছে?’
‘হ্যাঁ। ওরা আবহাওয়া বার্তার সমস্ত খবর জোগাড় করে রাখে দেখলাম। গাদা গাদা খবরের কাগজ ওদের বাড়িতে।’
‘আর কি দেখলে?’
জর্জের ঠাট্টা গায়ে মাখল না লিলিয়ান। সে আপন মনে বলে গেল, ‘দেখলাম মহিলা আবহাওয়া ব্যুরোর সাথে ফোনে কথা বলল। তাদের কাছে আবহাওয়া সম্পর্কিত লেটেস্ট খবরাখবর জানতে চাইল। তারপর স্বামীকে খবরটা জানাল। শেষে বলল ওরা যাবে। তবে আবহাওয়ার হঠাৎ কোন পরিবর্তন ঘটলে ফোন করবে আমাদেরকে।’
‘বেশ। আমরা তাহলে কাল যাচ্ছি।’
সাক্কারো পরিবারের সবাই সুশ্রী এবং হাসিখুশি মেজাজের। বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরে জর্জদের গাড়ি দাঁড় করানো। সাক্কারোরা হেঁটে এল গাড়িতে। সুদর্শন, তরুণ পরিবার প্রধানকে দেখে জর্জ তার স্ত্রীর কানে ফিসফিস করে বলল, ‘তাহলে এই মানুষটিই তোমার আগ্রহের মূল কারণ।’

‘হলে ভালই হত,’ হালকা গলায় বলল লিলিয়ান, ‘আচ্ছা, ভদ্রলোকের হাতে ওটা কি?’
‘পকেট-রেডিও। আবহাওয়ার খবর শোনার জন্যে এনেছে নিশ্চয়ই।’
সাক্কারোদের ছেলেটা দৌড়াতে দৌড়াতে এল। হাতে বায়ু-চাপ মাপার যন্ত্র। তিনজনে মিলে বসল পেছনের সিটে। আলাপচারিতা জমে উঠতে সময় লাগল না।
সাক্কারোদের ছেলেটা সত্যি খুব ভদ্র আর বিনয়ী। মুখচোরা টমিকে ওর পাশে ম্লানই লাগল। লিলিয়ান বেশ মজা পাচ্ছে গল্প করতে। মনে হচ্ছে এত আনন্দ সে কখনও পায়নি।
মি. সাক্কারো রেডিওর ভল্যুম কমিয়ে কানের কাছে ধরে রেখেছে। আবহাওয়া-বার্তা শুনছে। তাকে একবারের জন্যেও রেডিও নামিয়ে রাখতে দেখা গেল না।
আজকের দিনটি ভারী সুন্দর। ঝকঝকে, ঝলমলে। তেমন গরমও পড়েনি। ঝিরঝির হাওয়া বইছে। আকাশ নীল টলটলে। মি. সাক্কারো তার ছেলের বায়ু-চাপ মাপার যন্ত্রের দিকে সতর্ক চোখে তাকাল। নাহ্, বৃষ্টি আসার কোন সম্ভাবনা নেই।

লিলিয়ান দুই বাচ্চাকে নিয়ে পার্কের বিনোদন কেন্দ্রে ঢুকল। অনেকগুলো টিকেট কিনল। সবগুলো রাইডে চড়ল। তাকে একাই সব টিকেট কিনতে দেখে মৃদু আপত্তি করল মিসেস সাক্কারো।
‘প্লীজ,’ তার হাত ধরে বলল লিলিয়ান। ‘এবার আমাকে আপ্যায়ন করার সুযোগ দিন। পরেরবার আপনার।’
রাইড-টাইডে চড়ে স্বামীর কাছে এসে লিলিয়ান দেখল জর্জ একা। ‘আরে...’ বলতে গেল লিলিয়ান। তাকে থামিয়ে দিল জর্জ। ‘মি. সাক্কারো রিফ্রেশমেন্ট স্ট্যান্ডের দিকে গেছেন। তাঁকে বলেছি তোমাদের জন্যে এখানে অপেক্ষা করব। তোমরা এলে ওদের সঙ্গে যোগ দেব।’ তার কণ্ঠ কেমন গম্ভীর শোনাল।
‘কেন সমস্যা?’
‘না। কোন সমস্যা নেই। তবে মি. সাক্কারোকে আমার একটু অদ্ভুত মনে হয়েছে।’
‘কি রকম?’
‘লোকটাকে দেখে মনে হলো বেশ পয়সাঅলা। তবে বুঝতে পারছি না ওর আয়ের উৎসটা কি...’
‘এখন কার বেশি কৌতূহল জাগছে, সাহেব?’
‘না। মানে। তোমার কৌতূহল নিরসনের জন্যেই...মি. সাক্কারো বললেন উনি হিউম্যান নেচারের ছাত্র।’
‘এজন্যেই এমন ভাবুক স্বভাবের। আর এত এত পত্রিকা পড়েন।’
‘হতে পারে। তবে ওরা যে অ্যারিজোনা থেকে আসেনি এখন তা বুঝতে পারছি।’
‘ওরা অ্যারিজোনার লোক নয়?’
‘না। অ্যারিজোনার কথা বলতে ভদ্রলোক খুব অবাক হলেন। তারপর হেসে উঠে জানতে চাইলেন তাঁর কথায় অ্যারিজোনার টান আছে কিনা।’

লিলিয়ান কি যেন ভাবল। তারপর বলল, ‘অবশ্য ভদ্রলোকের অ্যাকসেন্টটা ঠিক বোঝা যায় না। দক্ষিণ-পশ্চিম স্প্যানিশ বংশের অনেক মানুষ আছে। কাজেই ওরা অ্যারিজোনার হতেও পারে। আর সাক্কারো নামটা স্প্যানিশ হওয়াও বিচিত্র নয়।’
‘আমার কাছে জাপানী জাপানী মনে হয়। যাক গে, চলো। ওরা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে। আরে দেখো, ওরা কি নিয়ে আসছে।’
সাক্কারোদের সবার হাতে তিনটি করে রেশমী মিঠাই’র স্টিক। চিনির তৈরি গোলাপী মিঠাইগুলো ফোমের মত ফুলে আছে। মুখে দেয়া মাত্র গলে যায়। মিষ্টি আঠাল ভাব থেকে যায় জিভে।
সাক্কারোরা একটা করে মিঠাই দিল জর্জদের। ওরা খুশি হয়ে নিল।
মিঠাই খেয়ে আরও কিছুক্ষণ পার্কে ঘুরল ওরা। গুলি করে বেলুন ফাটাল, ছবি তুলল, টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড করল গলা, এমনকি পাঞ্জাও লড়ল।
ঘোরাঘুরি করে খিদে পেয়ে গেছে টমির। সে হট-ডগ খাবে। জর্জ তাকে হট-ডগ কেনার পয়সা দিল। দোকানের দিকে ছুটল টমি। টমির সঙ্গে সাক্কারো পরিবারও গেল।
‘আমার যেতে ইচ্ছে করছে না,’ বলল জর্জ। ‘আবার যদি ওরা রেশমী মিঠাই কিনে আনে স্রেফ বমি করে দেব আমি।’
‘জানি। তবে ওরা এবার শুধু বাচ্চাদের জন্যে মিঠাই কিনছে,’ বলল লিলিয়ান। কাছেই রিফ্রেশমেন্ট স্ট্যান্ড। সাক্কারোদের দেখা যাচ্ছে এখান থেকে।
‘আমি মি. সাক্কারোকে হ্যামবার্গার খাওয়াতে চাইলাম। উনি মুখ অন্ধকার করে এদিক-ওদিক মাথা নাড়লেন। খাবেন না।’ বলল জর্জ।
‘আর আমি মিসেস সাক্কারোকে অরেঞ্জ স্কোয়াশ খাওয়ার কথা বলতেই উনি এমন জোরে লাফ মেরে উঠলেন যেন ড্রিংকটা আমি তাঁর মুখে ছুঁড়ে মেরেছি,’ বলল লিলিয়ান।
‘আসলে এরকম জায়গায় ওরা আগে কখনও আসেনি তো তাই পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সময় লাগছে।’
‘রেশমী মিঠাই বোধহয় ওদের খুব প্রিয়। তাই খালি ওগুলোই খাচ্ছে।’
‘হতে পারে,’ সাক্কারোদের দিকে পা বাড়াল জর্জ। ‘বৃষ্টি আসছে, লিল।’

মি. সাক্কারো রেডিও চেপে রেখেছে কানে, উদ্বেগ নিয়ে বারবার পশ্চিম আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। জর্জদের দেখে যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে পেল। বলল এখনই বাড়ি ফিরতে চায়। কারণ আকাশের মতি-গতি সুবিধের ঠেকছে না। ঝড় আসতে পারে। মিসেস সাক্কারো প্রায় ফুঁসে উঠল। অভিশাপ দিতে লাগল আবহাওয়া বিভাগের লোকজনকে। তাদেরকে সান্ত্বনা দিল জর্জ, ‘স্থানীয় আবহাওয়া সম্পর্কে আগেভাগে ভবিষ্যদ্বাণী করা মুশকিল। বৃষ্টি নাও আসতে পারে। আর এলেও আধঘণ্টার বেশি ঝরবে বলে মনে হয় না।’
এ কথা শুনে কেঁদে ফেলল সাক্কারোদের ছেলে। আর মিসেস সাক্কারো চোখে রুমাল চেপে ফোঁপাতে লাগল।
বৃষ্টিতে এদের এত ভয় কেন, অবাক হয়ে ভাবল জর্জ। সে হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘ঠিক আছে। বাড়ি চলুন তাহলে।’
ফিরতি যাত্রাটা হলো খুবই নিরানন্দময়। কেউ কোন কথা বলল না। মি. সাক্কারো বেশ জোরেই রেডিও ছেড়েছে, নব ঘোরাচ্ছে স্টেশন থেকে স্টেশনে, আবহাওয়া সংবাদ শুনছে। আবহাওয়ার বার্তায় ‘বজ্রসহ বৃষ্টিপাত, হতে পারে বলে সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে। সাক্কারোদের ছেলের বায়ু-চাপ মাপার যন্ত্র অর্থাৎ ব্যারোমিটারের কাঁটা দ্রুত নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। মিসেস সাক্কারো থুতনির ওপর হাত রেখে চুপচাপ বসে আছে। একটু পরপর ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছে আকাশের দিকে। জর্জকে অনুরোধ করছে আরও জোরে গাড়ি চালানোর জন্যে।

হঠাৎ বাতাস উঠল, ধুলোয় ভরে গেল সামনের রাস্তা। ওরা তখন ওদের বাড়ির রাস্তায় চলে এসেছে। বাতাসে শুকনো পাতা উড়তে লাগল। আকাশের বুক চিরে ঝিলিক দিল বিদ্যুৎ।
জর্জ বলল, ‘আর দু’মিনিটের মধ্যে বাসায় পৌঁছে যাব। দুশ্চিন্তা করবেন না।’
গাড়ি থেকে নেমে গেট খুলল জর্জ। এই গেট ধরে সোজা রাস্তা চলে গেছে সাক্কারোদের বাড়ির দিকে। হঠাৎ টপ করে একটা ফোঁটা পড়ল ওর মাথায়। ঠিক সময়েই চলে এসেছি, ভাবল জর্জ।
কাঁপতে কাঁপতে গাড়ি থেকে নামল সাক্কারো পরিবার, মুখ শুকিয়ে এতটুকু। বিড়বিড় করে ধন্যবাদ দিল জর্জদের। তারপর রাস্তার শেষ মাথায়, নিজেদের বাড়ির উদ্দেশে পড়িমরি করে দৌড় দিল।
‘সত্যি,’ বলল লিলিয়ান, ‘এরা বৃষ্টি যে এত ভয় পায়...’

লিলিয়ানের কথা শেষ হলো না, আকাশ ফুটো করে, বড় বড় ফোঁটা নিয়ে ঝুপঝুপিয়ে নেমে এল বৃষ্টি। যেন স্বর্গের বাঁধ হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়েছে। ড্রাম পিটানোর শব্দে জর্জদের গাড়ির ওপর ঝমঝমিয়ে পড়তে লাগল জলধারা। সাক্কারো পরিবার অর্ধেক পথও যেতে পারেনি, দাঁড়িয়ে পড়ল। হতাশ হয়ে তাকাল ওদের বাড়ির দিকে।
বৃষ্টিতে ওদের মুখগুলো ঝাপসা দেখাল; ঝাপসা এবং সঙ্কুচিত। ছোট হয়ে আসছে ওরা। তিনজনের শরীরই কুঁচকে ছোট হয়ে গেল, গা থেকে খসে পড়ল জামাকাপড়। তারপর তিনটে স্তূপ হয়ে পড়ে রইল রাস্তার ওপর।
নিজেদের গাড়িতে বসে অবিশ্বাস্য দৃশ্যটা আতঙ্কিত হয়ে দেখল জর্জ পরিবার। লিলিয়ান কোন মতে ফিসফিস করে বলল, ‘ওরা চিনি দিয়ে তৈরি! তাই পানিতে গলে যাবার ভয় পাচ্ছিল ওরা!!’