পরীর দেশে

মৃত্যুঞ্জয় রায়

অনেকদিন আগের কথা। এক গাঁয়ে ছিলো এক কৃষক। তার ছিলো এক ছেলে। তার নাম ছিলো শোভন। কৃষকের ছেলেটা চাষবাস কিছু করতো না। শোভন শুধু এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতো। তবে সে খুব সুন্দর বাঁশি বাজাতে পারতো। একদিন সে এক সাগর পাড়ের বেলাভূমিতে বসে আপন মনে বাঁশি বাজাচ্ছিলো। হঠাৎ দেখে এক ঝাঁক গাঙচিল সাগরের উপরে উড়ে উড়ে বেলাভূমির দিকে আসছে। বাঁশি বাজানো বন্ধ করে ওই দিকে সে তাকিয়ে রইলো। শোভন দেখে একে একে বারোটা গাঙচিল বালির সৈকতে নেমে এলো। আর কি অবাক কাণ্ড। মাটিতে নামতেই বারোটা গাঙচিল বারোজন অনিন্দ্য রূপসী তরুণী হয়ে গেলো। শোভন দ্রুত একটা বড়ো পাথরের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেললো, যেন পরীরা ওকে দেখতে না পারে। একটু পরেই শোভন দেখলো, পরীরা ওদের পালকের পোষাক খুলে রেখে সাগরে ঝাঁপ দিলো। সাগরে তারা অনেকক্ষণ সাতাঁর কাটলো, খেলা করলো, হাসি আনন্দে সাগর পাড় ভরে তুললো।

শোভনের মাথায় হঠাৎ একটা দুষ্টু বুদ্ধি এলো। একটু তামাশা করার জন্য সে চট করে ওদের একজনের একটা পোষাক লুকিয়ে ফেললো। পাথরের আড়ালে বসে দেখতে লাগলো ওরা কি করে। একে একে এগারোজন তরুণী  পোষাক পরে আবার গাঙচিল হয়ে উড়ে গেলো। কিন্তু একজন তার পোষাক খুঁজে না পেয়ে আর গাঙচিল হতে পারলো না। সে পোষাকের দুঃখে সাগর পাড়ে বসে কাঁদতে লাগলো। তরুণীটিকে কাঁদতে দেখে শোভনের খুব মায়া হলো।  সে আর দেরি না করে ওর পালকের পোষাকটা ফিরিয়ে দিলো, বললো, ‘সত্যিই আমি দুঃখিত। একটু তামাশা করার জন্য পোষাকটা লুকিয়ে রেখেছিলাম। এই নাও। ওটা পরে তুমি গাঙচিল হয়ে উড়ে যাও।’

পোষাক পেয়ে তরুণী খুব খুশি হলো। ওর চোখ থেকে পানি পড়া বন্ধ হলো। অশ্রুভেজা চোখে সে শোভনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। শোভনকে বললো, ‘ধন্যবাদ বন্ধু আমার পোষাকটা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য। ওটা না হলে আমি আর গাঙচিল হতে পারতাম না। তা না হতে পারলে আমি এই পৃথিবী থেকে জীবনে আর কখনো ফিরে যেতে পারতাম না।’

‘তাহলে তোমরা কি এই পৃথিবীর কেউ নও?’ শোভন তরুণীটিকে জিজ্ঞেস করলো।
তরুণী বললো, ‘না, আমরা পরী। আমরা বারো বোন। আমাদের পরীরাজ্য ওই দূরে আকাশের ওপারে, মেঘের মধ্যে। সেখানে গেলে আমরা তুলোর মেঘের মতো হালকা হয়ে যাই আর মেঘের মধ্যে হেঁটে বেড়াই, জলভরা মেঘের মধ্যে ফুলের বাগান করি। সে ফুলবাগানে আমরা নাচি, গান গাই আনন্দ করি। তবু আমাদের একটা কষ্ট আছে। আমরা সাগরে এসে গোসল না করলে বাঁচি না। মাঝে মাঝেই আমাদের সাগরে আসতে হয় গোসলের জন্য। আমাদের সবাইকেই আসতে হয়। সবাই আসে গাঙচিলের বেশ ধরে। কিন্তু মাটিতে নামলেই আমরা ফের পরী হয়ে যাই। আমার মা পরীদের রাণী। তুমি যাবে আমার সাথে? মা তোমাকে দেখলে নিশ্চয়ই খুব খুশি হবেন।’ পরীকে দেখে শোভন মুগ্ধ। ওর কথা শুনে আরও বেশি অভিভূত হয়ে গেলো সে। সুতরাং সে পরীর সাথে রওনা দিলো পরীদের দেশে।

এগারো মেয়ে ফিরে এসেছে, একটা মেয়ে ফিরে আসেনি। তাই পরী রাণী দুশ্চিন্তায় মেঘের মধ্যে পায়চারী করছেন। এমন সময় মেয়েকে দেখতে পেয়ে খুশিতে জড়িয়ে ধরলেন। মেয়ের কাছে সব কথা শুনে পরী রাণী শোভনকে পরীদের দেশে সাদরে স্বাগতম জানালেন। তিনি তার মেয়েকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য শোভনকে অনেক উপহার দেয়ার কথাও বললেন। শোভন বিনয়ের সাথে সেসব উপহার নিতে অস্বীকৃতি জানালো। পরী রাণী বললেন, ‘পরীদের দেশে যে কেউ এলে উপহার দেয়ার নিয়ম আছে। আর শোভন তো তার মেয়ের জীবন বাঁচিয়েছে। সুতরাং তাকে উপহার তো নিতেই হবে।’ এই বলে পরী রাণী ঘোষণা দিলেন, শোভনের সাথেই তার এই মেয়েটার বিয়ে হবে। তবে একটা শর্ত আছে, শোভন যদি তার বারো মেয়েদের মধ্যে হবু বউকে চিনতে পারে তাহলেই বিয়ে হবে। আর এক বার দুবার নয়, চিনতে হবে তিন বার।

পরী রাণী তার প্রাসাদের একটা জমকালো কক্ষে বারো মেয়েকে একই পোষাকে একই সাজে দাঁড় করিয়ে দিলেন। শোভন দেখলো, সবাইকে এক রকম লাগছে। একই গায়ের রঙ, একই চেহারা। এর মধ্য থেকে সে তার হবু বউকে কিভাবে চিনে নেবে?  শোভন দেখতে ছিলো খুব সুন্দর। তাই পরীর এ মেয়েটা তাকে ভালবেসে ফেলেছিলো। তাই এক সারিতে বারো বোন দাঁড়ানোর পর সে শোভনকে প্রতিবারই একটা গোপন সংকেত দিয়ে তাকে চিনতে সাহায্য করলো। তিনবারই শোভন সফল হলো তার হবু বউকে চিনতে। সুতরাং রাণীর আর আপত্তি রইলো না। আনন্দের সাথে মহা ধুমধামে ওদের বিয়ে হলো। শোভন আর তার পরী বউ বহু বছর সুখের সাথে সেই পরীদের দেশে বাস করতে লাগলো। পরী বউ প্রতিবারই সাগরে গোসল করার সময় শোভনকে সাথে করে নিয়ে আসে। তখন শোভন তার মা বাবাকে একবার করে দেখে যায়। পরীদের দেশে শোভনই হলো একমাত্র ছেলে। পরে অবশ্য ওদের কোনো পরী সন্তান হয়েছিলো কিনা সেটা কিন্তু আমি জানি না।


(বিদেশী রূপকথার ছায়া অবলম্বনে)