জাদুর ঢোল

আহমেদ রিয়াজ

বড্ড মন খারাপ নিয়ে বাসায় ফিরছি। আজ আমার দ্বিতীয় পার্বিক পরীক্ষার গণিত খাতা দিয়েছে। বাবাকে এই খাতা দেখানো যাবে না। আবার না দেখিয়েও উপায় নেই। খাতায় বাবার সাক্ষর লাগবে। এই খাতা আগামীকাল স্কুলে জমা দিতে হবে। একবার ভেবেছি বাবার সাক্ষরটা আমিই দিয়ে দেই। আমি বাবার সাক্ষর নকল করতে পারি। সামান্য এদিক ওদিক হবে অবশ্য। তবে সেটা কিছু না। আমি তো আর বাবার চেকে সাক্ষর নকল করে ব্যাংক থেকে টাকা তুলছি না! কাজেই আমাদের গণিত টিচারও ব্যাংকের ক্যাশিয়ারের মতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাবার সাক্ষর দেখবেন না। যদিও ব্যাংকের মতো আমাদের স্কুলেও বাবার সাক্ষর সংরক্ষণ করে রাখা আছে। তবু টিচাররা সেই সাক্ষরের সাথে খাতার সাক্ষর মিলিয়ে দেখার মতো সময় পাবেন বলে মনে হয় না। কিন্তু বাবা যদি কখনো জানতে চান, তোর গণিত খাতা দেয়নি?

তখন? তখন কী বলবো? দেয়নি বললে বাবা স্কুলে খবর নেবেন। আবার দিয়েছে বললে জানতে চাইবেন, আমাকে খাতা দেখাসনি কেন? তখন ঝামেলা বরং আরো বাড়বে। দোষ হবে দুটো। অপরাধ লুকনোর চেষ্টা করা, মানে কম নম্বরঅলা খাতা লুকনোর চেষ্টা করা এবং কম কম নম্বর পাওয়া। আমি বুকে সাহস আনার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলাম। যা আছে কপালে। বড়জোর...
নাহ! বড়জোর আর কী হবে, ভাবতে পারছি না। প্রথম পার্বিক পরীক্ষার পর এই গণিত খাতা নিয়ে যা হয়ে গেল, সেটা আমার মনে আছে। এবং অনেকদিন মনে থাকবে। আর মনে না থেকেও উপায় নেই। এখনও আমার পিঠে বেতের দাগ রয়ে গেছে। ওই দাগগুলো কবে যাবে কে জানে।

আনমনে হাঁটছি। আমি খুব আতঙ্কিত। আর কী কী হবে? আজ রাতের খাবারটাও মনে হয় পাবো না। প্রথম পার্বিক পরীক্ষার খাতা দেয়ার পর এক রাত না খেয়ে থাকতে হয়েছিল আমাকে।
হঠাৎ একটা ঢোলের শব্দ শুনতে পেলাম। আর একটা লোকের অবিরাম চিৎকার। কান দিলাম না। কারণ আমার তখন কেবল একটাই চিন্তা- পরীক্ষার খাতা। এবং এই খাতা বাবাকে দেখাতে হবে। কিন্তু কীভাবে দেখাবো?

যে পথ দিয়ে হেঁটে আসছি, তার পাশেই একটা মাঠ। এই মাঠে প্রতিবছর কয়েকটা মেলা হয়। এখনও হচ্ছে। শরতের মেলা। ইস! পরীক্ষায় ভালো করলে, এখন ইচ্ছে মতো ওই মেলায় ঘুরে বেড়ানো যেত। আমার কাছে মেলায় ঘোরার মতো যথেষ্ট টাকাও আছে। ইচ্ছে করলে এখনও ঘুরতে পারি। কিন্তু ঘুরতে মন চাইছে না। মনে ভয় নিয়ে মেলায় ঘোরার সাহস আমার নেই। আমি আবারও আনমনা হয়ে গেলাম। বাড়ির পথ ধরলাম। আবারও ঢোলের বাড়ি! ঢোলের শব্দ আমার খুব ভালো লাগে। এবার হাঁটতে হাঁটতেই কান পাতলাম। ঢোলের শব্দের সঙ্গে একটা মানুষের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু কী বলছে বোঝা যাচ্ছে না। দূর থেকে কেবল একটা শব্দই শুনলাম, জাদু।
জাদু!

বাড়ি যাবার পথটা আর আমাকে ধরে রাখতে পারল না। আমি মেলার পথ ধরলাম। নাকি মেলার পথ আমাকে ধরল? যেটাই হোক, আমি মেলার দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতে সোজা চলে এলাম ঢোলঅলার কাছে।
ঢোলঅলার চারপাশে মোটামুটি একটা জটলা। মাটিতে একটা চাটাই বিছানো। তার ওপর বেশ কিছু ঢোল সারি সারি করে সাজানো। ঢোলঅলার হাতেও একটা ঢোল। ওই ঢোলে একটা লাঠি দিয়ে বাড়ি দিচ্ছে আর বলছে, জাদুর ঢোল, জাদুর! এই ঢোলে বাড়ি দিয়ে যা চাইবে, তাহাই পাইবে।

ঢোলঅলার কথাটা শুনে বেশ হোঁচট খেলাম আমি। নাহ্! কথাটা ঠিক হলো না। সাধু আর চলিত মিশিয়ে ফেলেছে। নিশ্চয়ই স্কুলে বাংলায় খারাপ করতো। নিশ্চয়ই মনোযোগ দিয়ে বাংলা পড়ত না।
আমি ঢোলঅলার পাশে এসে দাঁড়ালাম। আরেকবার কথাটা বলার জন্য দম নিচ্ছিলেন ঢোলঅলা। তার আগেই আমি বললাম, আপনার সব ঢোলই কি জাদুর?
ঢোলঅলা বললেন, অবশ্যই।
আমি বললাম, কিন্তু জাদুর ঢোল জানার পরেও কেউ কিনছে না কেন?
ঢোলঅলা বললেন, সবাই জাদু বোঝে না।
আমি জানতে চাইলাম, কী কী জাদু হয় ঢোল দিয়ে?
ঢোলঅলা বললেন, যা তোমার দরকার, চাইবে আর পাইবে।
আমি বললাম, কিন্তু আপনি এমন সাধু আর চলিত মিশিয়ে কথা বলছেন কেন?
ঢোলঅলা বললেন, এটা আবার কী? এটা কি কোনো ঢোলের নাম?
নাহ্! সাধু চলিতই বোঝে না ঢোলঅলা। আবার জাদুর ঢোল বিক্রি করছে! আমি আবার বাড়ির পথ ধরার জন্য ঘুরলাম। তখনই আমার মনে হল, একবার চেষ্টা করেই দেখা যাক।
জানতে চাইলাম, কত একটা ঢোল?
ঢোলঅলা বললেন, জাদুর ঢোল অমূল্য জিনিস। দাম দিয়ে কি এর হিসাব হয়?
আমি বললাম, তাহলে এমনি এমনি নিয়ে যাবো?
ঢোলঅলা এবার হইহই করে ওঠলেন, কেন? এমনি এমনি নিয়ে যাবে কেন? এ অমূল্য জিনিস।
আমি বললাম, এই অমূল একটা জিনিসের জন্য কত দিতে হবে?
ঢোলঅলা বললেন, তোমার যা খুশি। সারাদিন মাত্র তিনটে ঢোল বিক্রি করতে পেরেছি। জাদুর ঢোলের মর্ম সবাই বোঝে না। তুমি বুঝেছ। এখন ঢোল নিলে নাও, নয় তো অন্য পথ ধরো। আমি এখন ঢোল বাজাবো আর চেঁচাবো।

কথাটা বলেই তার কাঁধে গামছা দিয়ে ঝোলানো ঢোলে কয়েকটা বাড়ি দিলেন তিনি। তারপর আগের মতো সাধুচলিত মিশিয়ে চেঁচাতে লাগলেন, জাদুর ঢোল, জাদুর! এই ঢোলে বাড়ি দিয়ে যা চাইবে, তাহাই পাইবে।
বেশ কয়েকবার বললেন। তারপর থামলেন। মানে দম নিচ্ছেন। এত ঘন ঘন দম নেয়ার দরকার কী আমি বুঝতে পারলাম না। আমার বুঝেও কাজ নেই। আমি একটা দশ টাকার নোট ঢোলঅলার হাতে দিয়ে বললাম, দিন একটা ঢোল। কাজ যেন হয়। আপনি নিজে বেছে দিন।
কিন্তু ঢোলঅলা দশটাকার নোটের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। নতুন নোট হাতে পেলে আমরা যেমন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি, তেমনি করে দেখতে লাগলেন তিনি। দশটাকার নোটখানা দেখা শেষ করে আমার হাতে আবার নোটটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, হবে না।
আমি অবাক হলাম। হবে না! কেন হবে না? বাজারে এমন ঢোলের দাম দশ টাকার বেশি নয়। বরং দামাদামি করলে আরো দু-এক টাকা কমতে পারে। কিন্তু কেন হবে না?
আমি জানতে চাইলাম, হবে না কেন?
ঢোলঅলা বললেন, হাজার টাকার ঢোল দশ টাকায়? ডানের দুটো শূন্যই হাওয়া? হবে না।
আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম ঢোল অলার কথা শুনে। চট করে শূন্যের হিসাবটা কেমন সহজে করে ফেললেন। নিশ্চয়ই স্কুলে গণিতে ভালো ছিলেন। তাছাড়া একটা শূন্যের জন্যই তো ঢোল কিনতে চেয়েছি আমি। মাত্র একটা শূন্য। সেটা অবশ্য আমি হাত দিয়েও বসিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু তাতে লাভ হতো না। খাতা ওল্টালেই সব গোমর ফাঁস হয়ে যেত। জাদু-মন্ত্রের গোমর সহজে ফাঁস হয় না।
আমি বললাম, কিন্তু আমি তো অতো শূন্যঅলা এক দিতে পারবো না।
ঢোলঅলা বললেন, ঠিক আছে যাও, তোমার জন্য আরো একটা শূন্য কমিয়ে দিলাম। দুই শূন্যঅলা একটা এক দাও।
আমি বললাম, উঁহু। তাও হবে না। আমি এক শূন্যের বেশি কোনো মতেই দিতে পারবো না। এখন শূন্যের আগে কত হবে সেটাই ভাবতে হবে।
ঢোলঅলা তড়িঘড়ি করে বলে ফেললেন, দুই, চার পাঁচে কিন্তু হবে না। আমি আগেই বলে রাখছি। সাত আটের উপরে যেতে হবে।

আমার কাছে অবশ্য এর চেয়েও বেশি টাকা আছে। তাই বলে সব টাকা দিয়ে দিতে হবে নাকি? আমাকে এত বোকা পেয়েছে? জাদুর ঢোল হয়েছে তো কী হয়েছে? আমি দরদাম শুরু করলাম। বললাম, আমি তিন আর তিনের পরে একটা শূন্য দিতে রাজি আছি।
ঢোলঅলা মুখটা অদ্ভুত রকম বাঁকিয়ে বললেন, হবে না।
আমি বললাম, না হলে নেই।
বলেই আমি বাড়ির পথ ধরলাম। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি, এর চেয়ে প্রথম পার্বিক পরীক্ষার পরে যা ঘটেছিল, সেটাই না হয় আবার ঘটুক। এর জন্য তিরিশটাকার বেশি কোনোভাবেই আমি দেবো না। এর চেয়ে অনেক বেশি টাকা আমার কাছে আছে। তবে টাকাটা জমাতে আমার খুব কষ্ট হয়েছে। প্রতি বছর আমি এমন টাকা জমাই। স্কুলের শেষ পরীক্ষার পর ছোট মামা আসেন। প্রতিবছর আসেন। আর প্রতিবছর আমাকে নিয়ে যান নানাবাড়ি। আট-দশ দিন বেড়িয়ে আসি। তখনই জমানো টাকা খরচ করি আমি। ঢোল কিনে সব টাকা খরচ করলে বেড়াতে গিয়ে কী করবো?
বাড়ির পথের মূল রাস্তায় তখনও উঠিনি, তার আগেই জোরে ডাক দিলেন ঢোলঅলা, এই খোকা, আর বিশটাকা বাড়িয়ে দিও। নিয়ে যাও।
আমিও হাঁক দিলাম, তিরিশের বেশি এক পয়সাও নয়।
ঢোলঅলার চেঁচানো গলা শুনতে পেলাম, আচ্ছা চল্লিশই দিও। নিয়ে যাও।
আমি না শোনার ভান করে হাঁটতে শুরু করলাম। পঞ্চাশ থেকে চল্লিশে নেমে গেছে, তার মানে তিরিশেই দেবেন। আমার কথাই ঠিক হলো, এবার আরো জোরে চেঁচিয়ে ওঠলেন ঢোলঅলা, আচ্ছা, নিয়ে যাও।
বাড়ির পথ ছেড়ে আমি আবার ঢোলঅলার পথ ধরলাম।

২.
বাবাকে গণিত খাতা দেখালাম। আমার হাসিখুশি ভাব দেখে বাবাও খুশি হলেন। বললেন, গণিতে ভালো করেছিস মনে হচ্ছে। কত পেয়েছিস?
বাবা জানতেন আজ আমাদের গণিত খাতা দেবে। বাকি বিষয়ের খাতা আগেই দিয়েছে। আর কোনো বিষয়ে গণিতের মতো এত খারাপ নম্বর পাইনি।
আমি ব্যাগ খুলে গণিতের খাতা বের করতে করতে বললাম, একশ।
বাবা অবাক হয়ে বললেন, একশ! বলিস কী? একশ!
উঁহ্! বাবা বিশ্বাসই করতে পারছেন না। আমি বুঝি গণিতে কখনো একশ পেতে পারি না? নাকি গণিতে একশ পাওয়ার নিয়ম নেই। গণিত তো আর বাংলা নয় যে, একশ পাওয়া যাবে না।
আসলে আমি পেয়েছিলাম দশ। ওই দশটাকেই একশ বানানোর পরিকল্পনা করছিলাম। তখনই তো জাদুর ঢোলঅলার দেখা পেলাম। জাদুর ঢোলও কিনলাম। তারপর মাঠের মধ্যেই ব্যাগ থেকে খাতা বের করলাম। ঢোলে একটা বাড়ি দিয়ে বললাম, একশ হয়ে যাও।
খাতায় তাকালাম। নাহ্! একশ হল না। মনে করার চেষ্টা করলাম, কীভাবে বলতে হবে। মনে পড়ল। চোখ বন্ধ করে বলতে হবে। ঢোলে বাড়ি দিয়ে অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখলাম। আর মনে মনে বললাম, একশ হয়ে যাও। একশ হয়ে যাও।
তারপর চোখ খুলে খাতার দিকে তাকিয়ে তো আমি অবাক! দশ হয়ে গেছে একশ। তখন আমার খুশি দেখে কে। ঢোল বাজাতে বাজাতে বাড়ি ফিরলাম। আর বাড়ি ফিরেই দেখি বাবা বসে আছেন উঠানে। একটা চেয়ার পেতে। বাবাকে গণিতের খাতা দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। বাবা অবশ্য বলেছিলেন, রাতে দেখবেন। কিন্তু আমি তখনই দেখাতে চাইলাম।

বাবার মুখটাও হাসি হাসি। বাবা বলতে শুরু করলেন, যাক। তাহলে পিট্টিতে শেষ পর্যন্ত কাজ হয়েছে। আর কাজটা দেখছি চালিয়ে যেতে হবে। তুই তো আমাকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলি।
আমি জানতে চাইলাম, কেন?
বাবা বললেন, ভেবেছিলাম পিট্টিতে যখন কাজ হয় না, তখন কাজ হওয়ার মতো অন্য কোনো উপায় বের করতে হবে। যাক, আর অন্য উপায়ে যেতে হবে না। পিট্টিতেই কাজ হয়েছে। একেবারে একশতে একশ। ভেরি গুড।
আমি ব্যাগ থেকে খাতা বের করে বাবার হাতে দিলাম। খাতার উপরেই ডানপাশে নম্বর লেখা। বাবা ওদিকে তাকালেন। তারপর বললেন, তুই কি আমার সাথে মজা করছিস?
আমি আমতা আমতা করে বললাম, মানে?
বাবা এবার গর্জে ওঠলেন, কোথায় একশ? ওটা তো দেখছি...
বাবার কথা শেষ হওয়ার আগেই খাতার দিকে তাকিয়ে বললাম, আমি তো দেখতে পাচ্ছি।
বাবা বললেন, আমিও দেখতে পাচ্ছি। তবে দশ। তুই কত দেখছিস?
দশ! মাত্র দশ! আমি বললাম, কোথায় দশ? এই তো একশ। এক এর পরে দুটো শূন্য।
বাবা বললেন, দুটো শূন্য? আমি দেখছি একটা আর তুই বলছিস দুটো?
আমি বললাম, তুমি তো চশমা ছাড়া ভালো মতো দেখতে পাও না। তোমার চশমা নিয়ে আসবো?
বাবা বললেন, চশমা দিয়ে দেখলেই বুঝি একটা শূন্য দুটো হয়ে যাবে?
আমি বললাম, হতেও পারে। চশমা ছাড়া তো তুমি ঝাপসা দেখো। তোমার চশমাটা নিয়ে আসি।
বলেই আমি ব্যাগ নিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকলাম। মায়ের সাথে দেখা হল তখন। মা বললেন, কি রে কখন এসেছিস?
আমি বললাম, এই যে মাত্র।
মা বললেন, হাত-মুখ ধুয়ে আয়। আমি খাবার দিচ্ছি।
আমি হাত-মুখ ধুতে গেলাম না। আমার ঘরে ঢুকলাম। ঢোলে বাড়ি দিলাম। তারপর দুচোখ বুঁজে বলতে লাগলাম, বাবার রাগ, কমে যাও। কমে যাও। একেবারে কমে যাও।

৩.
চশমা নিয়ে বাবার সামনে এলাম। বাবা তখনও আমার গণিত খাতা ধরে আছেন। উল্টে পাল্টে দেখছেন। আমি চশমা দিতেই চোখে লাগিয়ে খাতার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, আমি এখনও দশ দেখতে পাচ্ছি।
আমি বললাম, মনে হচ্ছে তোমার চশমাটা আর কাজ করছে না।
বাবা বললেন, একটু আগে এই চশমা পরেই আমি পত্রিকা পড়েছি। পত্রিকার লেখা অনেক ছোট ছোট। আমি ঠিকই দেখেছি। তখন কাজ করল কেমন করে?
বাবা এবার খাতা উল্টে-পাল্টে দেখতে লাগলেন। দেখতে দেখতে বললেন, একশ কেমন করে হবে? তুই তো সব প্রশ্নের জবাবই দিসনি। এই দ্যাখ!

বলে বাবা আমার ঘাড় ধরে মাথাটা খাতার উপর নিয়ে এলেন। এভাবে না আনলেও হতো, আমি নিজেই দেখে নিতাম। খামোখা বল প্রয়োগ করতে হলো বাবাকে। বাবার কতখানি এনার্জি নষ্ট হল? আসলে বোঝে না। নিশ্চয়ই স্কুলে বিজ্ঞানে অতো ভালো ছিলেন না বাবা। হয়ত গণিতে ভালো ছিলেন। তাই গণিত নিয়ে মাতামাতি বেশি করেন।
এবার আমি দেখলাম। সত্যিই দেখলাম। একশটা আবার কেমন করে যেন দশ হয়ে গেল। দুটো শূন্যের জায়গায় একটা শূন্য হয়ে গেল আবার। মোট কথা স্কুলে টিচার আমাকে ঠিক যেরকম খাতা দিয়েছিলেন, খাতাটা আবার তেমনই হয়ে গেল। ভয়ে আমার হাত-পা কাঁপতে লাগল। আমি ঠক ঠক করতে লাগলাম। আর ভাবতে লাগলাম, জাদুর ঢোলে তাহলে কোনো কাজই হল না। কিন্তু তখন যে...
আর ভাবতে পারলাম না। বাবা আমার হাতে খাতাটা দিয়ে বললেন, যা। হাত মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নে। এরপর থেকে ভালো মতো লেখাপড়া করবি। মনে থাকে যেন। থাকবে?
আমি অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকালাম। বাবা তো এমন করে কথা বলার মতো মানুষ নন। বাবার নজর যখন আমার পিঠের দিকে থাকে, তখন ভয়ে মা-ও বাবার সামনে আসার সাহস পান না। অথচ সেই বাবা! আমি অবাক না হয়ে পারিনি।


আমি কাঁপতে কাঁপতে বললাম, থা-থা-থাকবে।
বাবা আবার বললেন, এমন নম্বর যদি আর কখনও পেয়েও থাকিস, আমাকে খাতা দেখাবি না। অমন খাতা আমি দেখতে চাই না। মনে থাকবে?

বাবার এই আচরণে আমি এতটাই অবাক হয়ে গেলাম, আমার দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। বাবা দেখে ফেললেন সেটা। তারপর আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ভালো মতো লেখাপড়া করলেই তো পারিস। গণিত বোঝার চেষ্টা করে দেখিস, ঠিক বুঝতে পারবি।
সে রাতে আমি শুয়ে শুয়ে অনেক কিছু ভাবলাম। কেন এমন হলো? কেন বাবা এমন বদলে গেলেন? তবে কি জাদুর ঢোলের জন্য? যদি সেটাই হবে, তবে খাতার নম্বরটা আবার আগের মতো হয়ে গেল কেন? ভাবতেই লাগলাম আমি। আর ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।
ঘুম ভাঙল সেই সকালে। ঘুম ভাঙতেই চোখের সামনে টেবিলের ওপর জাদুর ঢোলটা দেখতে পেলাম। বিছানা থেকে উঠে ঢোলটা হাতে নিলাম। নতুন দিনের শুরুতে কী চাওয়া যায় ভাবতে লাগলাম। তখনই আমি বুঝতে পারলাম জাদুর ঢোলের রহস্য। আসলে জাদুর ঢোলের কাছে একটা জিনিসই চাইতে হয়। আরেকটা ইচ্ছের কথা বললেই আগের জাদুটা নষ্ট হয়ে যায়। এবং এটাই ঠিক। নইলে বাবা এমন বদলে গেলেন কেন? বাবা বদলে যাওয়াতেই খাতার নম্বর আবার আগের মতো হয়ে গেছে।
জাদুর ঢোলে একটা চাটি মারতে গিয়েও মারলাম না। হাত সরিয়ে ফেললাম। তারপর ঢোলটা খাটের তলায় এক কোনায় রেখে দিলাম, যাতে কেউ আর চাটি মারতে না পারে। কারণ বাবা আবার আগের মতো হয়ে যাক আমি চাই না। এই বদলে যাওয়া বাবাকেই আমার ভালো লেগেছে। বাবা বদলে যাওয়াতেই আমি খুশি হয়েছি। গণিতে একশ পেলেও আমি এত খুশি হতাম না।