নওরিনের স্কুল

এনায়েত রসুল

নওরিন যখন জানতে পারলো ওকে মফস্বল শহরের এক অখ্যাত স্কুলে বদলি করা হয়েছে, তখন ওর মন খারাপ হয়ে গেলো। সরকারি চাকুরেদের যখন-তখন যে কোনো জায়গায় বদলি করা হতে পারে, নওরিন তা জানে। তা বলে মুন্সীগঞ্জের মতো শহরে? যে মেয়ের জন্ম ঢাকায়, লেখাপড়া, বেড়ে ওঠা ঢাকায়-অমন একটি ছোট শহরে সে মন টেকাবে কেমন করে?
মন খারাপ করে বাসায় ফিরে এলো নওরিন। সারাটা বিকাল মুখ ভার করে বসে রইলো। শেষে বাবা ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে কান্নায় ভেঙে পড়লো- বাবা! বলো আমি কী করবো?
নওরিনের বাবা ধীর-স্থির প্রকৃতির মানুষ। অথচ মেয়ের কান্না বিচলিত করে তুললো তাকে। তারপর যখন কান্নার কারণটা জানতে পারলেন, তখন ঘর কাঁপানো হাসিতে ভেঙে পড়লেন তিনি।
নওরিনের এতোক্ষণ রাগ হচ্ছিলো বদলির কাগজটার ওপর- এখন রাগ হলো বাবার ওপর। নওরিন বললো, হাসছো কেনো বাবা? মেয়ের সমস্যা দেখে বাবার হাসি পায়-এমন বাবা আমি প্রথম দেখলাম।

নওরিনের কথা শুনে বাবা আবার হেসে উঠলেন। বাবা বললেন, তোর সমস্যা দেখে হাসি এলো কেনো জানিস? চাকরি জীবনের শুরুতে আমাকে যখন এমন একটা ছোট শহরে বদলি করা হয়েছিলো, আমিও তখন তোর মতো ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম কোর্ট-কাচারি ছেড়ে দিই। শেষে মা যখন সাহস দিয়ে সেখানে পাঠালেন, দেখলাম ভয় পাবার মতো কোনো জায়গাই নেই পৃথিবীতে। মানুষ এবং স্থানকে ভালোবাসলেই ওসব আপন হয়ে যায়।
: তার মানে তুমি আমাকে ইনডায়রেক্টলি মুন্সীগঞ্জ যেতে বলছো?
বাবা বললেন, ইনডায়রেক্টলি নয়-ডায়রেক্টলিই বলছি। সবাই যদি অমন ছোটখাটো শহরগুলোকে এড়াতে চায়, তাহলে ওরা তোর মতো সিনসিয়ার টিচার পাবে কোথায়?
: তাহলে আমাকে যেতে বলছো? অকৃত্রিম অসহায়ত্ব প্রকাশ পেলো নওরিনের কণ্ঠে।
বাবা বললেন, হ্যাঁ মা, তুই যাবি। কোনো সমস্যা হবে না। আর সমস্যা হলে আমি তো আছিই।

২.
সেই অখ্যাত স্কুলের অপরিচিত শিক্ষকরা নওরিনকে যখন পরিচিত জনের মতো আপন করে নিলো, মুহূর্তেই নওরিনের মন থেকে মুছে গেলো সব সংশয়। নওরিন হলো কারো বান্ধবী, কারো বোনঝি, কারো মেয়ের মতো আর কারো আপুমণি-এক দিনেই এক নওরিন হয়ে গেলো সবার।
সিক্সের ক্লাস টিচার করা হলো নওরিনকে। কো-এডুকেশন স্কুল। ছেলেমেয়ে মিলেমিশে এ স্কুলে পড়ে।
নতুন শিক্ষকরা অবশ্য প্রথম দিন পড়ালেখার কথা বলেন না ছাত্রদের সঙ্গে। নওরিনও বললো না। প্রথম নিজের পরিচয় দিলো। বললো, আমার নাম নওরিন। বিক্রমপুরের মেয়ে। তবে ঢাকায়ই জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তিন বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। এই প্রথম ঢাকা ছেড়ে বাইরে এলাম। তোমাদের দেখেই বোঝা যাচ্ছে তোমরা খুব লক্ষ্মী স্টুডেন্ট। আমি জানি আমাকেও তোমাদের ভালো লাগবে। আমি কি ঠিক বলেছি?
সঙ্গে সঙ্গে সারাটা ক্লাসরুম গমগম করে উঠলো- ঠিক বলেছো আপুমণি।
নওরিন জিজ্ঞেস করলো, তোমরা কি সব টিচারকেই তুমি করে বলো?
আবার ছাত্রছাত্রীরা এককণ্ঠে জবাব দিলো- না। শুধু তোমাকে।
নওরিন অভিভ‚ত হলো। মিষ্টি হেসে বললো, ঠিক আছে। স্কুল অথরিটির যদি আপত্তি না থাকে- আমারও আপত্তি নেই। এবার তোমাদের পরিচয় বলো। প্রথম বলবে মেয়েরা- তারপর ছেলেরা।
নওরিনের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে বললো, তা হবে না আপুমণি। সব সময় মেয়েরা সব সুযোগ আগে পায়। আজ পরিচয় আগে বলবো আমরা।

নওরিন বললো, না ভাই, আজ আমি যেমন বলেছি তেমনি হবে। প্রথম বলবে মেয়েরা- তারপর তোমরা। তবে আমি কথা দিচ্ছি, এরপর থেকে পড়া ধরবো ছেলেদের আগে, হোম টাস্ক না আনলেও ছেলেদের সাজা দেবো আগে। সব কিছুই মেয়েদের আগে করা হয়-এ অপবাদ ঘুচিয়ে দেবো। সমাধানটা তোমাদের মনের মতো হয়েছে তো?

সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা হ্যাঁ আর ছেলেরা না বলে চেঁচিয়ে উঠলো।
নওরিন বললো, দেখা যাচ্ছে তোমরা নিজ নিজ দাবিতে অটল। কিন্তু দু’পক্ষকে তো একসঙ্গে সুযোগ দেয়া যাবে না। তাতে হট্টগোল বেধে যাবে। আমি বরং একটা প্রশ্ন করি। ছেলে বা মেয়েদের মধ্যে যাদের জবাব সঠিক হবে তারা আগে বলবে।
এবার পিনপতন নীরবতা নেমে এলো ক্লাসরুমে। সবার চোখ স্থির হলো নওরিনের ওপর। নওরিন বললো, আমি তিনটি বিখ্যাত বইয়ের নাম বলবো। তোমরা বলবে মূল বইটি কোন ভাষায় লেখা এবং লেখকের নাম কী। দেশ কোথায় তা বলতে পারলে আমি আরো খুশি হবো। আমার প্রশ্ন হলো, লা মিজারেবল, দ্য সি উল্ফ এবং ওয়ার অ্যান্ড পিস বই তিনটি কোন্ কোন্ ভাষায় লেখা এবং কে লিখেছেন?
প্রশ্ন করার আগে থেকেই ক্লাসরুমে পিনপতন নীরবতা নেমে এসেছিলো। এবার সেই নীরবতা আরো গাঢ় হলো। নওরিন বিপুল আশা নিয়ে একবার তাকালো ছেলেদের দিকে, একবার মেয়েদের। কিন্তু কোনো পক্ষ থেকেই জবাব এলো না। আরো কিছুটা সময় কেটে যাওয়ার পর নওরিন বললো, বুঝেছি। প্রশ্নটা কঠিন হয়ে গেছে। আমি বলে দিচ্ছি। লা মিজারেবল লিখেছেন, ফরাসি লেখক ভিক্টর হুগো। দ্য সি উল্ফ ইংরেজি ভাষায় লেখা বই। লিখেছেন আমেরিকান লেখক জ্যাক লন্ডন। আর রাশিয়ান লেখক লিও টলস্টয় রুশ ভাষায় লিখেছেন ওয়ার অ্যান্ড পিস। আচ্ছা, অন্য প্রশ্ন করি। ‘ব্যথার দান’ আর ‘শেষের কবিতা’ নামে দুটো বই আছে। নাম শুনেছো?
এবার সমস্বরে ভেসে এলো- শুনেছি। আমাদের স্কুল লাইব্রেরিতে আছে। নজরুল ইসলাম আর রবীন্দ্রনাথের বই।
: গুড। বোঝা যাচ্ছে বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে তোমাদের কিছু জানা আছে। এবার বলো তো এ দুটো বইয়ের ভেতর কবিতার বই কোনটি?

মুচকি মুচকি হেসে নতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিলো নওরিন। ছেলেরা চুপ করে রইলো। একটি মেয়ে বললো, আমি বলবো আপুমণি?
নওরিন বললো, অবশ্যই বলবে। কোন্টা কবিতার বই, বলো।
মেয়েটি বললো ‘শেষের কবিতা’। আমি পড়িনি। তবে নাম দেখেই বুঝে গেছি।
সঙ্গে সঙ্গে একটি ছেলে বললো, আমরাও জানতাম শেষের কবিতা কবিতার বই। কিন্তু তোমাদের সুযোগ দেয়ার জন্য কিছু বলিনি।
নওরিনের খুব ভালো লাগলো সহজ-সরল ছেলেমেয়েগুলোর সহজ-সরল ঝগড়া। সঠিক জবাব কেউ দিতে পারেনি-এ কথাটা ওদের বলা দরকার। কিন্তু ইচ্ছে করেই বললো না নওরিন। শুধু বললো, শেষের কবিতা বইটা অবশ্যই পড়বে। ব্যথার দানও পড়বে। তাহলেই বুঝতে পারবে কি মজার জবাব দিয়েছো তোমরা। এবার শুরু হোক পরিচয়ের পালা। আমার ডান পাশে মেয়েরা বসেছে- বাঁ পাশে ছেলেরা। প্রথম ডান পাশ থেকে একজন তোমার পরিচয় বলো- তারপর বাঁ পাশ থেকে একজন। ঠিক আছে? আর কোনো সমস্যা নেই তো?
আবার একসঙ্গে একটা শব্দ হলো-  না।

৩.
প্রথম দিনেই সহকর্মী আর ছাত্র-ছাত্রীরা আপন করে নিলো নওরিনকে। আর নওরিন অবাক হয়ে উপলব্ধি করলো, বাবার কথাই ঠিক। ভয় পাবার মতো কোনো জায়গাই নেই পৃথিবীতে। আপন করে নিলে সব মানুষই আপন হয়ে যায়।

পরের দিন টিচার্স রুমে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলো নওরিন। এমন সময় স্কুল পিয়ন শফি এসে বললো, ম্যাডাম! অফিস রুমে আপনার ফোন এসেছে।
নওরিন বিব্রত বোধ করলো ফোনের কথা শুনে। অফিস রুম মানে হেড স্যারের রুম। সেখানে গিয়ে ফোন ধরতে হবে? এখানে আসতে না আসতেই ফোন এলো! কে না কে ফোন করেছে কে জানে? ভদ্রলোক কিছু না আবার মনে করে বসেন।
একরাশ সঙ্কোচ নিয়ে হেডস্যারের রুমে ঢুকলো নওরিন। হেড স্যার মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিলেন। নওরিন রুমে ঢুকতেই উঠে দাঁড়ালেন তিনি। বললেন, ফোন ধরার জন্য আপনাকে ডেকে আনাতে হলো, সরি। আমাদের অবশ্য আরেকটা ফোন এসে যাবে। ওটা টিচার্স রুমের জন্য। নিন, কথা বলুন। আমি ক্লাস রুমগুলো একটু ঘুরে আসি।
নওরিন রিসিভার তুলতেই ও পাশ থেকে ভেসে এলো বাবার কণ্ঠ- কেমন আছিস মা? তোর জন্য খুব চিন্তায় আছি।
বাবা ফোন করেছেন দেখে এক পলকে ঝরঝরে হয়ে গেলো নওরিনের মনটা। নওরিন বললো, আগে বলো তুমি কেমন আছো বাবা? ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়া করছো তো। আবুল চাচা আসছেন তো নিয়মিত? মকবুলকে বলে এসেছি সকাল-বিকাল দুধ দেয়ার জন্য। দুধ খাও তো বাবা?
বাবা বললেন, থাম। থাম তো মা থাম। আমাকে তোর প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে দে।
: দাও জবাব। ভালো আছো তো বাবা?
বাবা বললেন, হ্যাঁ, ভালো আছি। তবে তোর চিন্তায় মনটা কেমন কেমন করছে।
তোর নানা সমস্যা। সে সব কথা ভেবে।
: ওমা! আমার আবার কোন্ সমস্যা?
অবাক হয়ে জানতে চাইলো নওরিন। বাবা বললেন, একটা মফস্বল শহরের অখ্যাত স্কুলে পোস্টিং হলো। সহকর্মীরা কীভাবে নিচ্ছেন তোকে। স্টুডেন্টদের কন্ট্রোল করতে পারছিস কি-না- এমন হাজারো প্রশ দিশেহারা করে রাখে আমাকে। তবে মন খারাপ করিস না। আমি শিক্ষা সচিবের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন দু’এক মাসের মধ্যেই তোকে ঢাকা নিয়ে আসবেন।
নওরিন বললো, সর্বনাশ বাবা! এমন কাজ তুমি ভুলেও করো না।

: কেনো?
ওপাশ থেকে ভেসে এলো বাবার বিস্মিত কণ্ঠ। নওরিন বললো, কারণ আমি এখানেই থেকে যেতে চাই। তোমার সেই কথাটার সত্যতা আমি পেয়ে গেছি বাবা।
: কোন্ কথাটার?
: ওই যে সেই কথাটা- ভয় পাবার মতো কোনো জায়গাই নেই পৃথিবীতে। আপন করে নিলেই সব মানুষ আপন হয়ে যায়। এখানকার সবকিছু আমার আপন হয়ে গেছে বাবা। আমিও সবার আপন হয়ে গেছি।
বাবা বললেন, আপন তো হবিই। তুই যে আমার মেয়ে। যাক, খুব ভালো লাগছে তোর কথা শুনে।
নওরিন বললো, আমার আরো ভালো লাগবে তুমি যদি ভালো থাকো। আজ তবে রাখি বাবা। নিজের প্রতি যত্ন নিও।
ক্রেডলের ওপর রিসিভার রেখে এক বুক ভালো লাগা নিয়ে টিচার্স রুমের দিকে ফিরে চললো নওরিন।