ঝন্টু মন্টুর দাদি

আহসান হাবীব

-আমি মরলে বাহাত্তর ঘন্টা পর কবর দিবি
-কেন  দাদি?
-দিবি কিনা বল... আগে কথা দে
-আচ্ছা কথা দিলাম
-বাহাত্তর ঘন্টা পর কবর দিলেতো দাদি তোমার শরীরর থেকে পঁচা গন্ধ ছুটবে
-আহ ঝন্টু বাজে কথা বলবি না। ছোট ভাইকে বড় ভাই মন্টু ধমক লাগায়। ‘আচ্ছা দাদি কারণটা বলবে না? ’
-আছে কারণ আছে ...
-কি কারণ সেইটা খুলে বল না
-তোরা বুঝবি না
-বুঝবো বুঝবো... বুঝায়া বললেই বুঝবো
-তাইলে বলি শোন... আমার একটা সমস্যা আছে ... মৃত্যু ভয় আমার নাই, বয়স হইছে মরব, সেইটাই স্বাভাবিক
-দাদি তোমার বয়স কত হইল?
-তিরাশী পার করছি
-আহ ঝন্টু কথার মাঝে কথা বলিস... দাদি তুমি বল...মৃত্যু ভয় তোমার নাই তারপর?
-হ্যাঁ... যা বলছিলাম, মৃত্যু ভয় আমার নাই ... তবে একটা ভয় আমার আছে...
-সেটা কি?
-সেটা হচ্ছে। ধর আমি মরলাম তোরা কবর দিলি। মাটির নিচে চলে গেলাম। অন্ধকার কবর। হঠাৎ বাইচা উঠলাম তখন কি হবে? তাই বলছিলাম বাহাত্তর ঘন্টা পর যখন নিশ্চিত হবি আমি সত্যিই মরছি... তখন...

ছোট নাতী ঝন্টু হি হি করে হেসে উঠে। ‘মরলে কেউ আবার বেঁচে উঠে নাকি?’
-আহ ঝন্টু, কথার মাঝে ডিসটার্ব করবি নাতো... দাদি তোমার সমস্যাটা ধরতে পেরেছি। ইন্টারেস্টিং সমস্যা। আচ্ছা এক -কাজ করলে কেমন হয় দাদি ?
-কি কাজ?
-ধর আমরা বাড়ির পিছনে একটা মিথ্যা কবর খুড়লাম তোমার জন্য , সেখানে মাঝে মাঝে তুমি শুয়ে থাকলে, আমরা উপর দিয়ে কবরটা ঢেকে দিলাম...
-মানে?
-মানে... আগে থেকেই কবরে থাকার একটা প্র্যাকটিস... তাহলে কবরের অন্ধকারের ভয়টা কেটে যাবে তোমার । কবরের ভিতরে যদি বেঁচেও যাও তখন আর সমস্যা হবে না ।

দাদি মোসাম্মাত ফাতেমা বেগম বুঝতে পারলেন তার নাতি দুইটা আসলে তার সাথে ফাজলামো করছে। তার মনটা খারাপ হয়ে গেল। বুড়ো বয়সে এখন ঘরের এক কোনায় পড়ে থাকেন। কেউ খুব একটা খোঁজ খবর নেয় না। এই নাতি দুইটা মাঝে মধ্যে আসে। তাদের সাথে খোলামেলা কথা বলেন, কিন্তু আজ বুঝলেন এরা আসলে ফাজলামো করতে আসে। তিনি ধরতে পারেন না।
-কি দাদি আইডিয়াটা কেমন?
-ভাল
-কবর কি তাহলে খুড়বো ?

মোসাম্মাত ফাতেমা বেগম তার চশমার ফাক দিয়ে তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকান। বড় নাতিটার ঠোটে সুক্ষ্ম একটা হাসি। আর ছোটটা দাঁত বের করে আছে আগে থেকেই।
-তোমরা এখন যাও ... পরে কথা হবে। কাঁপা হাতে তিনি বালিশটা ঝাড়েন। বালিশের নীচ থেকে তজবিটা খুঁজে নিয়ে অভ্যস্থ হাতে টিপতে থাকেন... ।

... সেইদিনই মোসাম্মাত ফাতেমা বেগম মারা গেলেন ভোর চারটায়। সবাই টের পেল সকাল আটটায়। ফাতেমা বেগমের ছেলে  আদনান সাফি ঠিক বুঝলেন না তার কাঁদাটা উচিৎ হবে কিনা। তবে এটা ঠিক তার কান্না আসছিল না। এবং তিনি  আশ্চর্য হয়ে আবিস্কার করলেন কেউ কাঁদছে না তার মার জন্য। বড় দুই বোন আর এক ভাই বিদেশে থাকে। তাদের জানানো হল ফোন করে। বড় ভাই আর এক বোন কোনো রি-এ্যাকশন দেখালো না, আরেক বোন অবশ্য ফোঁপানের মত একটা শব্দ করলো বলে মনে হল... অবশ্য আদনান সাফির শুনতে ভুলও হতে পারে।

তবে বাসার সবাই খুব দ্রুতই  ব্যাস্ত হয়ে গেল তাকে কবর দেওয়ার জন্য। এক ফাকে স্ত্রীকে ডেকে আদনান সাফি বললেন  ছেলেদের স্কুল থেকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করো। মা মারা গেলেন...
- ওদের পরীক্ষা চলছে না... ফাইনাল পরীক্ষা !
-ও
 আদনান সাফি আর কথা খুঁজে পাননা। তিনিও অন্যদের সাথে ব্যস্ত হয়ে পরেন কবর দেয়ার যোগাড় যন্ত্র করতে।  

মন্টু আর ঝন্টু যখন ফিরে এলো বাসায়, তখন তাদের দাদির লাশ নিয়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি চলছে। বড় ছেলে মন্টু অবাক হল তবে ততটা রিএ্যাক্ট করল না,  কিন্তু ছোটটা ভেউ ভেউ করে কাঁদতে লাগল ‘দাদি দাদি’  বলে। আদনান সাফির বুকের ভিতর একটা কষ্ট এবার ঠেলে বের হয়ে আসতে চাইল। তিনি ফিস ফিস করে বললেন ‘মারে আমার মা... তোরে কত অবহেলা করছি...’ টপ টপ করে পানি পড়তে লাগলো তার চোখ দিয়ে। তিনি পকেটে হাত দিয়ে রুমাল খুঁজলেন । রুমাল নেই।
এই সময় বড় ছেলে মন্টু এল
-বাবা একটু কথা ছিল
-কি কথা?
-একটু এদিকে আস।
আড়ালে নিয়ে গিয়ে মন্টু যা বলল অবাক হলেন আদনান সাফি।
-দাদিকে বাহাত্তর ঘন্টা পর কবর দিলে হয় না?
-মানে?
-না মানে কাল দাদি সেরকমই বলছিলেন... তার নাকি একটা ভয় হয় কবরের ভিতর যদি তিনি বেঁচে উঠেন। সেজন্য বাহাত্তর ঘন্টা পর ...
-তোমার দাদি মারা গেছেন, ডাক্তার ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে গেছেন।
-ও। বড় ছেলে চুপ করে যায়।

মোসাম্মাত ফাতেমা বেগম মারা গেলেন ভোর চারটায়। আর দুপুর তিনটার ভিতর তাকে কবর দিয়ে ফিরে এলেন সবাই। একটা জলজ্যান্ত মানুষ নাই হয়ে গেল। আদনান সাফি ফিরে এসে দেখেন মায়ের ঘরটা ঝাড়পোছ করা হচ্ছে। আগেই কথা ছিল এই ঘরটা খালি হলে ছোট ছেলে ঝন্টুকে দেয়া হবে। কারণ ঝন্টু বড় হয়েছে তার একটা আলাদা রুম দরকার। এতদিন দুই ভাই এক সাথে ছিল এখন... মন্টুর রুমে মন্টু একা থাকবে আর মার রুমে ঝন্টু ।
আদনান সাফি বারান্দায় এসে বসলেন।
-চা খাবে? স্ত্রী শোভা নরম গলায় বলে 
-না
-শুয়ে একটু বিশ্রাম নাও।
কথা বলেন না আদনান সাফি। তার স্ত্রী কি তার মার প্রতি আরেকটু সদয় হতে পারত না? তিনি বূঝতেন তার স্ত্রী বৃদ্ধা শাশুরীকে অতটা পছন্দ করতেন না। অবশ্যই তাকেই বা দোষ দিয়ে কি হবে সেতো বাইরের মেয়ে । তিনি নিজেই কি মাকে সেভাবে দেখভাল করেছেন? না। আদনান সাফি পকেটে হাত দিয়ে রুমাল খুঁজেন। 

রাত দেড়টার দিকে আদনান সাফি ধরমর করে উঠে বসেন।
-কি হল তোমার?
-একটু কবরস্থানে যাব
-কেন?
-মা মরেন নি বেঁচে আছেন...
-কি বলছ?
-ঠিকই বলছি মার ডাক শুনলাম... স্পষ্ট...
আদনান সাফি সবাইকে অবাক করে দিয়ে গাড়ির চাবি নিয়ে ছুটলেন একাই । রাত তখন দেড়টার বেশি বাজে। হতভম্ব স্ত্রী দাড়িয়ে রইলেন দরজা ধরে তিনি কি করবেন বুঝতে পাছেন না। এই পাগলামোর মানে কি। বাইরে ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি হচ্ছে।

কবরস্থানের গেট খোলাই ছিল। আদনান সাফিকে উদভ্রান্তের মত ঢুকতে দেখে একজন কবর খোদক তার সঙ্গ নিল
-স্যার কি হইছে?
-তোমরা কেউ একজন আস আমার সাথে । আমার মা বেঁচে আছেন।

মায়ের কবরটির সামনে এসে তিনি নিজেই কোদাল নিয়ে পাগলের মত মাটি সরাতে লাগলেন। নরম মাটি সদ্য কবর দেয়া হয়েছে, দ্রুত মাটি সরে বাঁশ চাটাই বের হয়ে গেল... নিজ হাতেই দ্রুত সরালেন তিনি। কবর খোদক তরুনটিও হাত লাগাল বাঁশ চাটাই সরাতে। আরে একি কবরের ভিতর সত্যি সত্যি মা বেঁচে আছেন!  মা বসে আছেন কবরের কোনায় জড়োসরো হয়ে।

-মা?
-বাবা তুই আসছিস? আমাকে উঠা...
-মা মারে, মা... আমার হাত ধর। প্রচন্ড কষ্টে আদনান সাফির চোখে পানি এস যায়।  
-তুই নিচে নেমে আমারে উঠা বাবা ... আমার উঠার শক্তি নাই। এখানে অনেক পানি জমে গেছে দেখ।

সত্যিই তাই বৃষ্টির পানি চুইয়ে চুইয়ে জমেছে । লাফ দিয়ে নামলেন আদনান সাফি কবরের ভিতর । পাজাকলে করে মাকে কোলে তুলে নিলেন। মা একটা হাত দিয়ে শিশুর মত গলা জরিয়ে ধরলেন আদনানের। বৃষ্টিতে চুল ভিজে গেছে মায়ের। কাফনের কাপড়টাও ভেজা। মা অল্প অল্প কাপছেন।


-এই যে ভাই আমার একটা হাত ধরেন  মাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে কবর থেকে উঠার জন্য একটা হাত বাড়িয়ে দিলেন কবর খোদক লোকটার দিকে ।
লোকটাও এগিয়ে এল হাত ধরতে।   
    
গেটে গাড়ির শব্দ শুনে শোভা ঝন্টু ,মন্টু ছুটে গেল নিচে।  বাবা এসেছেন।  তারা অবাক হয়ে দেখল বাবা হাপাতে হাপাতে সিড়ি দিয়ে উঠে আসছেন। দু হাতে অদৃশ্য কিছু একটা ধরে আছেন তিনি। সারা গায়ে কাঁদা-পানি মাখা। হাসি মুখে বলে উঠলেন
-দেখ দেখ মাকে নিয়ে এসেছি,  মা বেঁচে আছেন। জলদি একটা শুকনো কাপড় টাপড় কিছু দাও... জলদি করো...