রাজার ঈগল পাখি (কম্বোডিয়ার লোককাহিনী)

অনুবাদ: মৃত্যুঞ্জয় রায়

অনেককাল আগের কথা। কম্বোডিয়ায় ছিলো এক রাজা। তার নাম ছিলো ইশো। রাজার ছিলো অদ্ভুত ক্ষমতা। সে পশুপাখিদের কথা বুঝতে পারতো আর সেও পশুপাখিদের ভাষায় কথা বলতে পারতো। রাজার ছিলো একটা পোষা ঈগল পাখি। ঈগল পাখিটা দেখতে ছিলো খুব সন্দর। রাজা সে ঈগল পাখিকে খুব আদর করতো। তার সব কথাই রাজা বিশ্বাস করতো। বিশেষ করে ঈগল যেসব স্বপ্ন দেখতো, রাজা মনে করতো সেগুলো সব সত্যি হবে। রাজার বিশ্বাস, ঈগল কখনো মিথ্যে স্বপ্ন দেখেনা। ঈগলকে রাজা এতটাই ভালবাসতো যে তার সব কথাই সে শুনতো, কখনো তার কোনো কথা ফেলতো না। আর ওদিকে ঈগলও সে সুযোগ নিয়ে রাজার কাছে নিত্য নতুন আব্দার নিয়ে হাজির হতো, তার সব ইচ্ছেকে নির্লজ্জের মতো একের পর এক পূরণ করতো। ঈগল যখন ক্ষুধার্ত হতো সে এসে তখন হয়তো রাজাকে কুর্নিশ করে বলতো, ‘রাজাসাহেব, রাজাসাহেব, আমি না কালরাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি।’

‘কি স্বপ্ন?’ রাজা তখন ঈগলকে প্রশ্ন করতো।
‘দেখলাম আমি একটা নাদুস নুদুস সুন্দর মোষ দিয়ে আমার রাতের ভোজ সারছি।’ অথবা বলতো, ‘আমি একটা বেয়াদব বানরকে দুপুরের ভোজে ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছি।’

রাজা ভাবতো, ঈগলের স্বপ্ন তো মিথ্যে হতে পারে না, সে তো ওদের খাবেই। তাই সে তার রাজ্যের পশুদের হুকুম দিয়ে দিতো, ‘তোমাদের মধ্যে যে মোষটা সবচেয়ে নাদুস নুদুস আর সুন্দর সে মোষটা যেন রাতে সবচেয়ে উঁচু যে পাহাড় তার চূড়ায় উঠে বসে থাকে। তাতে ঈগলের খেতে কষ্ট একটু কম হবে।’ অথবা হয়তো রাজা বলতো, ‘শোনো বানরের দল। তোমাদের মধ্যে নিশ্চয়ই কেউ বাঁদরামিতে সেরা। তাকে খুঁজে বের করো। কাল দুপুরে তাকে সবচেয়ে উঁচু গাছটার ডালে উঠতে বলো। কাল দুপুরে আমার ঈগল পাখি ওকে খাবে।’

কি আর করা! রাজার হুকুম। হুকুম পেয়েই সুন্দর মোষটা চলে যেতো পাহাড় চূড়ায় আর বানরটা চলে যেতো উঁচু গাছের মগডালে। ঈগল মজা করে তার রাত আর দুপুরের ভোজ সারতো মোষ আর বানর খেয়ে।


বনের সব পশুরা তাই সব সময় ভয়ে ভইে থাকতো, কার কখন হুকুম আসে। ঈগলের ইচ্ছের ছুরিতে কে কখন জবাই হবে সব সময় তারা সে আতংকেই থাকতো। ঈগলকে তাই ওরা ঘৃণা করতো। কিন্তু রাজার ভয়ে কেউ কিচ্ছু বলতো না, প্রতিবাদও করতো না। কারণ না জানি কখন রাজা রেগে গিয়ে শেষে সব পশুদেরই মেরে ফেলে!

একদিন ঈগল ভাবলো, একটা সাদা হাতি খেলে কেমন হয়? যথা ভাবা তথা কাজ। সে রাজার কাছে গিয়ে সিংহাসনের হাতলে বসে নত হয়ে তাকে কুর্নিশ করলো, বললো, ‘রাজাসাহেব, কাল রাতে আমি এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি। আমি দেখলাম, আমি একটা সাদা হাতি খাচ্ছি। দূর, কি বোকা আমি, আচ্ছা রাজা সাহেব, আপনিই বলুন, হাতি কখনো সাদা হয়? হাতিরা তো সব দেখতে বিচ্ছিরি কালো।’ এই বলে সে হাসতে লাগলো।

রাজা বললো, ‘কিন্তু ঈগল, তোমার স্বপ্ন তো কখনো মিথ্যে হতে পারেনা। তুমি হয়তো দেখোনি, কিন্তু উত্তরের বনে ওই হ্রদের ধারে কয়েক পাল সাদা হাতি সত্যিই আছে। ঠিক আছে আমি ওদের হুকুম দিয়ে দিচ্ছি। কালই তুমি সাদা হাতি খেতে পারবে।’
এই বলে রাজা দ্রুত তার একদল সৈন্যকে পাঠিয়ে দিলো উত্তরের জঙ্গলে। সৈন্যরা সেখানে গিয়ে দেখে, একটা মা সাদা হাতি তার বাচ্চাকে নিয়ে হ্রদের নীল জলে গা পরিস্কার করছে। সৈন্যরা সেই মা হাতিকে রাজার হুকুম জানিয়ে দিলো, ‘সাদা হাতি শোনো। কাল দুপুরে তুমি তোমার শিশুকে নিয়ে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টায় থাকবে। রাজার ঈগল পাখি স্বপ্ন দেখেছে যে সে একটা সাদা হাতি খাচ্ছে। রাজার ঈগল পাখির স্বপ্ন কখনো মিথ্যে হয়না। সে তোমাদের খাবেই। তাই তোমরা তৈরি থেকো।’

সৈন্যরা চলে যেতেই সাদা হাতি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো, ‘হায় হায়, আমাকে খেয়ে ফেললে তো আমি মরে যাবো। কি হবে আমার বাচ্চাটার। কে দেখবে ওকে?’

সাদা হাতির মরতে খুব ভয়। তাই হ্রদের জলে দাঁড়িয়ে সে কান্না জুড়ে দিলো। হ্রদের পাড়ে ছিলো একটা সুপারি গাছ। সুপারি গাছের মাথায় একটা পেঁচা বসেছিলো। পেঁচা সাদা হাতিকে ওভাবে চিৎকার করে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞেস করলো, ‘সাদা হাতি, তোমরা ওভাবে কাঁদছো কেন? কি হয়েছে তোমাদের?’

সাদা হাতি পেঁচাকে দেখে আরও জোরে কেঁদে উঠলো, কাঁদতে কাঁদতে সব ঘটনা খুলে বললো। শুনে পেঁচা বললো, ‘ওহ্, কি দুঃখের কথা। রাজা ইশো কেন এ রকম নির্বোধ বুঝি না। একটা আহাম্মক ঈগলের কথা সব সময় বিশ্বাস করে আর পশুদের প্রাণ নেয়।’

সাদা হাতি আবার কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘পেঁচা, আমি আর কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না যে আমাদের সাহায্য করতে পারে। দয়া করে আমাদের তুমি বাঁচাও। আমরা সারা জীবন তোমার গোলাম হয়ে থাকবো, জীবন দিয়ে তোমার সেবা করবো।’

‘ঠিক বলছো তো?’

‘একদম ঠিক পেঁচা। আমাদের তুমি বিশ্বাস করতে পারো।’
‘ঠিক আছে। তাহলে আজ থেকে তোমরা আমার চাকর হয়ে গেলে। দেখি তোমাদের জন্য কি করতে পারি। আমি চললাম  তোমাদের জীবন বাঁচাতে রাজার কাছে।’ এই বলে পেঁচা সুপারি গাছ থেকে নেমে এলো।

সাদা হাতি তার পিঠে বসিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে চললো রাজার কাছে। হ্রদ পেরিয়ে পাহাড় ডিঙিয়ে তারা পৌঁছলো রাজবাড়িতে। সেখানে পৌঁছেই পেঁচা সাদা হাতির পিঠ থেকে উড়াল দিয়ে ঢুকে গেলো রাজবাড়ির ভিতরে। একেবারে উড়ে গিয়ে বসলো রাজার সিংহাসনের পাশে, রাজার মুকুটের কাছাকছি। রাজাকে কুর্নিশ করে বললো, ‘মহানুভব রাজার জয় হোক। রাজাসাহেব হোক এই পৃথিবীর অধিশ্বর।’ এভাবে রাজার গুণকীর্তনে মেতে উঠলো পেঁচা। রাজা তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, ‘আহা কি বলবে তাই বলো।’
এরপর পেঁচা তার আসল কথা শুরু করলো, ‘সাদা হাতি আর তার বচ্চাটা আমার চাকর। কেন তাদের মরার হুকুম দিয়েছেন রাজাসাহেব? কি হয়েছে আপনার সাথে?’

‘ওহ্, এই কথা? শোনো পেঁচা। আমার ঈগল পাখি কাল রাতে স্বপ্ন দেখেছে যে সে একটা সাদা হাতি ভোজন করছে। আমার ঈগলের স্বপ্ন কখনো মিথ্যে হতে পারে না। তাই তোমার চাকরদের অবশ্যই মরতে হবে, আমার ঈগল যাতে ওদের খেতে পারে সেজন্য ওদের আমি পাহাড়ে থাকতে বলেছি।’এ কথা শুনে পেঁচা খুব দুঃখ পেলো, সে তার ডানা ছড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙ্গে বললো, ‘রাজামশাই, আপনি কি আপনার ঈগলের স্বপ্ন বিশ্বাস করেন? আপনি কি নিশ্চিত যে ঈগলের স্বপ্ন সব সময় সত্যি হয়?’

‘পেঁচা!’ পেঁচার এসব প্যাঁচাল শুনে খুব রেগে গেলো রাজা, বললো, ‘তুমি জানো তুমি কি বলছো? যখনই ঈগল কোনো স্বপ্ন দেখে আমি তা অবশ্যই বিশ্বাস করি আর আমি নিশ্চিত যে তা অবশ্যই সত্যি হবে।’

‘ওহ্, অবশ্যই, অবশ্যই রাজা। আপনার কথাই ঠিক। আমি কি কখনো আপনার কথা অমান্য করতে পারি? না আপনার সাথে কোনো তর্ক করতে পারি? এখন আমি সত্যিই বুঝতে পারলাম কেন আমার চাকর সাদা হাতি আজ অবশ্যই মরবে।’ এ কথা বলে পেঁচা খানিক্ষণ চুপ করে রইলো। সে এবার এমন ভান করলো যে তার খুব ঘুম পাচ্ছে। সে একটা হাই তুলে বললো, ‘রাজাসাহেব, আমি সত্যিই দুঃখিত। আমাকে ক্ষমা করুন। ওহ্, কাল সারারাত ধরে আমি খুব কাঁকড়া আর ইঁদুর ধরে বেড়িয়েছি। রাতে একটুও ঘুমুতে পারিনি। এখন খুব ক্লান্ত লাগছে, বড্ড ঘুম পাচ্ছে। দয়া করে আমাকে দুদণ্ড ঘুমুতে দিন। এরপরই আমি আমার সাদা হাতিদের নিয়ে চলে যাব। ওদের রেখে যাবো পাহাড়ের কোলে। আর আপনাকে বিরক্ত করবো না রাজাসাহেব।’ এই বলে পেঁচা ঘুমিয়ে পড়লো। না, না, আসলে সে ঘুমের ভান করলো। মাথা কাৎ করে ঘাড়ের উপর রেখে চোখ বন্ধ করলো।

কিছক্ষণ এভাবে ঘুমিয়ে থাকার পর হঠাৎ সে জেগে উঠলো। আস্তে আস্তে ডানা ছড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙ্গতে লাগলো। তির তির করে পালক কাঁপলো আর তার মুখের এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত একটা সুখের হাসি খেলে গেলো। রাজা জিজ্ঞেস করলো, ‘হাসছো কেনো পেঁচা? কি হয়েছে তোমার? এত খুশি খুশি লাগছে কেনো তোমাকে?’

‘রাজাসাহেব, ঘুমের ভেতর এই মাত্র আমি একটা মধুর স্বপ্ন দেখেছি। নিশ্চয়ই এই স্বপ্ন আমার জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে।’এ কথা শুনে রাজা কৌতুহলী হয়ে উঠলো। জিজ্ঞেস করলো, ‘কি এমন স্বপ্ন তুমি দেখলে, বলো বলো, শিগগিরই বলো আমাকে।’
‘না, না, রাজাসাহেব। আমার স্বপ্নটা এতোই মধুর যে সে স্বপ্নের কথা আপনাকে বলা যাবেনা। না, না রাজাসাহেব আমি সে কথা আপনাকে বলতে পারবো না।’

রাজা  পেঁচার কথা শুনে রেগে গেলো, বললো, ‘ঢং কোরোনা। কাছে এসো। বলো, আমাকে তোমার মধুর স্বপ্নের কথা, কানে কানে বলো।’

পেঁচা কিছুক্ষণ ইতস্তত করলো, তারপর রাজার খুব কাছে এসে বলতে শুরু করলো, ‘রাজাসাহেব, আমি স্বপ্ন দেখলাম, আপনার স্ত্রী উমা আমাকে খুব ভালবাসছে, এতটাই ভালবাসছে যে খুব শিগ্গিরই আমরা বিয়ে করতে যাচ্ছি। আমি আমার স্বপ্নর কথা খুব বিশ্বাস করি। আমার জীবনে কোনো স্বপ্ন কখনো মিথ্যে হয়নি। সুতরাং রাজাসাহেব এক্ষুণি আপনি আপনার স্ত্রী উমাকে ডাকুন। আমরা একে অপরকে বিয়ে করবো।’

রাজা পেঁচার এরূপ স্বপ্নের কথা শুনে যারপর নাই রেগে গেলো, ‘নির্বোধ। আমি কখনো বিশ্বাস করিনা যে তোমার স্বপ্ন কখনো সত্যি হবে। তুমি একটা আস্ত গাধা ছাড়া আর কিছুই না। বোকা কোথাকার!’

পেঁচা রাজার কথায় না রেগে ধীরে ধীরে ধৈর্য্যরে সাথে জবাব দিতে লাগলো, ‘মহানুভব রাজা, রাজ্যের প্রতিপালক। আপনি বলছেন যে আপনি আমার স্বপ্নের  কথা বিশ্বাস করেন না, আমার স্বপ্ন কখনো সত্যি হতে পারে না। তাহলে আপনার ঈগলের স্বপ্ন? কেন বিশ্বাস করছেন যে তার স্বপ্ন সত্যি হবে? আপনি রাজা। সবার জন্যই আপনার বিচার সমান হওয়া উচিত। কারণ ঈগল আর আমি উভয়ই পাখি। আমাদের দুজনের জন্য দুরকম বিচার কেন হবে?’
পেঁচার কথা শুনে রাজা মহাফাঁপড়ে পড়ে গেলো। গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলো, পেঁচার কথায়  যুক্তি আছে। সুতরাং সে আর কোনো যুক্তি দিয়ে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করলো না। বললো, ‘ঠিক আছে পেঁচা, এখন তুমি তোমার চাকর সাদা হাতিদের নিয়ে যেতে পারো। ওদের আমি ক্ষমা করে দিলাম।’এ কথা শুনে পেঁচা খুবই আনন্দিত হলো, নতজানু হয়ে রাজাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললো, ‘বিদায়, রাজাসাহেব। বিদায়। অন্ধভাবে যেন আর কাউকে কখনো বিশ্বাস না করেন, তাতে অনেক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।’ রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে পেঁচা মা-সাদা হাতি ও তার বাচ্চাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে চললো।