কুলরাজা কুলরাণী

শাশ্বত ভট্টাচার্য

এক গ্রামে পাশাপাশি দুটো কুল গাছ। এক গাছে বাস করে কুলরাজা আরেক গাছে বাস করে কুলরাণী। কিন্তু দুজনের কোনও দিন দেখাও হয়নি কথাও হয়নি। কুলরাজা জানে না যে পাশের গাছে কুলারাণী থাকে আর কুলরাণীও জানে না যে পাশের গাছে কুলরাজা থাকে। দিন যায় রাত যায়, আস্তে আস্তে দুই গাছে কুলারাজা কুলরাণী একটু একটু করে বড় হতে থাকে। একটু একটু করে রং ধরে। একটু একটু করে পেকে দুজনেই টুসটুসে হয়ে যায়। এদিকে চৈত্রমাসের এলোমেলো বাতাস ওঠে। ধুলো ওঠে। বাতাস সব গাছের ডালপালা এলোমেলো করে পাগল পাগল করে দেয়। সকাল থেকে সারাদিন সারারাত বাতাস বইতে থাকে। শেষরাতের এক দমকা বাতাসে কুলরাজা ও কুলরাণী দুজনেই বোঁটা থেকে খসে পড়ে এবং বাতাসের জোড় ধাক্কায় এক অন্যের কাছে চলে আসে। তখন ভোর ভোর ভাব। আলো ফুটি ফুটি করছে। বাতাসের পাগলামো কমে গেছে। বাতাস বইছে ঝির ঝির করে। প্রথমে ধুলোয় ঢাকা চোখ নিয়ে কুলরাজা অল্প আলোয়, অল্প অন্ধকারে তারই গা ঘেঁসে পড়ে থাকে কুলরাণীকে পিটপিট করে দেখে। এদিকে কুলরাণীও দেখে অল্প আলোয় অল্প অন্ধকারে তারই গা ঘেঁসে কে যেন পড়ে আছে। দুজন দুজনকে পিটপিট করে দেখে আর দুজনেই ভাবে কে রে আমার পাশে!

আলো ক্রমে বাড়ে। সোনা সোনা আলো, মিঠে মিঠে আলো। আলোয় আলোয় ভরে যায় চারদিক। ঝিরঝিরে বাতাসে গাছের পাতারা নাচতে থকে। পাখিরা গান ধরে। চারিদিকে একটা আনন্দ আনন্দ ভাব। এই আনন্দ আনন্দ ভাবের মাঝে কুলরাজা তার পাশের জনকে জিজ্ঞেস করে-
তুমি কে গো?
পাশে পড়ে থাকা কুলরাণী চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, নাচিয়ে নাচিয়ে বলে আমারও তো সেই কথা তুমি কে গো?
কুলরাজা বলে-
আমি কুলরাজা।
-সত্যি! আমি কুলরাণী। কুলরাণী বলে।
তারা একে অন্যকে বিস্ময়ভরা চোখে দেখে। তখন বাতাসে নাচন লাগে। পাখিরা আনন্দে আরও জোরে গান গেয়ে ওঠে। ফুলের গন্ধে চারিদিক ম ম করে।
কুলরাজা বলে-
সত্যি তুমি কুলরাণী?
কুলরাণী বলে-
হ্যাঁ, সত্যি আমি কুলরাণী।
কুলরাণী বলে-
সত্যি তুমি কুলরাজা?
হ্যাঁ, সত্যি আমি কুলরাজা।

দুইজন জন্মেছে দুইগাছে। আজ দু’জনের দেখা হল। প্রথমে আনন্দের সাগরে ভেসে তারা দুজন কাঁদলো। তারপর আনন্দে হাসলো। তারপর কতো কথা, কতো কথা। কথা যেন আর শেষ হতে চায় না। তারপর দুজনে ঠিক করল তারা দেশ ভ্রমণে বের হবে। নানা দেশ দেখবে। মনের আনন্দে গান গেয়ে গেয়ে, নেচে নেচে ঘুরবে দেশ থেকে দেশে।
কিন্তু তারা যাবে কীভাবে? তাদের তো হাত নেই, পা নেই, পাখা নেই। কী হবে তাহলে? তাদের খুব দুঃখ হল। এই দুঃখে কুলরাজা আর কুলরাণী আবার কাঁদতে লাগলো।
এদিকে কুলরাজার আর কুলরাণীর সবকথাই শুনছিল একটা ফুটফুটে দোয়েল পাখি। তাদের দুঃখ দেখে দোয়েলটারও খুব দুঃখ হল। সত্যি তো কতদিন পর এদের দুজনের দেখা। কোথায় তারা মনের আনন্দে নাচতে নাচতে, গাইতে গাইতে ঘুরবে তা না বেচারা দুজন হাতের অভাবে, পায়ের অভাবে, পাখার অভাবে কোথাও যেতে পারছে না। সত্যি তো কী কষ্ট কী কষ্ট! এই কথা ভেবে দোয়েলেরও চোখে জল আসে। ভাবে আমার যদি ক্ষমতা থাকতো তবে এখনই কুলরাজা আর কুলরাণীর হাত পা পাখা বানিয়ে দিয়ে তাদের মনের আশা পূর্ণ করতাম। কিন্তু সে ক্ষমতা তো আর দোয়েলের নেই। তাই বেচারা দোয়েল ওদের পাশে গিয়ে খানিক কেঁদে নেয়। তারপর পাখনা দিয়ে চোখের জল মুছে উড়তে উড়তে চলে যায় বিলের ধারে হিজল গাছে তার ছোট্ট বাসাটায়।
দোয়েলের মন আজ ভালো নেই। সে কোথাও যায় না। কিছু খায় না। শুধু ভাবে তার যদি ক্ষমতা থাকতো তবে হাত বানিয়ে, পাখা বানিয়ে, পা বানিয়ে কুলরাজা কুলরাণীকে দেশদেশান্তরে ঘুরতে পাঠিয়ে দিত। এদিকে দিন গড়িয়ে বিকেল হয় বিকেল গড়িয়ে রাত হয়। বেচারা দোয়েল শুধু কুলরাজা আর কুলরাণীর কথাই ভাবে। কিন্তু কোন কুলকিনারা করতে পারে না।

ঐ হিজল গাছে বাস করতো এক দয়ালু ভূত। সে সবার উপকার করে। কিন্তু কখনোই বুঝতে দেয় না যে সে কারো উপকার করছে। নিঃশব্দে চুপিচুপি সে যে কতজনের উপকার করেছে তার ইয়ত্তা নেই। এই তো সেদিন ঝড়ে পড়ে আমগাছের বুড়ো শালিকটার পা মচকে গেল, দয়ালু ভূত কী একটা করে সেই মচকানো পা সারিয়ে দিল। আবার কিছুদিন আগে মাছরাঙ্গার একটা পুচকে ছানা মাছ ধরার কায়দা দেখাতে গিয়ে জলে ডুবে মরেই যাচ্ছিল প্রায়, সেটাকে জল থেকে কী একটা করে তুলে আবার তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিল। এই ভাবে কী একটা করে নানা উপকার সে সবার অগোচরেই প্রতিদিনই করে চলেছে। সেই দয়ালু ভূত হিজল গাছের ডালে বসে রাতের অন্ধকারে দোয়েলের দুঃখ দেখলো। দোয়েলের মনের কথা শুনতে পেল। ভূত বলেই সে মনের কথা শুনতে পেল। দোয়েলের দুঃখে তারও চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। দয়ালু ভূত ভাবলো যেমন করেই হোক কুলরাজা আর কুলরাণীর হাত পা পাখা গজিয়ে দিতে হবে। তারা যেন মনের আনন্দে নেচে নেচে গেয়ে গেয়ে দেশে দেশে ঘুরতে পারে।

এইসব ভাবতে ভাবতে দয়ালু ভূত গেল সেই কুল গাছের তলে যেখানে পাশাপাশি বসে আছে কুলরাজা আর কুলরাণী। গিয়ে দেখল সত্যি কুলরাজা আর কুলরাণী সারাদিন কান্নাকাটি করে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখনো তাদের চোখে জল লেগে আছে। ঘোর ঘোর অন্ধকার। দয়ালু ভূত তাদের পাশে বসলো। অদৃশ্য হাত দিয়ে তাদের চোখের জল মুছিয়ে দিল। তারপর কী একটা করল। আর মনে মনে বললো আজ রাত ঘুমিয়ে কাটাও কাল সকালেই দেখবে তোমাদের হাত পা পাখা গজিয়ে গেছে। তখন তোমরা মনের আনন্দে দুজন দুজনের হাত ধরে নাচতে পারবে গাইতে পারবে আর দেশে দেশান্তরে ঘুরতে পারবে।

সকাল হল। ঝিরঝির বাতাস বইছে। ফুলের গন্ধে চারদিক ম ম করছে। পাখিরা গান গাইছে।
দোয়েলের সারারাত ঘুম হয়নি। ক্লান্ত দোয়েল ধীরে ধীরে উড়েছে আর ভাবছে এখনও নিশ্চয় কুলরাজা আর কুলরাণী মনের দুঃখ কাঁদছে।
কিন্তু কাছে গিয়ে দেখে এ কী কুলরাজা আর কুলরাণ হাত ধরাধরি করে মনের আনন্দে গান গাইছে আর নাচছে। তাদের কী সুন্দর হাত কী সুন্দর পা কী সুন্দর পাখা! কী করে হল? দোয়েল বিস্ময়ে হতবাক। সেও মনের আনন্দে কুলরাজা আর কুলরাণীকে ঘিরে একটু নেচে নিল, একটু শিষ দিয়ে নিল।

কুলরাজা আর কুলরাণী নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে রওনা দিল দেশ ভ্রমণে।

অদৃশ্য শরীরে ভাসতে ভাসতে উপর থেকে দেখতে লাগলো দয়ালু ভূত। তার মনে খুব আনন্দ হলো। আনন্দে চোখে জল চলে এল। সেই জল এক ফোঁটা গড়িয়ে পড়লো নিচে আনন্দে হতবাক হয়ে যাওয়া দোয়েল পাখিটির গায়ে। কোথা থেকে জল পড়লো? দোয়েল তাকালো আকাশের দিকে। কাউকেই দেখতে পেল না।