শামন্তীর শীতবেলা

মৃত্যুঞ্জয় রায়

শীতের সকালটা ভারী মিষ্টি লাগছে শামন্তীর। চিলচিলে শীত, ফিনফিনে কুয়াশা, শিরশিরে শিশির। ধানকাটা হয়ে গেছে অনেক আগেই। বিলের ন্যাড়া মাঠটা শুয়ে আছে কুয়াশার কাঁথা গায়ে। বিলের কোল ধরে শত শত খেজুর গাছ। কুয়াশা আর শিশির মেখে গাছগুলো আবছা ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। সব দৃশ্য যেন ঘোলাটে ঘোলাটে। খেজুর গাছগুলোর পিছন থেকে লাল আভা ছড়িয়ে সূর্য উঠছে, লাল বলের মতো সূর্য। কি সুন্দর! রোদের আঁচ লাগতেই একটু ওম ওম লাগছে শামন্তীর। চাদরের উপর দিয়ে শীত-রোদ পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। কি মিষ্টি একটা সকাল। ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় একটা বাঁশের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে শীতের একটা মিষ্টি সকাল দেখছে ও। শামন্তী জীবনেও কখনো ঢাকায় এমন একটা শীতের সকাল দেখেনি। গ্রামে তো ওর কখনো যাওয়াই হয়নি। তাই গ্রাম জায়গাটা যে কি রকম সেটা শামন্তী বোঝেই না। সাত বছরের শামন্তী অবাক হয়ে শীত সকালের সূর্য ওঠা দেখছে।

শামন্তীকে ওভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওর মামাতো বোন সৌমি ছুটে এলো, বললো,
‘আগুন পোহাতি যাবি?’
‘ওটা আবার কী?’ শামন্তী অবাক হয়ে ওকে জিজ্ঞেস করলো।
সৌমি শামন্তীকে একরকম টেনেই নিয়ে গেলো বাড়ির পিছনে। লাউক্ষেতের পাশে একটা ফাঁকা জায়গায় আগুন জ্বলছে। সেই আগুনকে ঘিরে কতকগুলো ছেলেমেয়ে হাঁটু ভেঙে বসে আছে। অনি, অন্তু, পাপ্পু, রিনাও আছে ওদের সাথে। শামন্তীকে নিয়ে সৌমি রিনার পাশে গিয়ে বসলো। ওদের দেখাদেখি শামন্তীও ভয়ে ভয়ে আগুনের দিকে দুহাত বাড়িয়ে দিলো। বাঃ, ভারি আরাম তো! চাদরেও এতক্ষণ পৌষের শীত মানছিলো না। এখন বেশ গরম গরম লাগছে। ভাবলো, ঢাকায় ফিরে ওদের ফ্ল্যাটের ছাদে এবার এপার্টমেন্টের সব বন্ধুদের নিয়ে আগুন পোহানোর মজা করবে। কেউ টের পাবে না, অতো সকালে কেউ ওঠে নাকি?

ধীরে ধীরে কুয়াশা মরে আসছে, শীত কমছে, রোদ বাড়ছে। আগুনটাও নিভে আসছে। তাই আগুন পোহানোয় ভাটা পড়লো। এমন সময় লাউ ক্ষেতের ওপাশের রাস্তা দিয়ে একজন বুড়ো লোককে আসতে দেখে সবাই রসবুড়া আইছে, রসবুড়া আইছে বলে আগুন ফেলে ওদিকে দিলো ছুট।

রসবুড়ো রসবুড়ো,
শীতে জড়োসড়ো
রসের হাঁড়ি কান্ধে নিয়ে
হুদাই ক্যান ঘুল্লি ঘোরো?
রসের ফোঁটা পিঁপড়া খাও
এক দুই ঠিলা আমায় দাও।

রসবুড়ো কাঁধ থেকে রসের হাঁড়িগুলো উঠোনে নামিয়ে রেখে মাথার মাফলার খুলতে খুলতে বললো, ‘কই গো নাতিপুতির দল, রস খাতি চালি তাত্তাড়ি চইলে আসো।’ সৌমিও ততক্ষণে শামন্তীকে নিয়ে রসবুড়োর কাছে এসে হাজির হয়েছে। মাফলারটা কোমরে বাঁধতে বাঁধতে শামন্তীর দিকে তাকিয়ে রসবুড়ো জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কিডা গো? এ যে দেখছি আমাগে গিরামে একখান নতুন পুতুল আইছে। রঙিন পুতুল। কিডা তুমি? নাম কী?’
‘রসদাদু, অউগ্যা কাইল আইছে। আমাগে ফুফতো বুন। ঢাকা শহরে থাকে। নাম শামন্তী।’
রসবুড়ো শামন্তীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘রস খাতি পারো তো? তুমারে আমি জিরান রস খাতি দিবানে। দেখবানে কি রহম টলটলা নিঝল রস, লাল লাল রঙ আর বিজায় মিঠা। বরফের মতন ঠাণ্ডা। যাও, এহন একখান পাটকাডি আর এট্টা গিলাশ নিয়ে আসো দেহি।’
রসবুড়োর কথাগুলো বেশ লাগছে শুনতে। একটা সুর আছে। রসবুড়োর কথা শুনে রস খাওয়ার লোভ হচ্ছে। কিন্তু শামন্তী কিছুতেই বুঝতে পারছে না, রস খেতে পাটকাঠির দরকার কী। আর সে বস্তুটাই বা কী?
‘ওই ছেমড়ি, তুই দাঁড়া। আমি আনতিছি।’ এই বলে রিনা গেলো গ্লাস আর পাটকাঠি আনতে। রসবুড়ো একটা খালি মাটির কলসের মুখে গামছা বেঁধে তার ভেতরে হাঁড়ি থেকে রস ঢালছে। রসের হাঁড়ির মুখে সাদা সাদা ফেনা। টলটলে রস গামছার ভেতর দিয়ে কলসিতে জমা হচ্ছে। এরই মধ্যে সবাই যে যার গ্লাস আর পাটকাঠি নিয়ে হাজির হলো রসবুড়োর কাছে। রসবুড়ো একে একে সবার গ্লাস ভরে দিচ্ছে রসে। রসের ভেতর পাটকাঠি ডুবিয়ে সবাই চোঁ চোঁ করে রস টেনে খাচ্ছে। শামন্তী ঢাকায় দোকান থেকে কত্ত রকমের জুস কিনে কতদিন যে ওভাবে টেনে খেয়েছে। তাই এ আর নতুন কী। সেও তাই পাটকাঠি রসে ডুবিয়ে টানতে লাগলো রস। কী মিষ্টি আর ঠাণ্ডা! রস খেয়ে শামন্তীর মন জুড়িয়ে গেলো। আচ্ছা কেমন করে রস হয়? ভাবতে ভাবতে রসবুড়োকেই দুম করে জিজ্ঞেস করলো শামন্তী। শামন্তীর কথা শুনে সবাই তো হো হো করে হেসে উঠলো, ‘এই ছেমড়ি থাহে কুনহানে? খাজুর গাছ চিনিস না?’
‘চিনি তো। ওই তো খেজুর গাছ।’ শামন্তী হাত তুলে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা খেজুরগাছগুলো দেখালো।
‘ওই খাজুর গাছতি রস হয়।’ তবুও শামন্তীর ঘোর কাটেনা, মা তো জুসারে কমলা চিপে রস বের করে। তাহলে রসবুড়োও কি খেজুর গাছ চিপে রস বের করে? কিন্তু না, এ কথাটা বলা যাবে না। তাহলে সবাই আরো ক্ষেপাবে।
রসবুড়ো আরও এক গ্লাস রস নিয়ে শামন্তীর কাছে এগিয়ে এলো, ‘পুতুল লাতনী, আর এট্টু রস খাও। তুমারে আমি খাজুর গাছের কাছে নিয়ে যাবানে। তহন দেইখেনে সেই গাছ কাইটে আমি ক্যামন রস বাইর করি। সেজন্যিই তো মাইনষে আমারে কয় নুরল গাছি। তা তুমি কিন্তু দুপুরে খাইয়ে দাইয়ে রেডি থাইকো। আমি গাছ কাটতি যাবানে, তহন তুমারে সাথে নিয়ে যাবানে।’

রসবুড়ো নানির কাছে বাকি রসের হাঁড়িগুলো দিয়ে যে পথে এসেছিলো সে পথেই চলে গেলো। শামন্তী রসবুড়োর যাওয়ার পথে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো, ইস কত কিছুই সে এখনো জানেনা। কি করে জানবে? স্কুলে ওসব পড়ায় কখনো? না ওসব কোনো বইয়ে লেখা আছে? ইস, কয়টা দিন যদি রিনা পাপ্পু আর রস বুড়োর সাথে গ্রামটায় বেড়ানো যেতো! কতো কিছুই যে জানা যাবে! কোনো কিছু দেখে শেখার মজাই আলাদা। সহজে ভোলা যায়না। নিশ্চই ওর ঢাকার বন্ধুরাও এসব জানেনা। এখান থেকে ফিরে গল্প করতে যা মজা হবে! শামন্তীর যেন আর সময় কাটেনা। কখন দুপুর হবে? কখন আসবে রসবুড়ো ওকে নিয়ে যেতে?

রসের আসর ভাঙতেই রিনা পাপ্পুরা পালাপালি খেলায় মেতে উঠলো। একজন চোর। একজন হাতের তালু দিয়ে চোর সাজা রিনার চোখ চেপে ধরলো। রিনা এখন আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। এবার সবাই এক দৌড়ে গিয়ে যে যার সুবিধা মতো জায়গায় লুকিয়ে পড়লো। শামন্তী দেখলো, পাপ্পু একটা মস্ত শিরিষ গাছের আড়ালে লুকিয়েছে। সেখান থেকেই আওয়াজ দিলো টুঁউ, কুঁউক..’। চোখ খুলতেই রিনা বলে উঠলো, ‘কিডা কুনহানে পলালো রে? শামন্তী তু তো দেহিছিস। ক না আমারে।’
কিন্তু চোখ চেপে ধরা মেয়েটা শাসিয়ে উঠলো শামন্তীকে, ‘ওই ছেমরি। খবরদার কবি না। কলি কিন্তু তোর খবর আছে।’
তাই শামন্তীও চুপ। এদিক ওদিক থেকে কেবল রিনার কানে আসছে ‘টুঁউ, কুঁউক..’। সেই শব্দ ধরেই রিনা পা টিপে টিপে এগোচ্ছে একজনকে লক্ষ্য করে। শিরিষ গাছটার কাছে গিয়ে চট করে তার আড়ালে চলে গেলো সে। খপ করে ধরে ফেললো পাপ্পুকে। অতএব খেলার নিয়ম অনুযায়ী পাপ্পু এবার চোর। সেও একইভাবে রিনার মতো চোর সেজে লুকিয়ে থাকা সবাইকে খুঁজবে। একজনকে খুঁজে পেলে সেইই হবে চোর।

কিন্তু আর পালানো খেলোয়াড়দের খুঁজতে হলো না। সৌমির মা এসেছে সকালের নাস্তা করার জন্য ডাকতে। বাড়ি থেকে রিনার মাও চেঁচিয়ে ডাকছে খেতে যাওয়ার জন্য। অতএব খেলা ভাঙলো। শামন্তীকে নিয়ে সৌমি চললো বাড়িতে। মাটির পৈঠায় পিঁড়ি পাতা হয়েছে। পিঁড়ির সামনে থালায় গুড়ের মতো পাতলা জাউভাত। তার মধ্যে টেনিস বলের মতো এক দলা নতুন লাল আলুর ভর্তা। পিঁড়িতে বসতেই পাতে পড়লো ঘিয়ের ফোঁটা। খেতে বসে শামন্তী মামীকে জিজ্ঞেস করলো, ‘মামী, নাস্তা কোথায়?’ শামন্তীরা ঢাকায় নাস্তা করে হয় রুটি না হয় পাউরুটি দিয়ে। এ আবার কোন বস্তু? পায়েসের মতো দেখতে।
মামী বললো, ‘খাও শামন্তী। ওটাই তো নাস্তা।’
‘তোমরা পায়েস দিয়ে নাস্তা করো?’
‘না, না। ওটা পায়েস হবে কেনো? ওটা তো জাউভাত। খেয়ে দেখো মজা লাগবে। পায়েস খাবা? সইন্ধা রাইতে নতুন খাজুর পাটালি দিয়ে পায়েস রানবোনে।’
শামন্তী খেয়ে সত্যিই অবাক হয়ে গেলো। কি মিষ্টি ঘ্রাণ আর স্বাদ! গরম গরম জাউভাতের সাথে ঘি। তার সাথে ঝাঁঝালো সর্ষে তেল দিয়ে মাখা আলু ভর্তা। অপূর্ব। শামন্তী ভাবলো, এবার ঢাকায় ফিরে এরকম জাউভাত দিয়ে শীতে একদিন বন্ধুদের নিয়ে পিকনিক করতে হবে। খুব মজা হবে। এমন ভাত নিশ্চয়ই বন্ধুরা কখনো খায়নি।

একটু পরেই রসবুড়ো এলো, ‘কই গো আমার লতুন পুতুল? যাবা নাকি আমার গাছ কাটা দেখতি?’
শামন্তী মাথা নাড়লো। সাথে সৌমিও চললো। বাড়ির পিছনেই বকুল আপাদের ভিটে। পাশের জমি থেকে খানিকটা উঁচু। সেখানে বেশ কয়েকটা খেজুর গাছ। রসবুড়ো তর তর করে তার একটাতে উঠে পড়লো। তার কোমরে একটা তালপাতার ঠুঙ্গিতে গাছি দা ও দড়ি। কোমরে বাঁধা মাটির ঠিলা। গাছের মাথায় উঠে ধারালো গাছি দা দিয়ে খেজুর গাছের মাথার একপাশ চাঁছতে শুরু করলো সে। ভাবখানা যেনো ব্লেড দিয়ে কারো মাথা ন্যাড়া করছে। চাঁছ দিতেই মাথাটা ফর্সা হয়ে উঠলো। আর সে ফর্সা যায়গা দিয়ে ঘামের মতো রস ঝরতে লাগলো। কাটা জায়গার নীচে একটা বাঁশের নালা মতো কাঠি বসানো। সে কাঠি বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় রস পড়তে লাগলো। কাঠির মুখে মাটির ঠিলাটা বেঁধে দিয়ে রসবুড়ো নেমে এলো। শামন্তীর দিকে তাকিয়ে রসবুড়ো জিজ্ঞেস করলো, ‘কি গো লাতনী, দেখলে তো কি হরে খাজুর গাছেরতে রস বারোয়?’ রসবুড়ো আর একটা গাছে উঠতে শুরু করলো।

এমন সময় পাপ্পু এসেছে ওদের ডাকতে। খানার পানি কমেছে। খানাটা কচুরিপানায় ঠাসা। কচুরিপানার দাঁড়ির মধ্যে নাকি কৈ মাছ থাকে। শীতে কৈ মাছেরও ঠাণ্ডা লাগে। কচুরিপানার শেকড়গুলোর মধ্যে লুকিয়ে তাপ খোঁজে। তাই কচুরিপানা ধরে টান দিলেই তার মধ্যে কৈ মাছ পাওয়া যায়। পাপ্পু এখন কৈ মাছ ধরবে। শামন্তী নিশ্চয়ই এভাবে কৈ মাছ ধরা দেখেনি। সব কিছুই নতুন লাগছে। গ্রামে কতো মজা! পাপ্পু বললো ‘তাত্তারি চল্। বেইল হয়ে গেলো তো। কৈ মাছ ধইরে নিয়ে গেলি দেখিস মা ফুলকপি দিয়ে সেগুলো রান্না করবেনে। ফুলকপি দিয়ে কৈ মাছ, যা মজারে খাতি।’ শামন্তী দেখেছে, বাড়ির পাশেই ফুলকপি ক্ষেতে সাদা সাদা ফুলকপি হয়েছে। ওদের কি মজা। বাজারে যেতেই হয় না। দল ধরে এবার ছুটলো খানাটার দিকে। শীতের মধ্যেও পাপ্পু তর তর করে নেমে পড়লো খানাটার পানিতে। কয়েকটা কচুরিপানার ধাপ টেনে তুলতেই তার কালো কালো শেকড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কই মাছ উঠে এলো। একটা মাটির ঠিলায় পাপ্পু সেগুলো রাখছে। শামন্তী খানাটার পাড়ে বসে এক দৃষ্টিতে পাপ্পুর সেই অদ্ভুতভাবে কৈ মাছ ধরা দেখছে। ভাবছে, ইস গ্রামে ওরা কতো কিছু পারে। কি মজা করে। শামন্তীদের ঘুম থেকে উঠে শুধু স্কুলে যেতে হয়। স্কুল থেকে ফিরে টিচারের হোমওয়ার্ক করতে হয়, টিচার আসলে আবার বই নিয়ে বসতে হয়। একটু সময় পেলে টিভিতে মিকিমাউস দেখতে হয়। আসলে তো দেশটাই চেনা হচ্ছে না। অথচ এ দেশে কত কিছু আছে। শামন্তী এই এক দিনেই গাঁয়ে এসে বুঝে গেছে, দেশকে জানতে হলে শুধু বই পড়ে কিছু হবে না। মাঝে মাঝে গ্রামের আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতেও যেতে হবে।