শূন্যে ডানা মেলে

এনায়েত রসুল

ছোট পাখি মা মুনিয়া ছোট্ট মেয়ে চিচিকে নিয়ে যে বনে বাস করে, সেই বনের নাম তমাল বন। তমাল বনে চিচিরা ছাড়াও রয়েছে অনেক পাখির বসবাস। রোজ সকালে দল বেঁধে উড়ে যায় ওরা-ফিরে আসে শেষ বিকেলে। বাসায় বসে চিচি দেখে পাখিদের ওড়াউড়ি। যতো দেখে ততোই মন খারাপ হয় ওর। কারণ চিচির ডানায় এখনো পালক গজায়নি-আর পালক গজায়নি বলে চিচি উড়তেও পারছে না।

চিচিদের বাসা ইউক্যালিপটাস গাছের ডালে। সেই গাছের উল্টো দিকের কদম গাছে থাকে এক প্যাঁচা। কয়েকদিন আগে উড়তে গিয়ে চিচি পড়ে গিয়েছিলো। সে সময় নিচ থেকে ওকে তুলে এনেছিলো প্যাঁচা। তাই প্যাঁচার ওপর মা মুনিয়ার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। সারাটা ক্ষণ শুধু প্যাঁচো দাদা প্যাঁচো দাদা বলে প্রশংসা করে প্যাঁচা'র। অথচ চিচির খুব একটা ভালো লাগে না প্যাঁচাকে। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলে, প্যাঁচা আলসে পাখি। আলসে পাখিদের দু’চোখে দেখতে পারি না আমি।

এখন সন্ধ্যা নামি নামি করছে। সেই যে সকালে বেরিয়েছে মা মুনিয়া, এখনো ফিরে আসেনি। বাসায় একাকী বসে আছে চিচি। ওকে একাকী বসে থাকতে দেখে প্যাঁচা এসে বসলো ইউক্যালিপটাস গাছের ডালে। তারপর জিজ্ঞেস করলো-তোর মা কোথায় রে?
চিচি বললো, খাবার আনতে গেছে।
প্যাঁচা বললো, সে তো সকালের কথা! এখনো ফেরেনি? খেয়েছিস কিছু?
চিচি কথা না বলে ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ালো।
প্যাঁচা বললো, কিছু খাসনি তাহলে? আমার কাছে শুঁয়োপোকা আছে-খাবি?
চিচি বললো, হুম্।
সঙ্গে সঙ্গে প্যাঁচা দুটো শুঁয়োপোকা এনে দিলো চিচিকে। চিচি খুব মজা করে খেলো পোকা দুটো। আর মনে মনে ভাবলো, মা মুনিয়া ঠিকই বলেন। প্যাঁচো মামু খুব ভালো প্রতিবেশী। শুধু শুধুই আমি অপছন্দ করি তাকে।

এসব ভাবছে চিচি, এমন সময় ফিরে এলো মা মুনিয়া। এসেই একগাদা কৈফিয়ত দিলো-উফ্! কী যে সমস্যা! এদিকে কোনো খাবারই পাওয়া যায় না। খাবারের খোঁজে গিয়েছিলাম অনেক দূর। সন্ধ্যা নেমে আসছে। তাই খাবার না নিয়েই ফিরে এলাম।
ফিরে তো এলে। এখন খাবে কী?
জিজ্ঞেস করলো প্যাঁচা। মা মুনিয়া বললো, সে কথা ভেবে ক‚ল পাচ্ছি না। আমি নাহয় না খেয়েই থাকবো। কিন্তু চিচিটা না খেয়ে রাত কাটাবে কেমন করে?
মা মুনিয়ার কথা শুনে চিচি বললো, আমার জন্যে ভেবো না মা। প্যাঁচো মামু আমাকে শুঁয়োপোকা খেতে দিয়েছে। উহ্ মা! কী যে নরম মাংস, কী যে মজার স্বাদ, বোঝাতে পারবো না।
মা মুনিয়া বললো, আমাকে আর স্বাদ বোঝাতে হবে না। প্যাঁচো দাদা যে তোর জন্যে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন, তা শুনে খুবই ভালো লাগছে। আর প্যাঁচো দাদা তোমাকে বলি, বারবার তুমি শুধু ঋণীই করে রাখছো।
প্যাঁচা বললো, বোনের বিপদে-আপদে ভাই পাশে থাকবে-এটাই তো নিয়ম। তো দিদি, এখন আমি যাই। সকালে দেখা হবে।

দুই.

কয়েকদিন ধরেই চিচির ডানা দুটো খসখস করছিলো। চিচি চিন্তিত ছিলো এ নিয়ে। তার ওপর আজ যখন দেখলো সেই ডানা দুটোর রং অন্য রকম লাগছে, তখন চিচি ঘাবড়ে গেলো। মা মুনিয়াকে ডেকে বললো, দেখো দেখো মা, কী অবাক কাণ্ড! আমার ডানা দুটো রঙিন হয়েছে।
মা মুনিয়া ডানা দুটো নেড়েচেড়ে দেখে বললো, রঙিন দেখাচ্ছে কেন জানিস? তোর ডানা দুটোয় পালক উঠেছে। তুই এখন উড়তে পারবি। প্রথম প্রথম এ বাসা থেকে তোর প্যাঁচো মামার বাসা পর্যন্ত-পরে সারা আকাশে উড়বি।

মা মুনিয়া বেরিয়ে যাওয়ার পর আকাশে ডানা মেললো চিচি। কথা ছিলো কদম গাছ পর্যন্ত উড়বে, কিন্তু উড়ে গেলো অনেক দূর। উড়ে উড়ে এক মাঠের ওপর এসে পড়লো চিচি। সেই মাঠে মহিষের পিঠে চড়ে একটা ছেলে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো। তা দেখে চিচিরও ইচ্ছে হলো অমন করে ঘুরে বেড়াতে। ও তখন নেমে বসলো একটা মহিষের পিঠে। অমনি মহিষ লেজ তুলে চিচিকে মারলো এক বাড়ি। সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে পড়লো চিচি। বারবার চেষ্টা করেও উড়তে পারলো না।
সে সময় মাঠের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলো প্যাঁচা। সে দেখলো তার মুনিয়া দিদির মেয়েটা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে! ব্যাপার কী?
প্যাঁচা জিজ্ঞেস করলো-তুই ওখানে কী করছিস, চিচি?
চিচি বললো, কী আর করবো, উড়তে চেষ্টা করছি-উড়তে পারছি না। পাখা দুটো টনটন করছে।
প্যাঁচা বললো, তাহলে এক কাজ কর। আমার পিঠে উঠে বোস, পৌঁছে দিই তোকে।
অবশেষে তাই করলো চিচি। প্যাঁচার পিঠে চড়ে পৌঁছে গেলো তমাল বনে।

পরদিন চিচি ঘটালো আরেক ঘটনা। উড়ে উড়ে চিচি চলে গেলো অন্য এক বনে। সেখানে ওর পরিচয় হলো এক টিয়ে পাখির সঙ্গে। টিয়ের নাম ট্যাট্যা।
চিচি খুব ছোট্ট পাখি। তাই টিপ্পনি কেটে ট্যাট্যা জিজ্ঞেস করলো-এ্যাই পুঁচকে! কী নাম তোর?
চিচি বললো, আমার নাম চিচি। মা মুনিয়ার মেয়ে আমি। তমাল বনের ইউক্যালিপটাস গাছে আমাদের বাসা। আকাশ ছুঁই ছুঁই মাথা ওই গাছটার।
ট্যাট্যা বললো, তুই তো খুব বাচাল রে! জিজ্ঞেস করলাম নাম-শোনালি চৌদ্দগুষ্ঠীর ইতিহাস।
চিচি বললো, আমি এমনই। শোনো, আমাদের বাসা থেকে আকাশ দেখা যায়।
ট্যাট্যা নাক সিটকিয়ে বললো, আকাশ দেখা যাক আর পাতাল দেখা যাক, গাছের ডালে বাসা। এ বাসার কোনো নিশ্চয়তা আছে? একটু জোরে বাতাস এলেই ধপাস। আর আমার বাসা কোথায় জানিস?
কোথায়?
এই বটগাছের খোড়লে। বাসা তো নয়, যেনো রাজপ্রাসাদ। রোদ-বৃষ্টিতে কষ্ট হয় না।
কিন্তু প্রাণ জুড়ানো হাওয়া তো লাগে না গায়ে। আকাশও দেখা যায় না।
খুব সাজিয়ে-গুছিয়ে নিজের বাসার সুবিধাগুলো জানালো চিচি। কিন্তু ট্যাট্যা বললো, আমার ধারণা, গাছের ডালে যে সব বাসা, অমন বাসায় কোনো সভ্য পাখি থাকে না।
ট্যাট্যার কথা শুনে মেজাজ বিগড়ে গেলো চিচির-কী বলতে চায় ট্যাট্যা! যারা গাছের ডালে বাসা বেঁধে থাকে, তারা সভ্য নয়? ঠিক আছে, অসভ্যতা কাকে বলে তা আজ দেখিয়ে দেবে চিচি।

ট্যাট্যার কাছে অপমানিত হয়ে চুপ করে বসে রইলো চিচি। আর চিচিকে থম ধরে বসে থাকতে দেখে ট্যাট্যা উড়ে গিয়ে বসলো অন্য গাছে। চিচি তো এমন সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলো। ট্যাট্যা অন্য গাছে গিয়ে বসতেই চিচি গিয়ে ঢুকলো ট্যাট্যার খোড়লের বাসায়। সেখানে বিছানো ছিলো কচি ঘাসের নরম বিছানা। চিচি ওগুলো ফেলে দিলো বাইরে। রাতে খাবে বলে ডাসা ডাসা ডুমুর এনে রেখেছিলো। ধারালো নখ দিয়ে আঁচড়ে-পিঁচড়ে নষ্ট করে দিলো সেগুলো। তারপর চলে এলো নিজের বাসায়। তবে তাতে খুব এটা লাভ হলো না। চিচি ওর নাম-ঠিকানা জানিয়ে ছিলো ট্যাট্যাকে। সেই ঠিকানা খুঁজে খুঁজে একটু পরেই ট্যাট্যা এসে হাজির হলো চিচিদের বাসায়। এসেই চিৎকার করে বললো, এই মুনিয়া! তোমার পাজি মেয়েটার বিচার করো। নইলে আমি যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটিয়ে ছাড়বো।
মা মুনিয়া জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলো চিচি কী করেছে, তার আগেই চেঁচিয়ে উঠলো চিচি-এ্যাই ট্যাট্যা! এতো জোরে চেঁচাবে না। এটা ভদ্র পাখির বাসা।
ট্যাট্যা বললো, হাজারবার চেঁচাবো। তুই আমার বাসা তছনছ করে এলি কেন? তোর মা যদি বিচার না করে, তাহলে আমি ঈগল রাজার কাছে যাবো। তখন বুঝবি মজা।
কদম গাছের ডালে বসে ট্যাট্যা আর চিচির কথা শুনছিলো প্যাঁচা। এবার নেমে এসে সে জিজ্ঞেস করলো-ভাই সাহেবের নাম কী?
ট্যাট্যা।
গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলো ট্যাট্যা। অমনি হই হই করে উঠলো প্যাঁচা-আরে তাই নাকি! তুমিই ট্যাট্যা?
ট্যাট্যা বললো, হ্যাঁ, আমিই ট্যাট্যা। কেন, শুনেছেন নাকি আমার নাম?
প্যাঁচা বললো, শুনিনি মানে! কে না জানে তোমার নাম! ভদ্র, সভ্য, মিষ্টভাষী-আরো কতো গুণ রয়েছে তোমার! সেই তুমি এসেছো চিচির মতো একটা ছোট্ট মেয়ের নামে নালিশ জানাতে? এটা কিন্তু তোমার সুনামের সঙ্গে মানানসই নয়। অথচ তুমি যদি তোমার অভিযোগ ফিরিয়ে নাও, তোমার মহত্ত্বের কথা ছড়িয়ে পড়বে চারদিকে।
প্যাঁচার কথা শুনে এক সেকেন্ড কী ভাবলো ট্যাট্যা। তারপর বললো, আচ্ছা, ফিরিয়ে নিলাম। আমি এখন যাই। ওই পুঁচকেটাকে নিয়ে আমার বাসায় যেও মা মুনিয়া।
মা মুনিয়া বললো, আচ্ছা, তুমিও বেড়াতে এসো।

তিন.

তিনদিন আগে খাবার আনতে গিয়েছিলো প্যাঁচা-আর ফিরে আসেনি। মা মুনিয়ার তাই মন খারাপ।
মা মুনিয়াকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে চিচি বললো, কী অবাক কাণ্ড জানো? আগে প্যাঁচো মামুকে আমার ভালোই লাগতো না। এখন মনে হচ্ছে, মামুর মতো ভালো পাখি আর একটিও নেই এ বনে। মামু নেই- মনে হচ্ছে বন শূন্য হয়ে গেছে!

বিকেলে চিচিকে রেখে মা মুনিয়া গেছে খাবার আনতে। সে সুযোগে চিচি ডানা মেললো আকাশে। কখনো মেঘ ছুঁয়ে কখনো আকাশ ছুঁয়ে উড়ে উড়ে চিচি এসে পড়লো এক গ্রামের ওপর। অনেকক্ষণ উড়ে জিরোবার জন্যে চিচি গিয়ে বসলো এক চালতা গাছের ডালে। আর তার পরপরই ওর কানে ভেসে এলো অদ্ভুত এক করুণ চিৎকার- চি..চি...রে...
সেই চিৎকার শুনে অবাক হলো চিচি। এই অচেনা গ্রামে নাম ধরে ওকে কে ডাকে?
অবাক চিচি এদিক-ওদিক তাকাতেই দেখতে পেলো গাছে নিচের সুন্দর একটা ঘরের ভেতর ঘুরঘুর করছে ওর প্যাঁচো মামু। আর ঘরটার পাশে বসে আছে ছোট একটা ছেলে।
চিচি জিজ্ঞেস করলো-প্যাঁচো মামু, অমন সুন্দর ঘরে বসে তুমি কী করছো?
প্যাঁচা বললো, এই দুষ্ট ছেলেটা আমাকে আটকে রেখেছে। তাই পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।
তাই? তো পালাচ্ছো না কেন?
কি করে পালাবো! খাঁচাটা খুব শক্ত। পালানো মনে হয় সম্ভব হবে না।
চিচি বললো, সম্ভব হবে না কেনো! একটু বুদ্ধি খরচ করলেই পালাতে পারবে। খাঁচাও ভাঙতে হবে না তোমাকে।
তাই নাকি? কী করতে হবে বল্ তো?
বিপুল কৌত‚হল নিয়ে প্যাঁচা তাকালো চিচির দিকে। চিচি বললো, মানুষরা তো মরা পাখি পোষে না। তুমি মরে যাওয়ার ভান করো। তাহলেই ছেলেটা ফেলে দেবে তোমাকে। সেই সুযোগে...
এটুকু মাত্র বলেছে চিচি, অমনি চেঁচিয়ে উঠলো প্যাঁচা- আর বলিস না, আর বলিস না। আমি বুঝতে পেরেছি কী করতে হবে আমাকে।
এ কথা বলে প্যাঁচা দম খিঁচে চোখ বন্ধ করে চিৎপটাং হয়ে খাঁচার ভেতর শুয়ে পড়লো। এ দৃশ্য দেখে ছেলেটা চিৎকার করে ডাকলো ওর মাকে। মা এসে দেখলেন প্যাঁচাটা জিভ বের করে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে।
মা বললেন, আহারে, পাখিটা মরে গেছে। কী আর করবি! ওকে চালতা গাছের নিচে রেখে দে। তোর বাবা ফিরে এসে কবর দিয়ে দেবেন।
মায়ের কথা মতোই কাজ করলো ছেলেটি- প্যাঁচাও চিচির কথা মতো কাজ করলো। যেই ওকে খাঁচা থেকে বের করে চালতা গাছের নিচে রাখা হলো, অমনি চিচি চেঁচিয়ে বললো, পালাও! প্যাঁচো মামু পালাও ...! প্যাঁচাও উড়ে পালালো।

চার.

দুপুরে মা মুনিয়া ফিরে এলে প্যাঁচা খুব প্রশংসা করলো চিচির। বললো, জানো মুনিয়া দিদি! তোমার মেয়ের বুদ্ধি মতো কাজ করেই আজ আমি জীবন নিয়ে ফিরে এসেছি। নইলে বাকি জীবনটা খাঁচার ভেতরই কাটাতে হতো।
চিচি বললো, শুধু শুধু আমার প্রশংসা করছো। আসলে তুমি খুব ভালো পাখি। আল্লাহ তাই বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন তোমাকে।
প্যাঁচা বললো, এ কথাটাও বুদ্ধিমতীর মতো বলেছিস। সব কিছুই হয় আল্লাহর ইচ্ছায়। তো আমি এখন যাই দিদি। তোমরা ভালো থেকো।

প্যাঁচা চলে যাওয়ার পর চিচি বললো, প্যাঁচো মামুর বিপদে কাজে লাগতে পেরে খুব ভালো লাগছে মা।
মা মুনিয়া বললো, ভালো তো লাগবেই। ভালো কাজ করার তৃপ্তিই আলাদা। সারা জীবন প্যাঁচো দাদা আমাদের উপকার করেছেন। তুই জীবন বাঁচিয়ে তার কিছুটা পরিশোধ করেছিস। ভালো লাগারই কথা। আয় বাছা, আমার বুকে আয়। আজ তোকে বুকে নিয়ে ঘুমোবো।

চিচি সেঁটে গেলো মা মুনিয়ার বুকের সঙ্গে। কিন্তু চিচির মনে হলো মায়ের বুকটা যেন আগের মতো নেই- ফুলে-ফেঁপে প্রশস্ত হয়ে গেছে ওটা! প্রশস্ত হতেই পারে। সন্তানরা ভালো কাজ করলে সব বাবা-মায়ের বুকই অমন প্রশস্ত হয়ে ওঠে।