টুঙ্গিপাড়ার খোকা

বেবী মওদুদ

জ্বরে চোখ লাল হয়ে আছে খোকার। মা পানিতে কাপড় ভিজিয়ে ভিজিয়ে কপালে রেখে জ্বর কমানোর চেষ্টা করছেন। বন্যায় ভেসে গেছে চারদিক। কাল রাত থেকে আবার বৃষ্টি নেমেছে। খোকা কী কারও কথা শোনে? ডিঙ্গি নৌকায় সঙ্গীদের নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিল। নৌকা উল্টে সবাই পানিতে পড়ে হাবুডুবু। ভিজে একেবারে জবুথবু। ভাগ্যিস আক্কাস তাদের সঙ্গে ছিল। নৌকা আবার সোজা করে সবাইকে টেনে টেনে তুলে ফেলে। না হলে কে কোথায় ভেসে চলে যেতো কে জানে!

বন্যার পানি তো খেয়েছে। সেই সঙ্গে ঠান্ডাটাও ধরেছে। মা তেল গরম করে বুকে পিঠে  মালিস করে দেন। গরম দুধ খাওয়ান। কিন্তু জ্বর ঠিকই এলো রাতে। হাঁচি উঠলে থামে না। নাক দিয়ে সর্দি পড়ছেই। টেনেটুনেও থামানো যাচ্ছে না। সারারাত মাথা ব্যথায় উহ্আহ্ করেছে। ঘুমুতে পারেনি এক মূহুর্তও। ভোরের দিকে ঘুম এসে খোকার দুচোখে যেন কাজল পরিয়ে দিয়েছে। সেই ঘুম ভাঙলো অনেক বেলায়। চোখ মেলতেই দেখে মা কপালে পানি পট্টি দিচ্ছে। মেজ বুজি তার পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।  সবাই দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে।

মা জিজ্ঞেস করে, “কেমন লাগছে বাবা ? ক্ষুধা লাগছে তোমার?” খোকা মায়ের কোলে মাথা গুজে দেয়। কোন কথা বলার শক্তি যেন নাই। মা তার মাথাটা ধরে বালিশে রেখে কপালে চুমু খান। মাথা ভর্তি কালো চুলে হাত বুলিয়ে দেন।

বলেন, ‘শুয়ে থাকো মানিক আমার, আমি তোমার জন্য জাউ ভাত রাঁধছি, নিয়া আসি। মুরগীর সালুন দিয়া খাইবা।’ মায়ের সঙ্গে আক্কাস গেলো। ছোট ফুফু তার মাথার কাছে বসেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।

তারা এসে খোকার মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলে, ‘ও মিয়া ভাই, তুমি জলদি ভালা হইয়া ওঠো।’ খোকা হাসে। জিজ্ঞেস করে ‘কেন রে ? এবার কোথায় গিয়ে নৌকা ওল্টাবি?’

তারা বলে, ‘আর  তোমাকে বাড়ি থেকে বেরুতে দিবে না মামী। আর ঘুরবা কই ? বন্যার পানি তো নামে নি মিয়াভাই। স্কুল মাঠ ছাড়িয়ে ক্লাশে ঢুকে পড়েছে। আর কদিন যাক না, এই ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে যাবে।’

খোকা তার কথা শুনে বলে, ‘তাহলে তো কালিদাস, আবু, মান্নান সবার বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। ওরা তো নীচু জায়গায় থাকে। নিশ্চয় খুব খারাপ অবস্থায় আছে।’

তারা বলে, ‘হ কষ্ট তো সবারই হবে।’
মা এক বাটি জাউ ভাত ও মুরগীর পাতলা ঝোল নিয়ে এসে বসেন। ফুফু তাকে তুলে বসিয়ে দেয়। মেজ
বুজী তার গায়ে কাঁথাটা ভালো করে জড়িয়ে দেয়।
মা চামচে করে তুলে তাকে খাইয়ে দেন। এক চামচ মুখে নিতেই খোকার মুখ যেন তেতো হয়ে যায়। সে বলে ‘ও মা লেবু নাই লেবু মাখায়া দাও।’ মা বুজীকে লেবু আনতে পাঠায়। খোকার মুখে মুরগীর গোস্ত তুলে দেন। খোকা আবার বলে, ‘ও মা একটা ডিম ভাজা খামু?’  মা হাসেন। আক্কাসকে বলেন, ‘যা তোর বুজীকে ক’ একটা ডিম ভাইজা দিবে।’

লেবু টিপে রস মাখিয়ে মা আবার তাকে খাইয়ে দেন। খুব ক্ষিধা পেয়েছিল বলে খোকা খেতে লাগলো। ডিমভাজা এলে মা খাইয়ে দেন। খোকা জিজ্ঞেস করে ‘তোমরা সবাই ভাত খাইছ মা?’
আমেনা বলে, ‘তোমাকে নিয়েই তো সবাই ব্যস্ত। তুমি যে পানিতে পড়ে কাহিল হয়ে এলে - মা তো তোমার কাছেই বসা। আমরা খাইছি। মিয়া ভাই, মা কিন্তু খায়নি।’
তারাও বলে ওঠে, ‘সত্য মিয়া ভাই, মামী কিন্তু কিছু খায়নি। খালি বসে বসে কাঁদছে।’
খোকা মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে ‘সত্যই মা, তুমি কিছুই খাওনি কাল থেকে?’
মা তার মুখে শেষ খাবারটুকু তুলে দিয়ে বলেন, ‘তুমি ওগো কথা শোন ক্যান বাজান ? এখন খাব। তুমি তো ভালো হইয়া উঠছ বাপ আমার।’

পানি খাইয়ে আচলে মুখ মুছিয়ে মা তাকে ভালো করে শুইয়ে দেন। বলেন, ‘এবার একটু ঘুম যাও - শরীর ভালা হইয়া যাব। আজ শুককুর বার তোমার আব্বা আসবেন ?’
আব্বার কথায় খোকার দুচোখ চঞ্চল হয়ে ওঠে। জিজ্ঞেস করে ‘আর কতখনে আসবে মা?’
মেজ বুজি বলে, ‘তুই এখন ঘুম যা ভাই। আব্বার আসতে সাঁঝ হয়ে যাবে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।’
মা সবাইকে ডেকে নিয়ে গেল। তারা আর আমেনা  থাকলো। খোকা তাদের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে না রে ?  আব্বার খুব কষ্ট হবে আসতে। তোরা দুজন হ্যারিকেন আর ছাতা নিয়ে দাঁড়ায়ে থাকিস। আমি তো আজ থাকতে পারব না। আব্বার যেন কোনও কষ্ট না হয়।’
তারা বলে ‘তুমি চিন্তা করো না মিয়াভাই। বৃষ্টি হয়তো থাইমা যাইতে পারে।’
খোকা বলে, ‘নারে তারা। শ্রাবণ মাসের শেষ এখন। বিষ্টি এখন সহজে থামে না।’

তারা খোকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। খোকার হাতটা ধরে বসে থাকে। খোকা জিজ্ঞেস করে, ‘মা খুব কাঁদছে না রে?’
তারা বলে, ‘কাঁদবো না? তোমার কিছু হলে মামী তো চিক্কুর পাইরা কান্দে। কাল বিকাল  থেকে তোমার কাছে বইসা আছে। রাতে যখন খুব জ্বর আসলো বালতি করে পানি এনে মাথায় ঢালছে।  আইজ জ্বর না কমলে তো কবরেজ চাচা আসতো।’ খোকা হাসে। বলে, ‘কবরেজ চাচার ওষুধ আমি খাইতে পারি না বলেই তো জ্বর নেমেছে।’

মাথা ব্যাথাটা এখনও যায়নি। পাশ ফিরে খোলা দরোজা দিয়ে বাইরেটা দেখতে পায়। বৃষ্টির শব্দ অনেক হালকা হয়ে আসছে। জবা ফুল ফুটে আছে। ভেজা সবুজ পাতা দেখতে কত সুন্দর। ভুলুটা বারান্দায় গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। ওকে কী কেউ খেতে দিয়েছে? খোকার হাতে ছাড়া আর কারুর হাতেই খেতে চায় না। বৃষ্টির জন্য বাইরে ঘুরতেও পারেনি বেচারা। আর সেই বোঁচা বানরটা নিশ্চয় পাকঘরের কোনায় পড়ে আছে। বৃষ্টিতে সেওতো কোথাও যেতে পারে নাই নিশ্চয়।

বৃষ্টিটা ভালোই নেমেছে। চারদিক কেমন অন্ধকারের ছায়া। ঘরের পেছনে চলাচলের রাস্তাটায় বন্যার পানি জমেছে বলেই  মানুষ কম, সাইকেলের ঘন্টি নেই। একটা নৌকা গেলো। কাজী বাড়ির বড় নানা যাচ্ছে মনে হলো। বন্যার পানি যখন জমেছে তখন কদিন থাকবে। সেই ভাদ্র’র মাঝামাঝিতে নেমে যেতে পারে। এতোদিন স্কুল বন্ধ, মাঠের কাজ নাই, হাট-বাজারও বসবে কোথায়? মানুষের যাতায়াতে কষ্ট হবে। কাজ না থাকলে তো ঘরে বসে থাকতে হবে। খাবে কী? নদী খাল-বিল ভাসিয়ে ঘরে ঘরে পানি ঢুকে পড়ে - এটা তো বড় কষ্টের।

কাঁথাটা আবারও গায়ে টেনেটুনে খোকা ঘুমিয়ে যায়। জ্বরটা একেবারে যায়নি। মাথা শুধু নয় হাত পাও বেশ ব্যথা করছে। ও ঘরে নাসের কেঁদেই চলেছে। মা, বুজি কী শুনছে না? তাহলে কোলে নিচ্ছে না কেন। কোথাও বুঝি কাঠঠোকরা ডাকছে ঠুন ঠুন ঠুন শব্দ তুলে। খোকার চোখে ঘুম নেমে এলো।

‘ও খোকা, খোকা.... বাজান আমার... সোনা আমার.... লক্ষী আমার ওঠো বাবা। ... মানিক আমার ধন আমার, বাজান আমার.... তাকাও বাবা, দেখো তোমার আব্বা আসছেন। চোখ মেলো বাবা ....।’
খোকা পাশ ফিরে ঘুমিয়েই থাকে। বড় ক্লান্তি তাকে ঘিরে ধরেছে। আজ শুধু ঘুমিয়েই থাকতে ইচ্ছে করছে তার।
‘ও বাপধন ওঠো বাবা।.... তোমার আব্বা আসছেন।..... ওঠো বাবা। .... দ্যাখো তোমার জন্য কি আনছেন।  ও  খোকা, সোনা আমার .... চাঁদের কণা আমার। বীর বাহাদুর আমার। ... ওঠো বাবাজান আমার । ...’ বুজি মায়ের পিঠে হাত রেখে বলে, ‘ও মা খোকা তো ঘুমায়া আছে। থাক আর ডাকবা না। ঘুম শেষ হলেই নিজেই উঠবে নে। ঘুমা ভাইডি।’

বুজি তার গায় কাঁথাটা ভালো করে জড়িয়ে দেয়। কপালে হাত বুলিয়ে বলে, ‘ও মা, জ্বর তো অনেক নেমেছে মা। এক্কেরে গেলেই খোকার ঘুম ভাঙ্গবে।’
আব্বা বসে বসে দেখছেন খোকাকে। সেই দিনের আলো মোছার আগেই এসেছেন।
বললেন “আককাসকে পাঠিয়ে তুমি ভালো করেছিলে সায়েরা। এতো বৃষ্টি দেখে ভাবছিলাম এ হপ্তায় আসব না।’
মা বললেন, ‘খোকার এমন জ্বর। আবার পানিতে পড়িছে, তাই চিন্তা করে পাঠালাম। জ্বর হইলে খোকা আবার বার্লি, বিস্কুট, বেদানা খাইতে চায়। ঘরে তো কিছু নাই। বানের পানিতে বাজারও বসে না কদিন।’

বাবা বললেন, ‘আর খোকাকে এখানে রাখব না। আমার কাছে গোপালগঞ্জ নিয়া রাখুম। সেখানে স্কুলে ভর্তি করায়ে দেব। গ্রামে থাকলে ও নিজের স্বাধীন মতো চলে।’
মা চিন্তিত হয়ে বলেন, ‘ওকে শহরে নিয়ে যাবেন? আমি থাকুম কেমনে খোকারে ছাড়া। ওরে খাওয়াবে কে? আমার রান্না ছাড়া তো ও খাইতেই চায় না। না, না, আপনি ওরে নিয়া যাবেন না।’ মা একেবারে কাঁদতে শুরু করে।
বাবা বলেন, ‘অভ্যাস করতে হবে খোকারে ছাইড়া থাকতে। খোকা এখন বড় হচ্ছে। ওর লেখাপড়ায় মনোযোগী হওয়া দরকার। ওকে তো বড় হতে হবে। অনেক বড় হবে আমার খোকা। তোমার বাপজান ওর জন্মের সময় নাম রেখে বলছিলেন না খোকার জগৎ জোড়া নাম হবে।’
মা তবুও কাঁদতে থাকে, ‘খোকাকে ছাইড়ে আমি থাকুম না।’
বুজি মাকে সান্তনা দেয়। বলে, ‘কাঁদো কেন মা ? শহর তো কাছেই। বাবার সঙ্গে প্রায় হপ্তায় আসবো নে।’
বাবা বললেন, ‘বেশ তো তোমরা সবাই চলো।’
মা বলে ওঠেন, ‘ও মা তাই হয় নাকি। ঘর খালি থুয়ে সবাই যামু কেমনে? ঘরে সাঁঝবেলা বাতি দেবে কে? ফকির আসলে ভিক্ষা না নিয়া চলি যাবে। আমি বাড়ি ছাইড়া যামু না।’
বাবা বললেন, ‘তুমি জেদ করে কথা বললে তো হবে না। আমার ছেলের ভবিষ্যৎ চিন্তা করেই
ওকে নিয়ে যেতে হবে। এখানে পড়ে থাকলে ও পৃথিবীটা চিনবে কি করে ? মানুষকে জানবে কী ভাবে।’

বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। রাত নেমেছে গভীর অন্ধকার নিয়ে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। খোকার ঘুম ভাঙ্গে। দু’হাত দুপাশে ছড়িয়ে হাই তোলে। জ্বর হালকা থাকলেও মাথা ব্যথাটা আছেই।
মাকে কাছে না দেখে ডাকে ‘ও মা তুমি কই ?’ মা পাশের ঘর থেকে ছুটে আসেন। বলেন, ‘কী হয়েছে বাপধন। ক্ষিধা লাগছে খুব, না?’ খোকার কপালে চুমু খান। হ্যারিকেনের আবছা আলোয় আব্বাকে হঠাৎ দেখে খোকা খুব খুশি হয়।
উঠে বসে বলে, ‘আব্বা কখন আসলেন’? আব্বা কাছে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেন। মা দু’জনকে রেখে বেরিয়ে যান খোকার জন্য খাবার আনতে। বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে খোকা।
‘আব্বা আপনি কখন আসলেন? আমার জ্বরের জন্য আজ ঘাটে যেতে পারি নাই। আপনার কষ্ট হয় নাই তো।’
আব্বা খোকাকে আদর করতে করতে বলেন, ‘আমি সব শুনেছি। তুমি পানিতে পড়ে গিয়েছিলে। জ্বরে কাহিল হয়ে গেছ একেবারে।’
মা খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। দুধভাত, চাঁপা কলা দিয়ে মাখানো। মা তাকে খাইয়ে দিলেন। আব্বা  বাইরে বারান্দায় গিয়ে পায়চারি করতে লাগলেন। আব্বার কথা শুনেই খোকা বুঝে গেছে তিনি খুব চিন্তিত। আব্বা কখনও তার ওপর রাগ করতে পারেন না। বকা ঝকাও দিতে পারেন না। তবে কোন আদেশ নির্দেশ দিলে খোকা চুপচাপ শুনে যায়। কোন উত্তর দেয় না। মায়ের কোলের কাছে বসে খোকা দুধভাত খায়। মা কত কথা বলে। সে কোন উত্তর দেয় না।

রাতে আব্বা তার কাছে শুয়ে থাকলেন। কত উপদেশ দিলেন। শহরের গল্প শোনালেন। সাহেব পুলিশরা ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়ায়। কোথাও গোলমাল হলে চাবুক দিয়ে মারে। তাদের বাড়ির পেছনে একটা বড় দিঘি আছে যেখানে সারাবছর লাল-সাদা শাপলা ফোটে। দিঘির মাছ খুব মিষ্টি।
সকালে ঘুম ভাঙ্গতেই খোকা দেখে আব্বা উঠে গেছেন। সে কাঁথা সরিয়ে উঠে বসে। তারপর পাশের ঘরে ঢুকে দেখে বিছানায় নাসের ঘুমুচ্ছে। তার পাশে ছোট বোন হেলেন ঘুমিয়ে আছে।
খোকা ঘর ছেড়ে বারান্দায় আসে। বৃষ্টি নেই। রোদদুরও নেই। সূর্য ওঠেনি। একদল চড়–ই বরই গাছটায় খুব হৈ চৈ করছে। উঠোনে বন্যার পানি ঢুকেছে। তার ওপর বাঁশ বসিয়ে পাকঘর ও পায়খানায় যাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। খোকা মাকে ডাকে। পাকঘর থেকে মাইজ্যা বুজি আগে বের হয়ে আসে।

দুপুর বেলা খাওয়া দাওয়া শেষ হলে মা কীসব গোছগাছ করতে থাকে। খোকা দেখে তার কাপড় চোপড়ও গোছান হচ্ছে। আব্বা বললেন, ‘খোকা তুমি কাল সকালে আমার সঙ্গে যাচ্ছ।’
খোকা আবাক হয়। বাবার হাত ধরে জিজ্ঞেস করে ‘আমি, আমি কেন যাবো ?’
বাবা বলেন, ‘এখন থেকে তুমি আমার কাছে থেকে লেখাপড়া করবে। ’
খোকা জিজ্ঞেস করে ‘আর মা। মা যাবে না? আমি মায়ের কাছে থাকবো আব্বা।’
বাবা বলেন, ‘আর কোনও কথা নয় খোকা। তুমি আমার সঙ্গে কাল যাচ্ছ।’
খোকা মা’কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে, ‘তোমাকে রেখে আমি যাবো না মা। তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারবো না।’ মা কোনও উত্তর দেন না। কিন্তু তার চোখ দু’টোও জলে ভেসে যাচ্ছে। সে রাতে আব্বা  তাকে অনেক বোঝালেন। বললেন, ‘লেখাপড়ার জন্য কত ছেলে শহরে যায়। কলকাতায় যায়। তুমিও একদিন বড় হয়ে কলকাতা পড়তে যাবে। তোমাকে তো অনেক বড় হতে হবে বাবা।’
খোকা মন খারাপ করা একটা কষ্ট পায়। এই টুঙ্গিপাড়া গ্রাম, মা ও অন্য আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, ভুলু, গাছ পালা, উঠোনের বরই গাছ, বড় দিঘির সেই মাছরাঙ্গা পাখিটা, স্কুলের খেলার মাঠ, পাটগাতি নদীর ঘাটের নৌকাগুলো, বোঁচা বানরটা, খাল আর বাইগার নদী সব ছেড়ে যেতে হবে। সেই অচেনা - অজানা শহরে মাঠ-ঘাট - গাছপালা - মানুষগুলো কেমন হবে? তারাও কি তাকে ভালোবাসবে!

এই টুঙ্গিপাড়ার বাতাস সে বুক ভরে নিয়েছে। এখানকার মানুষ তাকে কত ভালোবাসে। সব ছেড়ে যেতে হবে।  খোকা রাতে বাবার কাছে শোয়। বাবা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। বাবার গলা জড়িয়ে ধরে না শুলে তার তো ঘুমই আসে না। ঘুমুনোর আগে নিজের মনের সঙ্গে কথা বলে খোকা, এই টুঙ্গিপাড়া আমার জননী জন্মভূমি। আজ শহরে গিয়ে লেখাপড়া করলেও আমি তার কাছে বার বার ফিরে আসবো। এই টুঙ্গিপাড়ার মানুষ আমার আত্মীয়। আমি তাদের দু:খ কষ্ট অভাব মুছে দেবো। আমি সারাজীবন বাঙালি হয়ে থাকবো। আমি এই টুঙ্গিপাড়ার মাটির গভীরে একদিন মিশে যাব। পৃথিবীর আর কোথাও গিয়ে আমি শান্তি পাবো না।

পরদিন সকালে বাবার বজরা নৌকাটা ঠিক ঠাক করা হলো। মা খাবার রান্না করে দিলেন পথে খাবার জন্য। বাবা তাড়া দিয়ে নৌকায় উঠতে গেলেন। মা’কে জড়িয়ে ধরে খোকা হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে।
বলে “মাগো, তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাই নি। কোথাও থাকিনি। বলো কেমন করে থাকবো মা।”
ছোট ফুফু, মেজ বুজি সবাই তাকে সান্তনা দিতে থাকে। “কাইন্দো না। মাকে দেখতেই আসবা। গোপালগঞ্জে তোমার আব্বার সঙ্গে থাকবা। কোন চিন্তা কইরো না।” আক্কাস কাঁদতে কাঁদতে তার হাত ধরে টেনে নিয়ে চলে ঘাটে বজরায় তুলতে। আককাসও সঙ্গে যাবে। ভুলু আর বোঁচা বানরটাও চলেছে সবার সঙ্গে। তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “তোমরা ভালো হয়ে থেকো। হেলেন তোমাদের দেখাশোনা করবে। তোমাদের খাওয়াবে। একবারে মন খারাপ করবে না। আমি ঠিক ছুটির সময় চলে আসব। এ্যাই হেলেন তোর দায়িত্বে ওরা থাকবে। কোনো চিন্তা করবি না। আমি লেখাপড়া করে যখন বড় হবো তখন তোর সব পাওনা শোধ করে দেবো।”

খোকা চোখ মুছতে মুছতে ফিরে ফিরে তাকায়। মা, ছোট ফুপু, মেজ বুজি বড় উঠোন পর্যন্ত এলো। মায়ের কোলে নাসের। চোখ মেলে যেন বড়ভাইকে দেখছে। খোকা তাকে আদর করে চুমু খায়। মা খোকাকে জড়িয়ে ধরেন। তার কপালে চুমু খেয়ে আদরে ভরিয়ে দিলেন। বুকে জড়িয়ে ধরলেন মমতায়। মাইজা বুজি তার গায় হাত বুলিয়ে দিলো। তারাও কাঁদছিল আর সব সঙ্গীদের সঙ্গে। পাশের বাড়ির চাচারা চাচীরা সবাই এলন। ওরা ঘাট পর্যন্ত এলো বন্যার পানিতে হেঁটে হেঁটে। ঘাটে এসে সোজা বজরায় উঠে খোকা ভেতরে গিয়ে বসে। আর পিছু ফিরে দেখতে ইচ্ছে হলো না। বাবা শুয়ে আছেন। বেশ ছোট্ট বজরা নৌকা। মাঝি দু’জন। ছেড়ে দিতেই তর তর করে ছুটে চললো।

আকাশে তখন সূর্য উঠেছে। তার আলোয় চারদিক আলোকিত। গাছপালা পাতার ফাঁক দিয়ে সেই আলোর চমক ছড়িয়ে পড়েছে। বর্ষার দিনে সূর্য উঠলে চারদিক কেমন সুন্দর হয়ে ওঠে। খোকা বসে বসে এইসব দৃশ্য দেখছিল। বাবা তাকে কাছে টেনে কোলে বসান। বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরেন। গালের সঙ্গে গাল মিলিয়ে বলেন, ‘আমার খোকা বড় লক্ষীছেলে। খোকার মন খুব ভালো। লেখাপড়া করে খোকা একদিন বড় হবে। দেশের জন্য কাজ করবে। মানুষের সেবা করবে।”
খোকা কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে। তারপর বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে ‘তারপর একদিন টুঙ্গিপাড়া ফিরে আসবো। আর কোথাও যাবো না। কোথাও না।’
১৭.৩.২০১১