অবাক বইপাঠ

মুনির রানা

বাবার একটা মজার আর্কাইভ আছে। কতোরকম জিনিস যে আছে তাতে। অ্যালুমিনিয়ামের চামচ, কাঁচের কাপ (এতে করে নাকি আগে লোকে একরকম পানীয় খেতো), মোমবাতি (লম্বা মতো একটা জিনিস, বিদ্যুৎ চলে গেলে (!) নাকি এটা জ্বালিয়ে রাতের অন্ধকার দুর করার চেষ্টা করা হতো) আরো অনেক জিনিস। তবে আমার আগ্রহটা যে জিনিসে সেটি হলো বই। দুই পিঠে লেখা এমন কিছু কাগজকে একত্র করে এ বই বানানো হতো। আগের দিনে মানুষ নাকি বই পড়ে জ্ঞানী হতো। ২৩শ বা ২৪শ সালেরও বেশ কিছু পুরনো বইও আছে বাবার কাছে। বাবা বলেন এগুলো নাকি ইতিহাসের দলিল। এগুলো পড়লে আগেকার দিনের মানুষ সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। বাবাকে অবশ্য আমি কখনো বইগুলো পড়তে দেখিনি। মা তো ওর ধারে কাছেও যায় না।

বাবার আর্কাইভে ঢোকা আমার বারণ। কিন্তু তবু আমি লুকিয়ে মাঝে মাঝে ঢুকি। কাল বাবা সেন্টারে যাওয়ার পরে এক ফাঁকে আর্কাইভ থেকে আমি একটা বই সরিয়ে নিয়ে এসেছি। দু হাজার পাঁচ সালের বই এটা। এতো পুরনো বই এর আগে আমি দেখিনি। বইটা হাতে নেয়ার পর অদ্ভুত একটা আনন্দ হলো আমার। একটু উল্টে পাল্টে দেখলাম। পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও লেখাগুলো কিছুটা ঝাপসা। তবে অধিকাংশই পড়া যায়। পুরনো ধাঁচের হরফ হলেও বাক্যগুলো শেষ পর্যন্ত বোঝা যায়। তাছাড়া পড়ার জন্য বিশেষ কষ্ট করতে হবে না। আমাদের বাসায় রিডিং মেশিন আছে। যে কোন লেখা তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলে এখনকার চলতি ভাষায় সেটাকে বদলে দিতে পারবে সে।

চুপিচুপি সযতনে বইটা নিয়ে আমি আর্কাইভ থেকে বেরিয়ে সোজা আমার গোলঘরটায় চলে এলাম।
মা ওয়ালটিভিতে বান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডা দিচিছল। চান্সে আমি রিডিং মেশিনটা বের করে পড়া শুরু করলাম। কিছুদূর পড়লাম, কিন্তু কিছুই বুঝলাম না। মেশিনে কোন গোলমাল আছে কিনা সেটা একবার চেক করে দেখলাম। না, মেশিন ঠিকই আছে। ভাবলাম হয়তো বইয়ের মধ্যেই কোথাও গোলমাল আছে । বইয়ের বিবরণ আমাদের পরিচিত গ্রহের সাথে মেলে না। আবার গোড়া থেকে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগলাম। এবার ধীরে ধীরে আমার মনে একটা সন্দেহ দেখা দিলো : এটা এই পৃথিবীর কাহিনী তো?

বইয়ের যেখান থেকে শুরু সেখানে রবিন নামে এক ছেলের বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে
‘রবিনটা এতো দুষ্টু, কখন যে কি করে বসে। ও আসছে শুনলেই ওর দাদুর চুল খাড়া হয়ে যায় ভয়ে।’
এটুকু পরে আমার ভুরুতে একটা ভাঁজ পড়লো। ভয় পেলে আমার গায়ের লোম মাঝে-মধ্যে খাড়া হয় বটে। কিন্তু মাথার চুল কখনো খাড়া হয়েছে বলে মনে পড়ে না।

কি জানি আগেকার দিনে হয়তো হতো। ব্রাত্য তো বলে আগেকার দিনে মানুষ নাকি ৩ বেলা পেট পুরে খেতো। খাওয়া-দাওয়ার চিন্তাতেই নাকি অধিকাংশ মানুষের রাতে ঘুম হতো না। ব্রাত্য খুব উন্নতমানের রোবট। ওর আই কিউ বেশ ভাল। তবে ওর সব কথা আমি বিশ্বাস করি না। ব্রাত্য’র সাথে অনেকদিন আমার যোগাযোগ নেই। অতিরিক্ত চিন্তা করার ফলে ওর সিপিইউ তে গোলমাল লেগেছে। ও এখন স্যানাটোরিয়ামে আছে। ও থাকলে এ কাহিনীরও হয়তো একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে দিত।
যাকগে বইয়ের কথায় ফিরে আসি।
বইয়ে এরপরের বর্ণনা দেখি আরো ভয়াবহ। লেখক লিখেছেন,
‘রবিনের কাজ কারবার দেখলে সবার চোখ কপালে উঠে যায়।’
এ জায়গাটা পড়ে আমার শরীর আতঙ্কে শিরশিরিয়ে উঠলো। এটা কিভাবে সম্ভব আমার মাথায় ঢুকলো না। মানুষের চোখ কপালে কিভাবে ওঠে! আর চোখটা কি ভিতরের দিক থেকে উপরের দিকে ওঠে নাকি বাইরে বের হয়ে তারপর উপরে ওঠে। এই ব্যাপারে পরিষ্কার কিছু বলা নেই। সম্ভবত বাইরে থেকেই ঘটতো ব্যাপারটা। একটু পরে আরেক জায়গায় গিয়ে আমার মনে এই ধারণাটা বদ্ধমূল হলো । সেখানে লেখা আছে-
‘ বুড়ো লোকটা ঘরের এক কোণ থেকে আরেক কোণে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। রবিনের চোখ বুড়ো লোকটাকে অনুসরণ করতে লাগলো।’
এটা পড়ে আমার শরীরে রীতিমতো ঘাম দেখা দিল। গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল।
আমি দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। একটা মানুষের চোখ তার কোটর থেকে বের হয়ে আরেকটা লোককে অনুসরণ করে চলেছে। চোখগুলো কি ঘুরতে ঘুরতে মানে বলের মতো গড়িয়ে গড়িয়ে ঘুরছিল, নাকি বাতাসে শুধু ভেসে ভেসে যাচিছল। দ্রুত, নাকি ধীরে। চোখের এরকম কান্ড-কারখানায় গল্পের ভিতর কাউকে বিস্মিত হতে দেখা যায়নি। এটাই আমাকে অবাক করেছে বেশি। এমন একটা অদ্ভুত ঘটনা কারো নজরেই পড়লো না তা তো হতে পারে না। তার মানে ব্যপারটা সবার কাছে খুবই স্বাভাবিক ছিল বোঝা যাচেছ। চোখ যে আবার তার কোটরে ফিরে এসেছিল সেটার উল্লেখ নেই। তবে কাহিনী পড়ে ধরে নেয়া যায় সেটা হয়েছিল। বাহুল্য বিবেচনায় লেখক তার উল্লেখ করেননি হয়তো।

কিন্তু এহ বাহ্য! এর পরের লাইনগুলো পরে আমার মাথাতো রীতিমতো তাজ্জিম মাজ্জিম করতে লাগলো। হৃৎপিন্ড ধ্বকধ্বক করতে লাগলো। ঐ বুড়ো লোকটার প্রসঙ্গেই বলা হয়েছে। ঐ ব্যাটাই গল্পের ভিলেন। তাকে পাকড়াও করতে রবিনের দল তক্কে তক্কে ছিল।
তো এরপরে একজায়গায় লিখেছে ,
বুড়ো লোকটার তেলেসমাতি দেখে রবিনের বন্ধুদের মাথা ঘুরে গেল।
মাথা ঘুরে যাওয়ার পরও যে তাদের শারিরীক কোন সমস্যা হয়েছে তার কোন ইঙ্গিত নেই। অর্থাৎ ধরে নেয়া যায় হয়নি। শুধু এটা নয়, কয়েক জায়গায় যেমন ৫৬ পৃষ্ঠায় দেখলাম রবিনের এক বন্ধু ওর কাছে এসে বলছে
রবিন আমি ভুল করে জর্দা দেয়া পান খেয়ে ফেলেছি। আমি শেষ। আমার মাথা বনবন করে ঘুরছে।’
কল্পনায় একবার দৃশ্যটা দেখে নিলাম। একটা ছেলের মাথা বনবন করে ঘুরছে। এর আগে শুধু ঘোরায় সমস্যা হয়নি। কিন্তু এখন বনবন করে ঘোরার ফলে যে সমস্যা হচেছ তা বেশ পরিস্কার। ঘাড়ের উপর একটা মাথা বনবন করে ঘুরছে- ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ মজার মনে হলো। ইশ্শ একবার যদি দেখতে পারতাম।
এতক্ষণ পড়তে পড়তে আতঙ্ক থেকে কিছুটা আত্মস্থ হয়ে উঠেছি আমি। সিজিয়ামের দেয়ালে হেলান দিয়ে কিছুটা বোঝার চেষ্টা করছি ব্যাপারটা কি। এর মধ্যে মা আমাকে একবার দেখে গেছে। তার মন এখন খুবই ভালো। বই পড়তে দেখেও আমাকে বকলো না। আমার উত্তেজনা দেখে মা একবার শুধু আমাকে জিজ্ঞেস করলো কি ব্যাপার বর্ণ, কি পড়ছিস অত টানটান হয়ে।
বললাম একটা বই।

কবেকার।
২ হাজারের।
কি আছে ওতে।
আমি কিছু বললাম না। আমি জানি আমার ধারণার কথা বললে মা আমাকে পাগল ঠাউরাবে। বইটা  নিয়ে আমি পেছনের ক্রিস্টাল বারান্দায় চলে এলাম। রিডিং মেশিনে পড়তে শরু করলাম আবার।

কাহিনীতে এরপর রবিনের দল একটা পরামর্শ করতে বসে। তখন একজন আবার বলে ওঠে বুড়োটার ব্যাগ সার্চ করতে হবে গোপনে। সার্চ করার কথা শুনেই রবিনের বন্ধু অসীম ভয় পেয়ে গেল। ভয়ে ওর মাথা খারাপ হয়ে গেল।
এটা কি ব্রাত্য’র মতো ব্যাপার কিনা বুঝলাম না। এখানে এসে গল্পে বেশ উত্তেজনা টের পেলাম। এরপরও অনেক অস্বাভাবিক ঘটনাই ঘটলো। অস্বাভাবিক অবশ্য আমার কাছে। সেসময়ে নিশ্চয়ই এটা অস্বাভাবিক ছিল না। থাকলে নিশ্চয়ই লেখক সেটা কোথাও না কোথাও উল্লেখ করতেন।

খুব দ্রুত আমি পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগলাম। একেবারে শেষে গিয়ে পেলাম সবচেয়ে বড় চমকটা। ওদের মিশন সফল হওয়ার পর অর্থাৎ বুড়ো বদমাশটাকে হাতেনাতে ধরার পর লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী
রবিন ও তার বন্ধুরা আনন্দে আটখানা হয়ে লাফাতে লাগলো।
ওরা ছিল ৪ জন। প্রত্যেকে দু টুকরা হয়েছিল নাকি এক একজনই আট টুকরা হয়েছিল তা বুঝলাম না। সম্ভবত পরেরটাই। চোখ বুঁজে আমি দৃশ্যটা কল্পনা করতে লাগলাম। আহা, এক একটা দেহ আট টুকরা হয়ে নেচে নেচে বেড়াচেছ সবুজ মাঠের উপর। কী অসাধারণ দৃশ্য।      

রবিনের বাহিনীর মিশন সফল হওয়ায় আমার খুবই ভাল লাগলো।

বইটা বন্ধ করে আমি ভাবতে লাগলাম। এবং ভাবতে ভাবতে আমি নিশ্চিত হলাম, বলা যায়, আবিষ্কার করলাম যে, এই দুনিয়ায় ২ হাজার সালের দিকে ভিনগ্রহের কোন প্রাণী বাস করতো। তারা এই গ্রহে আগ্রাসন চালিয়েছিল কিনা আমি জানি না। এটাও জানি না কিভাবে তারা এই দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেল। কিন্তু আমি এটা নিশ্চিত যে তারা ছিল। এ ছাড়া এই বইয়ের আর কোন ব্যাখ্যা আমি পাই না।
আমার দাদু বলেছিলেন আগেকার দিনের মানুষ নাকি শরীরকে জয় করতে পেরেছিল। নানা রকম মন্ত্র তন্ত্রের সাধনা করে তারা নাকি শরীর নিয়ে যা খুশি তাই করতে পারতো। শরীরের যে কোন অংশকে তারা অবলীলায় আলাদা করতে পারতো। চোখ হাত পা। বিনা কষ্টে বিনা যন্ত্রণায়। সেসব মন্ত্র নিষিদ্ধ হয়েছে অনেক আগেই।  কিন্তু এ বইটা যে সময়ের তখন মানুষ মন্ত্র যুগের চেয়েও এগিয়েছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই।
আমাদের বিজ্ঞানপল্লীর লোকেরা ভিনগ্রহের প্রাণীর সন্ধানে প্রাণপাত করছে। এই বই পেলে তারা চমকে উঠবে সন্দেহ নেই। তার আগে আমি ঠিক করলাম ইশতি ভাইয়া আর অন্তি আপুকে চমকে দেব।
আমি ব্যালকনি থেকে নেমে এলাম নিচের ছোট্ট মাঠে। আমার কি যে আনন্দ লাগছিল এমন একটা দারুণ জিনিস আবিষ্কার করে। আমার এই আবিষ্কারের খবর এখনো কেউ জানেনা। আনন্দে আমি নাচতে লাগলাম ঘুরে ঘুরে।