এটা আমার বাবার গল্প, মায়েরও

শাহ্‌নেওয়াজ চৌধুরী

বাবা আমাকে ‘ফাঁকিবাজ’ বলে ডাকেন। কিন্তু ভাইয়ার প্রশংসা করেন সবসময়।

আমি পড়ালেখায় ভালো নই। ফাঁকি দেই বলেই ভালো নই। কিন্তু ভাইয়া খুব ভালো ছাত্র। বরাবর ক্লাশে ফার্স্ট হয়। শুধু গতবার ফাইনাল পরীক্ষার আগে অসুস্থ হয়ে পড়ায় ফার্স্ট হতে পারেনি। সেকেন্ড হয়েছে। বাবা তাতে একটুও রাগ করেননি। বরং নরম গলায় ভাইয়াকে সান্ত্বনা দিয়েছেন । “এটা কিছু না। ভালো করে পড়ালেখা করলে সামনের বার ঠিক ফার্স্ট হতে পারবি।”

কিন্তু সেভেনে ওঠার সময় আমার রোল নাম্বার যে ছেচল্লিশ থেকে এগিয়ে ত্রিশে পৌঁছল, বাবা তখন বললেন, “মৃদুলকে দিয়ে কিছু হবে না। ও তো মহা ফাঁকিবাজ! ওকে চিড়িয়াখানার বানরগুলোর সঙ্গে রাখা দরকার।”

একমাত্র মা আমার পক্ষে কথা বলেন।
বাবার এমন কথায় মা বললেন, “ওমা, ছেলেটা লাফ দিয়ে ষোলটা ঘর পার হল তাতেও সামান্য প্রশংসা পাবে না?”
“ষোল ঘর পার হয়েও তো ত্রিশের সামনে আরও ঊনত্রিশ ঘর বাকি!”, বাবা বললেন।

golpo_39_2.jpg কিন্তু আমি ওসব মানি না। যতটুকু এগিয়েছি সামনের বার হয়তো আরো আগাব। তাছাড়া সবাই ফার্স্ট-সেকেন্ড হতে চাইলেই তো চলবে না। ফার্স্ট তো মাত্র একজন হয়। সেকেন্ডও একজন। একটা নম্বর কয়জনকে দেয়া যায়? একটা নম্বরে ক’জন বসতে পারে? আমি ভাবি । আচ্ছা, বাবা এই সাধারণ বিষয়টা কেন বোঝেন না!
মা বোঝেন। মা বলেন, “তুই চেষ্টা কর্‌। আস্তে আস্তে আগাতে হয়। এই যে ষোল ঘর আগালি, এরপর আরেকটু...তারপর আরেকটু। এক সময় দেখবি ফার্স্ট হয়ে গেছিস।”
“আমি যদি ফার্স্ট হই তাহলে আমাদের ফার্স্টবয়ের কী হবে মা? ও আমার চেয়ে কত ভালো ছাত্র!”
মা বলেন, “ও তো পড়েই ভালো ছাত্র হয়েছে, তাই না? তুইও ভালোভাবে পড়বি।”

“তাহলে তো ক্রিকেট খেলা বাদ দিতে হবে।”
“তা কেন? পড়ার সময় পড়া, খেলার সময় খেলা। তবে স্কুল ফাঁকি দিয়ে তুই যে তন্ময়দের পাড়ায় গিয়ে ক্রিকেট খেলিস। এসব করলে চলবে না।”
“আচ্ছা মা, স্কুল ফাঁকি দেব না। কিন্তু বাবাকে বলো, আমাকে একটা ভালো ব্যাট কিনে দিতে। তাহলে পড়ালেখায় একদম ফাঁকি দেব না আমি।”
“তোর বাবা এ কথা শুনলে আস্ত রাখবে না। একটা বেসরকারি হাসপাতালের চাকরীর আয় দিয়ে সংসার খরচ, তোদের লেখাপড়ার খরচ এত কিছু চলে? কষ্ট করে চালাতে হয়। সেলাই মেশিন চালিয়ে আমি আর কয়টাকা হাতে তুলতে পারি?”

golpo_39_3.jpg আমি আর কিছু বলি না। মা’র কাছ থেকে পড়ার টেবিলে যাই। কিন্তু আমার একটা ক্রিকেট ব্যাট দরকার। টাকা জমিয়ে যে ব্যাটটা কিনেছিলাম সেটা টেনিস বল পেটানোর। কাঠের বল পেটাতে গিয়ে ভেঙে গেছে। এখন তন্ময়ের ব্যাট নিয়ে খেলতে হয়।
রাতের খাবার খেতে বসে বাবা বললেন, “মৃদুল, তোমাকে খুব দামী একটা ক্রিকেট ব্যাট কিনে দেব। ”

দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের পর হঠাৎ বাল্ব জ্বলে ওঠার মতো চমকে উঠলাম বাবার কথা শুনে। এত সহজে রাজি হলেন বাবা! বাবার মুখের দিকে তাকালাম।
বাবা পানি খাচ্ছিলেন। গ্লাসটা নামিয়ে রেখে বললেন, “তবে সেই দামী ব্যাটটার জন্য তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে।”
এবার যেন আবার লোডশেডিং শুরু হল। দপ করে বাল্ব নিভে যাওয়ার মতো আমিও নিভে গেলাম বাবার কথা শুনে।

golpo_39_4.jpg খেতে খেতে বাবা বললেন, “আর তিন-চার মাস পরেই তো তোমার ফাইনাল পরীক্ষা। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করো, তাহলেই তুমি তোমার দামী ব্যাটটা পেয়ে যাবে। আর ভালো রেজাল্ট মানে রোল নাম্বার পাঁচের ভেতর নিয়ে আসতে হবে।”

বাবার কথা আমার একটুও ভালো লাগল না। ধ্যাৎ, বাবা যা বললেন তা তো ভাইয়াকে দিয়ে সম্ভব। ভাইয়া নিশ্চিত বলতে পারে। সে ভালো রেজাল্ট করবে, সামনের বার সে ফার্স্ট হবে। কিন্তু আমি? দামী ব্যাটটার জন্য আমার খুব আফসোস হল।

আফসোস হল ভাইয়ার মতো ফার্স্ট-সেকেন্ড না হতে পারার জন্য! ইস্‌, আমি যদি অমন ছাত্র হতাম, তাহলে নিশ্চয়ই দামী ব্যাটটা আমার হাতছাড়া হত না।

‌‍golpo_39_5.jpg“শোন্‌ বাবা, ভালো কিছু পেতে হলে চেষ্টা করতে হয়, সাধনা করতে হয়। চেষ্টা কিংবা কষ্ট ছাড়া কে কবে ভালো কিছু পেয়েছে? আমার কথাই ধর্‌। আমার যখন মেট্রিক পরীক্ষা তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল। পরীক্ষা দেয়া হল না আর। আমাদের গ্রামের পান্নাভাই ইপিআর-এ চাকরি করতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে চাকরি ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলেন। তার সঙ্গে দল বেঁধে গ্রামের আরও অনেকের সঙ্গে ভারতে চলে গেলাম যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে। তারপর পান্নাভাইয়ের নেতৃত্বেই যুদ্ধ করলাম। মুক্তিযুদ্ধ শেষে গ্রামে ফিরে দেখি সব লণ্ডভণ্ড। সারা দেশটাই তো তখন লণ্ডভণ্ড। আমার যুদ্ধে যাওয়ার কারণে বাবাকে মিলিটারিরা ক্যাম্পে ধরে নিয়ে মেরে ফেলেছিল। বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে ফেলেছিল। মা চলে গিয়েছিলেন মামাদের বাড়ি। এইসব গুছিয়ে উঠে কি আর পড়ালেখা হয়? তবু চেষ্টা করলাম। কষ্ট করে হলেও মেট্রিক, আইএ পাশ হল। কিন্তু সেইটুকু বিদ্যায় হাসপাতালের এই চাকরিটা জুটেছিল। তারপর চাক্‌রি করতে করতে বিএ পরীক্ষাটাও দিলাম।”
একটু থেমে বাবা বললেন, “এসব কিছুর জন্য অনেক কষ্ট করতে হয়েছে, সাধনা করতে হয়েছে। কিন্তু তোমাদের তো এত সমস্যা নেই বাবা। তোমরা ভালো করে পড়ালেখা করো।”

আমার দিকে তাকিয়ে বাবা প্রশ্ন করলেন, “কী, পারবে না বাবা ভালো রেজাল্ট করতে?”
বাবার কথা শুনে আমার খুব মন খারাপ হল। তখনই মনে মনে ঠিক করলাম আর পড়ালেখায় ফাঁকি দেব না। বাবার প্রশ্নের উত্তরে বললাম, “পারব বাবা।”
বাবা বললেন, “না, তোমার ক্রিকেট খেলা ছাড়তে হবে না। খেলার সময় খেলবে, পড়ার সময় পড়বে।”

তারপর থেকে আমি আর স্কুল ফাঁকি দেই না। ঠিকমতো পড়ালেখা করার চেষ্টা করি। কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষার আগে আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম। খেতে মন চায় না, মাথা ঘোরে, বমি বমি লাগে, জ্বর হল। বাবা আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার বললেন, “জন্ডিস হয়েছে। কমপ্লিট বেডরেস্টে থাকতে হবে। প্রচুর পরিমাণে পানি, শাক-সবজি খেতে হবে। একটুও রোদে যাওয়া চলবে না।”

golpo_39_6.jpg পরীক্ষার আগে অসুস্থ হয়ে পড়লাম, আমি ভাবলাম বাবা আমাকে বকাবকি করবেন। কিন্তু না। বাবা আমার জন্য ডেক্সট্রোজ, চিড়া, ইসুবগুল আর কী কী ওষুধ নিয়ে এলেন।

আমি প্রায় সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকি। আস্তে আস্তে আমার শরীর আরও খারাপ হল। দুর্বল হয়ে পড়লাম। মা শরবত, চিড়ার পানি, ডেক্সট্রোজ গুলে বারবার খেতে দেন। কখনো বাবা একাজটি করেন। বাবা বেলের শরবত পছন্দ করেন। নিজের হাতে বেলের শরবত, লেবুর শরবত বানিয়ে খাওয়ান আমাকে। লোডশেডিং হলে হাত পাখা দিয়ে বাতাস দেন।
আমাকে নিয়ে বাবা-মা’র চিন্তার শেষ নেই। পারলে হাতে ধরে রোগ সারিয়ে দিতেন।

আজ বাবা ঘরে ফেরার পর মা বললেন, “মৃদুল খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। ওকে আরেকবার ডাক্তারের কাছে নেয়া দরকার।”

বাবা বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, “আর ডাক্তার! ডাক্তারদের কাছে যেতে একদম মন টানে না। কী অদ্ভুত ব্যবহার তাদের! হাসপাতালে বসে দেখি তো! একটু থেমে বাবা বললেন, রোগীর সঙ্গে যদি ভালো ব্যবহার না করবে, তাহলে ডাক্তার হওয়ার উদ্দেশ্য কী? আরে শুধু টাকা আয়-ই কি বড় কথা? দেশটার জন্য কিছু করার মানসিকতা তো থাকা উচিত।”

বাবার কথা শুনে ভালো লাগে। বাবা সব সময় দেশের কথা ভাবেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা বলেই হয়তো ভাবেন। আর ডাক্তারদের কথা শুনে খারাপ লাগে। আমি ভাবি। বড় হয়ে ডাক্তার হব। ডাক্তার হয়ে রোগীদের সঙ্গে আমি কখনো খারাপ আচরণ করব না।

আমি শুয়েছিলাম। বাবা এসে আমার মাথার কাছে বসলেন। মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে প্রশ্ন করলেন, “বাবা, আগের চেয়ে কি ভালো লাগছে কিছুটা?”

আমার কাছ থেকে জবাবের অপেক্ষা না-করে বললেন, “সুস্থ হয়ে যাবে। একদম চিন্তা নেই। সুস্থ হয়ে ওঠো, আমি তোমাকে সুন্দর একটা ক্রিকেট ব্যাট কিনে দেব।”
মা বললেন, “খেলার জন্য তোকে আর বকব না বাবা। সুস্থ হয়ে ঠিক খেলতে পারবি তুই।”
আমি একবার বাবার মুখের দিকে, একবার মায়ের মুখের দিকে তাকাই। নিজেকে তখন একদম ছোট্টটি মনে হয়!


শাহ্‌নেওয়াজ চৌধুরী/এবি/এমআইআর/০৭ জুলাই