গড়ে আটকা এক নেকড়ে

মোঃ মিন্টু হোসেন

ঢাকার এক স্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়ে সাগর, এবারের গ্রীষ্মের ছুটিটা সে তার মেজো মামার বাড়িতেই কাটাতে চায়। মেজো মামা থাকেন সিলেটে, সেখানে মামাতো ভাই রেজার সঙ্গে তার খুবই জমবে! কিন্তু ছুটিটা তো প্রায় শেষই হয়ে আসছে! কমলগঞ্জ এলাকায় মেজো মামার চাকরি। কিন্তু যেতে চাইলেই তো আর যাওয়া হয়ে ওঠে না। ছুটির প্রায় শেষদিকে এসে সাগরের কপাল খুললো। বড়ো মামা আর মামী ঢাকা থেকে সিলেটে যাচ্ছেন। ঠিক হলো সাগরকে সঙ্গে নেবেন তারা।

মেজো মামী আর রেজা সাগরকে দেখে তো মহাখুশি। দিনের বেলাটা বেশ আনন্দেই কাটলো সাগরের। কমলগঞ্জ দারুণ একটা এলাকা। ছোটো ছোটো টিলা আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা একটা গ্রাম। সে ঘুরে ফিরে দেখলো চারপাশটা। দেখে তো সে মুগ্ধ হয়ে গেলো। রাত হলে শুয়ে পড়লো সাগর। তখন সবেমাত্র ঘুম ঘুম চোখ তার। হঠাৎ দূর থেকে কেমন যেন একটা শব্দ ভেসে এলো। মনে হলো  অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে সে শব্দটা।

হু..হু..হু..হু..হুম। হু..হু..হু..হু..হুম। আবারও শব্দটা শুনতে পেলো সাগর। এবার যেন খুব কাছে। খুব ভয় পেলো ও। কিসের শব্দ? পাশে ছিলো মামাতো ভাই রেজা। ওতো ঘুমিয়ে কাদা। তবু ওকে ডাকবে ভাবলো। তারপর মনে হলো, ও যদি ভাবে আমি ভয় পেয়েছি, তাহলে কি হবে! ভয়ে ভয়ে ঘুমিয়ে পড়লো সে।

সকালে নাস্তার টেবিলে দেখতে পেল, সবাই যেন গোল বাধিয়েছে। মেজো মামী সাগরকে জিজ্ঞাসা করলেন- কোনো সমস্যা হয়েছে কিনা। সাগর বললো, না কোনো সমস্যা হয়নি। তবে রাতে ভয়ানক একটা শব্দ শুনেছিলাম, ওটা কিসের শব্দ? এবার মেজো মামা মুখ খুললেন। বললেন, ওটা বাঘের ডাক।

 সাগর বললো- বাঘ তো হালুম, হালুম ডাকে কিন্তু এরকমটি কেন ডাকলো! মেজো মামা বুঝিয়ে বললেন, এটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার নয়; হয়তো কোনো চিতা বা নেকড়ে টেকড়ে হবে।  কিন্তু সিলেটের এ অঞ্চলে নেকড়ে বা চিতা আসবে কোত্থেকে? মামা বললেন, চা-বাগান আর ছোটো-বড়ো জঙ্গলের মধ্যে বাঘটা হয়তো লুকিয়েছে। এ অঞ্চলটাতে বাঘ না থাকলেও হয়তো হিমালয়ের কোনো অঞ্চল থেকে খাবারের খোঁজে চলেও আসতে পারে। সাগর ভয় পেলো।

মামা বাঘটা আবার আক্রমণ করে বসবে নাতো? মামা বললেন না, না, এটা ততো হিংস্র নয়। তবে, শ্রমিকরা নাকি জানিয়েছে, বাঘটা এখন উত্তরের জঙ্গলের দিকে রয়েছে, গতকাল আস্ত একটা গরু ধরে নিয়ে গেছে।

সারাদিন বাঘের কথাটা ভেবে ভেবেই দিনটা কাটলো সাগরের। মামা-মামী আর রেজার সঙ্গে পুরো এলাকটা ঘুরে দেখলো ভালো করে। তবে, মনের মধ্যে সবসময় উঁকি দিচ্ছিল ঐখানে  বুঝি বাঘটা লুকিয়ে আছে। রাতে আবারও সে ডাকটা শোনা গেলো। তবে, এবার  আরো জোরে। ভয়ংকর হিংস্র সে ডাক। রক্ত হিম হয়ে এলো।

পরের দিন সকালে মামা বললেন, বাঘটা ভয়ানক হিংস্র হয়ে উঠেছে। আজ রাতে এক শ্রমিকের বাড়িতে আক্রমণ করে ছোটো বাচ্চাটাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো। শ্রমিক মারতে গেলে তাকে কামড়ে দিয়েছে।

সাগর জিজ্ঞাসা করলো, মামা বাঘটা কতো বড়ো? মামা বললেন, শ্রমিকরা বলছে ওটা নাকি আকারে অনেক বড়ো। ওটা চিতাবাঘ হবার সম্ভাবনাই বেশি। মামা বললেন, আজ রাতে বাঘটাকে মারার পরিকল্পনা করেছে।

মামা বাঘ মারা তো ঠিক নয়। তবে, কেন মারবে ওটাকে? মামা বললেন ঠিক মারা নয়, তবে ওটাকে ধরে সংরক্ষিত বনে ছেড়ে দেয়া হবে।  কিভাবে বাঘটাকে ধরা হবে বা কে ওর সামনে যাবে?

মামা বললেন শ্রমিকরা আজ রাতে গড় করবে।
সাগর বললো- কি করবে মামা?
-‘গড়’
-‘গড়’সেটা কি মামা?
-গড় মানে হলো ফাঁদ। বাঘটাকে ধরতে ফাঁদ পাতা হবে। উঁচু উঁচু জাল দিয়ে চারপাশ ঘিরে ফেলা হবে। তার চারদিকে মশাল জ্বালিয়ে দেয়া হবে। শিকারীরা চারপাশে মাচা পেতে বসে থাকবে। তারপর বাঘটি বেরোলেই তাকে জাল দিয়ে আটকে ফেলা হবে। অনেক লোক আর আগুন দেখে বাঘটি ভয় পেয়ে বোকার মতো কাণ্ড করে বসবে।

কিন্তু মামা যদি উল্টা হয়, যেমন, সে হিংস্র হয়ে গেলো বা আক্রমণ করে বসলো?
‘এ কাজ কেবল সাহসী শিকারীরাই করতে পারে। আর চারপাশে তো জাল দিয়ে ঘেরা থাকছেই। শিকারীরা জালের মধ্যে ঢুকে বাঘটিকে পাকড়াও করবে।’

মামা বাঘটি যদি ওখানে না থাকে?
বাঘরা একটু বিলাসী হয়তো। তাই একটা বাঘ শিকার করার পর কয়েকদিন একটা জায়গায় আস্তানা গাড়ে। যতোদিন খাবার না ফুরোয় ততোদিন আর শিকার করে না। শুনলাম এ বাঘটি একটা টিলায় আস্তানা গেড়েছে। সে টিলাটি ঘিরেই গড় তৈরি করা হচ্ছে।
মামা ওরা কি নিশ্চিত বাঘটি টিলাতে আস্তানা গেড়েছে?
হ্যাঁ, ওরা রক্তের দাগ দেখেছে। আর দেখেছে বাঘটি একটা গুহায় আস্তানা গেড়েছে।
সাগর মামাকে বলেই ফেললো, মামা আমি গড় দেখবো।
মামা বললেন- ঠিক আছে, রাতে তৈরি থেকো।

রাত দশটার পর মামার সঙ্গে বেরিয়ে পড়লো সাগর। ওর সঙ্গী হয়েছে রেজা। রেজা অবশ্য এর আগে আরেকবার গড় দেখার সুযোগ পেয়েছিলো। সেবার কি কি হয়েছিলো সে ঘটনা শোনানোর পুরো সুযোগটির ব্যবহার করে ফেললো সে। একসঙ্গে যেতে যেতে এমন সব রোমহর্ষক ঘটনা বলতে শুরু করলো সে, তা শুনে রীতিমতো ভয়ই করতে লাগলো সাগরের। মামা মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন।

গড়ের কাছে পৌঁছাতে প্রায় একঘন্টার বেশি সময় লাগলো। রেডিয়ামের আলোয় ক্যাসিও ঘড়িটাতে সময় দেখে নিলো সে।
গড়ের কাছে পৌঁছে তো সাগরের চোখই ছানাবড়া। গড় কোথায়? এতো দেখা যায় একটা কুঁড়েঘর। তার সামনে মশাল জ্বলছে।  কুঁড়ের মধ্যে বাঁশের মাচা পাতা। সেখানে কয়েকজন বসে স্থানীয় ভাষায় গল্প করছে। একটু দূরেই দেখা গেলো কয়েকজন লোক কি যেন একটা গোল করে ঘিরে বসেছে। ভালো করে খেয়াল করে সাগর দেখলো তারা একটা হাড়িতে কিছু একটা রান্না করার চেষ্টা করছে। ওদের এগিয়ে যেতে দেখেই কাঁধে গামছা ঝোলানো, একটু ভদ্রগোছের একটা লোক এগিয়ে এলো। মেজো মামাকে কি যেন বললো। তারপর দুজনে হাসতে লাগলো। মামা সাগরকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আর রেজা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো। লোকটি চলে গেলো।
ওরা আরো সামনের দিকে এগিয়ে গেলো। কিছুদুর গিয়ে দেখে আবারও কিছু লোক কুঁড়ে করে বসেছে। সাগর জিজ্ঞেস করলো মামা এরা কারা? এভাবে কি করছে?
-এরাই তো গড় পাহারা দিচ্ছে। এভাবে পুরো টিলাটাকে ঘিরে রয়েছে বেশ কিছু মাচা। প্রতিটির পাশেই লোকজন পাহারা দিচ্ছে। এভাবে লোক দেখা গেলেও সাগর গড় দেখতে পেলোনা।  রেজা ওকে দূরে একটা আলোর দিকে খেয়াল করতে বললো।  ওখানেই নাকি গড়। একটু ভালো করে তাকিয়ে দেখলো, দড়ির জাল টানানো হয়েছে আর তার একটু দূরেই জ্বলছে মশাল।

এভাবে ঘুরে দেখতে অনেক রাত হয়ে গেলো। সাগরের উত্তেজনা বাড়ছিলো, কখন বাঘ ধরা হবে? কিন্তু কোনো উৎসাহ কারো মধ্যেই দেখা যাচ্ছেনা। এদিকে ঘুম আসছে। সাগর আর রেজার বাড়ি ফিরতে মন চাইছিলো। মামা মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন। আবার অনেকটা পথ হেঁটেই যেহেতু ফিরতে হবে তাই তিনি বললেন- তোমরা বাড়ি যাও।

রাত প্রায় ২ টা বাজে। ওরা বাড়ি ফিরবে কিভাবে? মেজো মামা কি করবে? মামা ওদের মনের অবস্থা আঁচ করে বললেন- আমি রাতে এখানেই থাকবো। এরা আমার পরিচিত। তোমাদের বাড়ি পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করছি। একটু পরে গামছা ঘাড়ে করে বেড়ানো সে লোকটি ওদের পৌঁছে দেবার জন্য এলো। সাগর ওর নামটি জেনে নিয়েছিলো- রমজান আলী।

সে রাতে বাড়িতে ফিরে কিছুতেই ঘুম এলোনা সাগরের। আজ রাতে আর বাঘের ডাকও শোনা গেলোনা। একসময় ঘুমিয়ে পড়লো সে। স্বপ্ন দেখলো- ডোরাকাটা একটা ইয়া বড়ো বাঘ তার গলায় আবার কেশর! ঘুমের মধ্যেই হাসি পেলো ওর। বাঘের আবার কেশর হয় নাকি! কেশর তো হয় সিংহের।

সকালবেলায় নাস্তার টেবিলে মামার দেখা মিললো। সাগর তো উত্তেজনা চেপে রাখতে পারছিলো না।

মামা বাঘ কি ধরা পড়েছে?

মামা ঘুম জড়ানো গলায় বললেন- নাহ! সে ব্যাটায় গড় করা দেখেই হয়তো চম্পট দিয়েছে। সাগরের মনটা উত্তেজনার বদলে নিরাশায় ভরে গেলো।

চারদিন পার হয়ে গেছে। আবারো স্কুল খুলছে। অনেক পড়াশোনা বাকি। সাগরকে ঢাকায় ফিরতে হলো। ঢাকায় ফিরে ক্লান্তিভরা দুচোখ নিয়ে আবারও বিছানায় গেলো সে। এবারে সে স্বপ্ন দেখলো- সিলেটের সবুজ ঘন বনে একটা নেকড়ে বাঘ ঘুরছে, কিন্তু তার চারপাশে গড়। সাগর কেন জানি, গড়ের একটা কোনা কেটে দিয়েছে, সেখান দিয়ে দ্রুত ছুটে পালাচ্ছে ভয়ংকর নেকড়েটা।