বিন্নির খুশি

এনায়েত রসুল

এক.
আজ ঈদ- আজ খুশির দিন। মা রান্নাঘরে কাজ করছেন। বাবা গেছেন মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য। শুধু বিন্নি শুয়ে আছে ওর বিছানায়। শুয়ে শুয়ে ভাবছে এই দিনটি সে কিভাবে কাটাবে। হঠাৎ সেই ভাবনায় ছেদ পড়লো টেলিফোনের শব্দে। পাশের ঘরে টেলিফোন । ওটা বেজে উঠলো ঝনঝন করে।
টেলিফোন অবশ্য মা-বাবাই রিসিভ করেন। কখনো যদি রিমঝিম আপু ফোন করেন, তারা ডেকে দেন বিন্নিকে।  আজও মা রিসিভ করবেন ভেবে বিন্নি ভেবে চললো ওর নিজের কথা। কিন্তু তা একটা পরিপূর্ণ রূপ নেয়ার আগেই ভেসে এলো মায়ের কণ্ঠ- ফোনটা রিসিভ করছিস না কেন? শুনতে পাচ্ছিস না ওটা বেজে চলেছে?

কোনো দোষ না করলেও কেউ যদি ওকে অনুযোগ দেয়, বিন্নির মন তখন খারাপ হয়ে যায়। আজ মা যখন অনুযোগের সুরে কথা বললেন, বিন্নির মন তখন খারাপ হয়ে গেলো। তবে সঙ্গে সঙ্গে উঠে টেলিফোন রিসিভও করলো বিন্নি।
টেলিফোন করেছে টুসি- বিন্নির ক্লাসমেট। এ পাড়াতেই বাড়ি। মাঝেমধ্যে ফোন করে।
টুসি জানালো সে যাবে সূচনাদের বাসায়। সেখান থেকে মিথিলার কাছেও যাবে। গাড়ি নিয়েই যাওয়া-আসা করবে। ইচ্ছে করলে বিন্নি যেতে পারে।
মিথিলা আর সূচনা বিন্নিরও বান্ধবী। তাই বিন্নি বললো, অবশ্যই যাবো। আমি রেডি হয়ে থাকবো। যাওয়ার সময় আমাকে তুলে নিয়ে যাস।
ক্র্যাডলের ওপর রিসিভার রেখে বিন্নি গেলো মায়ের কাছে। মা জিজ্ঞেস করলেন, কে ফোন করেছিলো?
বিন্নি বললো, টুসি। দুপুরে সূচনা আর মিথিলাদের বাসায় যাবে। আমি যাবো কিনা জিজ্ঞেস করলো। আমি বলেছি যাবো। যাবো মা?

মা বললেন, বলেছিস তো যাবি। এখন আর আমাকে জিজ্ঞেস করে কি লাভ! ঈদের দিন। কোথাও বেশি দেরি করিস না।
বিন্নি বললো, একটুও দেরি করবো না। তো মা, কোন ড্রেস পরবো?
মা বললেন, ঈদে তোর তিন জোড়া ড্রেস হয়েছে। দু’জোড়া দিয়েছি আমরা আর তোর টুলু মামা পাঠিয়েছেন এক জোড়া। যেটা ইচ্ছে পরে যা।

দুই.
বিন্নির ঈদের কাপড় রাখা হয়েছিলো মায়ের আলমারিতে। সেখান থেকে কাপড় বের করে নিজের ঘরে নিয়ে এলো বিন্নি। একটা করে প্যাকেট খুলে বিছানার ওপর রাখলো। কিন্তু কোনোটাই ভালো লাগলো না। তাই মন খারাপ হলো। বিন্নি ছুটে গেলো মায়ের কাছে।
মা কি একটা রান্না করছিলেন। ঘুরে তাকালেন বিন্নির দিকে। বিন্নি বললো, একটা কাপড়ও ভালো লাগছে না।
: কেন?
: কেন যে ভালো লাগছে না, তা বোঝাতে পারবো না মা। কাপড়গুলো দেখে মনটাই খারাপ হয়ে গেলো।
: কিন্তু কেন মন খারাপ হলো?
বিন্নি বললো, টুলু মামা যে ড্রেসটা দিয়েছেন, ওটার সাইজটা দেখেছো? কম করে হলেও এক্স-এক্স-এল।
: এক্স-এক্স-এল মানে? ওটা আবার কি?
কথাটার অর্থ বুঝতে না পেরে মা তাকালেন বিন্নির দিকে। বিন্নি বললো, ওটা পালোয়ানদের সাইজ। আই মিন সবচেয়ে বড়ো সাইজ। ভেবে বিরক্তি এসে যাচ্ছে মা। টুলু মামার কাছে তো আমি অপরিচিত কেউ নই। প্রায় রোজই তিনি দেখছেন আমাকে। তারপরও কি করে ভাবলেন এমন হাতির মতো বড়ো ফ্রক আমার গায়ে লাগবে?
মা বললেন, টুলু হয়তো সাইজটা বুঝে উঠতে পারেনি। ওটা ঈদের পর বদলে আনা যাবে। আরো তো ড্রেস আছে। ও দুটোর একটা পরে যা।
বিন্নি বললো, পরার মতো হলে তো পরবো! যেটা তুমি দিয়েছো ওটার রং কটকটে। আর যেটা বাবা দিয়েছেন ওটার মধ্যে ঝকমকে চুমকি বসানো।
: তাতে কি হয়েছে?
: কি হয়েছে মানে? চুমকি বসালেই হলো? কাপড়ের রংয়ের সঙ্গে ম্যাচিংয়ের একটা ব্যাপার আছে না! না মা, এবার আমার ভাগ্যটাই খারাপ। একটা কাপড়ও পরার মতো নয়।
মা বললেন, তোর তো সব কাপড়ই নতুন। সেখান থেকে একটা পরে যা।
বিন্নি বললো, তা কি সম্ভব, বলো মা? সে সব ড্রেস তো সূচনা-টুসির দেখে ফেলেছে। কি ভাববে ওরা?
এবার মা বিরক্তি প্রকাশ করলেন- এতো ভাবাভাবির কি আছে? এমন তো নয় যে নতুন কাপড় কিনিনি তোর জন্য। আর কেনার সময় তুইও সঙ্গে ছিলি- ছিলি না? তখন চোখ বন্ধ করেছিলি।  এখন বলছিস হাজারটা সমস্যার কথা। ঘরে যা, আমি আসছি। দেখি কি করা যায়।

তিন.
বিন্নি ওর ঘরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো। কিন্তু রান্নাঘর থেকে বের হতে পারলো না। দেখলো দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছে কাজের বুয়া আর তার দুই মেয়ে রানু আর বানু। ঈদের দিন, তাই মা আসতে বলেছেন ওদের।
বিন্নি দেখলো ছেঁড়া-নোংরা ফ্রক পরে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে রানু আর বানু। হাড় জিরজিরে শরীর। রুক্ষ লালচে চুল। শুকনো মলিন মুখ। একবার তাকালেই বোঝা যায় সীমাহীন কষ্টে কাটছে ওদের দিন।
মাও দেখেছিলেন ওদের। মা বললেন, ভেতরে এসো।
কাজের বুয়া তার মেয়েদের নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে এক কোণে বসলো। মা বললেন, একটু বসো। হাতের কাজ শেষ করে তোমাদের খাবার দেবো। আয় বিন্নি, তোর প্রবলেম সলভ করি আগে।
মায়ের পিছুপিছু বিন্নি গেলো ওর ঘরে। বিছানার ওপর ছড়িয়ে গেলো কাপড়গুলো। মা সেগুলো মেলে মেলে দেখলেন বিন্নির অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা আছে কতোটুকু। তারপর বললেন, আমার দেয়া কাপড়ের রং বাবার দেয়া কাপড়টাও মন্দ নয়। তোর কি মনে হয়?
মা প্রশ্ন করলেন বিন্নিকে, কিন্তু বিন্নি জবাব দিলো না। আসলে জবাব দেয়ার মতো মনের অবস্থা তখন বিন্নির ছিলো না। বিন্নির মনের কোণে তখন ভেসে বেড়াচ্ছিলো রানু আর বানুর ছেঁড়া-ময়লা কাপড় আর কঙ্কালসার চেহারা।
মা বললেন, কি বলেছি শুনেছিস?
বিন্নি বললো, কি বলেছো মা?
মা বললেন, কাপড়গুলো কিন্তু একেবারে মন্দ নয়।
বিন্নি বললো, আমি এখন ওসব কথা ভাবছি না মা। আমি ভাবছি অন্য কথা।
: অন্য আবার কি কথা?
: অন্য কথা মানে, আমার তো কতো কাপড়ই আছে। কতো সুন্দর সেগুলো। এখান থেকে দুটো কাপড় রানু আর বানুকে দিই?
মা তাকালেন বিন্নির দিকে। বললেন, দিতে চাইছিস কেন? কাপড়গুলো তোর ভালো লাগেনি, তাই?
বিন্নি বললো, ভালো লাগেনি বলে নয় মা। আজ ঈদের দিন। অথচ একটা ভালো কাপড়ও পরে আসতে পারেনি ওরা। দেখে খুব খারাপ লাগছে। বলো না মা, দুটো কাপড় ওদের দিই?
মা বললেন, যদি দিস, আমি তাহলে সবচে’ বেশি খুশি হবো।
বিন্নি বললো, আর আমার যে কতো ভালো লাগবে, তোমাকে বোঝাতে পারবো না।