পরীটি কি জাদু জানে

শাহনেওয়াজ চৌধুরী

পরীমেয়েটি একা। যখন উড়তে শেখার সময় হলো, তখন কাউকে পেল না সে। অথচ এই বনে ওর বয়েসী যারা আছে, তাদের মায়েরা কত যত্ন করে উড়তে শেখায় তাদের! দেখে ভীষণ মন খারাপ হয় পরীমেয়ের। ইস্, ওর মা বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই ওকেও অমন যত্ন করে উড়তে শেখাত!
ছোট্ট পরীমেয়েটিরও ভীষণ ইচ্ছে করে উড়তে। কিন্তু পারে না। হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়, নয়তো অনেক চেষ্টার পর উড়ে উড়ে একটু উঁচুতে উঠতেই ভয় পেয়ে মাটিতে নেমে আসে। এসব কা- দেখে ওর বয়েসী পরীরা হেসে অস্থির। তখন ভারী লজ্জায় পড়ে যায় পরীমেয়ে। ভীষণ মন খারাপ হয়। ইস্, ওর মা বেঁচে থাকলে, নিশ্চয়ই খুব ভালো করে উড়তে পারতো ও! তাই বার বার মায়ের অভাব অনুভব করে মন খারাপ করে বসে থাকে। সবাই ওকে নিয়ে হাসাহাসি করে বলে কারো সামনে যেতে চায় না। কিন্তু এতে তো ওরই ক্ষতি। কেননা পৃথিবীতে এখন ফুল ফোটার মৌসুম। নানা রঙের ফুল ফুটেছে। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, গোলাপী, সাদা, কমলা সব, সব রঙের ফুল। ফুলে ফুলে সাজানো পৃথিবী! পরীরা সেখানে গিয়ে ফুলের মধু খেয়ে আসে। কিন্তু উড়তে পারে না বলে ছোট্ট পরীমেয়েটি যেতে পারে না। শুধু ফুলের মধু খাওয়া নয়, ফুলের বনে উড়ে বেড়াতে ওরও ভালো লাগতো ।
ফুলের বনে মধু খেয়ে এসে পরীমেয়ের কাছে গল্প করে সবাই। গল্প শুনে ওরও খুব ফুলের দেশে যেতে ইচ্ছে হয়।
পরীমেয়ে ভেবে পায় না- সে কবে ভালো ভাবে উড়তে শিখবে, কবে উড়ে উড়ে ফুলের দেশে যেতে পারবে!
ভাবতে ভাবতে পরীমেয়ের বুক ফেটে কান্না আসে। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে সে।
ঘুম থেকে জেগে পরীমেয়ের কী যে হলো, তার খুব ওড়ার ইচ্ছে হলো। সবার মতো ফুলের দেশে যাবার ইচ্ছে হলো। সে অপেক্ষা করে সন্ধ্যা হলেই উড়তে শুরু করবে। উড়ে উড়ে পৃথিবীতে যাবে। পরীরা যেটাকে ‘ফুলের দেশ’ বলে, সেখানে।
ফুলের দেশে যাবার এতই ইচ্ছে পরীমেয়ের, সে যে ভালোভাবে উড়তে পারে না সে কথা ভুলেই গেল।
যখন সন্ধ্যা নেমে এলো, পরীমেয়ে উড়তে শুরু করল। একটু জিরোয়, আবার ওড়ে। এমনি করে পরীর দেশ ছাড়িয়ে পৃথিবীর সীমানায় ঢুকে পড়লো পরীমেয়ে। আর তখনই ফুলের বাগানগুলো চোখে পড়লো। ওড়া থামিয়ে অবাক হয়ে ফুলের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে থাকল পরীমেয়ে। সত্যি, পরীদের কাছে সে যা শুনেছে, তা এতটুকু মিথ্যে নয়। এত চমৎকার ফুলের বাগান তো আর পরীর দেশে নেই!
ডানা ভাসিয়ে দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় থেমে থাকার কারণে ডানা দুটো ভারী হয়ে উঠলো ছোট্ট পরীমেয়ের। তাই উড়তে গিয়ে খেই হারিয়ে নিচে পড়তে লাগলো। পড়তে পড়তে অনেক উঁচু একটা প্রাসাদের জানালায় ডানা আটকে গেল। জানালা ধরে নিজেকে কোনো মতে সামলে নিল পরীমেয়ে। যাক, প্রাণটা বাঁচলো! জানালাটা শক্ত করে ধরে প্রাসাদের নিচে তাকালো ও। অমনি নিচের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। জানালা দিয়ে প্রাসাদের ভেতরে তাকাতে গিয়ে পরীমেয়ের চোখে পড়লো জানালায় আনমনে দাঁড়িয়ে আছে অপূর্ব রূপবতী এক মেয়ে! দেখে অবাক হলো পরীমেয়ে। রূপবতী এতক্ষণ তার চোখে পড়েনি কেন? আর রূপবতীও কি তাকে দেখতে পায়নি?
জানালায় দাঁড়ানো মেয়েটিকে মুগ্ধ হয়ে দেখছিল পরীমেয়ে। দেখে বুঝতে পারলো মেয়েটি হয়তো এ রাজ্যের রাজকন্যা। মুগ্ধ চোখে রূপবতীকে দেখতে দেখতে কখন তার গালে যে ডানার নরম পালক ছুঁইয়ে দিল পরীমেয়ে, টের পেল না। অমনি নড়ে-চড়ে উঠে রূপবতী জিজ্ঞেস করল, কে, আমাকে কে ছুঁয়ে দিল?
আমি পরীর মেয়ে ।
রূপবতী জিজ্ঞেস করল, কে তুমি?
আমি পরীমেয়ে।
সত্যি বলছো! তুমি পরীর মেয়ে? কোথায় থাকো তুমি? এখানে কেন এসেছ? অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো রূপবতী।
পরীমেয়ে বললো, পরীর দেশ থেকে এসেছি। তোমাদের রাজ্যে এখন ফুলের মৌসুম। তাই এসেছি।
অনেক ফুল ফুটেছে, তাই না? রূপবতী জিজ্ঞেস করলো।
কেন, তুমি দেখনি?
দুঃখি গলায় রূপবতী বললো, না দেখিনি।
শুনে পরীমেয়ে বললো, ছি, ফুল ভালোবাসো না তুমি!
কে বলেছে ফুল ভালোবাসি না? আমার একটা ফুলের বাগান ছিল, জানো?
এতই যদি ফুল ভালোবাসো, তাহলে চারদিকে এত যে ফুল ফুটেছে, তা কি একটিবারও চোখে পড়েনি তোমার?
রূপবতী বললো, হ্যাঁ, তোমার কথাই ঠিক। চোখে পড়েনি। এত যে ফুল ফুটেছে তা একটি বারের জন্যও দেখিনি।
কেন দেখনি? পরীমেয়ে জানতে চাইলো।
কেমন করে দেখব? আমি যে দেখতে পাই না!
রূপবতীর কথা শুনে ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল পরীমেয়ের। ভাবল ইস্, এত সুন্দর ফুটফুটে মেয়েটি কিনা দেখতে পায় না! নরম সুরে পরীমেয়ে জিজ্ঞেস করলো, তুমি দেখতে পাও না কেন?
ম্লান হেসে রূপবতী বললো, বোকা মেয়ে, অন্ধ কি  দেখতে পায়?
রূপবতীর অমন দুঃখি কণ্ঠ শুনে পরীমেয়ে একটুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর জিজ্ঞেস করলো, তুমি অন্ধ হলে কেমন করে?
রূপবতী বললো, সে ভীষণ দুঃখের কাহিনি। শুনে খারাপ লাগবে তোমার।
লাগুক। তবু বলো। আমি শুনবো। পরীমেয়ে বললো।
রূপবতী আবারও বললো, সেসব খুবই কষ্টের কথা। তুমি শুনে কষ্ট পাবে।
পরীমেয়েও রূপবতীকে ছাড়ে না। সে বললো, এমনিতেই আমার খুব দুঃখ। তুমি আর কতটা দুঃখ দেবে?

পরীমেয়ের কথা শুনে রূপবতীর মনটা নরম হলো। বলতে শুর“ করলো আমার নাম সুখলতা। আমি এ রাজ্যের রাজকন্যা। আমি যখন সামান্য বড় হয়েছি, কথা বলতে শিখছি, হাঁটতে শিখছি তখন আমার মা মারা যান। বাবা আরেকটি বিয়ে করলেন। নতুন রানীকেই মা বলে ডাকতাম আমি। প্রথম দিকে নতুন রানীও আমাকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করতেন। তারপর যখন তার কোল জুড়ে এক মেয়ে জন্ম নিল, তখন থেকে আমাকে সহ্য করতে পারতেন না নতুন রানী। ধীরে ধীরে নতুন রানীর মেয়েটিও বড় হলো। আমাদের দু’বোনের কিন্তু খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আমরা দুজন যে আপন বোন নই এ কথা কেউ বুঝতো না। প্রজারা বলতো বড় রাজকন্যা আর ছোট রাজকন্যা হরিহর আত্মা। একজন মরে গেলে, অন্যজনও বোনের শোকে মরে যাবে। কিন্তু আমাদের দুবোনের মধ্যে ভাব থাকলে কী হবে? ছোট রাজকন্যা যখন একটু বড় হয়ে উঠলো, তখন থেকে রানী আমাকে মোটেও সহ্য করতে পারতেন না।
সহ্য করতে পারতেন না কেন? পরীমেয়ে জানতে চাইল।
রাজকন্যা বললো, আমাদের কোনো ভাই নেই। নিয়মমতো বৃদ্ধ বয়সে রাজা যখন আর শাসন কাজ চালাতে পারবেন না, তখন রাজার সন্তানদের কেউ একজন রাজ্য শাসন করবে। সে ক্ষেত্রে বাবার পরে আমিই হতাম এ রাজ্যের শাসক। নতুন রানী এটা মেনে নিতে পারেননি। তিনি চাইতেন না আমি সিংহাসনে বসি। তার ইচ্ছে সুলেখা সিংহাসনে বসুক। তাই আমার বিরুদ্ধে নানারকম ষড়যন্ত্রে মেতে উঠলেন। এদিকে ঘটে গেল আরেক ঘটনা। একদিন সন্ধ্যা বেলা এক অচিন দেশের রাজকুমার সদলবলে আমাদের প্রাসাদে এসে রাতের জন্য আশ্রয় চাইলো। আমার বাবা আশ্রয় দিলেন। রাজকুমারের সম্মানে ব্যাপক আয়োজন হলো। সকাল বেলা রাজকুমার আমার ফুলের বাগানটা ঘুরে দেখছিল। বাগানের হরেক রকম ফুল দেখে রাজপুত্র মুগ্ধ। ঠিক ওই সময়ে আমিও ফুল কুড়াতে বাগানে গিয়েছি। প্রতিদিন সকালবেলা ঘুম থেকে জেগে বাগানে ফুল কুড়ানোর অভ্যেস আমার। অচিন দেশের রাজকুমার যে তখন বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল তা খেয়াল করিনি। কিন্তু রাজকুমার আমাকে ঠিকই খেয়াল করেছিল। একমনে ফুল কুড়াচ্ছিলাম, রাজকুমার পেছন থেকে আমাকে ডাকলো।
নিরিবিলি বাগানে কারো গলা শুনে চমকে উঠলাম। তাকিয়ে দেখি রাজকুমার দাঁড়িয়ে। নিজের পরিচয় দিয়ে রাজকুমার বললো, শিকার শেষে দেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছি। রাত হয়ে আসছে দেখে এই প্রাসাদে আশ্রয় নিয়েছিলাম। একটু পরেই চলে যাব আমরা। সকালবেলা ঘুম থেকে জেগে এই সুন্দর ফুলের বাগানটা চোখে পড়লো। ফুলের বাগানটা একটু ঘুরে দেখতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু তুমি কে?
আমি নিজের পরিচয় দিলাম।
রাজপুত্র জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি ফুল খুব ভালোবাস?
ফুল ভালোবাসি বলেই তো বাবা আমাকে এই ফুলের বাগানটা উপহার দিয়েছেন। আমি নিজ হাতে প্রতিদিন বাগানে পানি দেই। আর সকালবেলা ফুল কুড়াতে আসি।
রাজকুমার বললো, তোমার যেমন ফুল পছন্দ, তেমনি তোমাকে ভালো লেগেছে আমার। মাঝে মাঝে তোমাকে দেখতে আসবো। তখন এই ফুলের বাগানে দেখা হতে পারে না আমাদের?
রাজকুমারকেও ভীষণ ভালো লাগলো আমার। তাই তার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়ে গেলাম। বললোাম, আমি কেমন করে জানবো তুমি এসেছ।
তোমার বাগানে এসে বাঁশি বাজাবো আমি। বাঁশি শুনে বুঝবে আমি এসেছি।
বাগানে দাঁড়িয়ে রাজকুমারের সঙ্গে এভাবে কথা বলতে দেখলে নিশ্চয়ই রানী আমার ওপর খেপে যাবেন। তাই রাজকুমারকে বললাম, আজ তাহলে বিদায়। আবার দেখা হবে আমাদের।
রাজকুমার আমার কথায় সায় দিয়ে বিদায় নিল। তারপর থেকে অনেকদিন পরপর আমাদের দেখা হতো। কথামতো বাগানে এসে বাঁশি বাজাতো রাজকুমার। এমনি করে রাজকুমারের বাঁশির সুর চেনা হয়ে গিয়েছিল আমার।
এক রাতে রাজকুমারের বাঁশি শুনে বাগানে যাওয়ার সুযোগ খুঁজলাম।
কিন্তু রাতেরবেলা রানী, সুলেখা, দাস-দাসী আর প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কেমন করে বাগানে যাব? ওদিকে রাজকুমার মিহি সুরে বাঁশি বাজিয়েই চলেছে। কেউ যদি ওভাবে বাঁশি বাজাতে শোনে তাহলে সন্দেহ করবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব রাজকুমারের কাছে যাওয়া দরকার। অনেক চেষ্টা করে প্রাসাদ থেকে বের হলাম। রাজকুমারের সঙ্গে দেখা হলো। কিন্তু কেমন করে যেন রানী টের পেয়ে গেলেন! অবশ্য আমার দিকে নজর রাখার জন্য কয়েকজন দাস-দাসী আর প্রহরীকে নিযুক্ত করেছিলেন তিনি। রাতের বেলা প্রাসাদ থেকে বেরোনোর খবরটা হয়তো তারাই রানীর কানে দিয়েছে। রাজকুমারের সঙ্গে কথা বলছিলাম, ঠিক তখন গলা হাঁকলেন রানী। প্রহরীকে গোপনে বলে দিলেন আমাকে প্রাসাদে নিয়ে বন্দি করতে। প্রহরীরা রানীর হুকুম পালন করলো। বাবা প্রতিবাদ করেছিলেন, কিন্তু রানীর বিরুদ্ধে পেরে উঠলেন না। তাছাড়া রাজাকে খুব একটা মান্য করতেন না রানী। সুলেখাও কিন্তু একটিবারের জন্য আপত্তি করলো না। অথচ আপন বোন না হলেও, ওকে আমি আপন বোনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছি। সে যাক, আমাকে বন্দি করার পেছনে রানীর ষড়যন্ত্র ছিল। রাজার বড় সন্তান হিসেবে আমি যেন সিংহাসনে বসতে না পারি, তাই ক‚টকৌশলে আমাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করতেন রানী। আমি মরে গেলে সুলেখার সিংহাসনে বসতে কোনো বাঁধা থাকে না। এসব আমি শুনেছি আমার বিশ্বস্ত এক দাসীর মুখে। যে কিনা আমার মায়েরও বিশ্বস্ত ছিল। কিন্তু রানী মনে করতেন এই দাসী তার বিশ্বস্ত। আর দাসীও সেভাবেই চলতো। যাতে রানী এতটুকু বুঝতে না পারেন দাসী আমার হয়ে কাজ করছে। রানী তাকে বিশ্বস্ত মনে করে সব বলেন। সুলেখাও বলে। এদিকে দাসী খাবার দিতে এসে সুযোগ বুঝে আমাকে সব বলে দেয়। শুধু তাই নয়, আমাকে বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করার সুযোগও খোঁজে। কিন্তু এত কড়া পাহারার মধ্যে দাসী কোনো সুযোগ বের করতে পারে না। এমনকি দূরদেশের সেই রাজকুমারকে আমার বন্দিত্বের খবরও পৌঁছাতে পারেনি।
রাজকুমার যাতে এখানে আসতে না পারে, সেজন্য চারদিকে কড়া প্রহরা বসিয়েছেন রানী।
জানালায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল পরীমেয়ের। তাই রাজকন্যাকে সে বললো, আমি যে আর এভাবে জানালায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। কোনোভাবে হাতটা ছুটে গেলেই নিচে পড়ে যাব।
রাজকন্যা বললো, তুমি আমার ঘরে এসো।
কেমন করে?
তাই তো! এই জানালা দিয়ে তো ভেতরে ঢুকতে পারবে না তুমি। তৎক্ষণাৎ কিছু একটা মনে করে রাজকন্যা বললো, ভেবো না, একটা উপায় আছে।
কী উপায়?
সে আরেক ঘটনা। তার আগে তোমাকে ঘরের ভেতরে আনি। রাজকন্যা বললো।

পরীমেয়ে দেখলো রাজকন্যা ঠোঁট  নোড়ে বিড়বিড় করে কী যেন পড়লো, অমনি জানালাটা বড় হয়ে গেল। আর জানালার ফাঁক গলিয়ে অনায়াসে রাজকন্যার ঘরে ঢুকে পড়লো পরীমেয়ে। জানালাটা আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেল। অবাক চোখে এসব দেখলো পরীমেয়ে। সে আরো অবাক হলো রাজকন্যাকে দেখে। এই প্রথম রাজকন্যাকে আপাদমস্তক দেখতে পেল। রাজকন্যার সুন্দর মায়াবী মুখটা দেখে পরীমেয়ে প্রথমেই মুগ্ধ হয়েছিল। আর এখন তার দীঘল চুল, সুন্দর পোশাক দেখে আরো মুগ্ধ হলো। পোশাকটাতে রাজকন্যাকে বেশ মানিয়েছে।
পরীমেয়ে বললো, তুমি তো পরীর চেয়েও সুন্দর।
তুমিও বুঝি খুব সুন্দর! রাজকন্যা বললো।
পরীমেয়ে বললো, তোমার মতো অতটা সুন্দর না। তুমি খু-উ-ব সুন্দর! আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি নিজেই আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দ্যাখো, কে বেশি সুন্দর তুমি না আমি! কই তাকাও।
রাজকন্যা শুকনো হাসি হাসলো । তারপর বললো, তাকালাম না-হয়। কিন্তু তাকিয়ে কী লাভ? তোমাকে তো দেখতে পাব না। বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো রাজকন্যা।
রাজকন্যার কথা শুনতে শুনতে পরীমেয়ে ভুলেই গিয়েছিল রাজকন্যা অন্ধ। এ কথা মনে পড়তেই চুপ করে গেল সে।
একটু পরে রাজকন্যা বললো, চলো আমরা পালঙ্কে বসে কথা বলি।
পরীমেয়ে বললো, সে না হয় বসলাম। কিন্তু কেউ আমাকে দেখে ফেললে তো সমস্যা হবে।
আমি যে দেখলাম! রাজকন্যা ঠাট্টার সুরে বললো।
তুমি দেখলে কই? তুমি তো দেখতে পাও না! তাছাড়া তুমি তো আমার জীবন বাঁচিয়েছ। পরীমেয়ে বললো।
আমি কীভাবে জীবন বাঁচালাম?
এই যে তোমার ঘরে ঢোকার ব্যবস্থা করলে। আর কিছুক্ষণ জানালায় দাঁড়িয়ে থাকলে পা টলে নিচে পড়ে যেতাম। এমনিতেই উড়তে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম। তোমার জানালায় ডানা আটকে গেল বলে পড়ে যাইনি। জীবন বাঁচলো। আর এখন বাঁচালে তুমি।
ভ্রু কুঁচকে রাজকন্যা জিজ্ঞেস করলো, কখনো তো এমন শুনিনি, উড়তে গিয়ে পরীরা নিচে পড়ে যায়।
পরীমেয়ে বললো, সে ঠিক আছে। কিন্তু আমি যে এখনো ভালোভাবে উড়তে শিখিনি!
কেন?
কে উড়তে শেখাবে? তোমার মতো আমারও যে মা নেই!
শুনে রাজকন্যারও ভীষণ মন খারাপ হলো। বললো, আমার সঙ্গে তোমার একটা মিল খুঁজে পাওয়া গেল তাহলে। তোমারও মা নেই, আমারও না। একটু থেমে রাজকন্যা বললো, কিন্তু তার আগে তোমাকে যেন কেউ দেখে না ফেলে সে ব্যবস্থা করি।
পরীমেয়ে জিজ্ঞেস করলো, কী ব্যবস্থা করবে?
প্রহরীদের বলে দেব আমি এখন ঘুমাব। কেউ যেন বিরক্ত না করে। আর দাসী এলেও যেন ঢুকতে না দেয়। তাহলে কেউ আর তোমাকে দেখতে পাবে না।
শুনে পরীমেয়ে নিশ্চিন্ত হলো। এই তো তোমার গল্প শুনতে শুনতেই রাত ফুরিয়ে আসবে। আর রাত ফুরিয়ে যাবার আগে আমিও চলে যাব।
ভাবনা মতো প্রহরীদের বলে এলো রাজকন্যা। ফিরে এসে পরীমেয়েকে বললো, এবার আরাম করে পালঙ্কে বসো। তারপর একে একে সব বলছি।
পরীমেয়ে তার ছোট্ট দুটি ডানা গুটিয়ে রাজকন্যার পালঙ্কে বসলো। তারপর বললো, আগে বলো তুমি কেমন করে আমাকে তোমার ঘরে ঢোকার ব্যবস্থা করলে। তারপর বলো তুমি অন্ধ হলে কেমন করে।
রাজকন্যা বললো, তোমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর শোনো তাহলে। তুমি যেমন জানালায় এসে থামলে, অনেক দিন আগে এমনি করে এক পরী এসে থেমেছিল আমার জানালায়। সে ছিল আমার মায়ের বয়েসী। সেই পরী উড়ে যাচ্ছিল এই প্রাসাদের উপর দিয়ে। পিপাসা পেয়েছিল বলে জানালায় এসে থেমেছিল। আমাকে দেখে পানি চাইল।
পরীর জন্য পানি নিয়ে এলাম। কিন্তু জানালা গলিয়ে পানির পাত্র বাইরে বের করা যাচ্ছিল না, আর পরীও পানি খেতে পারছিল না। তখন পরী আমাকে একটা মন্ত্র শিখিয়ে দিয়ে বললো, এটা মনে মনে পড়। তাহলে দেখবে জানালাটা বড় হয়ে যাবে। তখন খুব সহজে পানির পাত্রটা আমার হাতে দিতে পারবে।
পরীর কাছ থেকে মন্ত্রটা শিখে নিয়ে কাজে লাগালাম। পরী পানি খেতে পারলো। পানি খেয়ে খুব তৃপ্তি পেল সে। আমার ওপর ভীষণ খুশি হলো। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তখন আমার কী মনে হয়েছিল জানো?
কী মনে হয়েছিল? পরীমেয়ে জানতে চাইল।
মনে হয়েছিল, যেন আমার মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বলতে বলতে রাজকন্যা কেঁদে ফেলল।
রাজকন্যাকে কাঁদতে দেখে পরীমেয়ের ভীষণ মায়া হলো। নিজের মায়ের কথা মনে হলো। রাজকন্যার চোখের পানি মুছে দিয়ে পরীমেয়ে বললো, কেঁদো না। তোমার মতো আমারও তো নেই। ওভাবে মায়ের কথা বললে আমারও তো কষ্ট হয়।
কান্না থামিয়ে রাজকন্যা বললো, তাহলে বুঝেছ, কেমন করে তোমাকে আমার ঘরে আনলাম।
হ্যাঁ, তা বুঝেছি। কিন্তু সেই পরী তোমার কাছে আর কখনো আসেনি?
না, আর আসেনি। তবে সে এক অদ্ভুত কথা বলে গিয়েছিল।
কী কথা?
আগে তার কথা আরেকটু বলে নিই।
বলো।
আমাকে কাঁদতে দেখে সে জিজ্ঞেস করেছিল, রাজকন্যা, তুমি কাঁদছ কেন?

আমি তাকে সব ঘটনা খুলে বললাম। কেন আমাকে ওরা এই প্রাসাদে বন্দি করে রেখেছে। রাজকুমার আমাকে খুঁজে পচ্ছে না কেন। সবকিছু। যেমন করে তোমাকে বলছি। সব শুনে সেই পরী বলেছিল, ‘অপেক্ষায় থাকো। কোনো এক পরী এসে একদিন ঠিক উদ্ধার করবে তোমাকে।’ সেই পরী তার আঙুলের একটা আংটি আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিল ‘যে পরী তোমাকে উদ্ধার করতে রাজি হবে, এই আংটিটা তাকে দেবে।’ কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো পরী আমাকে উদ্ধার করার কথা বলেনি। তাই আংটিটাও কাউকে দেয়া হয়নি। একটু থেমে রাজকন্যা বললো, তারপর থেকে অপেক্ষায় আছি। সেই পরী চলে যাবার পরে আরো কত পরী এসেছে। জানালায় এসে আমার কাছে পানি চেয়েছে। আমি তাদের শুধু পানিই দেইনি, শরবত খেতে দিয়েছি। সুমিষ্ট শরবত খেয়ে তারা তৃপ্ত হয়েছে। তাদের বহুদিনের তৃষ্ণা মিটেছে। আর খুশি হয়ে আগের সেই পরীর মতো তারাও বলে গেছে ‘অপেক্ষায় থাকো। কোনো এক পরী এসে তোমাকে উদ্ধার করবে।’ কিন্তু তারা কেউ আমাকে উদ্ধার করাতে আগ্রহ দেখায়নি।
পরীমেয়ে বললো, অবাক কা- তো। কেউই তোমাকে উদ্ধার করতে আগ্রহ দেখায়নি!
না, কেউ না। তাই পরী এলে এখন আর অবাক হই না আমি। কিন্তু ভাবতে খুব কষ্ট হয়, আজ পর্যন্ত কেউ আমাকে উদ্ধার করতে এলো না। একথা ভাবতে গেলে মায়ের কথা ভেবে কষ্ট হয়। নিশ্চয়ই মা বেঁচে থাকলে আমার এমন দুর্ভাগ্য হতো না। মায়ের কথা মনে করে কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে গেছি আমি। রাজকুমারের কথা ভেবেও কষ্ট হয়। আমি ভাবি রাজকুমার কি আমার মতো অন্ধ মেয়েকে বিয়ে করবে?
পরীমেয়ে জিজ্ঞেস করল, রাজকুমার কি জানে তুমি অন্ধ হয়ে গেছ?
জানে না। রাজকন্যা জবাব দিল।
কেন, রাজকুমার বুঝি তোমার খোঁজ করেনি আর?
না, তা হবে কেন? হয়তো করেছে। হয়তো আগের মতো আমার বাগানে এসে বাঁশি বাজিয়েছে। কিন্তু আমাকে পায়নি। বললাম না, রাজকুমার যেন এখানে না আসতে পারে, সে জন্য রাজ্যে কড়া পাহারা বসিয়েছেন রানী। রাজকুমার তো জানে না আমি এই প্রাসাদে বন্দি। রাজপ্রাসাদ থেকে এই প্রাসাদটা অনেক দূরে। খুব নিরিবিলি পরিবেশে। অনেক অনেক গাছপালায় ঘেরা। রাজ্যের শাসন কাজ চালাতে চালাতে যখন একঘেয়ে লাগে, তখন রাজা এসে এখানে অবকাশ যাপন করেন। অবশ্য এখন আর আসেন না। নিরিবিলি এই প্রাসাদটার কথা কি আর রাজকুমার জানে? ওরা জানতেও দেবে না। দাসী আমাকে বলেছে আমি যে এই প্রাসাদে বন্দি আছি, কিছুতেই এই খবর যাতে রাজকুমারের কানে না যায়, সে ব্যাপারে রানী খুব সতর্ক।
কেন? পরীমেয়ে জানতে চায়।
রাজকন্যা বললো, তুমি আসলে বোকা। এটা বোঝা তো খুব সহজ রাজকুমার যদি জানতে পারে আমাকে ওরা বন্দি করে রেখেছে, তাহলে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে নিশ্চিত উদ্ধার করতে আসবে। শুধু আমাকেই উদ্ধার করবে না, এ রাজ্যও দখল করে নেবে। তাহলে তো রানীর আশা-আকাংক্ষা পূরণ হবে না। ছোট রাজকন্যাকে সিংহাসনে বসাতে পারবেন না। এ কারণেই আমাকে বন্দি করে ভিনদেশী রাজকুমারের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত থেকে দূরে রেখেছে। তা না হলে রাজকুমারের সাহায্য নিয়ে আমি যদি সিংহাসনে বসে যাই। রানীর এই ভয়।
রাজকন্যার কথা শুনে অবাক হয়ে পরীমেয়ে বললো, তুমি তো গভীর ষড়যন্ত্রে পড়েছো। যতদূর বুঝতে পারছি এ থেকে তোমার মুক্ত হওয়া কঠিন। তবু যেমন করে হোক এখান থেকে তোমাকে মুক্তি পেতেই হবে। ষড়যন্ত্রকারীদের হারিয়ে জিততে হবে। আর যেমন করেই হোক তোমার বাবার সিংহাসনে তোমাকেই বসতে হবে।
কিন্তু কেমন করে? তার ওপর আমি অন্ধ। অন্ধ রানীকে কি প্রজারা মানবে?
দেখো, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। পরীমেয়ে বললো।
পরীমেয়ের কথা শুনে রাজকন্যার ভালো লাগল। তার বুকে আশা জাগলো। আবার সে আগের মতো দেখতে পাবে। এরচেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে?
একটু চিন্তাও হলো রাজকন্যার। পরীমেয়ে যতই বলুক, এসব কেমন করে সম্ভব? রানী আর তার লোকেরা তাকে যেভাবে চোখে চোখে রাখছে, তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কিছু করা এত সহজ নয়। আর পরীমেয়েও তো ছোট। কী আর এমন করতে পারবে সে!
পরীমেয়ে যেন রাজকন্যার মনের কথা বুঝতে পারলো। রাজকন্যাকে সে বললো, এত ভাবছ কেন? আমি একবার চেষ্টা করে দেখতে চাই তোমাকে এই প্রাসাদ থেকে মুক্ত করা যায় কিনা।
কেমন করে? রাজকন্যা প্রশ্ন করলো।
কেমন করে, তা এখন বলতে পারবো না। তবে যেমন করেই হোক তোমাকে এই প্রাসাদ থেকে উদ্ধার করবো।
তাহলে সেই আংটিটা তো তোমাকে দিতে হয়। বলে রাজকন্যা বালিশের নিচ থেকে আংটিটা বের করে পরীমেয়ের হাতে দিল।
আংটিটা আঙুলে পরলো পরীমেয়ে। ওর আঙুলে ঠিকমতো এঁটে গেল আংটিটা। তারপর রাজকন্যাকে পরীমেয়ে বললো, এবার আমাকে যেতে হবে।
রাজকন্যা আবার সেই মন্ত্রটা পড়লো। জানালাটা আগের মতো বড় হলো।
আবার দেখা হবে বলে পরীমেয়ে রাজকন্যার কাছ থেকে বিদায় নিল।
এবার উড়তে গিয়ে অবাক হলো পরীমেয়ে। খুব ভালোভাবে উড়তে পারছে সে। এতটুকু কষ্ট হচ্ছে না। উড়তে উড়তে তার ডানা দুটো আগের মতো ভারী লাগছে না। তবু সে ভাবে আরেকটু উড়ে দেখা যাক না।
না, এতটুকু সমস্যা হচ্ছে না। পরীমেয়ের মনে হলো পরীরাজ্যের অন্যসব পরীর মতো সুন্দরভাবে উড়তে পারছে সে।
খুব খুশি পরীমেয়ে। অন্য সব পরীর মতো উড়তে পারছে সে। তাকে পারতেই হবে। অ-নে-ক দূরে উড়ে যেতে হবে তাকে। রাজকুমারের কাছে গিয়ে পৌঁছতে হবে।
রাজকন্যা তো খুব সহজ করে বলে দিল দক্ষিণ দিকে চার-পাঁচটা রাজ্য পেরিয়ে গেলেই রাজকুমারের রাজ্য। কিন্তু অচেনা জায়গায় পৌঁছা কি এত সহজ? সেই রাজ্য কেমন করে চিনে নেবে পরীমেয়ে! রাজ্যের নাম, রাজার নাম কিছুই তো বলে দেয়নি রাজকন্যা। শুধু রাজকুমারের নাম বলেছে। নাকি রাজকন্যা নিজেই এসব জানে না! ঠিকানা ছাড়া কেমন করে রাজকুমারের দেখা পাবে পরীমেয়ে?
যেমন করেই হোক রাজকুমারকে খুঁজে বের করতেই হবে। রাজকন্যার দুঃখ ঘোচাতে হবে।

সারারাত ধরে উড়ে চললো পরীমেয়ে। দেখতে দেখতে আকাশের তারাগুলো জ্বলে জ্বলে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। তাই চাঁদেরও বুঝি জেগে থাকতে ইচ্ছে হলো না। কেমন করে ইচ্ছে হবে? চাঁদ-তারা যেমন জ্বলে জ্বলে ক্লান্ত, ভোরের পাখিরাও ঘুমিয়ে ক্লান্ত। তারা ভোরের আলোর অপেক্ষা করে। রাত শেষ না হতে গান গেয়ে গেয়ে সূর্যকে ডাকে। ভোরের পাখিদের ডাক শুনে সূর্যও ঘুমিয়ে থাকতে পারে না আর। তার জেগে ওঠার কথা জানায় চাঁদকে। চাঁদ বলে, আমি আকাশটাকে পাহারা দিতে দিতে ক্লান্ত। তারাগুলোও। এবার তোমার পালা। তুমি এসো ভাই।
ভোর হলো। পরীরা তো দিনের আলোতে চলতে পারে না। তাই সে মেঘের দেশে লুকালো।
পরীমেয়েকে দেখে মেঘেরা ভীষণ খুশি। তারা ডানার রঙের সঙ্গে মিলে যায় মেঘের দুধ-সাদা রং।
মেঘ জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাও গো পরীমেয়ে?
দূরের রাজ্যে। ভোর হয়ে এলো। সূর্য উঠলো বলে। তাই তোমাদের কাছে একটু জিরিয়ে নিতে এলাম।
মেঘেরা বললো, তা জিরিয়ে নাও। কিন্তু দূরের রাজ্যে তোমার কী কাজ?
মেঘের কাছে একে একে সব খুলে বললো পরীমেয়ে।
রাজকন্যার দুঃখের কথা শুনে মেঘেদেরও ভীষণ দুঃখ হলো। ম্লান হয়ে এলো মেঘের রং।
পরীমেয়ে বললো, তোমরা দুঃখ পেয়ে কেঁদো না যেন। তাহলে বৃষ্টি ঝরবে। বৃষ্টিতে ভিজে আমার ডানা ভারী হয়ে যাবে। উড়তে পারবো না তাহলে। তাছাড়া আকাশে মেঘ জমলে সন্ধ্যা বেলা চাঁদ উঠবে না। তারারা হাসবে না। আমি তাহলে কেমন করে পথ চলবো? রাজকন্যার খবর নিয়ে কেমন করে পৌঁছব রাজকুমারের কাছে?
মেঘেরা বললো, চিন্তা করো না তুমি। আমরা সময়মতো চাঁদের ঘুম ভাঙিয়ে দেব। আর তারাদেরও জাগিয়ে দেব।
মেঘের কথা শুনে পরীমেয়ে নিশ্চিন্ত হলো। সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত জিরিয়ে নিল সে।
তারপর সন্ধ্যা নামে। পরীমেয়ে মেঘেদের বললো, এবার তাহলে চলি।
মেঘেরা বললো, একটু দাঁড়াও। এক টুকরো মেঘ নিয়ে যাও।
ঠিক আছে দাও। বলে হাত বাড়িয়ে মেঘ টুকরো নিল পরীমেয়ে। তার হাতের আংটিটায় যে হীরের পাথরটা বসানো, সেই পাথরটা তুলে মেঘ টুকরো রেখে আবার বসিয়ে দিল পাথরটা। তারপর চলতে শুরু করলো।
পরীমেয়ের সঙ্গে চাঁদটাও চললো।
চাঁদ বললো, মেঘের কাছে সব শুনেছি আমি। চলো, তোমার সঙ্গে আমিও যাচ্ছি।
চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে উঠল পরীমেয়ে। তার সঙ্গে চাঁদটাও। ঘুম পেয়ে গেল তার।
চাঁদ বলে, আমি একটু ঘুমিয়ে নেই। তুমিও জিরিয়ে নাও।
পরীমেয়ে দেখে ভোর হয়ে এলো। সে আবার মেঘের আড়ালে লুকালো। সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে তাকে।
আবার সন্ধ্যা নামলো।
পরীমেয়েও চলতে শুরু করলো। আগের মতোই তার সঙ্গে চললো চাঁদ। তারারা আজ আরো উজ্জ্বল হয়ে ফুটেছে।
অনেকটা পথ এসে এক বিশাল একটা পাহাড় দেখতে পেল তারা।
চাঁদ বললো, আমি পাহাড়ের ওপাশে যেতে পারব না।
কেন, ভয় পাচ্ছ? পরীমেয়ে জিজ্ঞেস করলো।
চাঁদ জবাব দিল, একটুও না। চাঁদের আবার ভয় কী? আমার তো কোনো শত্রু নেই। আমি আলোয় আলোয় ভরিয়ে তুলি সবকিছু। আলোর মাঝে কি কালো থাকতে পারে?
তাহলে যেতে চাচ্ছ না কেন?

পাহাড়ের ওপাশে গেলে এপাশটা আড়ালে পড়ে যাবে। আলো পড়বে না। আঁধারে ডুবে থাকবে। তাহলে কেমন করে যাই বলো! তারচেয়ে আমি বরং পাহাড়ের ওপর বসে থাকি। তাহলে পাহাড়ের দু’পাশই আলো পাবে। আর তোমার সঙ্গে তারাদের পাঠিয়ে দিচ্ছি।
পরীমেয়ে বললো, ঠিক আছে। তাহলে আজকের মতো তোমার কাছ থেকে বিদায়।
চাঁদ বললো, একটু থামো। ফেরার পথে যদি তোমার সঙ্গে দেখা না হয়! এক মুঠো চাঁদের আলো নিয়ে যাও।
পরীমেয়ে আগের মতো তার আংটিতে বসানো পাথরটা তুলে চাঁদের আলোটুকু রেখে দিল। তারপর চলতে শুরু করলো।
চাঁদটাকে পাহাড়ের ওপরে পাহারায় রেখে পরীমেয়ে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে বিশাল এক প্রাসাদ দেখতে পেল। আর প্রাসাদের বাঁ দিকে বেশ বড় এক ফুলের বাগান। কত যে ফুল ফুটেছে বাগানটাতে! দেখে মুগ্ধ হলো পরীমেয়ে। তার মনে পড়লো পৃথিবীতে ফুলের মধু খেতে এসেছিল সে। ভালো করে উড়তে পারেনি, তার ডানা আটকে গিয়েছিল রাজকন্যা সুখলতার প্রাসাদের জানালায়। শেষে আর ফুলের বনে যাওয়া হয়নি তার।
কিন্তু এখন সে ভালোভাবে উড়তে পারে। এখন ফুলের বনে নামতে এতটুকু কষ্ট হবে না তার। এই ভেবে ফুলের বনে নামলো পরীমেয়ে।
থোকায় থোকায় ফুটে থাকা রজনীগন্ধার ঝোপের সামনে দাঁড়িয়ে বুক ভরে ফুলের ঘ্রাণ নিতে গিয়ে বিশাল প্রাসাদটায় চোখ বুলালো পরীমেয়ে।
রাজকন্যা সুখলতা যে প্রাসাদে বন্দি, সেটির চেয়ে এই প্রাসাদটা অনেক বড়।
প্রাসাদের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে পরীমেয়ে আবার ফুলের দিকে মন দিল। রজনীগন্ধা আর গোলাপের ঝোপের কাছে এলো সে। তখন কোত্থেকে যেন বাঁশির সুর ভেসে এলো! মনকাড়া মোহন বাঁশির সুর! এমন বাঁশির সুরে মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। ফুলের দিকে মন থাকে না পরীমেয়ের। কান পেতে বাঁশি শোনে সে। তারপর গুটি গুটি পায়ে বাগানে হাঁটতে হাঁটতে বুঝতে চেষ্টা করে বাঁশির সুরটা কোনদিক থেকে আসছে।
অনেকক্ষণ ধরে খুঁজে খুঁজে পরীমেয়ে হয়রান। বাঁশির সুর শুনতে পাচ্ছে, কিন্তু কোনদিকে থেকে সুরটা আসছে বুঝে উঠতে পারছে না। তাই যেদিক থেকে বাঁশির সুর ভেসে আসছে বলে মনে হলো, পরীমেয়ে সেদিকে গেল। কিন্তু কাউকে খুঁজে পেল না।
বাঁশির সুর থেমে গেল হঠাৎ। অনেক খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে হতাশ হয়ে পড়লো পরীমেয়ে। আকাশের দিকে তাকালো সে। চাঁদের আলো ফিকে হয়ে আসছে। পরীমেয়ে ভাবে ওই দূর পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে পাহারা দিতে দিতে চাঁদটা কি ক্লান্ত হয়ে পড়লো?
আবার বেজে উঠল মোহন বাঁশির সুর। চমকে উঠে কান পাতলো পরীমেয়ে।
বাঁশিতে এবার কর“ণ সুর। বাঁশি যেন কাঁদছে এমন সুর শুনে রাজকন্যা সুখলতার কথা মনে পড়লো পরীমেয়ের। রাজকুমারের কথা মনে পড়লো। পরীমেয়ে ভাবে তাহলে কি এমন সুরে রাজকুমারই বাঁশি বাজাচ্ছে!
রাজকুমারকে খুঁজে পেতে ব্যাকুল হয়ে উঠল পরীমেয়ে। তার খুব মন খারাপ হলো এই ভেবে রাজকুমারকে পেয়েও যদি চিনতে না পারে সে!
পরীমেয়ের মন খারাপ ছুঁয়ে দিল বাগানের ফুলদেরও। পরীমেয়ের জন্য তাদের খুব মায়া হলো। মায়া হবে না কেন? তাদের বাগানে অনেক পরী এসেছে। কিন্তু ছোট্ট পরীমেয়েটির মতো কেউ আসেনি।
সব ফুলেরা একসঙ্গে পরীমেয়ের উদ্দেশে বলে উঠলো মন খারাপ করো না। আমরা জানি রাজকুমারকে কোথায় পাওয়া যাবে।
চমকে উঠে ফুলের দিকে তাকালো পরীমেয়ে।
ফুলেরা পরীমেয়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো।
ফুলেদের হাসি দেখে মন ভালো হয়ে গেল পরীমেয়ের।
গোলাপ বললো, এই বাগানটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে একটা দিঘি আছে। দিঘির শান বাঁধানো ঘাটে বসে প্রতি রাতে বাঁশি বাজায় রাজকুমার। আর ভোর হলে প্রাসাদে ফিরে যায়। তুমি এক্ষুণি যাও। দেরি করো না। ভোর হয়ে আসছে।
গোলাপের কথায় অন্য ফুলেরাও সায় দিল।
পরীমেয়ে আর দেরি করলো না। দিঘির ঘাটে চলে এলো।
একমনে বাঁশি বাজাচ্ছিল রাজকুমার। হঠাৎ তার চোখে পড়লো চাঁদের আলোতে দিঘির পানি আরো বেশি টলটল করছে। ঝকমকে আলোয় ভরে উঠেছে দিঘির শান বাঁধানো ঘাটটিও। বিস্ময়ে বাঁশি বাজাতে ভুলে গেল রাজকুমার।
পাশ থেকে পরীমেয়ে বললো, খুব বেশি অবাক হয়েছ রাজকুমার?
ঘোর কাটিয়ে পরীমেয়ের দিকে তাকিয়ে সত্যি আরো বেশি অবাক হয়ে গেল রাজকুমার। এই ছোট্ট পরীমেয়ে কোত্থেকে এলো!
পরীমেয়ে বললো, রাজকুমার, আমি রাজকন্যা সুখলতার খবর নিয়ে এসেছি।
চমকের পর চমক রাজকুমারকে যেন দিশেহারা করে তুললো। সুখলতার নাম শুনে সে এতই চমকিত হলো, এক মুহূর্ত থ হয়ে থাকলো।
তখন পরীমেয়ে বললো, ভোর হয়ে এলো। জলদি ফিরতে হবে। তোমাকে যে কারণে এত কষ্ট করে খুঁজে বের করেছি, সে কথা শোনো।
বলো, জলদি বলো। আকুল কণ্ঠে বললো রাজকুমার।
রাজকন্যা সুখলতাকে তার সৎমা বন্দি করে রেখেছে। এই দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে সুখলতা অন্ধ হয়ে গেছে।
পরীমেয়ের কথা শুনে ভীষণ অবাক হলো রাজকুমার। জিজ্ঞেস করলো এতসব কেমন করে হলো? এ কারণেই সুখলতার ফুলের বাগানে গিয়ে বাঁশি বাজিয়ে তার দেখা পাইনি।
পরীমেয়ে সুখলতাকে বন্দি কারার ঘটনা থেকে শুরু করে সবকিছু খুলে বললো।
সব শুনে একটুক্ষণ চুপ করে থেকে পরীমেয়ের সঙ্গে ফিসফিস করে কী সব বললো রাজকুমার।
পরীমেয়ে বললো, ভোর হয়ে এলো। এবার যেতে হবে আমাকে।

পরদিন সন্ধ্যা নামতেই পরীমেয়ে রাজকন্যা সুখলতার কাছে পৌঁছল।
রাজকন্যা আগের মতোই মন্ত্র বলে জানালা গলিয়ে প্রাসাদের ভেতরে ঢোকার সুযোগ করে দিল পরীমেয়েকে। তারপর উৎসুক কণ্ঠে জানতে চাইল রাজকুমারের দেখা পেলে?
হাসি মুখে পরীমেয়ে বললো, হ্যাঁ পেয়েছি। শুধু আমার সঙ্গে কেন, একটুক্ষণ পরে তোমার সঙ্গেও রাজকুমারের দেখা হবে।
পরীমেয়ের এমন কথায় যেন মোটেও খুশি হতে পারলো না সুখলতা। তেমন কণ্ঠে বললো, দেখা হলেই কী? আমি তো দেখতে পাব না তাকে।
একটুও মন খারাপ করো না। আবার সবকিছু দেখতে পাবে তুমি। এবং একটু পরেই। বলে আংটির হীরের পাথর তুলে সেই মেঘ টুকরো, চাঁদের আলো আর তারার ঝিকিমিকি তুলে সুখলতার দুচোখে মেখে দিল পরীমেয়ে।
একটুক্ষণ পর চোখের পাতা মেলে রাজকন্যা বললো, আবার দেখতে পাচ্ছি আমি। পরীমেয়ের দিকে তাকিয়ে বললো, তোমাকেও দেখতে পাচ্ছি! বলে পরীমেয়েকে জড়িয়ে ধরলো রাজকন্যা।
ঠিক তখনই প্রাসাদের বাইরে হই-হল­া শোনা গেল। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলো প্রহরীদের সঙ্গে একদল সৈন্যের ভীষণ যুদ্ধ চলছে। সৈন্যদের পুরোভাগে রাজকুমারকেও দেখা গেল।
পরীমেয়ে বললো, ওই যে, রাজকুমার তার সৈন্যদের নিয়ে চলে এসেছে। আর ভয় নেই। তোমাকে আর বন্দি থাকতে হবে না।
রাজকুমারের সৈন্যদের যুদ্ধ হলো রানীর সৈন্যদের সঙ্গে। রানীর সৈন্যরা পরাজিত হলো। রানী আর তার মেয়ে সুলেখাকে বন্দি করা হলো।
যুদ্ধ থামলো। রানীর সব প্রহরী আর সৈন্যদের গ্রেপ্তার করা হলো। আর রাজকুমার সুখলতাকে উদ্ধার করলো।
বৃদ্ধ রাজা অনেকদিন পর মেয়েকে কাছে পেয়ে ভীষণ খুশি। সুখলতাও বাবাকে পেয়ে খুশি।
রাজকুমারের বাবা-মাকেও আনা হলো। তারপর রাজকুমারের সঙ্গে সুখলতার বিয়ে হলো। অনেক দিন ধরে রাজ্যে উৎসব চললো। প্রতিদিন সন্ধ্যায় পরীমেয়ে আসে সেই উৎসব দেখতে।
সুখলতার স্বামীকে এ রাজ্যের নতুন রাজা হিসেবে সিংহাসনে বসানো হলো। প্রজারাও নতুন রাজাকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলো।
নতুন রাজাকে পেয়ে রাজ্য আরো ধুমধাম চললো।
 এত আনন্দ, হৈ-হুলে­াড়ের মাঝেও পরীমেয়েকে ভোলেনি সুখলতা। কিন্তু একটি প্রশ্ন তার মনে বারবার উঁকি দিযে যায়- এই পরীটি কি জাদু জানে? নাহলে এই ক’বছরে যা সম্ভব হয়নি, এমনকি আরো যে পরীরা এসেছে তারাও তো রাজকন্যাকে উদ্ধারের সাহস দেখায়নি! অথচ এত কঠিন কাজটি সল্প সময়ে কেমন করে সম্ভব করলো পরীমেয়ে! রাতারাতি সবকিছু বদলে গেল যেন!
কিন্তু পরীমেয়েকে প্রশ্নটা করা হয় না সুখলতার। পরীমেয়েকে সুখলতা বললো, তোমার কারণেই আবার সবকিছু ফিরে পেয়েছি। এত এত সুখ ঘিরে আছে আমাকে। তাই তোমাকে কোনোদিন হারাতে চাই না। তাছাড়া তোমারও মা নেই, আমারও মা নেই। আজ থেকে তুমি আমার বোন। এখন থেকে জানবো আমরা দুই বোন।
পরীমেয়ে হেসে সায় দিল সুখলতার কথায়।
একদিন নিজের দেশে ফিরে গেল পরীমেয়ে। অনেক দিন পর তাকে দেখে সবাই ছুটে এলো। এতদিন পর পরীমেয়েকে দেখে ভীষণ অবাক হলো তারা। তাই কত না প্রশ্ন তাদের।
পরীমেয়ের আঙুলে পরা আংটিটা চোখে পড়লো পরীমেয়ের মায়ের বয়সী একজনের। বিস্ময়ভরা কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করল এই আংটি কোথায় পেলে তুমি?
পাল্টা প্রশ্ন করল পরীমেয়ে। আংটি দেখে অবাক হচ্ছ? নাকি এটা পছন্দ হয়েছে তোমার?
দুটোই। আগে বলো এই আংটি তুমি কোথায় পেয়েছ? কেননা এটা তোমার মায়ের ছিল।
শুনে অবাক হলো পরীমেয়ে। রাজকন্যা সুখলতার কথা মনে পড়লো তার। তাহলে কি তার মা-ই সুখলতার কাছে রেখে এসেছিল আংটিটা? নিশ্চয়ই সে জানত, বন্দি রাজকন্যাকে একমাত্র তার মেয়েই উদ্ধার করতে পারবে। আর তাই বুঝি যত পরীই সুখলতার কাছে গিয়েছে কেউই রাজি হয়নি তাকে উদ্ধার করতে!
মায়ের কথা ভেবে পরীমেয়ের খুব মন খারাপ হলো। আবার এই ভেবে কিছুটা ভালো লাগলো রাজকন্যা সুখলতাকে সে বোন হিসেবে পেয়েছে। রাজকন্যার বোন হওয়াও তো ভাগ্যের ব্যাপার। অমন রূপবতী মেয়ের হাসিতে চাঁদ হাসে, ফুল ফোটে, পাখি গান গায়। পৃথিবীটা আনন্দে ভরে ওঠে।