নিলেশের অন্য ভূবন

আফরোজা অদিতি

দাদি আম্মা, ও দাদি আম্মা কুয়ার মইদ্যে বালতি পইড়া গ্যাছে।
কাজের বুয়া সমিরনের ডাকে গৃহকর্ত্রী, রোমেনা বেগম একটু বিরক্ত হন। তিনি, তার ছেলে বউ এর সঙ্গে কথা বলছিলেন। ওরা এই মাত্র ঢাকা থেকে এসেছে। বউ এর কাছে ছেলের কথা জানতে চাচ্ছিলেন তিনি। অনেকদিন দেখেননি ছেলেকে। ডাক্তার, গবেষক ছেলে। নিজের কাজে সময় খুবই কম পায়। তা ছাড়া কাজ হাতে থাকলে কোনদিকেই খেয়াল থাকে না ওর। ছেলের জন্য আজকাল খুব বেশি খারাপ লাগে মায়ের। তাই মনোযোগ দিয়ে বউ এর কথা শুনছিলেন তিনি। সমিরনের ডাকে সেই মনোযোগ নষ্ট হওয়ায় খুবই বিরক্ত হন তিনি। বিরক্তি না চেপেই তিনি বলেন,-
দেখে শুনে কাজ করতে পারিস না। কুয়ায় বালতি নামালি আর পড়ে গেলো। এ কেমন কথা।
নাগো, দাদি আম্মা দেইখাই নিছিলাম। ছেড়া আছিলো না। তয় বালতি কেমুন কইরা খুইলা গেলো তা কইতে পারুম না।
রোমেনা বেগমের খুব রাগ হয়। কিছু বলেন না। কুয়া অনেক দিনের পুরানো। বন্ধ করে দিবেন দিবেন করেও এখনও বন্ধ করেন নি। আর সমিরনের এই কুয়া থেকে পানি তোলা খুব পছন্দের। ওর চাপ কলে পানি তুলতে হাত ব্যথা করে। চাপকলটাও আবার দুই দিন ধরে নষ্ট। মিস্ত্রিও পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকা থাকে ওরা আসবে দেখে ভোর বেলাতেই মিস্ত্রি খুঁজতে পাঠিয়েছে নাদুসকে। নাদুস এখনও আসে নি। কোথায় কী করছে কে জানে। রোমেনা বেগমের রাগ আরও বাড়ে। কাউকে দিয়েই তিনি ঠিক মতো কাজ করিয়ে নিতে পারছেন না আজকাল।

ওরা চলে এসেছে। ট্যাপের পানি খেতে পারে না তা নয়, কুয়ার পানি খেতে পছন্দ করে ওরা। এই কুয়ার পানি খুব ঠান্ডা আর মিষ্টি। ওরা কুয়ার এই ঠান্ডা পানি রেখে ফ্রিজের পানি খেতে চায় না। তাই ঠান্ডা পানি আনতে বলেছে সমিরনকে। কিন্তু এখন কী করবেন ? ওদের পানি দিবেন কী ভাবে? বউমা আবার রেগে যাবে!
বালতি তোলার কাঁটা যে কোথায় রেখেছেন তাও মনে করতে পারছেন না। রোমেনা বেগম, টেবিলের ড্রয়ার, আলমারির মাথায়, সো-কেচের ভেতর, সব জায়গায় খুজলেন, পেলেন না। তারপর এঘর ওঘর খুঁজতে থাকেন আর বকবক করতে থাকেন।
ওকে নিয়ে আর পারি না মা। দশটা কাজের মধ্যে নয়টাই অ-কাজ করে। তবুও রেখেছি, ভালো মেয়ে, চোর না। ¯^ভাব চরিত্র ভালো। আজকাল তো বিশ্বাসী মানুষের খুব অভাব। ওর ওপর ঘর সংসারের ভার দিয়ে  দুই চার দিন অনায়াসে অন্য কোথাও থেকে ঘুরে আসতে পারি। এই যা ভরসা।
বউমাকে কথাগুলি বললেন তিনি।  খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে কাঁটা পেলেন বড়ো কাঠের সিন্দুকে। এখানে কবে, কখন রেখেছেন তাও মনে করতে পারলেন না তিনি।  যা হোক পেয়েছেন। কাঁটা নিয়ে সমিরন চলে যায়।

রোমেনা বেগম আবার ছেলে বউ এর কাছে এসে বসলেন।
রোমেনা বেগমের দুই ছেলে। বড়ো ছেলে, মোফাজ্জল তারেক, মা তাকে ছোট করে ডাকেন এমটি। ঢাকায় তার নিজ¯^ ক্লিনিক আর ল্যাবরেটরি আছে। ওখানেই গবেষণা করে। গবেষণার বিষয় ব্রেন ট্রান্সফার।  

ছোট ছেলে, তোফাজ্জল তারেক। মা ডাকেন টিটি। আমেরিকায় থাকে। পি.এইচ.ডি. করছে। তোফাজ্জল পাঁচ বছর পর এবার দেশে ফিরেছে। মায়ের ইচ্ছা ছোট ছেলের বিয়ে দেন। মেয়েও দেখা হয়েছে। এই উপলক্ষেই সবাই এসেছে। বড়ো ছেলে কাজ ফেলে ওদের সঙ্গে আসতে পারে নি। তোফাজ্জল, ভাবী আর ভাতিজা, ভাতিজিদের নিয়ে এসেছে। ওরা না থাকলে আনন্দ তো জমে না। বিশেষ করে নিলেশ।

নিলেশ, ভাইএর একমাত্র ছেলে। ওর বড়ো বোন সিথি আর ছোট বোন বিথি। সিথি পড়ে ইউনিভারসিটিতে। বিথি সিক্সে। আর নিলেশ ক্লাস এইট। নিলেশ আর বিথি দু’জন যেন এক বৃন্তের ফুল। সবসময় দু’জনে একসঙ্গেই থাকে। ওরা একসঙ্গেও থাকে আবার মারামারিও করে। হাতের বুড়া আঙুল থুতনিতে ঠেকিয়ে ছড়ায় ছড়ায় আড়ি দেয়। বলে আড়ি, আড়ি, আড়ি/ কাল যাবো বাড়ি/ পরশু যাবো ঘর/ কী করবি কর। ব্যাস আড়ি হয়ে গেলো। তারপর দুই মিনিট যেতে না যেতেই ভাব। দুজনের হাতের তর্জনী মিলিয়ে বলে, ভাব, ভাব, ভাব। ব্যাস ভাব হয়ে গেলো। এইভাবেই চলে ওদের দিন।

বছরে একবার ওরা গ্রামে আসে। রোজার ঈদে। এবার বছরে দুইবার হলো। ঈদের একমাস পর দাদির বাড়ি এসেছে ওরা। আর একবার দাদির বাড়ি আসবে বলে নিলেশ আর বিথি দু’জনের মনের ভেতর আনন্দ টগবগ করছিলো। এখানে আসবে শোনার পর থেকেই আনন্দে অধীর হয়ে ছিলো ওরা। সবার থেকে আনন্দ হচ্ছিলো নিলেশেরই বেশি। কী করবে, কী না করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলো না।
ও একবার টেলিভিশন ছাড়ছিলো। একবার গান গাইছিলো। কখনও মায়ের আঁচল ধরে ঘুরছিলো। একবার তো খাটের ওপর লাফাতে গিয়ে মায়ের বকুনিই খেলো। ওকে বকুনি দেওয়া চাচার পছন্দ হয় নি। টিটি, তার ভাবীকে বলে,
কেন বকছো ভাবী ওকে। বকো না। ছেলেমানুষ। এখনই তো আনন্দ করার সময়।
হ্যাঁ, তা তো করার সময়, তাই বলে সব কিছু ভেঙেচুরে। ভাবী, বিরক্তি প্রকাশ করে।

মোফাজ্জল তারেক, ওদের সঙ্গে যেতে পারবে না। পরে যাবে। মা ভেবেছিলো, বাবা যখন যাবে তখন সবাই একসঙ্গে যাবে। কিন্তু নিলেশ আগে যাবে বলে জেদ ধরে বসলো, সে জন্য মা-কেও আসতে হলো। তাছাড়া দেবরের বিয়েতে ভাই-ভাবী থাকবে না তা কি হয়। তোফাজ্জলের অনুরোধ আগেই যেতে হবে। কেনাকাটা ঢাকা থেকেই করেছে, তবুও মায়েরও তো সখ থাকতে পারে, এটা ওটা কেনার। মা-কে সঙ্গ দিতেও তো একজনের প্রয়োজন।  

স্কুল থেকে পাঁচ দিনের ছুটি নিয়েছে নিলেশের মা।
নিলেশের মা, বকুল তারেক জানে, গ্রামে গিয়ে এই পাঁচ দিন কাটতে চাইবে না। দুইদিন নিলেই ভালো হতো। নিলেশের বাবার জন্য চিন্তা। কিছু মনে থাকে না তার। ভাবুক মানুষ তিনি। খাওয়া-দাওয়া গোসল সব কথাই মনে করে দিতে হয় তাকে। নিলেশের বাবাকে নিয়ে মাঝেমধ্যে খুবই মুশকিলে পড়ে যান মা। কখনও কখনও  প্রয়োজনীয় কাজের কথাও ভুলে বসে থাকেন। সব কাজ তাকেই করতে হয়।

ঘর সংসার দেখেন আবার চাকরিও করেন তিনি।
দেবরের বিয়ে না হলে আবার গ্রামে আসতেন না তিনি। শাশুড়িকে বলেছিলেন বিয়ের ব্যবস্থা ঢাকায় করতে কিন্তু তার ইচ্ছা গ্রামের সকলকে নিয়ে ছেলের বিয়ের আনন্দ করবেন। শাশুড়ির মনের ইচ্ছা হতেই পারে সেই কথা ভেবে তিনি রাজী হয়েছেন।

কিন্তু আসার মুহূর্তে আর আসতে ইচ্ছা করছিলো না তার। টিটি ভাবীকে স্বান্তনা দেয়। ভরসা দেয়।

চিন্তা করো নাতো ভাবী, ভাইয়া সব ম্যানেজ করে নিবে দেখো তুমি। তা ছাড়া মেয়ে দেখতে ভাইয়াকে তো যেতেই হবে। ভাইয়া আজ আমাদের সঙ্গে না গেলেও কাল পরশু তো তাকে যেতেই হবে। না গেলে, আমি এসে নিয়ে যাবো। কয়েক ঘণ্টার তো পথ।

নিলেশের মা ঘরে কাপড়্গুলো গুছিয়ে রাখছে।
সিথি ঘরে দাদির সঙ্গে গল্প করছে। নিলেশ আর বিথি উঠানে খেলছে।
উঠানের অন্যপাশে কুয়া। টোকন, কুয়ার ভেতরে বালতি তোলার কাঁটা নামিয়ে ওপর নিচ করছে। সমিরন, কুয়ার পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখ কুয়ার মধ্যে।

কুয়া জিনিসটাই নিলেশ আর বিথির কাছে মজার এক বিস্ময়। তার ওপরে কুয়ার ভেতরে পড়েছে বালতি। কুয়া থেকে ওটার সঙ্গে দড়ি বেঁধে পানি তোলে সবাই। সেই বালতিটা কুয়ার ভেতরে, এখন দড়িতে কাঁটা বেঁধে তুলবে টোকন- এ যেন আরও বিস্ময়। না দেখে বালতিটা, কী ভাবে তোলা হবে কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না নিলেশ আর বিথি। বালতি কী ভাবে তোলা হবে তা দেখার জন্য মনে প্রাণে ছটফট করছে দু’জনে। কিন্তু মাকে ভীষণ ভয়! মা বকা দিবে।
চল ভাইয়া, মাকে বলি। বিথি, নিলেশকে আদুরে কণ্ঠে বলে।
চল।
ওরা গুটিগুটি পায়ে মায়ের কাছে এসে দাঁড়ায়। মায়ের সামনে গিয়ে এ ওর মুখের দিকে তাকায়। ওদের এভাবে মুখ চাওয়া-চাওয়ি দেখেই মা বুঝে ফেলে ওরা কিছু একটা বলতে এসেছে। মা বলে,
কিছু বলবি তোরা।
ভাইয়া, তুই বল। বিথি, নিলেশকে ছোট একটা ধাক্কা দিয়ে বলে।
তুই বল। নিলেশ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে।
তুই বল না ভাইয়া। শেষ হয়ে যাবে তো।
কি শেষ হয়ে যাবে? তাড়াতাড়ি বলো। আমার কাজ আছে।
মা, আমরা কুয়ার বালতি তোলা দেখবো। নিলেশ বলে।
যাও, কিন্তু খুব কাছে যাবে না, বুঝেছো।

মা, একটু শক্তভাবেই কথাগুলি বলে। ওদের এ ভাবে না বললে ওরা কুয়ার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াবে। অঘটনও ঘটে যেতে পারে। তখনকার কান্না আর ভাবনার চেয়ে প্রথমেই সাবধান হওয়া ভালো।
বকুল তারেক সব সময়ই সাবধানী। তার এই সাবধানতার জন্য আজও ভালো আছে, ভালো আছে ছেলেমেয়ে।

নিলেশ, বিথি কুয়ার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। টোকন, কুয়ার ভেতর দড়িটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বালতির হদিস খুঁজছে। নিলেশ, বিথি উৎসুক। গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে কুয়ার ভেতরে, দেখছে পানিতে দড়ির নড়াচড়া। টোকন, আধঘণ্টার মধ্যেই বালতি তুলে আনে। বালতির ভেতর বালি। বালি ধুতেই বের হয় একটা ছোট রূপার কৌটা আর রূপার কাঠি।
এট আমাকে দাও না, টোকন ভাই।
নিলেশ, রূপার কৌটা আর রূপার কাঠি নেওয়ার জন্য আব্দার করে।
দাঁড়াও দাদিকে জিজ্ঞেস করি।
টোকনের কথা দাদি শুনতে পায়। বলে,
কিরে, কি জিজ্ঞেস করবি।
নানি, কুয়ার মইদ্যে এই দুইটা ছিলো, নিলেশ ভাইয়া চায়।
কৌটা আর কাঠি দেখায় টোকন। রোমেনা বেগমের হাতে দেয়। রোমেনা বেগম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জিনিস দুটো দেখে দিয়ে দেয় নিলেশকে।
নাও দাদু, খেলো গে।
নিলেশ খুব খুশি। দৌড়ে ঘরে চলে যায়। খুলতে চেষ্টা করে কিন্তু খুলতে পারে না। বিথি পাশে বসে আছে। বলে,
দে, ভাইয়া আমি খুলি।
না, না, তোকে দিবো না।

ঘরে ঢোকে বড়ো বোন সিথি।
কিরে কী করছিস তোরা। আর হাতে ওটা কি?
ওরা কথা বলে না। সিথি ওদের কাছে এগিয়ে যায়।
তোরা যে আমার সঙ্গে কথাই বলছিস না। তোরা না সব কথা আমাকে বলিস। এখন কী হয়েছে আমাকে কিছু বলছিস না। এখানে এসে আপু পর হয়ে গেলো। কোনোবার তো এমন করিস না তোরা।

এ কথা ঠিকই বলেছে সিথি। দাদির বাড়ি এসে নিলেশ, বোনের সঙ্গে কথাই বলছে না। অথচ সব কথা আপুকে না বলে থাকতে পারে না নিলেশ। আপু ওর সবচেয়ে কাছের আর আপন মানুষ। ওর বকবকানিতে মাঝেমধ্যে বিরক্ত হয়ে যায় সিথি। কিন্তু এখানে এসে তোয়াজ করেও কোন কথা বলাতে পারছে না নিলেশকে।
কিরে কিছু বলছিস না যে। শুনতে পাচ্ছিস না আমাকে।
পাচ্ছি আপু। কিন্তু ব্যস্ত আমি দেখতে পাচ্ছো না।
খুব ব্যস্ততার সঙ্গে উত্তর দেয় নিলেশ।
ব্যস্ত তাতো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু কী নিয়ে ব্যস্ত তাই তো জানতে চাচ্ছি।
নিলেশ, সিথির দিকে কৌটা আর কাঠি এগিয়ে দেয়। সিথি কৌটা এদিক ওদিক ঘোরায়, মোচড় দেয়, টানে কিন্তু খুলতে পারে না। কৌটা খুলতে না পরে নিলিশের হাতে কৌটা দিয়ে বলে,
 অনেক পুরানো তাই খুলছে না। এটা মনে হয় খুলবে না।

নিলেশ আরও কিছুক্ষণ চেষ্টা করে। খুলতে পারে না। ওর নিজের ব্যাগে রেখে দেয় কৌটা। ওইদিন, তারপর দিন চাচার বিয়ের মেয়ে দেখতে যাওয়ার হৈ চৈ এর মধ্যে কৌটার কথা ভুলে যায়। রাতে ¯^প্ন দেখে অদৃশ্য কেউ ওকে বলছে, তুমি আমাকে ভুলে গেছো নিলেশ। নিলেশ এদিক ওদিক তাকিয়ে খোঁজে, দেখতে চেষ্টা করে। দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করে,
কে তুমি ?
আমি, আমি সেই রূপার কৌটা। আমাকে দেখো।
কেন, কেন আমি তোমাকে দেখবো ?
দেখো, দেখলেই বুঝতে পারবে !
ঘুম ভেঙে যায় নিলেশের। ধড়ফড়িয়ে ওঠে বসে বিছানায়। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে ভোর হয়ে আসছে। বিছানা থেকে নেমে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। ভোরের আলো, ভোরের বাতাস খুব ভালো লাগে ওর। ভোরের আলো মাখে চোখে, ভোরের বাতাস টেনে নয় বুকের ভেতরে। বুকের ভেতরে বাতাস টেনে নিতেই মনে পড়ে যায় রূপার কৌটার কথা। ঘরে গিয়ে কৌটা আর কাঠি এনে আবার বসে বারান্দায়।

কেউ ওঠে নি তখনও।  তবে দাদি এখনই উঠবে। আজান দিলেই ওঠে দাদি। নামাজ পড়ে। ঘণ্টাখানেক হাঁটে। দাদির ডায়াবেটিক আছে। তাই হাঁটতে হয়। নিলেশও দাদির সঙ্গে গিয়েছে হাঁটতে। গ্রামের রাস্তায় ভোরে হাঁটতে ভালোই লেগেছে ওর। গ্রাম তো আর ঢাকার মতো নয়। ঢাকার রাস্তা ব্যস্ত, পলিউশন আক্রান্ত। হাঁটতে ভালো লাগে না। তবুও মানুষ হাঁটে।

বারান্দায় আপন মনে বসে আছে নিলেশ। আপন মনে কাঠি দিয়ে শব্দ তুলছে কৌটায়। শব্দটা গুঞ্জন তুলছে ওর মনেও।  ওর ভেতরে কী যেন হচ্ছে ঠিক বুঝতে পারছে না ও। নিলেশ কৌটার দিকে সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে থাকে। আনমনে বাজাতে থাকে। হঠাৎ কৌটার ঢাকনা খুলে যায়।
কৌটার ঢাকনা খুলতেই ওর চারপাশে দমকা বাতাসের সৃষ্টি হয়। বাতাসের ঘূর্ণিপাকে বাঁধা পড়ে নিলেশ। ওই হাওয়া এতো জোরে টানছে ওকে, ও কিছুতেই বের হতে পারছে না। যতো জোর আছে গায়ে ততো জোর লাগিয়ে চেষ্টা করেও পারলো না। মাকে ডাকলো, ডাকলো দাদিকে, সিথি, বিথিকে। চাচ্চু, চাচ্চু ডাকলো কয়েকবার। কেউ ওর ডাকে সাড়া দিলো না। কতোক্ষণ সময় গেছে তা বলতে পারে না নিলেশ। যখন খেয়াল হলো তখন দেখলো একটা সরু টানেলের মধ্যে ও। যাচ্ছে, যাচ্ছে, যাচ্ছে।

চারদিক অন্ধকার। অন্ধকার পথে কতোক্ষণ চলেছে জানে না। চলতে চলতে শূন্য মাঠের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করে নিলেশ। বিশাল মাঠ। ওর মনে হয় তেপান্তরের মাঠ, গল্পের মতো। ও মাঠের কিনার ধরে হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পায় মাঠের শেষ মাথায় সবুজ বন। ওর খুব তেষ্টা পেয়েছে। সবুজ বনে নিশ্চয় পানি আছে। গাছ-গাছালি থাকলে তো পানি থাকবেই। সবুজ বনের কাছে এসে দাঁড়ায় নিলেশ।

বনের কাছে এসেই দৌড়ে বনের মধ্যে ঢুকে যায়। চারদিক তাকায়। গাছ আছে, ঘাস আছে, হরিণও দেখলো কয়েকটা, দেখলো দোয়েল, কোকিল, ফিঙে, হলুদ রঙের কুটুমপাখিও দেখলো দুটো। কিন্তু কোথাও পানি বা পানির উৎস দেখতে পেলো না।  পানি, পানি, পানি কোথায় !

পানির উৎস খুঁজতে আবার হাঁটতে শুরু করে নিলেশ। কেউ কি ডাকছে ওকে ! এদিক-ওদিক তাকায় নিলেশ। এখানে কে ওকে চেনে যে ওর নাম ধরে ডাকবে! যা! হাত নেড়ে নিজের ভাবনাকে নিজেই তাড়িয়ে আবার হাঁটতে শুরু করে নিলেশ।

সামনে ঘাসজমি। ঘাসজমিটা অদ্ভূত। জমিতে ছোট থেকে বড়ো এমন ভাবে ঘাসগুলো বেড়ে উঠেছে, দেখে মনে হয় যেন কেউ সুন্দরভাবে সাজিয়ে রেখেছে। অবাক হয়ে সাজানো ঘাসগুলো দেখছিলো নিলেশ। নাম ধরে কেউ ডাকলো ওকে!
কে, কে ডাকে ?
আমি। এদিকে তো পানি পাবে না তুমি। পানি চাইলে পশ্চিমে যাও।
নিলেশ শব্দ লক্ষ্য করে তাকাতেই দেখে ছোট একটা ঘাসের মাথায় বেগুনি রঙের ফুল। সেই ফুলের ওপর বসে আছে সবুজ ঘাসফড়িং। ফড়িং এর দিকে তাকাতেই ফড়িং বলে ওঠে,
নিলেশ, নিলেশ, এই যে আমি।
তুমি আমাকে ডাকছো! তুমি কথা বলতে পারো। আশ্চর্য! নিলেশ খুবই অবাক।
হ্যাঁ, আমি কথা বলতে পারি। ঘাসফড়িং এ ঘাস থেকে ও ঘাসে লাফিয়ে লাফিয়ে নিলেশের চোখের আড়ালে চলে গেলো।
ঘাসফড়িং এর যাওয়ার পথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঘাসফড়িং যেদিকে যেতে বলেছে, সেই পশ্চিমে হাঁটতে শুরু করে নিলেশ। কিছুদূর যেতেই দূরে একটা বাড়ি দেখতে পায়।
আরে, এতো আমাদের বাড়ি।
আনন্দে লাফিয়ে ওঠে নিলেশ। ওর চিৎকার করে গান গেয়ে গেয়ে নাচতে ইচ্ছা করছে। ও ঢাকায় চলে এসেছে। ঢাকায়!
ঢাকার কথা মনে হতেই বিস্মিত হয় নিলেশ! কী ভাবে এলো ঢাকায়! কীভাবে!?
দূর ছাই, এতোসব ভেবে কী হবে। এসেছে এই তো ঢের। এখন বড়িতে গিয়ে পানি খেতে হবে। ঘাসফড়িং
ঠিকই বলেছিলো। মনে মনে ঘাসফড়িংকে ধন্যবাদ দেয়। ঘাসফড়িং ধন্যবাদ, ধন্যবাদ তোমাকে।

দরোজা খোলার জন্য দরজায় হাত দিতেই খুলে গেলো দরজা। বাড়ির ভেতর ঢুকতেই প্যাসেজ। প্যাসেজের শেষ মাথায় ডাইনিং রুম। ডাইনিং রুমে ফ্রিজে পানির বোতল থাকে। ওর মা, প্রতিদিন পানি ভর্তি বোতল ফ্রিজে রাখে। কিন্তু মা তো বাড়ি নেই। দাদার বাড়ি। মা তো আসে নি। ও একাই এসেছে। নিলেশ ফ্রিজ খুলে দেখে বোতল আছে তিনটা। ঢকঢক করে বোতল ধরেই পানি খেলো। মা দেখলে বকা দিতো। এভাবে বোতল থেকে পানি খাওয়া পছন্দ করে না মা। কিন্তু এমন তেষ্টা পেয়েছে ওর, গ্লাস খোঁজার কথা মনেই পড়ে নি নিলেশের।

পানি খেয়ে শান্ত হওয়ার পর খেয়াল হয় বাইরের দরজা খোলা। খটকা লাগে মনে। ওদের দরজা তো খোলা থাকে না। সব সময় বন্ধ থাকে। তাহলে! বাবা কি বাইরে গেছে! বাবা তো কাউকে কিছু না বলে আনমনে বাইরে চলে যায়। এসব কথা ভাবতে ভাবতে আবার পানি খায় নিলেশ। পানি খেতে খেতেই দেখতে পায় ওরই মতো একটা ছেলে প্যাসেজ পার হয়ে ওর ঘরে ঢুকে গেলো। পানির বোতল নামিয়ে রেখে দরজার কাছে এসে চুপিচুপি উঁকি দেয়। ছেলেটা ওর বিছানায় শুয়ে দিব্যি টেলিভিশন দেখছে।

ঘড়িতে চারটা বেজে পনেরো। এখনই দেয়াল ঘড়িটার পাখি ডেকে উঠবে। নিলেশ জানে ওই ঘড়িটায় একটা ছোট দাঁড় আছে। সেই দাঁড়ে আছে ছোট সুন্দর পাখি। পনেরো মিনিট পর পর পাখিটা ডাকে। গুনেগুনে পাঁচটা। নরম মিষ্টি সুর। টুঁইটুঁই, টুঁইটুঁই টুঁই। নিলেশের সবচেয়ে প্রিয় ঘড়ি। নিলেশের মন অজান্তেই পাখির ডাক শোনার জন্য তৈরি হয়। পাখি ডেকে ওঠে। টুঁইটুঁই, টুঁইটুঁই, টুঁই।

মা, এসময় বাড়ি থাকে না। স্কুলে থাকে। আরে, কি ভাবছে ও । মা তো বাড়িতেই নেই। দাদার বাড়ি থেকে ও তো একাই এসেছে। কিন্তু ওই ছেলেটা কে? যে এখন ‘জি সিনেমা’য় ‘চালবাজ’ ছবি দেখছে। দরোজার কাছে দাঁড়িয়ে টেলিভিশন দেখছিলো নিলেশ। নিলেশের এসব সিনেমা দেখতে ভালো লাগে না। তবে ‘চালবাজ’ দেখতে ভালোই লাগে। নায়িকার ডাবল-রোল।

নিলেশের সবচেয়ে ভালো লাগে সায়েন্স ফিকশন। এ ছাড়া ভালো লাগে ঠাকুর মা’র ঝুলি। ভালো গল্প, কবিতা, ছড়ার বই পড়তেও ভালো লাগে ওর। আরও ভালো লাগে মেঠো পথ ধরে হেঁটে হেঁটে বহুদূর চলে যেতে। ভালো লাগে শিউলি ফুল, গোলাপ, কাঁঠালিচাঁপা। ভালো ক্রিকেট, ফুটবল খেলা দেখতে, ভালো লাগে দাবা খেলতে। দাবা খেলতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু দাবা তো রেখে এসেছে। দাদার বাড়ি থেকে আসার সময় কিছুই তো নিয়ে আসে নি।

যাওয়ার দিন ট্রেনে দাবা খেলতে খেলতে গিয়েছে। ওর চাচা দাবা খেলতে খুব ভালোবাসে। চাচার কাছ থেকেই দাবা খেলা শিখেছে। ওরও ভালো লাগে দাবা। কিন্তু চুলোয় যাক দাবা খেলা, টেলিভিশন দেখা। ওই ছেলেটা কে ? জিজ্ঞেস করবে ওকে। ঘরের ভেতর ঢোকার জন্য পা বাড়িয়েছে ঠিক এমন সময় পেছনে মায়ের কণ্ঠ,
এই ঘরে না ঢুকে ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি করছো ?
কিছু না মা।
কিছু না কী? আমি দেখছি চোরের মতো দাঁড়িয়ে আছো, ঢুকছো না ঘরে! এ কী হাতে পায়ে এতো ময়লা, শার্টে ধূলা-বালি। যাও হাত মুখ ধুয়ে নাও। জামা কাপড় পাল্টাও, নাস্তা হতে বেশী সময় লাগবে না। নুডলস করবো।

মা নিজের ঘরে ঢুকে যায়। নিলেশ অবাক হয়। ওর মা জামা কাপড়ে নোংরা দেখেও কিছু না বলে চলে গেলো। এতোক্ষণ ও খেয়াল করে নি ওর হাতে পায়ে কাপড়ে ময়লা। মা বাইরে বেরিয়ে এলো।
 এখনও দাঁড়িয়ে আছো তুমি! যাও।
নিলেশ দেখলো ওর মা অন্য রকম করে শাড়ি পরেছে। কেমন যেন গোলমেলে লাগছে সব। শাড়িটা উল্টা। বাঁ কাঁধে আঁচল না দিয়ে মা আজ ডান কাঁধে দিয়েছে আঁচল।

ওরই মতো একটা ছেলে একটু ভাবিয়েছিলো ওকে। কিন্তু এখন আবার মায়ের মতো আর এক মা ওকে আরও ভাবিয়ে তুললো।  
কোথায় এসেছে ও ? এটা কি ঢাকা ? এটা কি ওদের বাড়ি ? কোথায় এসেছে ও ?
সায়েন্স ফিকশন পড়তে পড়তে প্যারালাল ওয়ার্ল্ডের কথা জানতে পেরেছে নিলেশ। প্যারালাল ওয়ার্ল্ড পৃথিবীর সমান্তরালে চলে। প্যারালাল ওয়ার্ল্ডের কথা কেউ বিশ্বাস করে কেউ করে না। কিন্তু প্যারালাল ওয়ার্ল্ড বিশ্বাস করে নিলেশ।
তবে কি ও ---
নিলেশ আর ভাবতে পারে না। ওর মাথার ভেতর কেমন রিনরিন শব্দ হচ্ছে। মন বলছে লুকিয়ে পড়ো, লুকিয়ে পড়ো নিলেশ। নিলেশ চুপিচুপি ঘরে ঢুকে খাটের নিচে লুকিয়ে পড়ে। উল্টো নিলেশ এতক্ষণ শুয়ে ছিলো, এবার উঠে বসে টেলিভিশন বন্ধ করে। উল্টো নিলেশ ওঠার আগেই ঘরে ঢুকে পড়েছে নিলেশ তা না হলে ওর ‘দফা রফা’ হয়ে যেতো। সময় মতো ঈশ্বর বাঁচিয়েছে ওকে। আঃ একটা আরামের নিঃশ্বাস ফেলে নিলেশ।

প্রায় বিশ মিনিট পরে ডাকে মা। বিথি, নিলেশ খেতে এসো।
নিলেশেরও খুব খিদে পেয়েছে। কিন্তু খেতে যেতে পারছে না। উল্টো নিলেশ আছে। ওর সামনে পড়া চলবে না। কিন্তু পেটের ভেতর ছুঁচোর কেত্তন শুরু হয়েছে। খিদায় মনে হচ্ছে হাজারটা ছুচো চিঁচিঁ করে গান গাইছে।
নিলেশ পেট চেপে, ঠোঁট কামড়ে খাটের নিচে পড়ে থাকে।

উল্টো নিলেশ ঘর থেকে বের হলে খাটের তলা থেকে বের হয় নিলেশ। ওয়ারড্রব থেকে গেঞ্জি আর প্যান্ট নিয়ে বাথরুমে ঢোকে। খুব তাড়াতাড়ি গোসল সেরে বের হয়। ময়লা কাপড়সহ ঢুকে পড়ে খাটের তলে।
অপেক্ষা করে কখন উল্টো নিলেশ বাড়ি থেকে বের হবে। ও বের হলেই তবে না খাবার খেতে পারবে। ও চিন্তা করার সঙ্গে সঙ্গে শুনতে পায় উল্টো নিলেশ বলছে,
মা, আমি সুমনদের বাড়ি যাবো।
এখন যাবে ? এই অবেলায়। মা বলে।
যাই মা। যাবো আর আসবো।
বেশ যাও। দেরী করো না।
আচ্ছা। মায়ের কথায় সায় দিয়ে বেরিয়ে যায় উল্টো নিলেশ।

উল্টো নিলেশ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর খাটের তলা থেকে বের হয় নিলেশ। ডাইনিং রুমে এসে দেখে টেবিল মুছছে মা। খাবার গুছিয়ে রেখেছে। সিথি এখনও ফেরে নি। সিথির বাবাও আসে নি। ওকে দেখেই প্রশ্ন করে মা,
সুমনদের বাসায় যাও নি।
না, মা। তখন পেট ভরে নি। তাই আর কয় টুকরা পাউরুটি খাবো।
আশ্চর্য হয় মা। তবুও রুটিতে জেলি লাগিয়ে দেয়। হাপুস-হুপুস খায় নিলেশ। ওর খাওয়া দেখে মা আরও আশ্চর্য হয়। মা-কে অবাক তাকিয়ে থাকতে দেখে নিলেশ বলে,
আর দুটো দাও না মা।
মা, কথা না বলে আরও দুটো রুটি দেয় ওকে। ভাবে ছেলেটার হলো কি? এরকম তো ও নয়! অসুখ-বিসুখ করবে নাকি!
নিলেশ খেয়ে দেয়ে সিথি, বিথির ঘরে উঁকি দেয়। বিথি শুয়ে শুয়ে তিন গোয়েন্দা- ‘এখানেও ঝামেলা’ পড়ছে। বিথিটা এই রকমই, সারাদিন বই পড়ে। শুয়ে থাকে। ঘরের কোন কাজ করে না। বড়ো বোন সিথি মায়ের সঙ্গে ঘরের কাজ করে। আপু বোধহয় এখনও আসে নি। নিলেশ এখন আর অবাক হচ্ছে না। ও বুঝতে পেরেছে বিথি আর সিথিও ওর বোনদের মতোই হবে।

উল্টো নিলেশ আসার আগেই ওকে ঘরে ঢুকে যেতে হবে। বিথির ঘরে উঁকি দিয়েই আর দেরী করে না, দৌড়ে ঢুকে যায় উল্টো নিলেশের ঘরে। বিছানার চাদরটা সামনের দিকে টেনে নামিয়ে দেয় যাতে কেউ ওকে দেখতে না পায়। খটের নিচে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে। কিছু ভালো লাগে না ওর। আকাশ পাতাল ভাবতে থাকে ও।

কী করবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। এখানে সব কিছুই উল্টা। এটা প্যারালাল ওয়ার্ল্ড। ও এখানে বেমানান।
মাথায় কিছুই আসছে না। নাহ! শুয়ে থাকলে চলবে না। দেখতে হবে সব কিছু। বাড়ি ফেরার পথও বের করতে হবে। সুমনদের বাড়ি গিয়ে দেখবে কিছু হয় কি না।
 
ঘর থেকে বের হয়ে নামে পথে। সুমনরা থাকে মতিঝিল কলোনিতে। ওখানে একটা মাঠ আছে। বিকেলে ওরা সবাই খেলে ওখানে। কখনও ফুটবল, কখনও চি-বুড়ি, কখনও কানামাছি। কখনও আবার খেলার লোক হলে ক্রিকেটও খেলে ওরা।

নিলেশ ভাবতে ভাবতে এগিয়ে যায়। ওরা মাঠে খেলছে। ওদের মধ্যে উল্টো নিলেশও আছে। নিলেশ বুঝতে পারে, ও ভুল করে ফেলেছে। ওর এখানে আসা ঠিক হয় নি। ও ভুলেই গিয়েছিলো উল্টো নিলেশ এসেছে এখানে। ও আর এগোয় না। দূরে দাঁড়িয়ে ওদের খেলা দেখে। ওর খুব কান্না পায়। এতোবড়ো ছেলে কাঁদলে মানুষ কি বলবে! সবাই খেপিয়ে মারবে। পাশের দোকানের আড়ালে গিয়ে চোখ মুছে নিলেশ।
নিলেশ জানে এমনই হবে, প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে এমনই হয়। তবুও ভাবনার হাত থেকে রেহাই পায় না নিলেশ। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলো।
এখানে দাঁড়িয়ে কি করছো নিলেশ ? খেলছো না কেন ?
সুমনের বাড়ির দোতলার মহসিন কাকা। সালাম দেয় নিলেশ। কেমন আছেন, চাচি কেমন আছে জিজ্ঞেস করে।
মহসিন কাকা হাসে। সামনে এগিয়ে যেতেই দেখে খেলছে নিলেশ। অবাক হয়ে পেছনে তাকায়। নিলেশ ততোক্ষণে দোকানের আড়ালে সরে পড়েছে। মহসিন কাকা ধান্ধায় পড়ে যান। চোখের ভুল হয়ে গেলো।
তাই বলে এরকম ভুল। এরকম ভুল তিনি তো কখনও করেন না। নাহ, নিজের ওপর নিজেই বিরক্ত হন তিনি।

নিলেশ, মহসিন চাচা পেছন ফিরতেই দোকানের আড়ালে চলে গিয়েছিলো। এখান থেকে বের হওয়ার আগে কোন রকম অঘটন ঘটতে দেওয়া যাবে না। ওকে আরও সাবধান হয়ে চলতে হবে।
এই নিলেশ, নিলেশ।
বড়ো বোন সিথি। ইউনিভারসিটি থেকে ফিরছে। ওকে দেখে রিকশায় তুলে নেয়।
বাসায় ফিরে নিলেশ ডাইনিং রূমে ঢুকে রুটি, জেলি, কলা আর পানির বোতল নিয়ে খাটের তলে ঢুকে পড়ে। কী জানি রাতে খাবার পাওয়া যায় কি না যায়।  ও খাটের তলায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসে নিলেশ। সোজা বোনের ঘরে গিয়ে বলে,
আপু, দশটা টাকা দাও না। রিকশা ভাড়া দিবো।
রিকশা ভাড়া ! বিস্মিত সিথি।
তোকে না আমি রিকশা করে নিয়ে এলাম। ভাড়া তো দিয়েছি আমি। তুই আবার কেন দিবি। তোর টাকা লাগলে, কী জন্য টাকা লাগবে সেটা বল, টাকা দিচ্ছি।
আমি তো তোমার সঙ্গে আসি নি। বিশ্বাস না হয় বাইরে গিয়ে দেখো।
বাইরে গিয়ে দেখবো কি রে! আমিই তো নিয়ে এলাম তোকে। সুমনদের বাড়ির কাছে দোকানটার পেছনে চোরের মতো দাঁড়িয়ে ছিলি, আমি ডাকতেই চমকে উঠলি। কতো কথা জিজ্ঞেস করলাম, ঠিক মতো জবাব দিলি না। শুধু হু, হু করলি।
আপু, আমি আসি নি। তুমি দেখ না আপু। রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করো। আমি কিছু মনে করবো না।
সিথি, দশটাকা দিয়ে দেয় ওকে। ওর সঙ্গে এসে দেখে , উল্টো নিলেশ রিকশা ভাড়া দিচ্ছে।

সিথি ভাবে, এখন এলো নিলেশ তবে তখন ওর সঙ্গে কে এলো ? অবশ্য নিলেশকে কথা না বলতে দেখে আগেই মনে হয়েছিলো নিলেশ এমন কেন করছে ? প্রশ্নও করেছিলো।
কি রে কথা বলছিস না কেন ? শুধু হু হু করছিস।
কোথায় কথা বলছি না। উত্তর দিয়ে অন্য দিকে তাকিয়েছিলো নিলেশ। তখন একটু সন্দেহ হয়েছিলো ওর। সন্দেহটা দানা বাঁধে নি। এখন সিথির মনে নিলেশ কি দু’জন সন্দেহটা পাক খেতে লাগলো বারবার। জামা-কাপড় ছেড়ে ওর সন্দেহের কথা মাকে গিয়ে জানালো।

ওর কথা হেসে উড়িয়ে দিলো মা।
তুমি কি পাগল সিথি। আর নিলেশের কি যমজ কোন ভাই আছে যে দু’জন নিলেশকে দেখেছো তুমি। নাকি নিলেশ যাদু বিদ্যা শিখে তা  অ্যাপ্লাই করছে। এ কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফ্যলো। এই আলু কয়টা কুটে দাও।

মা রান্না করছিলো। সারাদিনের রান্না রাতেই সেরে রাখতে হয় তাকে। তা না হলে সময় হয়ে ওঠে না সকালে। সকালের নাস্তা, ওদের স্কুলের টিফিন, সিথির বাবার জন্য দুপুরের ভাত রান্না করে রেখে যাওয়া সবই করতে হয়। এতোগুলো কাজ  এক সকালে এক হাতে করে উঠতে পারেন না বকুল তারেক। রাতে সব রান্না করা থাকলেও গরম করা, টেবিল সাজিয়ে রাখা, সিথির বাবার অফিসের ফাইলপ্ত্র ঠিক করে দেওয়া, ছেলে মেয়ের স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হওয়ার তাগাদা দেওয়া, তারপর নিজের তৈরি হওয়া। মাঝেমধ্যেই লেট হয়ে যায়।

কিন্তু লেট হলে চলে না। ক্লাস ফাইভের ক্লাস টিচার তিনি। দিনের শুরুর ক্লাস লেট হলে চলেনা, তাছাড়া, দুপুরে বাড়ি আসতে হয় তাকে। না হলে ভুলো মনের মানুষ- সিথির বাবা ভাত খেতে ভুলে যায়।

সিথি, আলু কুটতে থাকে। মন থেকে কিছুতেই যাচ্ছে না নিলেশকে নিয়ে আজকের ঘটনাটা। বারবার ঘুরেফিরে একটা কথাই মনে আসছে, ওর সঙ্গে কে এলো, আর যে এলো, সে কোন নিলেশ !

রাত দশটা বেজেছে। খাটের নিচে নিলেশ পাউরুটি খেয়ে নেয়। বোতল থেকে ঢকঢক করে পানি খেয়ে খাট আর ওয়ারড্রবের আড়ালে লুকিয়ে রাখে। বাড়িতে কাজের লোক নেই। ঘর বাড়ির আনাচে-কানাচে ঝাড়ু দেওয়া হয় না প্রতিদিন। ঝাড়ু দেওয়া হলে এই দুইদিনে ধরা পড়ে যেতো নিলেশ।

টেলিভিশনে হ্যারিপটার সিনেমা চলছে। নিলেশের প্রিয় ছবি। দেখতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু কি ভাবে দেখবে? হ্যারিপটার দেখার জন্য খাটের নিচ থেকে মুখ বাড়াতে যাবে, এমন সময় মায়ের কণ্ঠ।
নিলেশ, এই নিলেশ শুয়ে পরো।
মা ঘরে ঢুকে টেলিভিশন চলতে দেখে রেগে যায়। মা, টেলিভিশন দেখা পছন্দ করে না। তবুও টেলিভিশন দেখে উল্টো নিলেশ। কিছু পছন্দের ছবি আছে, যা না দেখলে ভালো লাগে না ওর।
টিভিটা বন্ধ করো নিলেশ। কালকে সকালে উঠতে হবে।
কথাগুলো বলতে বলতে ঘর থেকে বেরিয়ে দরোজা বন্ধ করতে গিয়ে আবার নিলেশের কাছে ফিরে আসে মা।
নিলেশ, তোমার কী হয়েছে বলতো। কাল সাতটায় স্কুল যেতে হবে তাই পাউরুটি এনে রেখেছি তা খেয়ে ফেললে তুমি ! আমাকে জিজ্ঞেস করলে না।
‘মা’। আর্তনাদ করে ওঠে নিলেশ। আমি খাই নি মা।
মিথ্যে বলছ কেন? সিথি তো খাবেই না। আর বিথি ও তো খায় নি।
আমিও খাই নি মা, বিশ্বাস করো মা, আমি খাই নি।
তোমার খেতে ইচ্ছা করলে খাবে, কিন্তু আমাকে বললে হতো কি আমি আবার একটা রুটি আনিয়ে রাখতে পারতাম। যাও শুয়ে পরো।
ঠিক আছে মা। মা, দৌড়ে গিয়ে রুটি আনবো।
না, যেতে হবে না। এতো রাতে বাইরে যেতে হবে না।

পরদিন, তিন ছেলে-মেয়েকে স্কুল আর ইউনিভারসিটিতে পাঠিয়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হয় মা। যাওয়ার আগে সিথির বাবার কাছে মোবাইল করে মা। মোবাইল বেজে বেজে থেমে গেলো, কেউ ধরল না। কাল রাতে ক্লিনিক থেকে বাড়ি আসেন নি বাবা। স্কুলে হাজিরা দিয়ে তার খোঁজেও যেতে হবে। মা জানেন না, স্কুলে গিয়ে বের হতে পারবেন কিনা। তবুও টিফিনবক্সে কিছু খাবার ভরে নিয়ে বেরিয়ে যায় মা।

মোফাজ্জল তারেক গবেষণা করছে। মা খুশি। একটা কিছু আবিষ্কারে দেশের যদি ভালো হয়, তাহলে তো মোফাজ্জল তারেকের নাম হবে। আর মোফাজ্জল তারেকের নাম হলে ভালো লাগবে বকুল তারেকেরও।

খাটের নিচে নিলেশের খিদে লেগেছে। কেউ বাড়িতে নেই। দুই দিন ভাত খায় নি। আজ ভাত খেতে ইচ্ছা করছে। ডাইনিং টেবিলে এসে দেখে ভাত আর মাংস। পেট পুরে খেয়ে বাইরে যেতে গিয়ে দেখে দরোজায় তালা বন্ধ। ফিরে আসে ঘরে। টেলিভিশন ছাড়ে।

ওর স্কুলের কথা মনে হয়। প্রতি সপ্তাহে স্কুলে পরীক্ষা নেয়। সাপ্তাহিক পরীক্ষার নম্বর ফাইনাল পরীক্ষার নম্বরের সঙ্গে যোগ হয়। পরীক্ষা দিতে না পারলে তো রেজাল্ট ভালো হবে না। পরীক্ষায় এমনিতে ফার্স্ট হতে পারে না। বীজগণিতের সুত্র মনে থাকে না। হাজারবার মুখস্ত করেও মনে রাখতে পারে না ও।  

পরীক্ষার কথা মনে পড়ে ওর। ওর মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যায় নিলেশ, এই বাড়ি, এই স্কুল, এই মা, বাবা, বোন ওর কেউ নয়। এই পৃথিবী, এই সময়ও ওর নয়। এখানে সব ওর মতো হলেও সব কিছুই উল্টা-পাল্টা।

ও টেলিভিশন দেখছে। সব কিছুর সঙ্গে বেমালুম ভুলে আছে বাড়ি আসার সময় হয়েছে মায়ের। মা এসে খাবার নিয়ে পৌঁছে দেয় ক্লিনিকে। তা না হলে আত্মভোলা মানুষ খেতেই ভুলে যাবে। মায়ের যন্ত্রণার শেষ নেই।

প্রথম দিকে স্কুল থেকে ছুটি পেতো না মা। বাবারও খাওয়া হতো না। এতে শরীর খারাপ হয়ে প্রায় একমাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছিলো। মা-কেও নিতে হয়েছিলো ছুটি। এর পর থেকে ছুটি ম্যানেজ করেছে মা।

নিলেশ এখানে কী হয় তা পুরোপুরি জানতে পারে নি। ওর বাবার ক্ষেত্রে এমন হয়েছিলো তাই ভাবছে এই উল্টো নিলেশের ক্ষেত্রেও এমনই হয়েছে। মা, বাবা, আর বোনদের কথা মনে পড়তেই কান্না পায় নিলেশের। কেঁদে ফেলে নিলেশ। কান্নার মধ্যেই শুনতে পায়  একা একাই কথা বলছে মা। এতো কম কেন ভাত? ভুলে কি চা’ল কম দিয়েছি। এইটুকু সময়ের মধ্যে ভাত রান্না করতে পারবো না। কী করি এখন।

নিলেশের বাবার কথা মনে পড়ে। বাবাকে দেখতে ইচ্ছা করছে। না হোক নিজের বাবা। বাবার মতো দেখতে তো। গুটিগুটি পায়ে মায়ের সামনে এসে দাঁড়ায় নিলেশ। হাতদুটো সামনে রেখে এক হাত দিয়ে অন্য হাত ধরে আছে। মুখে ভয় লেপ্টে আছে। ওকে দেখেই রেগে ওঠে মা,
তোমার স্কুল কি ছুটি হয়ে গেছে ? না কি স্কুলেই যাও নি ?
নিলেশ খুব আস্তে আস্তে গোবেচারা ভঙ্গিতে বলে,
ছুটি হয়েছে মা। তুমি এখন কী করবে। ভাত রান্না করলে, তুমি ভাত রান্না করো, আমি বাবার খাবার নিয়ে ক্লিনিকে যাই।
অবাক হয় মা। নিলেশ হাসপাতাল যাবে ! অবাক কান্ড! যাকে কখনও ঠেলে ধাক্কিয়ে নেওয়া যায় না হাসপাতালে, সে আজ স্বেচ্ছায় যেতে চাচ্ছে হাসপাতাল।

নিলেশ বুঝতে পারে, অবাক হয়েছে মা। কিন্তু এখন আর করার কিছুই নেই। হাসপাতালে বাবার খাবার দিয়ে আজ বনের ধারের সে মাঠের ওই ঘাসফড়িংকে খুঁজতে যাবে। ঘাসফড়িংকে খোঁজার জন্য বাবার মানিব্যাগ, মায়ের পার্স, বোনের ব্যাগ থেকে টাকা নিয়েছে। ও জানে এভাবে না বলে নেওয়া ঠিক না, তবুও নিয়েছে, না নিয়ে কোন উপায় নেই ওর।

এভাবে টাকা নিতে খুব খারাপ লেগেছে ওর। টাকার প্রয়োজন হবে। কারণ ও জানে না কয়দিন এই বাড়ির বাইরে থাকতে হবে ওকে। আদৌ এই বাড়ি কিংবা নিজের বাড়ি যেতে পারবে কী না জানে না ও। তবুও পথ তো খুঁজতেই হবে ওকে।

নিলেশ টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে। মা আশ্চর্য হয়েছে, আরও হবে। যখন দেখবে টাকা নেই, বিরক্ত হবে সবাই উল্টো নিলেশের ওপর। এমন কি মারতেও পারে ওকে। উল্টো নিলেশের কথা ভেবে অর মনের ভেতর একটা দুঃখবোধ জেগে ওঠে। মনে মনে বলে, আমাকে মাফ করে দাও ভাই উল্টো নিলেশ।

কিন্তু এতোসব ভাবলে চলবে না ওর। ওকে যেতে হবে সেই সবুজ অরণ্যে। খুঁজে বের করতে হবে সেই
ঘাসফড়িংকে, জানতে হবে এখান থেকে বের হওয়ার পথ।  হাসপাতাল থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামে নিলেশ। সবুজ ঘাসফড়িং যে রাস্তা বাতলে দিয়েছিলো তাতো এখন ভুলে গেছে নিলেশ। ভাবছে কোন পথে যাবে।

একটা রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে নিলেশ। ঈশ্বরের ওপরই ভরসা এখন। যা থাকে কপালে। চেষ্টা করতে হবে। বিনা চেষ্টায় মারা তো যেতে পারে না ও। ও হাঁটে। রাস্তায় অনেক পরিচিত মানুষ। যাদের সঙ্গে ঘনিষ্ট তাদের দেখলেই লুকিয়ে পরছে। এমনই করে অনেকটা পথ হাঁটে কিন্তু সবুজ অরণ্যের দেখা পায় না। খুব পানি পিপাসা পেয়েছে। মাঠের ধারে একটা গাছের ছায়ায় বসে ফ্লাস্ক থেকে এক ঢোক পানি খায়। বেশি পানি খেতে চাচ্ছে না, পানি ফুরিয়ে গেলে যদি পানি না পায়। পানির প্রয়োজন তো সবসময়। পানি খেয়ে গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলেশ। ক্লান্তিতে চোখ জুড়ে ঘুম চলে আসে। ঘুমের মধ্যেই মনে হয় কে যেন ডাকছে।
নিলেশ, নিলেশ।
নিলেশ তাকিয়ে দেখে ওর সামনেই একটা বেগুনি ঘাস ফুল। সেই ফুলের ওপর বসে পাখা নাড়ছে সেই সবুজ ঘাসফড়িং। ডাকছে ওকে।
নিলেশ, নিলেশ।
ও আমার সুন্দর মনের ঘাসফড়িং, তোমাকেই খুঁজছিলাম। আমার এই অবস্থা কেন, আমাকে বলো।
ধৈর্য ধরো, ধৈর্য ধরো বন্ধু। ঘাসফড়িং হাসে।
হেসো না ঘাসফড়িং, হেসো না। তোমার কথা শুনে বাড়ি গেলাম। ওখানে দেখি আমারই ঘরে আমারই মতো আর এক নিলেশ। আমার মা, আমার বোনের মতো মা আর বোন। আমার বাবার মতো বাবা। কিন্তু সবাই কেমন উল্টা।
হ্যাঁ। এমনই তো হবে ! কারণ তুমি প্যারালাল ওয়ার্ল্ডে এসে পড়েছো।
প্যারালাল ওয়ার্ল্ড ? এক একবার আমারও তাই মনে হচ্ছিলো, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
নিলেশ উদাস ভঙ্গিতে কথাগুলি বলে।
বিশ্বাস না করার কী আছে। বিজ্ঞানীরা মনে করে এই পৃথিবীতে একই সময়ে একের অধিক পৃথিবী একই সমান্তরালে চলছে। তোমার পৃথিবীতে তুমি যেমন, তোমরা যেমন, তেমনি তোমার মতো, তোমাদের মতো এখানকার পৃথিবী। এক পৃথিবীর কেউ যদি কোনভাবে অন্য আর এক পৃথিবীতে চলে আসে তাহলে তার কাছে সময়টা একটু অন্য রকম লাগবে। মনে হবে সব যেন কেমন কেমন! বিস্মিত হবে সে।
এখানে সব একরকম, কিন্তু সবই উল্টা, আয়নার ভেতরে যেমন দেখায় তেমন।
হা হা হা হা । হাসে ঘাসফড়িং।
তুমি হেসো না ঘাসফড়িং, আমাকে বলো আমি এখন কী করবো ?
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ঘাসফড়িং উড়ে গিয়ে অন্য এক ফুলে বসে। পাখা নাড়ায়। নিলেশ তাকিয়ে দেখে ঘাসফড়িং এর পাখায় নানা রঙের সুন্দর ছবির দাগ ফুটকি। সব ভুলে ঘাসফড়িং এর পাখার দিকে চেয়ে থাকে নিলেশ। আপনমনে বলে, সুন্দর। ফ্যান্টাস্টিক।
নিলেশের দিকে তাকায় ঘাসফড়িং। বলে,
তোমাকে সাবধানে চলতে হবে। যে পথ দিয়ে এসেছো তুমি, ঠিক সে পথেই ফিরে যেতে হবে তোমাকে। তোমাকে খুঁজে বের করতে হবে সেই রকম টাইম-গেইট। ওই গেইট দিয়েই যেতে হবে, না হলে ---
ঘাস ফড়িং চুপ করে যায়। অধৈর্য হয় নিলেশ।
বল, তারপর কী ? না হলেই বা কী ?
নাহলে, যদি কখনও এই পৃথিবীর নিলেশের সঙ্গে তোমার শরীরের কোন অংশ ভুলেও লেগে যায় তাহলে তুমি বিপদে পরবে।  
নিলেশ খুব ভয় পেয়ে যায়।
কী করবো তাহলে ?
তাকিয়ে দেখে ঘাসফড়িং নেই। নেই ওর সামনের বেগুনি রঙের ফুল, ফুলগাছ। নিলেশ গাছে হেলান দিয়ে ভাবতে থাকে। কী করে ফিরে যাবে এখান থেকে। কবে দেখা হবে বোনদের সঙ্গে, মা-বাবার সঙ্গে । বোনদের কথা মনে পড়ে। কী করছে এখন ওরা। ওদের কি ওর জন্য খারাপ লাগছে, ওরা কি খুজছে ওকে? ওরা কি ওর জন্য না খেয়ে আছে? ওর বড়ো আপু তো ওকে ছাড়া কখনও খেতো না। আজ কি খাচ্ছে?  নানা প্রশ্ন ভীড় করে নিলেশের মনে। আবার নিজেই সমাধান দেয়।

না খেয়ে কী করবে ওরা। কারও জন্য কী কারও সময় থেমে থাকে, না কি খাওয়া আটকে থাকে। সময় তার নিজের নিয়মে বয়ে যায়। মানুষের ক্ষুধা লাগে, ঘুম পায়, মানুষকে তার জীবনের প্রয়োজনে খেতে, পরতে, ঘুমাতে সব করতে হয়।

নিলেশ, সিথিকে ডাকে। ওর খুব ডাকতে ইচ্ছা করে।
আপু, আপু রে। কোথায় তুই। আমি তোর কাছে যাবো রে আপু। আমি মায়ের কাছে যাবো, বাবার কাছে যাবো, বিথির কাছে যাবো। আমি বন্ধুদের সাথে খেলবো। স্কুলে যাবো।
আপুরে, আমি পথ খুঁজে পাচ্ছি নারে আপু।
পথ? কোথায় পথ? কোথায় ওর বাড়ি ফেরার পথ? পথ যদি না পায় তবে কী সারা জীবন এখানে এই লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতে হবে? আর থাকতে থাকতে যদি উল্টো নিলেশের সঙ্গে ধাক্কা লাগে, তাহলে---
আর ভাবতে পারে না নিলেশ। কান্না পায় ওর । দু’চোখ ভরে কান্না আসে। কাঁদে।
কাঁদতে কাঁদতে দুই হাতে টেনে ধরে মাথার চুল। মৃত্যুভয় চেপে বসে ওর মনে। ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে বসে থাকে ও। উল্টো নিলেশের বাড়ি যেতে ভয় করছে। উল্টো নিলেশ আছে ওখানে। যদি কোনভাবে ঊল্টো নিলেশের সঙ্গে ঠোকাঠুকি হয়ে যায়, তাহলে--- আর ভাবতে চায় না নিলেশ।

চারদিন বাড়ির বাইরে ও। চারদিন পানি কিনেছে, খাবার কিনেছে, খেতে ইচ্ছা করে নি, তাও খেয়েছে। গাছের নিচে শুয়ে থেকেছে। হাতে যা টাকা ছিলো তা ফুরিয়ে গিয়েছে। এখন তো ওই বাড়িতে যেতেই হবে ওকে। পেটে ক্সুধা। পেটে ক্ষুধা থাকলে তো কোন কাজ করতে পারা যায় না। মাথা থেকে কোনো বুদ্ধি বের হতে চায় না। ওই বাড়িতে না গেলে খাবার পাবে কোথা থেকে। অন্য জায়গা থেকে চুরি করার থেকে ওই বাড়িতেই চুরি করবে। ওই বাড়িতে না থেকেও যদি অন্য বাড়িতে থাকে তাহলে তো আরও হাঙ্গামার সৃষ্টি হবে। যেখানেই থাকবে, ওখানকার সকলে মিলে আবার ওই বাড়িতেই রেখে যাবে ওকে। এতো হাঙ্গামা করার থেকে ওই বাড়িতে যাওয়াই স্থির করে ও। আর এটাকে তো নিজের বাড়িই মনে হয় ওর। না বলে খেলেও মনে হয় না চুরি করে খাচ্ছে। ও ভাবে, এ যাত্রা বেঁচে ফিরতে পারলে এ অন্যায়ের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করবে।

বাড়ির দরোজা খোলা। বাড়ির ভেতর ঢুকতেই ঊল্টো নিলেশের চিৎকার শুনতে পায়।
মা, ও মা, আমার খয়েরি রঙের গেঞ্জি আর কালো প্যান্ট পাচ্ছি না। ও মা, জানো নাকি কোথায়।
আমি কী জানি। তোমার জামা প্যান্ট তোমারই তো ভালো জানার কথা।
মায়ের কন্ঠে বিরক্তি টের পায় নিলেশ।
তোমাকে নিয়ে পারি না। এই কয়দিন হয়েছে কী তোমার? ডাবল-ডাবল শার্ট প্যান্ট নোংরা করলে, এখন আবার বলছো গেঞ্জি নেই , প্যান্ট নেই। এসব তো ভালো নয় নিলেশ।
মা, আমি ডাবল-ডাবল নোংরা করি নি মা, বিশ্বাস করো মা।
তুমি করো নি তবে বাড়িতে ভূত এসেছে। ভূত তোমার শার্ট প্যান্ট পরছে।
মা !!!
মায়ের বিরক্তি আর রাগে কেঁদে ফেলে উল্টো নিলেশ।  ওর কান্নায় আরও বিরক্ত মা।
কাঁদছো কেন ? আমি কান্না করার মতো কোনো কথা বলেছি? চুপ করো। ছেলেদের কান্না শুনতে আমার একটুও ভালো লাগে না।  
কান্না থামিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় উল্টো নিলেশ। মায়ের আঁচল ধরে ডাকে,
মা, মা, তুমি বিশ্বাস করো আমার কথা, আমি কিছুই করি নি। আমার মনে হয় কী জানো মা, এই বাড়িতে কেউ লুকিয়ে আছে যাকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে মা, আমি ওকে খুঁজে বের করবোই।
ও তুমি ভাবছো, কেউ আছে এই বাড়িতে যে তোমার জামা কাপড় পরছে, টাকা চুরি করছে, খাবার খাচ্ছে তাই না। নিলেশ, তুমি জানো এরকম কথা শুনলে আমার খুব রাগ হয়। তারপরেও---
কিছুক্ষণ কথা বলে না মা। তারপর বলে,
ছাড়ো, আঁচল ছাড়ো। আমার অনেক কাজ পড়ে আছে। আজ ছুটি দেখে রক্ষা। যাও।

ওদের কথার ফাঁকে সিথিদের ঘরে ঢুকে যায় নিলেশ। খাটের তলায় ঢুকে পড়ে। ভাগ্যিস দেখা হয় নি উল্টো নিলেশের সঙ্গে, দেখা হলে তো হয়েছিলো আর কী? যে রাগ হয়েছে উল্টো নিলেশের।
খাটের তলায় ঢুকে নিলেশ ভাবে, এখানে সব কিছু শুধু উল্টাই নয়, এখানে মা, সবার সঙ্গে তুমি করে বলে। কিন্তু ওর মা ওদের তুই করে বলে। তুই বললে যতোটা আপন শোনায়, তুমিতে অতোটা শোনায় না। একটা নিঃশ্বাস ফেলে নিলেশ।


ওদিকে নিলেশের দাদির বাড়িতে বাবার আসার কথা ছিলো না। বাবা এসে পড়ায় সিথি, বিথি দুজনেই খুব খুশি। সবার আগে দেখেছে সিথি। বাইরের বারান্দায় বসেছিলো সিথি। রাস্তায় বাবাকে দেখেই দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বুকে।  বুকের ভেতর আনন্দের লক্ষ শালিক কিচির মিচির করছে সিথির।



বাবার হাত ধরে বাড়ি এসে মা, দাদি ডাকতে ডাকতে বাড়ি মাথায় করে সিথি। ওর ডাকে বিথি আর মা উঠানে বেরিয়ে আসে। দাদি বাড়ি নেই।  
রোমেনা বেগম, রোজ সকালে নামাজ শেষ করে হাঁটতে যান। নিয়ম করে দুই ঘণ্টা হাঁটতে বলেছেন ডাক্তার। প্রতিদিন আগেই চলে আসেন। আজ আম-লিচুর বাগান দেখতে গিয়েছিলেন, তাই আসতে দেরী হচ্ছে।

মোফাজ্জল তারেককে দেখে উজ্জ্বল হয়ে ঊঠে মায়ের মুখ। মা, বাবার কুশল জিজ্ঞেস করে। এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খাইয়ে গোসলের কথা বলে রান্না ঘরে যায়। রান্নাঘরে রুটি বেলছিলো  সমিরন। ওগুলো সেঁকে রাখতে হবে। একটা ভাজি করতে হবে। সিথির বাবা রুটির সঙ্গে সুজির হালুয়া না হয় সেমাই আর ডিম পোচ খেতে পছন্দ করে। সেগুলো বানাতে হবে।
সিথি, বিথির হাসি শোনা যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে বাবার হাসিও মিলছে ওদের হাসিতে। ওদের আনন্দে বকুল তারেকেরও আনন্দ হচ্ছে।
মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে জামা কাপড় নিয়ে ওয়াস-রুমে যেতে যেতে নিলেশের কথা জিজ্ঞেস করে বাবা।
নিলেশকে তো দেখছি না।
মায়ের সঙ্গে হাঁটতে গেছে মনে হয়।
বকুল তারেকের রুটি সেঁকা শেষ হয়ে এসেছিলো। ভাজিও হয়ে গেছে। ওগুলো টেবিলে রাখতে রাখতেই দেখে
বাড়িতে ঢুকছে রোমেনা বেগম।
ওই তো মা এসেছে।
মাকে সালাম করে মোফাজ্জল তারেক। খুশিতে উজ্জ্বল মা।
তুমি কখন এলে বাবা।
এই তো মা, আধঘণ্টা হবে। তুমি কেমন আছো মা।
ভালো।
নিলেশ কোথায় মা।
রোমেনা বেগম অবাক হলেন।
নিলেশ তো আমার সঙ্গে যায় নি। বারান্দায় নেই দেখে ভাবলাম ঘুমিয়ে আছে। যাওয়ার আগে তাই ডাকি নি।
মা, নিলেশ তো বিছানায় নেই। বকুল তারেক বলেন।
তাহলে নাদুসের কিংবা টোকনের সঙ্গে কোথাও যেতে পারে। রোমেনা বেগম বলেন।
ওরা এলে জানা যাবে।
বাবা শাওয়ার নিতে ঢোকেন। রোমেনা বেগম হাত মুখ ধুয়ে একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য বারান্দায় বসেন।
দশটা বেজেছে। নিলেশ ফেরে নি। টোকন এসেছে, ওর সঙ্গে যায় নি নিলেশ। একটু পর নাদুসও এলো একা।
ওদের কারও সঙ্গে যায় নি নিলেশ। নিলেশকে দেখেও নি ওরা। সকাল গিয়ে দুপুরও গড়িয়ে যায়। নিলেশ আসে না। চারদিকে লোক পাঠিয়েছে রোমেনা বেগম।

বাবা এসেছে গ্রামে বিয়ের আনন্দে যোগ দিতে, নিলেশের হারিয়ে যাওয়ায় বিয়ের আনন্দও বন্ধ। কেউ আনন্দ করতে পারছে না। খেতে পারছে না। একটা নিরানন্দ বাড়িতে পরিণত হয়েছে আনন্দের এই বাড়িটি। বিয়েটা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য বললেন রোমেনা বেগম।

গবেষণা ফেলে আসতেই চায় নি মোফাজ্জল তারেক। পাঁচ বছর ধরে চলছে এই গবেষণা। এখন শেষের দিকে, মোফাজ্জল তারেক ভেবেছেন গ্রাম থেকে ফিরে গিয়ে রেজাল্ট জানবেন নিজে, প্রেস কনফারেন্স করে গবেষণার ফলাফল  জানাবেন সকলকে।

মানুষের ব্রেন ট্রান্সফার। যার মাথায় বেশি বুদ্ধি, তার মাথার কিছু ব্রেন নিয়ে যে নির্বোধ, বুদ্ধি যার কম তার মাথায় স্থাপন করলে নির্বোধ ওই মানুষটা কিছুটা হলেও বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে। কোন বিজ্ঞানী যদি তার মাথার ব্রেনের কিছুটা অংশ সাধারণ মানুষের মাথায় স্থাপন করে তাহলে সে সাধারণ মানুষটা বিজ্ঞানী হয়ে যাবে। যে অঙ্ক বুঝে না সে অঙ্ক ভালো বুঝবে।  

গবেষণার এখন শুধু রেজাল্ট বাঁকি। মোফাজ্জল তারেকের জন্য এখন সুসময়। আর এই সুসময়ে গায়েব হয়ে গেলো নিলেশ। কোথায় গেলো নিলেশ। ওর শত্রু পক্ষ, যারা এই গবেষণার থিসিস চুরি করতে চায়, তারা নিয়ে গেলো না তো! বাবা চিন্তায় পড়ে যান।

নিলেশের মা, রাগ করছে একবার, একবার কাঁদছে। নিলেশের বাবা ছাড়া এই রাগারাগি, কান্নাকাটি কেউ শুনতে পাচ্ছে না।
তোমার জন্য, তোমার ভাইয়ের জন্য আমার গ্রামে আসা। গ্রামে না আসলে তো আমার ছেলেকে হারাতাম না। আমার ছেলে এনে দাও। এনে দাও আমার নিলেশকে।
নিলেশের বাবা অবাক। সিথির মায়ের মতো শক্ত মনের মানুষ কাঁদছে। নিলেশের বাবা স্বান্তনা দিতে পারে না। কী বলে স্বাস্তনা দিবে বুঝতেও পারে না। বসে থাকে মায়ের পাশে চুপচাপ।

নিলেশকে খুঁজতে ব্যস্ত সকলে। রোমেনা বেগম গ্রামের এ মাথা থেকে ও মাথা খুঁজে এলেন নিজে। নাদুসকে পাঠালেন শহরে এক ভাইয়ের বাসায়, টোকনকে পাঠালেন অন্য ভাইয়ের বাসায়। ওরা ফিরে এসেছে। নিলেশ নেই।

মা, রোমেনা বেগম, ছেলের ঘরে ঢোকে। বকুল তারেককে ডাকে। বকুল তারেক কথা বলে না। ছেলে বলে,
বলো মা, আমাকে বলো।
তুই একবার থানায় যা বাবা। এতোবেলা পর্যন্ত যখন এলো না, তখন এভাবে বসে থাকা যায় না বাবা। তুই যা বাবা।
মোফাজ্জল তারেক থানার উদ্দেশ্যে বের হয়। তোফাজ্জল তারেক খুব মুষড়ে পরেছে। নিজেকে দোষ দিচ্ছে। ওকে সঙ্গে সঙ্গে রাখে নি কেন, সেই কথা ভেবে নিজের ওপর নিজেরই রাগ হচ্ছে ওর। ভাবীর সামনে লজ্জায় যেতে পারছে না।

দাদির মনে পড়ে, ছোট বেলায় নিলেশের বাবা, মাঝে মাঝেই উধাও হয়ে যেতো। কোনো কোনোদিন কালীমন্দিরের দেবীর বেদীতে ঘুমন্ত অবস্থায় পাওয়া যেতো ওকে। কখনও দেখা যেতো খাটের তলায় মাদুর পেচিয়ে ঘুমিয়ে আছে।
ছেলে মাঝে মাঝেই এরকম বিরক্ত করতে লাগলো। একদিন ওর বাবা, দিলদার তারেক উঠানের মধ্যে রোদে দাঁড় করিয়ে রেখে দিলেন তিন ঘণ্টা। সেই থেকে ছেলের ঘর পালানো বন্ধ হলো। ছেলে লেখাপড়ায়ও হলো মনোযোগী। এমটি, টিটি’র বাবা এভাবেই ছেলেদের শাসন করতেন। তিনি ছেলেদের কখনও মারতেন না। ছেলেরা বাবাকে খুব ভয় করতো, করতো শ্রদ্ধাও। সমীহ করে চলতো বাবাকে।  

দাদি নাদুসকে কালীমন্দিরে পাঠালেন আর নিজে গেলেন ঘরের ভেতর খুঁজতে। এমটিকে পাওয়া গিয়েছিলো কিন্তু তার ছেলে নিলেশকে পাওয়া গেলো না।

মা, বিথিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো কিন্তু কিছুই জানতে পারলো না। শুধু জানতে পারলো একটা রূপার কৌটা নিয়ে খেলছিলো। ও চেয়েছে কিন্তু দেয় নি। ভ্যা করে কেঁদে ফেলে বিথি। মায়ের কাছে ধমক খেয়ে আরও বেড়ে যায় বিথির কান্না। সিথি ঘরেই ছিলো, ও জানে, কান্না দেখলে মায়ের রাগ আরও বেড়ে যায় তাই তাড়াতাড়ি বিথিকে ঘরের বাইরে নিয়ে যায় সিথি।

বাড়ির পেছনে বিশাল বাগান। আম, কাঁঠাল, লিচু, সফেদা, কলা, জাম, জামরুল নানা ধরণের ফল গাছ আছে এই বাগানে। এই বাগানের ফজলী আম খুব বড়ো বড়ো হয়। দাদি প্রতিবছর আম কাঁঠাল পাঠয় ওদের ঢাকার বাড়িতে।
বাগানে কিছুক্ষণ ঘুরলো সিথি। গল্প করলো বিথির সঙ্গে। কিন্তু সব কিছুর মধ্যেও ওর মনের মধ্যে শুধুই নিলেশ। গেলো কোথায় ? ও তো এরকম না। কোথাও না বলে যায় না কখনও। আর কোথাও গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছে, একথা বিশ্বাস হয় না সিথির। ও এখন পথ চিনে আসার মতো বড়ো হয়েছে। তা ছাড়া গ্রামের মানুষ একা একা ঘুরতে দেখলে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যাবে ওকে।

কৌটা নিয়ে খেলতে সিথিও দেখেছে ওকে। তবে ওই কৌটাটা কী টাইম গেইট? ওই গেইট দিয়ে কী চলে গেছে নিলেশ? কোথায় গেছে ? ফিরবে তো ? ওর কেন যেন মনে হচ্ছে ওই কৌটাটা টাইম গেইট আর ওই গেইট দিয়ে চলে গেছে। কিন্তু কোথায়, কোন সময়ে ?

সিথির কান্না পায়। ভালো আছে তো তার ছোট ভাইটা। ওর সাহস আছে আবার ভীতুও। ওর জন্য বুকের ভেতর কাঁপতে থাকে। টাইম গেইট কথাটা ভাবিয়ে তোলে সিথিকে। কৌটাটা যদি টাইম গেইট হয় তাহলে আর একটা টাইম গেইট না পেলে এই পৃথিবীতে ফিরতে পারবে না নিলেশ।

টইম গেইট এর কথা বলতে চায় সিথি কিন্তু বলবে কাকে? মা-কে বলবে? নাহ! মা বকা দিবে। মায়ের মন-মেজাজ দুই-ই খারাপ। মা এখানে আসতেই চায় নি। চাচার অনুরোধ আর নিলেশের জিদের জন্য এখানে আসা।

আজ চাচার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে, খুলনা যাওয়ার কথা। মা বলেছিলো, খুলনা গিয়ে মেয়ে দেখার পর দুই দিন থাকবে, বেড়াবে। এই আনন্দের সময় বিপদ বাধালো নিলেশ।
নিলেশটা গেলো কোথায়? আশ্চর্যের কথা, এই ছিলো এই নাই! বিস্ময়কর। সিথির কান্না পায়। কাঁদতে কাঁদতে ভাবে টাইম  গেইটের কথা কী দাদিকে বলা যায়। দাদি কী বুঝবে টাইম গেইট কি? নাহ, দাদি বুঝবে না। বাবাকে বলার কথা মনে হতেই চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায় সিথি।

ওর সন্দেহের কথা বলে বলে বাবাকে বলে সিথি। বাবা ওর কথা মন দিয়ে শোনে। কিছুটা হলেও বিশ্বাস করে। বাবার মনে হয় টাইম গেইট হলে হতেও পারে।

রাত ৮টা। নিলেশ ফেরে নি। বাড়ি জুড়ে দুঃখ ছড়িয়ে আছে। বাড়িতে এতক্ষণ হৈ হুল্লোড়ে ভরে থাকার কথা। কিন্তু ধুসর বিকেলের মতো করুণ নিরবতা ছড়িয়ে আছে বাড়িতে। মা কাঁদছে, কাঁদছে দাদি। সিথি, বিথি কেঁদে কেঁদে চুপ করে আছে। বাবা পায়চারী করছে।

মা, চোখ মুছে বাবার কাছে এসে দাঁড়ায়। বলে,
আমার নিলেশকে এনে দাও। কোথায় আমার নিলেশ। আমি আজকেই চলে যাবো। এখানে থাকলে আমার বিথিও হারিয়ে যাবে।
মায়ের মন যে এতো নরম আগে কখনও বুঝতে পারে নি সিথি। বাবাও পারে নি। মায়ের এই অবস্থা দেখে  নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে দাদির। ওদের এখানে না আনলেই হতো।

মা, কাপড় গোছাতে গোছাতে কাঁদছে। বাবা করুণ শান্ত কন্ঠে বলছে, কেঁদো না সিথির মা, নিলেশ চলে আসবে। আর এই রাতে আমরা কোথায় যাবো। কাল সকালে যাবো।
মায়ের রাগ হয়ে যায়।
কেউ আমার ছেলেটাকে দেখে রাখলো না। আমি আর এখানে থাকবো না।
তুমিও তো দেখে রাখো নি। নতুন জায়গা, তোমার তো ছেলের দিকে নজর দেওয়া উচিত ছিলো।
বাবার কথায় মায়ের আরও রাগ হয়ে যায়। মায়ের, চোখ আর নাক মুছতে মুছতে লাল হয়ে গিয়েছে। সেই লাল হয়ে যাওয়া নাক আবারও মুছে মা।  তারপর ব্যাগ থেকে সব কাপড় বের করে ছড়িয়ে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
কথা বলো না বেশী, ছেলে হারিয়েছে তোমার আর তুমি বসে আছো ঘরে। কে খুঁজে দিবে তোমার ছেলে?
মায়ের কথায় বাবা লজ্জা পায়। তাই তো ছেলেকে তো খুঁজতে যেতেই হয়। কিন্তু খুঁজবে কোথায়? গ্রামের সব জায়গায় তো খুজেছে ওরা। শুধু এ গ্রাম নয়, পাশের গ্রামও বাদ দেয় নি কেউ। গ্রামের মানুষরাও ওদের সঙ্গে খুঁজেছে। তবুও মায়ের কথা রাখতে নিলেশের বাবা হাঁটতে হাঁটতে বড়ো রাস্তায় এসে দাঁড়ায়।

চাচার বিয়েও বন্ধ। নিলেশকে পাওয়া যায় নি কোথায়ও। ওকে ছাড়াই ঢাকা চলে এসেছে সবাই। না এসে উপায় নেই। স্কুলে পরীক্ষা। সিথির ইউনিভার্সিটি, বিথির স্কুল। বাবার ক্লিনিক, গবেষণা। তা ছাড়া মায়ের আর এক মুহূর্ত গ্রামে ভালো লাগছিলো না।

এই পৃথিবীতে সময় থেমে থাকে না। কারও জন্য কোন কাজও আটকে থাকে না, আটকে রাখা যায় না।
আসার সময় বকুল তারেক তার শাশুড়ির সঙ্গে কথা বলে নি একটাও। মোফাজ্জল তারেক, মায়ের কাছে বিদায় নিতে এলে, মা খুব কষ্টে কথাগুলি বলে, আমার কোন কথা নাই রে বাবা।

নিলেশ নেই। ওদের ঢাকার বাড়িটা খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগে ওদের। প্রাণ নেই বাড়িতে। ওদের প্রাণের নিলেশ, আদরের নিলেশ নেই, কোন কিছুতেই মন দিতে পারে না ওরা। নিলেশ গেলো কোথায়? সারা গ্রাম খোঁজা হয়েছে, নেই কোথাও। ছেলে ধরার খপ্পরে পড়ে নি তো। টাইম গেইট তো কল্পকাহিনী তাই টাইম গেইট এর কথা ছাপিয়ে ছেলে ধরার চিন্তাটাই ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খায় সিথির মন।

অনেক হেঁটেছে নিলেশ। আর হাঁটতে পারে না। খিদে লেগেছে। খাওয়া হয় নি দুই দিন। উল্টো নিলেশের বাড়ি ঢোকে নিলেশ। ডাইনিং স্পেস দিয়ে সিথির রুমে যাওয়া যায়। ও ডাইনিং স্পেস থেকে রুটি, কলা, পানি আর আপেল নিয়ে টুক করে সিথির ঘরে ঢুকে যায়। সিথির ঘরে ঢোকাই সহজ। উল্টো নিলেশের ঘরে যেতে হলে উল্টা দিকে যেতে হয়। তাই ওদিকে না গিয়ে এদিকেই এলো নিলেশ।
রাত পার হয়ে সকাল হলো। সকালের খাবার দিতে এসে দেখে রুটি নেই, নেই আপেল কলা। মা রেগে গিয়ে ডাকে নিলেশ, এই নিলেশ।
জী। খাটের তলা থেকে জবাব দেয় নিলেশ।
জবাব দিয়েই বুঝতে পারে, ভুল করে ফেলেছে ও। ওকে ডাকে নি মা। ডেকেছে উল্টো নিলেশকে। নিলেশ জবাব দিলেও খাটের তলা থেকে বের হয় না নিলেশ। ও জানে উল্টো নিলেশ বাড়িতেই আছে। কিন্তু উল্টো নিলেশ আসছে না কেন? মা, রেগে যাবে। নিলেশ খেয়াল করে দেখেছে, ও যা ভাবে তাই ঠিক হয়ে যায়। এবারেও নিলেশের ভাবনা ঠিক হয়ে গেলো। রেগে গিয়েছে মা।
নিলেশ, এই গাধা, আসছিস না কেন? আমার কাজ আছে না।
মা। খাটের তলা থেকে বের হয়ে আসে নিলেশ।
যা, পাউরুটি নিয়ে আয়।
মায়ের দেওয়া টাকা নিয়ে বের হয়ে যায় নিলেশ। নিলেশ বের হয়ে যাওয়ার মিনিট পাঁচেক পরেই মায়ের কাছে এসে দাঁড়ায় উল্টো নিলেশ।
ডাকছিলে কেন মা?
ডাকছিলাম মানে। রুটি কোথায়? মা, খুব জোরে ধমক দেয় উল্টো নিলেশকে।
রুটি আনতে যাই নি তো মা। টাকা দাও। ভয়ে ভয়ে বলে উল্টো নিলেশ।
টাকা দিবো কীরে? টাকা না দিলাম। মায়ের মুখ রাগে লাল হয়ে গিয়েছে। সকালবেলা এমনিতে কাজের চাপ, তার ওপর এই রকম উটকো ঝামেলা কার মাথার ঠিক থাকে।
মা, আমি তো টাকা নেই নি। আমি বাথরুমে ছিলাম। তুমি বিশ্বাস করো মা।
তুমি বাথরুমে ছিলে, তাহলে টাকা কী ভূতে নিয়ে গেলো। উঃ পাগল হয়ে যাবো আমি। রোজ রোজ ফ্রিজে রাখা রুটি তরকারি, কলা খেয়ে ফেলছো তোমরা! আবার বলছো তোমরা কেউ খাচ্ছো না! এ কেমন কথা! টাকা দিলাম তোমাকে, টাকা নিলে আবার বলছো টাকা নাও নি। এ কেমন কথা হলো? বলো আমাকে?
মা, রুটি কলা কে খায় মা, জানি না। আমি যে খাই না এ-টুকু জানি। আমি তো মা রাতে রুটি কলা দেখলাম ফ্রিজে। পনির, জেলি সবই তো ছিলো মা।
কথা বাড়িও না নিলেশ, দোকানে যাও।

মা, রান্নাঘরে।
আনমনে ওর ঘরে এসে ঢোকে উল্টো নিলেশ। কে খেলো রুটি, কে খাচ্ছে পনির, জেলি, কলা? রুটি খাওয়া কয়েকদিন বন্ধ ছিলো, আবার শুরু হলো, কেন? কে আছে এই বাড়িতে? ভূত না জ্বীন? নাকি অন্য গ্রহের মানুষ?

সিথি একটা বই খুঁজছিলো। ওদের ক্লাসের একটা মেয়ের বই। বইটা চেয়েছে। নিলেশের ঘরে বইটা থাকার কথা। কোথাও না পাওয়া গেলে এই ঘরে পাওয়া যাবেই। কিন্তু আজ পাচ্ছে না। গেলো কোথায় বইটা। ওর যতোদূর মনে আছে বইটা ফেরত দেওয়া হয় নি।
কী রে, কী বিড়বিড় করছিস। ঊল্টো নিলেশকে ঘরে ঢুকতেই জিজ্ঞেস করে সিথি।
সিথির কথার জবাব না দিয়ে বলে,
কি খুঁজছো ?
কালিদাস রচনাবলী।
এখানেই তো ছিলো। আমি পড়তে এনেছিলাম।
বইটা কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। সিথির খুঁজতে খুঁজতে রাগ হয়ে গেলো।
তুইই আসলেই বকা হাওয়ার যোগ্য।
আপু, তুইও আমাকে বিশ্বাস করছিস না। আমি কিছু করছি না আপু।
তাহলে কে করছে, প্রমাণ করো।
উল্টো নিলেশ কথা খুঁজে পায় না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ওর মাথার চুলগুলো আদর করে নেড়ে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসে সিথি।

টেবিলে খাবার সাজিয়ে বাবার খাবার সাজাতে সাজাতে মা, উল্টো নিলেশের সঙ্গে কথা বলে,
নিলেশ মিথ্যে বললি কেন ?
মিথ্যে! কোন কথা মা। ভয়ে ভয়ে বলে উল্টো নিলেশ। ও বুঝতে পেরেছে মা খুব রাগ করেছে। রাগ হলে মা শান্ত সুরে কথা বলে। আর ওদের তুই করে বলে। মা এমনিতে তুমি করে বলে।
মিথ্যে বললি না! তুই যদি পাউরুটি কেনার টাকা নিস নাই, তাহলে পাউরুটি কেনার টাকা পেলি কোথায়?
আমি তো পাউরুটি আনি নি মা! আরও অবাক উল্টো নিলেশ।
মা, একটা থাপ্পড় দেয় ওকে। উল্টো নিলেশের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। কান্না ভেজা কন্ঠে বলে,
সত্যি বলছি মা, আমি পাউরুটি আনি নি। তাছাড়া আমি বুঝতে পারছি না মা, আমার কাপড় কে নোংরা করছে, কে আমার বই সরাচ্ছে, পরদিন আবার রেখে দিচ্ছে। কে আমার খাতায় লিখছে? কিছুই বুঝতে পারছি না মা।
কেউ ওর কথা বিশ্বাস করছে না। মনের দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে খাওয়া ছেড়ে উঠে যায় উল্টো নিলেশ।

খাটের তলা থেকে সব শুনতে পাচ্ছে নিলেশ। খুব খারাপ লাগছে ওর। এভাবে তো ও থাকতে চায় নি। এরকম চুরিও করতে চায় নি। চুরি করা খারাপ কাজ, তবুও চুরি করে খেতে হচ্ছে, চুরি করে থাকতে হচ্ছে। মন খারাপ হয়ে যায় আরও।
মা, মা, মাগো। মা-কে ডাকে নিলেশ। মা-কে দেখতে ইচ্ছা করছে খুব। এই মায়ের কাছে যেতে পারে কিন্তু সময় বুঝে যেতে হচ্ছে, না হলে বিপদ ঘটতে পারে।
ঊল্টো নিলেশ, সিথি বের হয়ে যায়। সিথি ইউনিভার্সিটি, উল্টো নিলেশ স্কুলে। বিথির ভ্যান এসেছিলো, আগেই চলে গেছে ও। সবার শেষে বের হয় মা।

ওরা সকলে চলে যেতেই খাটের তলা থেকে বের হয় নিলেশ। বাথরুমে যায়। শাওয়ার নিয়ে কাপড় বদলিয়ে উল্টো নিলেশের বিছানায় শুয়ে শুয়ে টেলিভিশন দেখতে থাকে। অনেকদিন টেলিভিশন দেখে নি। টেলিভিশনের ভলিউম একটু বেশীই ছিলো। তালা খোলার শব্দ শুনতে পায় নি নিলেশ। স্কুলের খাতা ফেলে গিয়েছে তাই নিতে ফিরে এসেছে মা।
স্কুলে যাওয়া বাদ দিয়ে টেলিভিশন দেখছো। উঃ আর পারি না---
মায়ের আওয়াজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চোঁ চোঁ খাটের তলে ঢুকে যায় নিলেশ।
নিলেশ, তুমি তো আগে এমন ছিলে না। খুব লক্ষী ছেলে ছিলে, সবার কাছে গর্ব করে বলতাম, তোমার কথা। আমাকে আগে কখনও জ্বালাও নি, কোন রকম যন্ত্রণা দাও নি। এখন বড়ো হয়ে কেন---
কথা বলতে বলতে ঘরে ঢোকে মা। টেলিভিশন চলছে, ঘরে কেউ নেই। বাথরুমে উঁকি দেয়, ওখানেও নেই। যে শার্ট আর প্যান্ট খুঁজে তোলপাড় সেই খয়েরি শার্ট আর কালো প্যান্ট পড়ে আছে বাথরুমে।
আশ্চর্য ছেলে! মা টেলিভিশন বন্ধ করে বের হয়ে যায়। দেরী হয়ে গেছে অনেক, আর দেরী করা যায় না।

বিকেলে সিথির কাছে এসব কথা বলে মা। সিথিরও সন্দেহ হয়েছে আগেই, সে কথাও বলে মাকে।
মা, এমন অদ্ভূত কান্ড কেন হচ্ছে বল তো। পাউরুটি থাকছে না, থাকছে না কলা। ভাত খেয়ে যাচ্ছে কেউ। মা তুমিই বলো, একবার খেলে আর পর মুহূর্তেই খাওয়া যায়! একটু ভাবো মা, কেন এমন হচ্ছে। আমাদের নিলেশ তো খুব ভালো ছেলে ও কেনই বা এরকম মিথ্যে বলবে, চুরি করবে!
কী জানি বাপু। আর কী চিন্তা করবো! ওর কি যমজ ভাই আছে না কি?
তা নেই। অন্য কোন জগত কিংবা গ্রহ থেকেও তো অর মতো কেউ আসতে পারে মা। সিথি এক নিঃশ্বাসে কথাগুলি শেষ করে।
সারাদিন ওইসব আজগুবি বই পড়ে পড়ে মাথায় আজেবাজে ভাবনার পাহাড় বানিয়ে ফেলছো, এটা ঠিক না সিথি।
সিথি কিছুই বলে না মাকে। এটা বিশ্বাসযোগ্য কথাও না। মায়েরও কোন দোষ নেই।
আপু।
উল্টো নিলেশ স্কুল থেকে ফিরেছে। ওকে দেখেই মা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ওর দিকে, তারপর বলে,
তোমার খয়েরি প্যান্ট আর কালো শার্ট খুঁজে পাচ্ছো না, তাহলে ওই দুটো কি?
উল্টো নিলেশ উঠানে তাকিয়ে বিস্ময়ে চিৎকার করে ওঠে।
মা! কোথায় পেলে?
কেন, বাথরুমে।
আমি তো খুলি নি মা!
তবে কে খুলেছে? সিথি না বিথি?
মা রাগ করো না। মেরো না আমাকে। আমার কথা শোন, বিশ্বাস করো মা। মা, আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে ব্যাটা আমার সঙ্গে এমন করছে, তাকে যদি পাই তবে---
যাও, আর বীরত্ব দেখাতে হবে না।
মা কথা শেষ করতে দেয় না ওকে। তুমি যাও এখান থেকে।

খাটের তলায় নিলেশ কানে আঙুল দেয়, এসব কথা শুনতে চায় না ও। সব কথা শেষ করে নি নিলেশ তবুও ওর কণ্ঠ শুনেই ভয়ে বুকে ভেতর কাঁপতে থাকে নিলেশের।

এখান থেকে চলে যাবে! কিন্তু যাবে কোথায়? টাকাও নেই কাছে যে লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়াবে। কয়দিন না খেয়ে থাকতে পারবে ও? তাছাড়া এই মহল্লায় যেখানেই যাবে, সবাই চিনে ওকে। ওকে দেখলেই এই বাড়িতে পৌঁছে দেবে। তারপর--- আর ভাবতে পারে না নিলেশ। একটা হার্টবিট মিস হয়ে যায় ওর।
সব কিছু চিন্তা বাদ দিয়ে নিলেশ সিদ্ধান্ত নেয়, এখানেই লুকিয়ে থাকবে। লুকিয়েই থাকতে হবে, কিন্তু কতোদিন লুকিয়ে থাকা যাবে? আর কীভাবেই বা লুকিয়ে থাকবে?
দুষ্টু বুদ্ধি খেলা করে নিলেশের মাথায়। উল্টো নিলেশকে যদি এই বাড়ি থেকে বের করে দোয়া যায়, তাহলে কেল্লা ফতে। কিন্তু বাড়ি থেকে কীভাবে বের করে দিবে ওকে? আর বের করে দেওয়াটা কী ভালো দেখাবে? অন্ধকার খাটের কোণে শুয়ে শুয়ে ভাবে নিলেশ। মশা খুব কামড় দিচ্ছে। ভাবনায় বাধা সৃষ্টি হচ্ছে তবুও ভাবতে ওকে হবেই। একটা পথ না বের করা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছে না মনে।

দি আইডিয়া। টাকা চুরি করলে তো ওকে বকবে না হয় মারবে! গহনা চুরি করলে, নিশ্চয় বের করে দেবে বাড়ি থেকে। কিন্তু কথা তো একটা থেকেই যায়। নিলেশ চুরি করছে, বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে ওকে, তাহলে ও যাবে কোথায়? উল্টো নিলেশ না থাকলেও নিলেশ তো থাকছেই। তাহলে, কেউ তো দেখতে পারবে না ওকে, কেউ কথা বলবে না ওর সঙ্গে, চোরের সঙ্গে--- নাহ,  
তাছাড়া এতো বড়ো খারাপ কাজ করা কী ঠিক ? না, না, বাতিল, বাতিল।

ঘাসফড়িংএর কথা মনে আবার। ছোঁয়াছুঁয়ি হলে তো রক্ষা থাকবে না। ও ফিনিসড। ধ্বংস হয়ে যাবে ও। অস্তিত্ব থাকবে ওর। উঃ মাগো। চোখ বন্ধ করে নিলেশ। নাহ, আর কিছু ভাববে না। যা হওয়ার তাই হবে।
নিলেশ শুয়ে থাকে চুপচাপ। ও দুষ্টুমি পছন্দ করে কিন্তু শয়তানি নয়।

নিলেশের চিন্তার জট পাকিয়ে যায়, কিছুই চিন্তা করতে পারে না। কী করবে ও--- চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। কাঁদলে তো কোন চিš—া করতে পারবে না। চোখ মুছে চিত হয়ে শুয়ে থাকে। উল্টো নিলেশকে যদি কোন জায়গায় বন্দী করে রাখা যায়। তারপর পথ পেলে ছেড়ে দেওয়া যাবে। খুশিতে লাফিয়ে উঠে বসতে গিয়ে আঘাত পায় কপালে। হাত দিয়ে দেখে ফুলে গেছে কপাল। মন বিষন্ন হয়ে যায় আবার।

পরদিন আনন্দের ঘটনা ঘটে গেলো। নিলেশকে কিছুই করতে হলো না। নানার বাড়ি থেকে চিঠি আর কার্ড এসেছে ছোট মামার বিয়ে ঠিক হয়েছে, সবাইকে যেতে হবে। মায়ের কার্ড দেখেই রাগ হয়ে যায়। ছোট ভাইয়ের বিয়ে দিনক্ষণ তো ওকে জিজ্ঞেস করে করতে পারতো। ওর কি যেতে ইচ্ছা করে না। বকুল তারেকের বাবা- মা অমনই। মেয়ের ইচ্ছা অনিচ্ছার মূল্য কোন সময়ই দেয় নি তারা।
বকুল তারেক যেতে পারবে না। তার স্কুলে পরীক্ষা। মোফাজ্জল তারেকের গবেষণা। যাওয়ার কথাই আসে না। সিথির শিক্ষাট্যুর, বিথি বোনকে ছাড়া যাবে না। কিন্তু উল্টো নিলেশ যাওয়ার জন্য জেদ ধরে বসে আছে।
মা, যেতে দিবেন না। কিন্তু ওর জেদের কাছে হার মানে মা। উল্টো নিলেশ নানা বাড়ি যায়।

দুইদিন পর বিকেলে খাটের তলা থেকে বের হয়। বাথরুম থেকে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে ডাইনিং টেবিলে।
কখন এসেছো! মায়ের বিস্ময়। সিথিও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে।
বিয়ে কী শেষ হয়েছে। সিথি জিজ্ঞেস করে।
হ্যাঁ। খিদে লেগেছে মা।
মা খাবার দেয়।
তোমার নানা, নানি, মামা মামী কেমন। বাড়ির সবাই কেমন?
 ভালো। খুব কম কথায় জবাব দেয় নিলেশ।
নানি কী বললো। মা আবার জিজ্ঞেস করে।
তোমরা কেমন আছো। গেলে না কেন। এইসব আর কী---।
সিথি কোন কথা বলছে না। নিলেশের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সিথিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলে নিলেশ, তুমি খাচ্ছো না আপু। খাও।
তুই এতো তাড়াতাড়ি চলে এলি, ব্যাপার কী। এমন মরিয়া হয়ে নানার বাড়ি গেলি, আর দুই দিনেই চলে এলি! বিস্ময়কর! তুই তো এমন করে আসার মানুষ না!
এমনই। তোমাদের ছাড়া ভালো লাগলো না তাই।
নিলেশের কথায় মায়ের মনে সন্দেহ হয়। এ কোন নিলেশ। এতো বদলে গেলো কী ভাবে নিলেশ।
তোমার মামার বউ দেখতে কেমন?
ভালো।
নাম কি?
নাম তো শুনি নি। খাবার মুখে দেয় নিলেশ। খাওয়ার জন্য কখনও তাড়াহুড়া করে না উল্টো নিলেশ।
কিন্তু তাড়াহুড়া করছে নিলেশ। মা, সিথি অবাক।
তোমার নানি, আমাদের যাওয়ার কথা কিছু বললো না।
না। কিছুই বলে নি। চিঠি দিয়েছো না।
চিঠি! না, দেয় নি।
নিলেশের ভুল হয়ে গেছে। এখন করার কিছুই নেই। তাড়াতাড়ি একটা রুটিতে আখের গুড় মাখিয়ে ঘরে চলে আসে। মা আর সিথি এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। দুই জনের মনেই ভাবনা- এ কোন নিলেশ।

অনেকদিন পর আখের গুড় আর রুটি খেতে ভালো লাগছে । নিলেশের খুব প্রিয় খাবার। ঘরে এসে রুটি শেষ করে পানি খায় নিলেশ। কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।
কেটে গেলো চার দিন। কাটলো ভালোই। কিন্তু সুখ তো বেশী দিন থাকে না, পালিয়ে বেড়ায়। নিলেশের সুখও পালিয়ে গেলো। নানা বাড়ি থেকে ফোন করেছে উল্টো নিলেশ।
মা, আমি নিলেশ।
কোথা থেকে বলছো ?
পাবনা।
ফাজলামি করার আর জায়গা পাচ্ছো না। তুমি, পাবনা থেকে ফিরেছো আজ চারদিন। এখন কোথায় বলো? মায়ের সঙ্গে মিথ্যা বলছো, লজ্জা হচ্ছে না!  
মা, মা, আমি ফিরি নি। আরও দুই দিন থাকবো।
সিথি, ঘরে দেখো তো নিলেশ আছে কি না?
মায়ের কথা শুনেই চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ে নিলেশ। সিথি এসে দেখে নিলেশ ঘুমিয়ে আছে; মাকে বলে সে কথা। মা সে কথা শুনেই ধমক দেয় ওপাশের নিলেশকে।
ফাজলামি করার আর জায়গা পাচ্ছো না, শয়তান ছেলে। বড়ো ছোট জ্ঞান নেই, ফোন রাখ।
মা, এসব কী বলছো? কাঁদো কাঁদো কণ্ঠ উল্টো নিলেশের।
ফের মা। তুমি যে নিলেশ নও তা জানি। এ নাম তুমি কোথায় শুনলে! তুমি নিশ্চয় নিলেশের বন্ধু।
মা ফোন রেখে দেয়।

ওদিকে উল্টো নিলেশ ফোন রেখে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ফোনের পাশে। বুকের ভেতর কান্না দলা পাকিয়ে উঠছে। ওকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে আছে নানি।
কি হয়েছে দাদুভাই, দাঁড়িয়ে আছো কেন? মন খারাপ। নানি আদর করে জিজ্ঞেস করে।
উল্টো নিলেশ, নানির কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নানির আদরে দুই চোখ উপচে পড়ে জল। বুক ভাঙা কান্নায় নানির আঁচল ভিজে যায়। নানি স্বান্তনা দেয় ওকে।
কাঁদিস না। বল না কী হয়েছে? কাঁদলে আমি কী করে বুঝবো কি হয়েছে।
বাড়িতে ফোন করেছিলাম, কিন্তু মা যা ইচ্ছা তাই ব্যবহার করলো। আবার ফোঁপাতে শুরু করে নিলেশ।
নানি কান্নার সুযোগ দেয়। কেঁদে কেঁদে শান্ত হলে আবার জিজ্ঞেস করে ওকে। নিলেশ শান্ত হয়। চোখ মুছে শান্ত হয়ে বসে কিছুক্ষণ। তারপর নানিকে এতোদিন ধরে কি ঘটেছে সব কথা খুলে বলে।
 মা, আমাকে বুঝতে পারছে না। আমি নাকি ফাজিল ছেলে, আমি বড়োদের সম্মান করি না। আমার যে কী কষ্ট নানি, মা-কে তা বুঝাতে পারছি না।
কেঁদো না দাদুভাই, আমি দেখছি। নানি স্বান্তনা দেয় নিলেশকে।

নানি ঢাকায় লাইন লাগানোর চেষ্টা করলো, লাইন লাগলো না। অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পরও লাইন না পেয়ে নানি বললো,
চিন্তা নেই দাদু ভাই, নিপু মামা আসুক, তারপর মোবাইল করা যাবে।

নিপু মামার বিয়েতেই এসেছে নিলেশ। নিলেশের এই একটাই মামা। ইঞ্জিনিয়ার। মামী খুব সুন্দর। গান গায়। খুলনা বেতারের শিল্পী। গানের স্কুল আছে একটা। টেলিভিশনে এনলিস্টেড হওয়ার জন্য আবেদন করেছে। আগামি দুই তারিখে অডিশন। মামা, মামী ঢাকা যাবে। নিলেশও ওদের সঙ্গে যাবে। এই কথা বলতেই মা-কে ফোন করেছিলো নিলেশ।

মামা, নিউমার্কেট গিয়েছে। মামীর ভাই-বোনেরা এসেছে। ওদের জন্য গিফট কিনতে গিয়েছে। মামা অনেক কিছু কিনেছে। নতুন আত্মীয় স্বজনদের জন্য তো কিনেছেই, নিলেশের জন্যও কিনেছে। সিথি, বিথি, মা, বাবার জন্য কিছু না কিছু কিনেছে মামা। সবাইকে ওগুলো দেওয়ার পর মামাকে সব কিছু খুলে বলে নানি।
মামা, খুব তাড়াতাড়ি মোবাইল করলো ঢাকা। কিন্তু লাইন পরিষ্কার না, কোন কথাই শুনতে পাচ্ছে না মামা। নেটওয়ার্ক প্রব্লেম হতে পারে। মাঝে মধ্যেই এমন হয়।

কিছু চিন্তা করিস না নিলেশ। একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে। মামা স্বান্তনা দেয় ওকে। প্রায় আধা ঘণ্টা পর লাইন ক্লিয়ার হলো। অনেকক্ষণ কথা বললো। মামার কথা শুনতে পাচ্ছে নিলেশ। কিন্তু কী কথা হচ্ছে ওপাশে তার কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। তবুও এ পাশের কথা আর মামার মুখের ভাবে কিছুটা আঁচ করতে পারছে নিলেশ।

ফোন ছেড়ে দিলো মামা। গম্ভীর মুখ। মামা কিছু বলছে না। এক পা দুই পা করে কাছে এলো নিলেশ।
কী হলো মামা।
কী জানি বুঝতে পারছি না। তোর মা তো কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না, তুই পাবনাতে আছিস। তোর মা বলছে তুই নাকি পাবনা এসে দুইদিন থেকেই ঢাকা ফিরে গিয়েছিস।
মামা। আর্তনাদ করে ওঠে নিলেশ।
হ্যাঁ, রে। তোর মা তো আমাকেও বিশ্বাস করতে চায় না। আমিও নাকি ঠগ-জোচ্চোর। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিপু মামা। যাক গে, আমরা তো শুক্রবার যাবো। আমাদের সঙ্গেই তো যাবি, তখন দেখবো।
মামা, কালকে চলো না।
কাল কে কি রে। আমরা সকলে দিনাজপুর বেড়াতে যাবো তো। দিনাজপুর রাজবাড়ি দেখতে যাবো, দেখতে যাবো কান্তাজিউ মন্দির, মন্দিরের টেরাকোটার কাজ দেখার মতো, তুই আশ্চর্য হয়ে যাবি। আমরা স্বপ্নপুরিতেও যাবো। যাবো মাতাসাগর। ওটা কিন্তু সাগর না, দীঘি। পাড়ে দাড়ালে মনে খুব শান্তি লাগে। যা, যা, খেল গে এখন। মন খারাপ করিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।

উল্টো নিলেশের মনে মামার কথা ঘুরে ফিরেই আসছে- নিলেশ দুই দিন পরেই ফিরে গিয়েছে। কিন্তু ও তো যায় নি। তাহলে ---। উল্টো নিলেশের মনের ভেতর খচখচ করে কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে কথাগুলো।

ওতো ফিরে যায় নি। তবে কে গিয়েছে ঢাকায়? কে রয়েছে ওর জায়গায়? ওর জামা-কাপড় কে পরে? কে খাবার খায়? ও ছাড়া কা’কে দেখা যাচ্ছে যার জন্য ওকে সন্দেহ করছে মা। এতোসব চিন্তায় কিছুই ভালো লাগে না উল্টো নিলেশের। ওর ভালো লাগে না কিছুই। মামাকে কথা দিয়েছে ওদের সঙ্গে যাবে তাই শুক্রবারের অপেক্ষা করে উল্টো নিলেশ।

উল্টো নিলেশের এখানে- ঘরে বাইরে, নিলেশ কারও সঙ্গে সহজ ভাবে কথা বলতে, মিশতে পারছে না। যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ঘরেই থাকে। স্কুল থেকেও দেরীতে ফিরছে। জিজ্ঞেস করলে জবাব দিচ্ছে না। কী করবে বুঝে উঠছে না। নিলেশের ব্যবহারে খুবই অবাক মা। তিনিও  কী করবেন বুঝতে পারছেন না। অবাক সিথি, বিথিও। সিথির সঙ্গে আগে সারাদিনের কী কী ঘটেছে সব কথাই বলতো কিন্তু এখন হাজার চেষ্টা করেও কোন কথা বের করতে পারছে না নিলেশের মুখ থেকে। মায়ের কাছে প্রায়ই নালিশ করছে বিথি।
ভাইয়া, ওর সঙ্গে কথা বলে না, খেলে না। শুধুই ধমক দেয়।

মা, নিলেশকে নিয়ে খুব ভাবনায় পরেছে। নিলেশ তো এমন ছিলো না। এতো কম কথা বলার ছেলেই না নিলেশ। এতো বাইরেও থাকতো না কখনও। কখনও মিথ্যে কথাও বলতো না। কী হয়েছে ওর। নিলেশের মা, কোন কাজে মন লাগাতে পারে না।

বিকেলে মা-বাবা একসঙ্গে চা খাচ্ছে। বাবার গবেষণার ফল পেয়ে গেছে। বাবার মনে আজ আনন্দ। এতোদিনের পরিশ্রম আজ সার্থক। আগামি সপ্তাহে প্রেস কনফারেন্স। সেখনেই এই গবেষণার উপকারিতা ঘোষণা করবে। এই আনন্দে বাবা, নিলেশের সাহচর্য পছন্দ করে।

নিলেশ কোথায়? জিজ্ঞেস করে বাবা।
বোধ হয় ঘরে। এই একটু আগেই ফিরেছে। কোথায় ছিলো কিছুই বললো না। ও যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে! দেরী করে বাড়ি ফিরছে, কথা কম বলছে, যাও বা বলছে তাও আবোল তাবোল। কখনও বা মিথ্যে বলছে। একটু খোঁজ নেওয়া দরকার।
এই রকম একটু হয়েই থাকে। ও নিয়ে ভেবো না। সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে। চায়ে চুমুক দিয়ে বাবা বলেন।
মা জানে এরকম কথাই বলবে বাবা। চায়ের কাপ নিয়ে উঠে পড়ে মা। চায়ের কাপ রেখে নিলেশের ঘরে গিয়ে দেখে ঘুমাচ্ছে নিলেশ। ডাকে মা।
নিলেশ, ওঠো।
নিলেশ ধড়মড়িয়ে উঠে বসে।
কিছু বলছিলে মা।
হ্যাঁ, পাবনা থেকে তোমার মামা ফোন করেছিলো, তোমরা নাকি শুক্রবার আসছো। নিলেশও ফোন করেছিলো। কেমন সব বন্ধু তোমার, এমন ফাজলামি করে। তাও আবার মায়ের সঙ্গে।

নিলেশ বন্ধুদের হয়ে কথা বলে। না বলেই বা কী করবে! ও তো জানে পাবনা থেকে উল্টো নিলেশই ফোন করেছে। কেউই মায়ের সঙ্গে ফাজলামি করে নি। কিন্তু সে কথা বলতে পারছে না মা-কে। একবার ভাবে বলবে, কিন্তু আবার ভাবে মা আবার ওকে মিথ্যেবাদী ভাববে।

মা, ওকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়। বলে,
তোমার কী হয়েছে বলো তো।
কিছু না মা।

ওর কী হয়েছে কেমন করে বুঝাবে এদের। কিছুই তো বলা যাবে না। ওর বাড়ির জন্য মন খারাপ লাগছে। সিথিবু আর বিথির জন্য খারাপ লাগছে। মা-কে দেখতে ইচ্ছা করছে। বোনদের সঙ্গে কতদিন খুনসুটি করা হয় নি। এসব কথা বলবে কেমন করে, আর বলবেই বা কা’কে?  

ওর বাবার গবেষণা কতোদূর?  এই গবেষণা যুগান্তকারী এক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বাবাকে বলেছে সবার আগে ওর ব্রেন ট্রান্সফার করতে হবে। ওর কিছুতেই জেনারেল ম্যাথ মাথায় ঢোকে না। মনে থাকেনা বীজগণিতের সুত্র। জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, পরিমিতি একবারে কখনই বুঝতে পারে না।
বাবা, ওর ব্রেন ট্রান্সফারের কথা শুনে হেসে বলেছে, পাগল।

নিলেশ স্কুলে। জেনারেল ম্যাথস এর ক্লাস। ভয়ে ভয়ে ক্লাসে ঢোকে। টিচার ক্লাসে ঢুকেই পরিমিতির একটি সমস্যার সমাধান করতে দিয়েছে। সমস্যা সমাধানের জন্য ব্ল্যাকবোর্ডে ডাক পড়ে নিলেশের। বুকে কাঁপন।
আমিতো সমাধান করতে পারবো না। কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে সুমনকে।
যা জেনারেল ম্যাথস এর যে কোন সমস্যা সমাধানে তোর ভয়! হাসালি। যা স্যার ডাকছে। সুমন উঠিয়ে দেয় ওকে।

নিলেশ, নিজের বুকে হাত দিয়ে দেখে হার্টের ধুকধুকানি বেড়ে গিয়েছে। ও ধীরে ধীরে গিয়ে চক হাতে নেয়। নিজেই আশ্চর্য হয় সমাধান করে ফেলেছে। নিজেই আশ্চর্য হয় সমস্যার সমাধান ঠিক ঠিক করে ফেলেছে। নিজের মনেই বলে, অ্যাপোলোনিয়াসের উপপাদ্য (জ্যামিতিক সুত্র)। ত্রিভূজ অইঈ এর অউ মধ্যমা ইঈ বাহুকে সমদ্বিখন্ডিত করে। সুতরাং, অই২+অঈ২= ২(অউ২+ইউ২)। নিলেশ হাসে নিজের মনে।
আশ্চর্য! নিলেশ নিজেও আশ্চর্য হয়, কিন্তু ক্লাসের কেউই আশ্চর্য হয় না। কারণ উল্টো নিলেশ বরাবরই অঙ্কে ভালো। ক্লাসের ফার্স্ট বয়।

তেলেসমাতি কান্ড! যা কখনও হয় নি তাই হয়ে গেলো। কী করে এমন হলো। বাবাকে বলবে ওর আর ব্রেন ট্রান্সফারের প্রয়োজন নেই। বাবা, ও বাবা। বাবার কথা মনে হতেই কান্না পায় নিলেশের। দুঃখ ছাপিয়ে ওঠে মুখে।

কি রে দুঃখ কেন মনে? ওর খুব কাছের বন্ধু, সুমন প্রশ্ন করে।
মন ভালো লাগছে না।
কি যে বলিস না! ভালো ছাত্রদের কখনও মন খারাপ করতে নাই।  ওঠ ওঠ, চল যাই।
না রে যাবো না।
কেন! অবাক হয় সুমন। কেন মন খারাপ আমাকে বল।
না, কিছু না। নিলেশ উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।

নিলেশের ব্যবহারে অবাক সুমন। ও তো এমন নয়। এমন কোন কথা নেই যা ওকে না বলে থেকেছে নিলেশ। কিন্তু আজ কি হলো! কিন্তু অবাক হওয়ার পালা শেষ হয় নি। যখন বাড়ি ফেরার পথে নিলেশ বলে,
তুই বাড়ি যা সুমন, আমি এক জায়গায় যাবো।
আমিও যাবো। সুমন বলে। আমরা তো সব সময় একসঙ্গেই সব জায়গায় যাই।
না, আমি একাই যাবো।

নিলেশ দৌড়ে সুমনের চোখের আড়ালে চলে যায়। অবাক হয়ে নিলেশের যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকে সুমন। ওর বেস্ট ফ্রেন্ড এরকম ব্যবহার করবে ওর সঙ্গে স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি ও। ও ভুলেই যায় বাড়ি যেতে হবে ওকে।  ইংলিশ টিচারের ডাকে চমকে ওঠে।
এই সুমন, তুমি বাড়ি না গিয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেন? যাও, বাড়ি যাও।
যাচ্ছি স্যার।

নিলেশ, স্কুল থেকে বেরিয়ে এ-পথ, ও-পথ ঘুরে বেড়ায়। পথ খুঁজে ফেরে। ওর আসল বাড়ি যাওয়ার পথ। যেখানে ওর আসল মা আছে, আসল বোন আছে, আর আছে আসল বাবা। বন্ধুরা আছে। এখানে সবাই দেখতে একই রকম কিন্তু এক নয়। ওদের সঙ্গে কোন হৃদ্যতা নেই ওর। আর হৃদ্যতার ব্যাপার তো নয় আছে ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপার। উল্টো নিলেশের সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি হলে ওর প্রাণ যাবে। কতোদিন ও উল্টো নিলেশ থেকে বেঁচে ফিরতে পারবে। একদিন না একদিন ওদের দুজনের ছোঁয়াছুঁয়ি হতেই পারে, তখন ---

আবার মৃত্যু ভয় তাড়া করে ওকে। ঘুরতে ঘুরতে এক খোলা মাঠের ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করে। ও ক্লান্ত হয়ে একটা গাছের নিচে বসে পড়ে। উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ অদ্ভূত এক মানুষ দেখতে পায়, যার মুখটা গরুর মতো আর নিচের অংশ মানুষ। দুটো হাত, দুটো পা আছে। লেজ নেই।  মানুষটার হাতে এক মুঠা ঘাস। অবাক হয়ে মানুষটাকে দেখছিলো নিলেশ। আরে, সেই পাগল বৈজ্ঞানিক। এই পাগল বৈজ্ঞানিক ওদের বাড়ি থেকে পাঁচ মাইল দূরে নদীর পাড়ে বিশাল এক মাঠ আছে, সেই মাঠের ভেতর প্রকান্ড এক বাড়িতে থাকে। শুনশান বাড়ি। হাওয়া ছাড়া কোন শব্দ নেই ও বাড়িতে।

ওই শুনশান বাড়িতে ঢুকে পড়েছিলো ওরা তিন বন্ধু। সুমন, পারভেজ আর ও। ঢুকে অবাক। এক বিশাল চিড়িয়াখানা। বাঘ, সিংহ, হাতি, গন্ডার থেকে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি এমন কি পাখিও আছে কয়েক হাজার। অবাক হয়ে দেখছিলো ওরা। এমন সময় হুংকার।
এই কে তোমরা? কেন ঢুকেছো এখানে?
চমকে তাকিয়েছিলো ওরা। ভয়ে কণ্ঠ শুকিয়ে কাঠ। কোনোমতে বলেছিল, ভুলে।
এই ভুল আর কক্ষনও করবে না। ফের যদি আমার সামনে আসো তাহলে রক্ষা নেই, যাও।
ওরা দৌড়ে বেরিয়ে এসেছিলো। সুমন আর পারভেজ আর কখনও যায় নি। কিন্তু এক অদৃশ্য শক্তির টানে ও প্রায়ই যেতো সেখানে। লুকিয়ে লুকিয়ে যেতে যেতেই দেখেছিলো ছোট্ট এই গরুমানব। যার মুখ গরুর, আর দেহটা মানুষের। ও প্রতিদিন ওই গরুমুখো মানুষটাকে দেখতে যেতো পাঁচ মাইল পথ হেঁটে হেঁটে।

একদিন চোখে পড়ে যায় সেই পাগল বৈজ্ঞানিকের। পাগল বৈজ্ঞানিক পেছন থেকে এসে ঘাড় চেপে ধরে। আগের দিনের মতো হুংকার দেয়,
আবার এসেছো ছোকরা। বারণ শোন না কেন?
জী--- জী---। ও---ওই মা--- মানুষটা---- তোতলাতে তোতলাতেও কথা শেষ করতে পারে না ভয়ে। বৈজ্ঞানিকের লাল চোখ দেখে কণ্ঠ শুকিয়ে কাঠ। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাতের বোতল থেকে ঢকঢক করে পানি খায়। ওর দিকে তাকিয়ে কি মনে করে বৈজ্ঞানিক বলে,
হ্যাঁ, ওটা আমার তৈরি। গরু আর মানুষের ডি.এন.এ. দিয়ে তৈরি করেছি ওকে। ওর মাথায় অনেক বুদ্ধি আর গায়ে অনেক শক্তি। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে বৈজ্ঞানিক। তারপর আবার বলে,
এই ছেলে চলে যাও এখান থেকে, আর কখনও আসবে না এ বাড়িতে, বুঝেছো।
আচ্ছা। বলেই দে ছুট। এক ছুটে মাঠের শেষ প্রান্তে তারপর নদীর পাড়ে একটু জিরিয়ে নিয়ে বাড়ির পথ ধরে।

সেদিনের পর আর কখনও পাগল বৈজ্ঞানিকের বাড়ি যায় নি। তার সামনে পড়তে চায় না কখনও, কখনও পরতে চায় না গরুমানবের সামনেও। এখানে আবার ওই পাগল বৈজ্ঞানিক। চোঁ-চা দৌড় দিলো নিলেশ। যতোক্ষণ ক্লান্ত না হয় ততোক্ষণ দৌড়ে চললো নিলেশ। তারপর ক্লান্ত হয়ে মাঠের ঘাসে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে।
কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ বন্ধ করে। চোখ বন্ধ করতেই শুনতে পায় সেই চেনা কণ্ঠ। লাফিয়ে ওঠে।
ঘাসফড়িং, ঘাসফড়িং, তুমি এসেছো। ঘাসফড়িংকে দেখে খুশি হয় নিলেশ। ঘাসফড়িং কথা বলে।
নিলেশ, নিলেশ তোমার মন খারাপ।
হ্যাঁ, পথ খুঁজে পাচ্ছি না। বলে দাও না আমাকে বাড়ি যাওয়ার পথ। মা-কে দেখতে ইচ্ছা করছে, ইচ্ছা করছে বোন, বাবাকে দেখতে। সব চেয়ে আমার ভয় করছে, কখন দেখা হয়ে যায় এই নিলেশের সঙ্গে, তাহলে-- । আমি তো  মারা যেতে চাই না, ঘাসফড়িং।
পথ পেয়ে যাবে, তুমি। সান্তনা দেয় ঘাসফড়িং।
আমাকে বলে দাও না ঘাসফড়িং। অনুনয় করে নিলেশ।
আমিও জানি না। বলে ঘাসফড়িং। আমিও খুঁজছি। ঘাসফড়িং পাখা মেলে দেয়। উড়তে উড়তে বলে,
ধৈর্য ধরো বন্ধু, ধৈর্য ধরো। বিপদে ধৈর্য হারাতে নাই। চলে যায় ঘাসফড়িং।
নিলেশ উদাস হয়ে তাকিয়ে ভাবে, এ কী জটিল ধাঁধার সৃষ্টি হয়েছে ওর জীবনটা ঘিরে। শুধু কী জটিল ধাঁধা। ভয়াবহ জটিলতা। এই জটিলতার শেষ কবে হবে আর হবেই বা কী ভাবে কিছুই জানে না ও।

আরও কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে নিলেশ। এই আকাশ, এই মাঠ, মাঠের ঘাস সব চেয়ে প্রিয় মনে হয় ওর।
বাবা, মা, সিথি, বিথি, সুমন, রাজীব,তুহীন, শিপার আরও সব ক্লাসের বন্ধুদের মনে পড়ছে। মনে পড়ছে দাদি, চাচার কথা। নীহারিকা, বিজলি, তারিকা সবার থেকে কতো কতো দূরে ও এই ভেবে কান্না পাচ্ছে ওর। ওদের সঙ্গে কী আর কোনদিন দেখা হবে, না কি হবে না।

নাও হতে পারে! এরা যখন জানবে ও এখানকার নিলেশ নয় তখন এরা কী ছেড়ে দিবে ওকে। দিবে না। পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে দিবে। আর নিলেশের সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি হলে তো এই প্রাণটাই চলে যাবে।
উল্টো নিলেশ কি পাবনা থেকে ফিরেছে। আজ তো ফেরার কথা।  সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ধূসর উদাস বিষন্ন বিকেল। ওর মনও এই বিকেলের মতো বিষন্ন।

বইয়ের ব্যাগ হাতে বাসার দিকে রওয়ানা দেয়। অনেকক্ষণ হাঁটে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় খেয়াল করে বাসার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বাসায় ঢোকার জন্য এক পা ভেতরে দিয়েছে শুনতে পায় মায়ের কণ্ঠ।
বেয়াদব ছেলে, ফাজলামি করার জায়গা পাচ্ছিস না। মায়ের সঙ্গে ফাজলামি, মায়ের সঙ্গে জোচ্চুরি। পাঁচদিন আগে বাসায় ফিরে এখন আবার ব্যাগ নিয়ে এসেছিস, দেখাচ্ছিস এখনই ফিরলি। বদমাশ ছেলে! পাবনা থেকে তুমি টেলিফোন করলে, তোমার মামা টেলিফোন করলো, একসঙ্গে আসছো। কোথায়, কোথায় তারা!
মামীর বাবার হঠাৎ স্ট্রোক করেছে মা, তাই মামা, মামী ওখানে চলে গিয়েছে। নানিও গিয়েছে। ফোন করে দেখো না মা।
ফের মিথ্যা কথা। মিথ্যুক ছেলে।
মা, মিথ্যা বলছি না, এই দেখো টিকিট।
ওসব কোন কথা শুনতে চাই না। স্কুলের নাম করে কোথায় গিয়েছিলি তাই বল।
মা, আহত স্বরে বলে উল্টো নিলেশ। কোথাও যায় নি মা।

ওদের কথার ফাঁকে টুক করে ঘরে ঢুকে যায় নিলেশ। ওরা উল্টো নিলেশের ঘরে। নিলেশ সোজা সিথিদের ঘরে ঢুকে যায়।  খাটের তলায় ঢুকতে ঢুকতে নিলেশের কান্না শুনতে পায়। কাঁদতে কাঁদতে উল্টো নিলেশ বলছে, প্লিজ মেরো না মা। মেরো না, লাগছে মা।
মায়ের আজ ভীষণ রাগ হয়েছে। মায়ের রাগ সহজে থামবে না জানে সিথি, তবুও থামাতে চেষ্টা করে ও।
মা, মামাকে টেলিফোন করি।
 ঠিক আছে, করো।
সিথি, টেলিফোন করে।

উল্টো নিলেশ কাঁদছে। ওর জন্য মায়া হয় নিলেশের। ওকে আদর করতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কখনই আদর করা যাবে না। আদর করতে গেলেই মৃত্যু। নিলেশের পলাতক জীবন শুরু হলো আবার। বন্দী থাকা, লুকিয়ে থাকা, চুরি করে খাওয়া। আর কতো দিন! নিলেশের চোখে জল। এখন শুধুই কান্না পায় নিলেশের।

পরদিন স্কুলে যায় উল্টো নিলেশ। যাওয়ার সময় ব্যাগ খুঁজে পাচ্ছিলো না। মাকে বলতেও ভয় হচ্ছিলো। কিন্তু বেশী খুঁজতে হয় নি। খাটের মাথার কাছে ওয়ারড্রবের কাছে পড়ে আছে। মনে হচ্ছে কেউ তাড়াহুড়া করে রেখেছে।

উল্টো নিলেশ ব্যাগ খুজছে দেখে ব্যাগটা, খাটের তলা থেকে ঠেলে দিয়েছে নিলেশ। সুমনের সঙ্গে হাঁটছে উল্টো নিলেশ। হাঁটতে হাঁটে জেনে নিতে চায় এই কয়দিন কী কী পড়া হয়েছে ক্লাসে।
গতকাল কী পড়িয়েছে ইংরেজি টিচার। কাল তো গ্রামার ছিলো।
ওর কথা শুনে সুমন অবাক হয় তাকায়। উল্টো নিলেশ পথের দিকে তাকিয়েছিলো, সব ঘটনায় তোলপাড় চলছিলো মনের ভেতর। উদাস, আনমনা উল্টো নিলেশ উত্তর শোনার জন্য তাকায় সুমনের দিকে।
কি রে কথা বলছিস না কেন?
কী বলবো, তুই তো ক্লাসে ছিলি।
আমি, আমি ক্লাসে ছিলাম! কী আশ্চর্য! আকাশ থেকে পড়ে উল্টো নিলেশ।
আশ্চর্য কেন? ছিলিই তো। সুমন বলে।
দেখ সুমন, তুইও মায়ের মতো, সিথি আপুর মতো  আমাকে অবিশ্বাস করছিস।
অবিশ্বাস! অবিশ্বাস কেমন!!!

উল্টো নিলেশ প্রথম থেকে সব ঘটনা খুলে বলে। ওর সব কথা শুনে সুমনও আশ্চর্য হয়। বলে,
শুধু আন্টি বলবে কেন? আমিও বলছি। আর তুই যে ক্লাসে এসেছিলি সবাই বলবে। হাজিরা খাতায় সই আছে তোর।

মায়ের কথায় যতো না বিস্মিত, চিন্তিত হয়েছিলো, এখন সুমনের কথায় আরও চিন্তিত হয়। ওর স্থির বিশ্বাস, ওর মতো কেউ একজন আছে, যে থাকে ওদের বাড়িতে, রুটি-ভাত খায়, টাকা চুরি করে। ওর কাপড় পরে, স্কুলেও আসে।

নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে। তাই এমন সব অদ্ভূত ব্যাপার ঘটছে। এর একটা বিহিত না করলেই না। স্কুলে যায় উল্টো নিলেশ। বন্ধুরা মিলে পরামর্শ করে, কী করা যায়।

আজ এই বাসাতে থাকতে ভয় করছে নিলেশের। ওর মনে হচ্ছে আজ উল্টো নিলেশ তন্ন তন্ন করে খুঁজবে, বের করতে চেষ্টা করবে ওকে। নিলেশ আজ এখানে থাকবে না। কিন্তু কোথায় যাবে? যাহোক এক জায়গায় যাবে!!!

রাত আটটা। খাটের তলা থেকে চুপি চুপি বের হয় নিলেশ। দৌড়ে চলে যায় গেইটের বাইরে। গেইট লাগানোর শব্দে ঘর থেকে বাইরে আসে উল্টো নিলেশ। কেউ বাইরে গেলো মনে হয়। কিন্তু এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পায় না। বাতাসের শব্দ ভেবে ফিরে আসে উল্টো নিলেশ।  

নিলেশ এসে ওঠে পারভেজদের বাসায়। এতো রাতে অবাক পারভেজ।
কী খবর তোর।
আজ থাকবো তোর বাড়িতে। আপত্তি আছে।
না, আপত্তি নেই। কিন্তু খালাম্মা---
কিছু বলবে না, মা-কে বলে এসেছি।
নির্বিঘ্নে কেটে যায় রাত। পারভেজ ঘুম ভেঙে দেখে জানালায় দাঁড়িয়ে আছে নিলেশ।
কখন উঠেছিস?
এই তো। ওকে উঠতে দেখে এগিয়ে আসে নিলেশ। বলে, যাইরে।
অবাক হয় পারভেজ। নিলেশ কেমন বদলে গেছে। ভীত সন্ত্রস্ত ছিলো সারারাত। ওর সঙ্গে বেশী কথাও বলে নি। আর ভোর হওয়ার আগেই উঠে পড়েছে। ও উঠতে না উঠতে চলেও গেলো। পারভেজ আনমনে দাঁতে ব্রাশ ঘষে।

ডোর বেলের ঘণ্টি বাজে। টুং টাং টুং টাং। এতো ভোরে কে এলো? পারভেজ দরজা খুলে অবাক।
ফিরে এলি যে। এই তো গেলি, সুমনকে কোথায় পেলি।
এই তো গেলি মানে কি। আর সুমন তো কাল আমার সঙ্গেই ছিলো। সুমন আমাদের বাড়িতে ছিলো। কয়েকদিন ছিলাম না তাই পড়া দেখতে রেখছিলাম ওকে, বলে উল্টো নিলেশ।
সুমন কাল তোর সঙ্গে ছিলো, তা হলে আমার সঙ্গে ছিলো কে? পারভেজ চোখ বড়ো বড়ো করে তাকায়। বিস্মিত কণ্ঠে পারভেজ আবার বলে,
তুই কী বলছিস, কিছুই বুঝতে পারছি না। তুই ছিলি না, তাহলে কী ভূত ছিলো আমার সঙ্গে। আর ভূত কী ভয়ে ভয়ে থাকে, বল।
কই, কোথায় সেই বদমাশটা, কই। বদমাশটা, আমার জীবন হারাম করে দিয়েছে। কই, আরে বল না, কই?
কাকে খুঁজছিস। তোকে নাস্তা খাওয়ার জন্য কতো পীড়াপীড়ি করলাম, কিন্তু তুই তো চলে গেলি।
ধ্যাৎ, ওই ব্যাটা আমি না, অন্য কেউ। আমার ভূত। জানি না কোথা থেকে উদয় হয়েছে।
উল্টো নিলেশ দৌড়ে জানালার কাছে যায়। ওর পিছে পিছে সুমন, পারভেজ। চিৎকার করে ওঠে সুমন।
ওই যে ওই যে, ওই বাড়ির আড়াল থেকে বের হয়েছে। ব্যাটা পালাচ্ছে, ধর ধর, ব্যাটাকে ধর।

ওরা তিনজন দৌড়ে পথে নামে। নিলেশ, দোকান, বাড়ির আড়ালে আড়ালে দৌড়াতে থাকে। ওরাও দৌড়ায় নিলেশের পেছন পেছন। একসময় নিলেশ ওদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে একটা বাড়ির বেজমেন্টে ঢুকে ভাঙা জিনিসপত্রের ভেতর লুকিয়ে থাকে।

নিলেশকে খুঁজে না পেয়ে ফিরে আসে পারভেজের বাড়িতে। নাস্তা খেয়ে আর সব বন্ধুদের ফোন করে। ওদের সবাইকে বলে, ওর মতো দেখতে একটা ছেলে যদি যায় আটকে রাখতে হবে, কিছুতেই যেন পালাতে না পারে। উল্টো নিলেশ আরও বলে আমি সবসময় পারভেজের সঙ্গে থাকবো, একা থাকবো না।

রাফিন, সুহাস, মিন্টু, লালু, নীলু সবাই টেলিফোনে আশ্বাস দেয় ওকে। ওরা সবাই ওর কথা মতো কাজ করবে।

কিছুক্ষণ পরে বেজমেন্ট থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে বেরিয়ে উল্টো নিলেশের বাড়ি গিয়ে মাকে বলে,
মা, খিদে লেগেছে। খাবার দাও।
তোমার সুমনদের বাড়ি খাওয়ার কথা, খাও নি।
না, মা। তোমার কাছে খাবো বলে চলে এসেছি।
তাহলে গেলে কেন?
এমনি মা। খাবার দাও। তাড়াতাড়ি মা, ওরা এসে পড়বে।
ওরা কারা! মা আশ্চর্য হয়।
না। মা। এমনই। মানে---
নিলেশ কী বলে বুঝতে পারছে না। সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে, তাই কথা না বলে খেতে থাকে। ওর খাওয়া দেখে মা আরও আশ্চর্য হয়ে বলে,
এতো তাড়াহুড়া করছো কেন? আরাম করে খাও। আজ তো ছুটি।
মা, ওরা অপেক্ষা করবে। একসঙ্গে কোচিং এ যাবো।

মায়ের কাছে মিথ্যা বলতে নাই। আমাকে মাফ করে দাও মা। মিথ্যা না বলে আমার উপায় নেই মা। বিড়বিড় করে কথাগুলো বলে নিলেশ।
কী বিড়বিড় করছো।

মায়ের দিকে একবার তাকায়। তারপর চটপট খাবার শেষ করে বাড়ি থেকে বের হতেই দেখে আসছে উল্টো নিলেশ। ওর সঙ্গে পারভেজ আর সুমন। দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। ওখান থেকেই শুনতে পায় মা  বলছে।
ফিরে এলে যে। তোমরা তো কোচিং এ যাবে।
কি বলছো মা। না খেয়ে কোচিং এ যাবো না কি।
খেয়ে তো গেলে, বললে সবাই দাঁড়িয়ে আছে।
মা, কই, কই সেই বদমাশটা কই?  বলেই জিভে কামড় দেয় উল্টো নিলেশ। ওর মা বকাবকি পছন্দ করে না। মায়ের কাছে গিয়ে দুই হাতে কান ধরে, বলে, স্যরি, মা।

মায়ের মনে আজ আনন্দ। বাবার ছবি বের হয়েছে কাগজে। আবিষ্কারের খবর খুব বড়ো করে ছাপিয়েছে। পাঁচটা কাগজে বের হয়েছে এই আবিষ্কারের খবর। বাবার সাফল্যে আনন্দিত মা, আজ উল্টো নিলেশকে মাফ করে দেয়। রাগ করে না।
যাও, আজ আমাদের খুশীর দিন। তাই কিছু বললাম না। কিন্তু কাকে বকা দিচ্ছো।
ওই তো ওকে। আমার মতো যে দেখতে।
সকাল থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনা সব বলে মা-কে। মা ভয় পেয়ে যায়। বাবা আজ ব্যস্ত। কয়েকটা চ্যানেল এসেছে সাক্ষাৎকার নিচ্ছে। মা, এই কথা শেয়ার করার জন্য ডাকে সিথিকে।

সব শুনে সিথি কাছে ডাকে ভাইকে। আদর করে।
দেখ ছুঁয়ে দিস না কিন্তু ওকে। আমি শুনেছি ছোঁয়াছুঁয়ি হলে নাকি মারা যায় দুজনেই।
দরকার কি ওকে ধরার। মা বলে।
চল সুমন ব্যাটাকে আগে খুঁজে বের করি। ওরা আবার নিলেশের খোঁজে বের হয়।

নিলেশ দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনলো। ওদের বেরিয়ে যেতেও দেখলো। ওরা বেরিয়ে যেতেই নিলেশ বের হলো। কিন্তু যাবে কোথায়? এ বাড়িতে আর থাকা যাবে না, এখন সবাই জেনে গেছে ও এ বাড়ির ছেলে, উল্টো নিলেশ নয়। কোথায়, কোনদিকে যাবে ভাবতে ভাবতে হাঁটতে হাঁটতে পেপারের দোকানের সামনে আসতেই বাবার ছবিওয়ালা ম্যাগাজিন দেখতে পায়। ম্যাগাজিন কিনতে চায়, কিন্তু পকেট হাতড়ে দেখে দশটা টাকাই আছে মাত্র। হতাশ হয়ে ম্যাগাজিন রেখে দিতে গিয়েও রাখতে পারে না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে শুরু করে। বাবার লেখাটায় এতোই মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলো যে কখন ওরা এসেছে টের পায় নি। ওদের কথায় তাকিয়ে দেখে খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে দিবে উল্টো নিলেশ। ম্যাগাজিন রাখার সময় পায় না নিলেশ। প্রাণভয়ে ভোঁ দৌড়। দৌড় দৌড় দৌড়, একেবারে ওদের নাগালের বাইরে।

আজ মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার। মাদার’স ডে। মা দিবস। নিলেশের বাবা, মোফাজ্জল তারেক, এম.টি. এইসব দিনগুলো পালন করেন। ছেলেমেয়েদেরও উৎসাহ দেন। তিনি মনে করেন মা দিবস, বাবা দিবস এইসব দিবসগুলোতে মা, বাবা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কাটাবে। এতে তাদের মধ্যে আন্তরিকতা বাড়বে।
মোফাজ্জল তারেক, কাজের জন্য মায়ের কাছে যেতে পারেন না। তিনি এই উপলেক্ষ মা-কেই কাছে নিয়ে আসেন।

মা দিবসের দিন, বাবা তার মা-কে এনে দেয় একটা বড়ো হলুদ গোলাপ আর গিফট। আর সিথি, বিথি, নিলেশ তার মায়ের জন্য এনে দিতো তিনটে সাদা গোলাপ। আজ তিনটে গোলাপ মায়ের হাতে দেওয়ার পর থেকেই মায়ের কান্না আর থামছে না।

মায়ের কান্নায়, সিথিরও কান্না পাচ্ছে। কাঁদছে বিথিও। দাদি, রোমেনা বেগম অপরাধীর মতো মুখ করে বসে আছেন। চোখ দিয়ে জল পড়ছে তারও। আজ মোফাজ্জল তারেকের এতো বড়ো একটা খুশির দিন কিন্তু আনন্দ নেই কারও মনে।

সিথির মনও ভারাক্রান্ত খুব বাজে একটাস্বেপ্ন দেখেছে।  
সিথি, বিথি, বাবা-মায়ের সঙ্গে রেললাইন ধরে হাঁটছে হঠাৎ চিৎকার। তাকিয়ে দেখে নিলেশ দৌড়াচ্ছে আর ওর পেছনে ছুটছে ওরই বয়সি তিনটা ছেলে। ওদের মধ্যে একজন দেখতে ঠিক নিলেশের মতো। স্বপ্নের কথা মা-কে বলতে পারে নি। এমনিতেই কাঁদছে মা। আরও কাঁদবে। কিন্তু একজনকে স্বপ্নের কথা বলতে হবে। কা’কে বলবে কা’কে, অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক করে দাদিকেই বলবে ওর স্বপ্নের কথা।

আজ সিথির ইউনিভারসিটি বন্ধ। ছাত্ররা বাংলা টিচারকে অপমান করেছে, সেই জন্য শিক্ষকরা ক্লাস বর্জন করেছে। মায়ের সঙ্গে কাজ শেষ করে দাদির কাছে এসে বসে। দাদি শুয়ে আছে। দাদির কপালে হাত ছোঁয়াতে চোখ মেলে তাকায় দাদি।
এসো দিদিভাই, বসো।
তুমি কাঁদছো দাদি। দাদির কাছে বসতে বসতে বলে সিথি। কেঁদো না দাদি। আর মায়ের ব্যবহারে কিছু মনে করো না।
নারে, কী মনে করবো তোর মায়ের ব্যবহারে। আজ আমার, দাদুভাইকে মনে পড়ছে। ছেলেটা যে কোথায় গেলো। চোখ মুছেন রোমেনা বেগম।
দাদি, আজ একটা স্বপ্ন দেখেছি।
কী স্বপ্ন। দাদি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

সিথি স্বপ্নের কথা বলে যায়। মন দিয়ে শুনে দাদি।
স্বপ্ন, স্বপ্নই দিদিভাই। তবুও রেললাইন কোথায় সেটা জানলে দেখে আসা যেতো। অনেকে বলে ভোরের স্বপ্ন ঠিক হয়।
কিন্তু বিজ্ঞান তো সে কথা বলে না। দাদির কথায় বলে সিথি।

কয়েকজন সাংবাদিক এসেছে। আগামীকাল প্রেস কনফারেন্স। তার জন্য ডেকেছেন ওদের। কথা বলছেন বাবা।

এতো বড়ো সাফল্যেও আনন্দ নেই মায়ের মনে, কাজ করছেন একমনে। আনন্দ নেই দাদি, সিথি, বিথির মনেও। নিলেশ যদি থাকতো এখন, তাহলে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে বাড়ি তোলপাড় করে ফেলতো। কিন্তু নেই ও! কোথায় যে চলে গেলো!

কাগজে কাগজে বিজ্ঞাপণ দেওয়া হয়েছে। থানায় জিডি। চ্যানেলে হারিয়ে যাওয়ার খবর সব করা হয়েছে। কিন্তু নিলেশের কোন খবর নেই। নামী বাবার সন্তান, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ খোঁজ করছে। কিন্তু কোন খবর আজ পর্যন্ত জোগাড় করতে পারে নি কেউ।

দাদির সঙ্গে কথা বলছিলো সিথি। বিথির চিৎকার।
মা, আপু, দাদি তাড়াতাড়ি এসো। ভাইয়া এসেছে।

সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। মা জড়িয়ে ধরে ওকে। রাগ করে না। আদর করে । নিলেশ, জড়িয়ে ধরে থাকে মা-কে। ভয়ে কাঁপছে। এখনও ভয় যায় নি। এখনও ভাবছে এটা ওর বাড়ি না উল্টো নিলেশের বাড়ি।
মায়ের দিকে তাকিয়ে, মায়ের আদরে নিশ্চিত হয়। এটা ওরই বাড়ি। তবুও ভয়ে ভয়ে তাকায় দাদির দিকে, নাহ! ঠিক আছে। ওকে ঘিরে ধরেছে সবাই। সবাই মিলে একসঙ্গে জিজ্ঞেস করে ওকে,
কোথায় ছিলি এতোদিন।
এই কথাতে আরও আশ্বস্ত হয়, না এটা ওদেরই বাড়ি। ওই বাড়ির মা তো তুমি করে বলতো। ওর মা বলে, তুই।

এটা কি? ওর হাত থেকে ম্যাগাজিনটা নিয়ে পড়তে চায় সিথি। পড়তে পারে না। সব লেখা উল্টা। সিথি ম্যাগাজিন নিয়ে দৌড়ে ঘরে গিয়ে আয়নার সামনে ধরে। পড়া যাচ্ছে! পড়া যাচ্ছে! আনান্দে চিৎকার করে। বাবার খবর বেরিয়েছে।

নিলেশকে ঘরে নিয়ে এসে খেতে দেয় আগে। তারপর একে একে সব কথা শোনে । অবাক হয়, ভয়ও পায়।
বাবার সাক্ষাৎকার চলছে। ঘরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে নিলেশ। কী শান্তি! কী শান্তি! কী শান্তি কতো দিন পর নিজের বাড়ি, নিজের ঘর, নিজের বিছানা। মা, বাবা, বোন, দাদি সব স---ব নিজের। গুনগুন করে।

নিলেশ, নিলেশ। চোখ খোলে নিলেশ। ওর জানালায় সেই সবুজ ঘাসফড়িং।
তুমি, এসেছো। ভালোই হয়েছে। অনেক সাহায্য করেছো আমাকে, তোমাকে ধন্যবাদ।
ধন্যবাদ রাখো। ঘাসফড়িং বলে। এই অঙ্কের রেজাল্ট বলো।
আমি তো পারবো না।
ঘাসফড়িং ওর কথা শোনে না। পরিমিতি অনুশীলনীর প্রশ্ন বলে যায়।
প্রশ্নঃ একটি আয়তক্ষেত্রের  ক্ষেত্রফল ২০০০ বর্গমিটার। যদি এর দৈর্ঘ্য ১০ মিটার কম হয় তাহলে এটি একটি বর্গক্ষেত্র হতো। আয়তক্ষেত্রের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ কতো বলো।

উত্তরঃ দৈর্ঘ্য ৫০মিটার প্রস্থ ৪০মিটার। উত্তর দিতে এক সেকেন্ডও দেরী হয় না নিলেশের। ঠিক হয়েছে তাই না। জিজ্ঞেস করে ঘাসফড়িংকে।

ঘরের দরজায় মিলিত হাসি। মুখ ফেরায় নিলেশ। সবাই দাঁড়িয়ে। ওর খাটের সামনে দাঁড়িয়ে বাবা, সঙ্গে চ্যানেলগুলোর ক্যামেরা। ও লজ্জা পেয়ে লাফিয়ে ওঠে, এদিক ওদিক তাকিয়ে হেসে ফেলে নিজেও।