এক টুকরো মেঘ ও দুঃখী গাছ

বিএম বরকতউল্লাহ

এক টুকরো মেঘ। পথভুলে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছে আকাশে। তার কোনো সঙ্গীসাথি নেই।। কারো সঙ্গে মনের কথা বলতে পারে না। ভীষণ খারাপ হয়ে আছে তার মনটা। সে একা একাই আকাশে ভেসে বেড়ায় ।

দিন যায় রাত যায়। মেঘের টুকরোটি ভাসতে ভাসতে চলে আসে একটা বিরান ভূমির উপর। সে নিচে তাকিয়ে দেখে বিশাল মাঠে একটি গাছ দাঁড়িয়ে আছে। গাছটির আশপাশে আর কোনো গাছ নেই। মেঘটি ভাবলো, বোধহয় ওই গাছটি আমার মতোই একা। আমার মতো তারও যদি কোনো কষ্ট থাকে, একা থাকার কষ্ট। আমি যাই না কেন তার কাছে?

মেঘটি ধীরে ধীরে চলে এলো গাছটির কাছে। দেখে মনে হল রোগাপটকা গাছটি অনেক সংগ্রাম করে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। একটি পাতাও নেই কোনো শাখায়। শুকিয়ে গেছে গাছের শরীর। মেঘটি আরেকটু কাছে আসতেই দুর্বল গাছটি করুণভাবে তাকালো তার দিকে। কিছুই বলল না। মেঘটি আরও কাছে এলো। মেঘের শীতল ছায়া গিয়ে পড়লো গাছের ওপর। অমনি গাছটির শরীর কেঁপে উঠলো। আহ্ কী আরাম!- আপন মনে বলে উঠলো গাছটি।
 
মেঘটি বলে, গাছভাই, এ বিশাল মাঠে আর কাউকে দেখছি না যে! তুমি কি আমার মতোই একা? তোমার শরীর-স্বাস্থ্যের এ অবস্থা কেন?

কী আর বলবো ভাই। ভীষণ কষ্টের মধ্যে পড়ে আছি। এই যে বিশাল পতিত ভূমি দেখছ, এখানে আর কোনো গাছ নেই। আমি একদম একা। আমার সাথে কথা বলারও কেউ নেই। আমার কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারি না। তুমি কি আমার সাথে থেকে গল্প করবে মেঘভাই? মায়া করে বললো গাছটি।
মেঘটি আনন্দে মুখ বাড়িয়ে বলে, দেখো, তোমার মতো আমারও অনেক কষ্ট। একা একা থাকি। মনের কথা মনের ভেতরে পড়ে আছে; বলতে পারি না কাউকে। আমি তোমার কাছেই থাকবো। আমরা অনেক গল্প করবো। আনন্দে কেটে যাবে সময়।
গাছটি খুশি হয়ে বলে, আচ্ছা, তাহলে এখন থেকে আমরা দুজন প্রাণের বন্ধু হয়ে গেলাম। কেউ কাউকে কখনও ছেড়ে যাব না। কথা দাও মেঘভাই।
কথা দিলাম- বলে মেঘটি গাছে এসে বসলো। মেঘের শীতল ছোঁয়ায় গাছটি তরতাজা হয়ে উঠলো। কচি কচি পাতা গজাতে শুরু করলো। দেখতে দেখতে সবুজ পাতায় আর ফুলে-ফলে ভরে গেল গাছটি। কী সুন্দর গাছ!
একদিন একটা কাঠবিড়ালি কোত্থেকে এসে আনন্দে ছুটোছুটি করতে লাগলো গাছের ডালে ডালে, পাতায় পাতায়। পোকামাকড়েরা বাসা বাঁধতে লাগলো। নানা জাতের পাখি এসে কিচিরমিচির করতে শুরু করলো, গান গাইতে লাগলো, মনের সুখে বাসা বানিয়ে সংসার পেতে বসলো। বনের পশুরাও শিকার ধরে খেয়েদেয়ে গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিতে লাগলো। আর সব দেখেশুনে গাছটিও নিজেকে খুব বড়ো ভাবতে শুরু করল। সে বড়াই করে বলতে লাগলো, এই বিারণভূমিতে আমার আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া পশু-পাখিরা কিছুতেই বেঁচে থাকতে পারবে না। সে নিজেকে তার কাছে আশ্রয় নেওয়া পশু-পাখি, পোকা-মাকড়দের রাজা ভাবতে শুরু করলো। 

এখন আর গাছটি আগের মত মেঘের সঙ্গে গল্প করে না। মেঘের খবরও নেয় না। এমন কি তার সাথে একটি কথাও বলে না। সব দেখেশুনে খুব কষ্ট পেল মেঘটা। সে গাছের ওপর এক কোণে চুপচাপ বসে থাকে সারাদিন। ভাবে, এভাবে আর বসে থেকে লাভ কী? আমি তো সেই আগের মতোই একা হয়ে গেলাম। গাছটিকে ডেকে বললো, গাছ ভাই, তুমি যদি আমার সাথে গল্প না করো, তো আমি খুব কষ্ট পাই। আমি এমন কী অন্যায় করেছি যে তুমি একটি কথাও বলছো না আমার সাথে? কষ্টে আর অভিমানে কেঁদে ফেললো মেঘটি।
গাছটি তেজ দেখিয়ে বলে, দেখছ না কত ব্যস্ত আমি। এতোটুকু সময় নেই আমার। কত পশু আমার ছায়ায় এসে প্রাণ জুড়ায়, কত পোকামাকড় আর পাখি আমার ফুল-ফল খেয়ে আমার আশ্রয়ে বেঁচে আছে। তাদের সুখ-দুঃখ তো আমাকেই দেখতে হয়। শাসন করতে হয়। কারণ ওরা আমার প্রজা। কথা বলার সময় নেই আমার। এখন আমি খুবই ব্যস্ত। বরং তুমি অন্য চিন্তা করো গে।
মেঘ অবাক হয়ে বলে, অন্য চিন্তা করো গে, মানে?
গাছটি বললো আমি তো তোমাকে মোটেও সময় দিতে পারছি না। বিরাট রাজ্য আমার। সবাইকে নিয়ে আমার ভাবতে হয়। দেখো, এমন কোনো বেকার গাছের সন্ধান পাও কি না যে সারাক্ষণ চুটিয়ে গল্প করতে পারবে তোমার সাথে।
মেঘটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ও, এই কথা? ঠিক আছে, বিদেয় হই তাহলে।
গাছ খুশি হয়ে সাথে সাথে বলে, যাও। ভালো থেকো বন্ধু।
মন খারাপ করে চলে গেল মেঘটি।

মেঘটি চলে যাওয়ার পর গাছটি শুকিয়ে যেতে লাগলো। বিরাণভ‚মিতে প্রখর রোদে শুকিয়ে তার পাতাগুলো ঝরে পড়ে যেতে লাগলো। এখন গাছটির পাতাও নেই, ছায়াও নেই। ধীরে ধীরে তাই তার কাছ থেকে সরে যেতে লাগলো সব পশুপাখি আর সব পোকামাকড়। ঠিক সেই আগের মত একা ও দুখী হয়ে গেল গাছটি।

এখন আবার আকাশের দিকে চেয়ে থাকে দুখী গাছটি। যদি মেঘবন্ধুর দেখা পাওয়া যায়!