জলে কোলাহল

চন্দন চৌধুরী

বৃষ্টি হচ্ছে না। মাঠ-ঘাট শুকিয়ে ফেটে চৌচির। মাঠে সবুজ ঘাসগুলোর মরো মরো অবস্থা। গরুগুলোও দাঁড়িয়ে আছে নির্বাক মেঘের দিকে চেয়ে। চাতকপাখি সেই যে গলা উঁচিয়ে উপরের দিকে চেয়েছে, নামানোর আর কোনো লক্ষণ নেই। জলরাজ্যেও বেহাল অবস্থা। শুকিয়ে ক্ষীণকায় হয়ে গেছে নদীনালা। জলজ প্রাণীদেরও আর বসবাসের অবস্থা নেই। নদী ভরে গেছে চরে। বালিরাশিও চেয়ে আছে যেন মুখ হা করে। জলজ প্রাণীদের কষ্ট আর দেখে কে! কুমীর চলে এসেছে জল ছেড়ে ডাঙায়, সাথে ব্যাঙেরাও এসেছে। কিছু জলকীটও চলে এসেছে। আর যেগুলো স্থলে বাঁচতে পারে না, ওরা জলেই রয়ে গেছে মাছদের সাথে। সাপেরা আশ্রয় নিয়েছে তীরের বনজঙ্গলে। কিন্তু শুধু ডাঙায় কি আর ওরা বাঁচতে পারে! স্থলে এসেও সাপ, ব্যাঙ, কুমীর আর জলকীটেরা ভালো থাকতে পারলো না। একদিন তারা একসাথে হয়ে নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা আলাপ করতে লাগলো। কুমীর কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো, ‘কী বলবো দুঃখের কথা! আমার দু’টো ছানাকে শিয়ালে খেয়ে ফেলেছে। সারারাত পাহারা দিয়ে যে-ই চোখ দু’টি বন্ধ করেছি, ওই সুযোগেই সর্বনাশ করে ফেলেছে শিয়াল।’
সাপ কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘আমার যে সব গিয়েছে। বেজি আমার একমাত্র সঙ্গীকে চিরদিনের জন্য শেষ করে ফেলেছে।’
ব্যাঙ বললো, ‘আমার অবস্থাও খারাপ। শুকনো নদীর মতো নিজেই শুকিয়ে যাচ্ছি। আর কয়েকদিন এভাবে থাকলে আমাকে আর খুঁজেও পাওয়া যাবে না।’
জলকীটেরা বললো, ‘আমরাও অসার আর নিস্তেজ হয়ে পড়েছি। পুঁচকে পিঁপড়েরা পর্যন্ত আমাদের বিরক্ত করছে।’
সাপ বললো, ‘এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের কিছু একটা করতে হবে।’
ব্যাঙ বললো, ‘কী করা যায়, কিছুই তো বুঝতে পারছি না।’
কুমীর বললো, ‘চলো আমরা আবার জলে যাই। ওখানে মাছ আর কিছু জলকীটেরা রয়ে গেছে। মাছ তো অনেক বিষয়ে জ্ঞান রাখে। তার কাছ থেকে কোনো বুদ্ধি পাওয়া গেলেও যেতে পারে!’
কুমীর, সাপ, ব্যাঙ আর স্থলবাসী জলকীটেরা জলে নেমে এলো। জলে গিয়ে দেখলো মাছ আর জলে থাকা বাকি জলকীটের অবস্থা আরও করুণ। ঝাঁঝালো রোদে আগুনের মতো গরম হয়ে আছে জল। বেশকিছু মাছের শরীরে ফোস্কাও পড়ে গেছে। এসব দেখে স্থল থেকে আসা কুমীর, সাপ, ব্যাঙ আর জলকীটের মাথা আরও খারাপ হয়ে গেল।
কুমীর বললো, ‘ভাই মাছ, এই অবস্থায় কী করা যায়? তোমার মাথায় যদি কোনো বুদ্ধি থাকে তবে আমাদের বলো।’
মাছ গম্ভীর মুখে বললো, ‘একটা কিছু তো অবশ্যই করতে হবে। ... হ্যাঁ, একটা কাজ করা যায়। এ ব্যাপারে মেঘের সাথে আমরা একটা চুক্তি করতে পারি।’
‘কী রকম চুক্তি?’
‘চুক্তি তো চুক্তিই। মেঘ আমাদের বৃষ্টি ঝরিয়ে জল উপহার দেবে, আর বিনিময়ে সে আমাদের কাছে যা চাইবে তাই দেব।’
‘কিন্তু মেঘের সাথে এই চুক্তি করবে কে?’
‘সাপ আর ব্যাঙকে স্থলে পাঠাও। ওরা চুক্তি করতে পারবে বলেই আমার বিশ্বাস।’
‘সাপ আর ব্যাঙ কিভাবে মেঘের সাথে চুক্তি করবে?’
‘গাছে পাখি আছে। পাখির সাথে তারা চুক্তিটা সারবে। আর পাখিরা চুক্তি করে দেবে মেঘের সাথে।’

সাপ আর ব্যাঙকে ডাঙায় পাঠানো হলো। অনেক কষ্টের পর পাখির দেখা পেল তারা। সাপ পাখিকে বললো, ‘পাখি ভাই, আমরা বড় বিপদে পড়ে তোমার কাছে এসেছি।’
পাখি সাপের আর্তকণ্ঠ শুনে বললো, ‘বলো, তোমাদের জন্য আমি কী করতে পারি ?’
‘খরায় আমাদের প্রাণ যায় যায় অবস্থা! তাই আমরা জলের প্রাণীরা মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি মেঘের সাথে একটা চুক্তি করবো।’
‘কী চুক্তি?’
‘চুক্তিটা এরকম- মেঘ আমাদের বৃষ্টি দিবে আর বিনিময়ে সে আমাদের কাছে যা চাইবে তা দিয়েই আমরা তাকে সন্তুষ্ট করবো।’
‘বেশ, সে তো খুব ভালো চুক্তি।’
‘তাহলে তুমি আমাদের সাহায্য করছো?’
‘অবশ্যই, কেন নয়! তোমাদের সাহায্য করলে তো সাথে সাথে আমরাও উপকার পাচ্ছি। ঠিক আছে, তোমরা এখানেই অপেক্ষা করো, মেঘের সাথে আমি এক্ষুণি কথা বলে আসছি।’ এই কথা বলে পাখি উড়ে গেল আকাশের দিকে। উড়তে উড়তে চলে গেল একেবারে মেঘের কাছে। গিয়ে বললো, ‘মেঘবন্ধু, তোমার কাছে আমি একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলাম।’
মেঘ বললো, ‘কী প্রস্তাব?’
‘জলের প্রাণীদের খুব কষ্ট হচ্ছে। নদী-নালা শুকিয়ে গেছে। তারা চায় তুমি বৃষ্টি দিয়ে তাদের সাহায্য করো। আর এর বদলে তুমি তাদের কাছে যা চাইবে ওরা তোমাকে তা-ই দেবে।’
‘উত্তম প্রস্তাব।’
‘তাহলে তুমি তাদের জন্য বৃষ্টি ঝরাচ্ছো!’
‘হ্যাঁ। তবে আগে আমি যা চাইব তা আমাকে দিতে হবে। তাহলেই বৃষ্টি ঝরাবো।’
‘বলো, কী চাও তুমি?’
‘আমার বহুদিনের শখ, সাপের মণির। আমি সাপের মণি চাই।’
‘ঠিক আছে, আমি তাহলে ওদেরকে বলি, তোমার সাপের মণি চাই। আমি তাহলে যাই। তোমার সাথে পরে দেখা হবে।’ এই বলেই পাখি মেঘের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলো। ফিরে এসে দেখল সাপ আর ব্যাঙ আগ্রহভরে তার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছে। ব্যাঙ বললো, ‘পাখি ভাই, খবর কী?’
‘খবর ভালো। তোমরা যদি মেঘকে সাপের মণি দাও তবে সে বৃষ্টি ঝরাতে রাজি আছে।’
‘ঠিক আছে, আমরা এখন যাচ্ছি। আশা করি মেঘকে আমরা সাপের মণি দিতে পারবো।’

সাপ ও ব্যাঙ জলে ফিরে এলো। সব খুলে বললো বাকিদের। মাছ মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, ‘ঠিক আছে, আমাদের মধ্যে যখন সাপ রয়েছে, মণি দিতে কষ্ট হবে না। তবে এজন্য আমরা সবাই মিলে সাপকে উপযুক্ত অর্থকড়ি প্রদান করবো।’
সকলে মাছের প্রস্তাবটি মেনে নিলো। মিটিং-এ সিদ্ধান্ত নে’য়া হলো, একদিনের মধ্যেই কড়ি জমা দিয়ে দেওয়া হবে। ক্যাশিয়ার ও মণিবাহক হিসেবে তারা ব্যাঙকে নিয়োগ করলো।

পরদিন সকালে মাছের সঙ্গে কুমীর আর জলকীটেদের দেখা হলো। কুমীর ও কীটেরা বললো, ‘মাছ ভাই, বিশেষ একটা কাজে আমাদের দূরে যেতে হচ্ছে, এই নাও আমাদের কড়ি। তুমি ব্যাঙকে দিয়ে দিও।’ বলেই চলে গেল কুমীর আর জলকীট।
কুমীর ও জলকীটেদের কড়ি নিয়ে মাছ গেলো ব্যাঙের কাছে। বললো, ‘এই নাও ব্যাঙ ভাই, কুমীর, কীট আর আমার কড়ি। ওরা বিশেষ কাজে দূরে চলে গেছে। আর আমারও একটা কাজ আছে। যাই, পরে দেখা হবে।’
এতগুলো কড়ি একসাথে পেয়ে ব্যাঙের মনে লোভ দেখা দিল। ভাবলো, সাপকে বোকা বানিয়ে কড়িগুলো না দিয়ে নিজেই জমিয়ে ব্যবসা করলে কোনোদিন আর খাওয়া-পরা নিয়ে ভাবতে হবে না। এই ভেবে সে সাপের কাছে গেল। বললো, ‘ভাই সাপ, সেই সকাল থেকে কুমীর, মাছ আর কীটেদের কোনো দেখা মিলছে না। আমার মনে হয় ওরা কোনো কাজে দূরে কোথাও গেছে। কিন্তু তোমাকে সম্পূর্ণ কড়ি না দিয়ে মণি নিয়ে যাই কী করে!’
সাপ বললো, ‘নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কাজে এরা দূরে গেছে। এসে কড়ি দিয়ে দিলেই হবে। এই নাও মণি, তুমি পাখিকে দিয়ে এসো।’

মণি নিয়ে লাফাতে লাফাতে ব্যাঙ চলে এলো পাখির বাসায়। মণিটি পাখিকে দিয়েই সে গাছ থেকে নেমে গেল। এদিকে মণিটিকে পাখি বাসায় রাখতেই তার বাচ্চারা মণিটিকে নিয়ে খেলতে শুরু করলো। হঠাৎ করে বাসা থেকে মাটিতে পড়ে গেল মণিটি। গাছের তলা দিয়ে যাচ্ছিল এক লোক। সে তো সাপের মণি দেখে আর লোভ সামলাতে পারলো না। তাড়াতাড়ি ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে নিয়ে চলে গেল। পাখি অনেক চেষ্টা করেও মণিটিকে আর উদ্ধার করতে পারলো না।

এদিকে দুইদিন হয়ে গেল সাপ একা বসে আছে। কারো সঙ্গে দেখা নেই। না ব্যাঙ, না কুমীর, না মাছ, এমনকি কীটদেরও! সে ভীষণ চিন্তায় পড়লো।
অন্যদিকে মণি দেওয়ার দুদিন পরও বৃষ্টি শুরু না হওয়ায় ব্যাঙও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো। সে আবার গেল পাখির বাসায়। দেখে বাচ্চাসহ পাখিটি উধাও। ব্যাঙ-ও তো পড়লো মহা বিপদে। এমন সময় মাথার উপরে একটা ঘুড়িকে দেখতে পেয়ে বললো, ‘ঘুড়িবন্ধু, দুইদিন আগে মেঘকে দেওয়ার জন্য পাখিকে একটি সাপের মণি দিয়েছিলাম। তুমি কি মেঘের কাছ থেকে একটু খবর এনে দিতে পারবে?’
ঘুড়ি অবাক হয়ে বললো, ‘সাপের মণি!’
‘হ্যাঁ, তার বিনিময়ে মেঘের বৃষ্টি ঝরানোর কথা ছিল।’
‘সে তো খুব ভালো কথা। ঠিক আছে, আমি এখুনি এনে দিচ্ছি তোমার খবর।’
ঘুড়ি মেঘের কাছ থেকে খবর নিয়ে এসে ব্যাঙকে জানালো, ‘পাখি এ ব্যাপারে তিনদিন আগে আলাপ করেছিল বটে, তবে এরপর আর সে মেঘের কাছে যায়নি।’
একথা শুনে ব্যাঙের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। কুমীর, মাছ আর জলকীটদের কড়ি দিয়ে ইতোমধ্যেই সে স্থলে ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। আর পাখি যদি সাপের মণি না দিয়ে থাকে তবে বৃষ্টির তো কোনোই সম্ভাবনা নেই।
মাছ ফিরে আসার আগেই ফিরে এলো কুমীর। সাপের সাথে দেখা হতেই বললো, ‘সাপবন্ধু, তুমি বুঝি ব্যাঙের কাছে মণি দাওনি?’
সাপ বললো, ‘তোমরা কড়ি না দিয়ে চলে গেলেও আমি তো মণি দিয়ে দিয়েছি ব্যাঙের কাছে। বৃষ্টি হচ্ছে না কেন কিচ্ছুই তো বুঝতে পারছি না!’
‘কী বলছো! আমি আর জলকীট তো মাছের কাছে কড়ি দিয়ে গেছি।’
‘তাহলে কড়ি গেল কোথায়, আর ব্যাঙই বা গেল কোথায়?’
‘নিশ্চয়ই মাছ কড়িগুলো মেরে দিয়েছে। আর তোমাকে কড়ির জবাব দিতে পারবে না বলেই ব্যাঙ আর ফিরছে না।’
‘হতেও পারে! কিন্তু মণি নিয়ে ব্যাঙ গেলো কোথায়?’
কুমীর রাগে গরগর করতে করতে লাগলো, ‘সব দোষ ওই ব্যাটা মাছের। আজ আসুক মাছ, চিবিয়ে খাব ওকে।’
কিছুক্ষণ পর মাছ আসতেই তেড়ে গেল কুমীর, ‘মাছ, তুমি আমাদের কড়িগুলো সব মেরে দিয়েছ, না?’
মাছ বলল, ‘না! না! বিশ্বাস কর।’
বিশ্বাস করলো না কুমীর। ছুটলো মাছের পিছনে। মাছ প্রাণপণে সাঁতরাতে লাগলো প্রাণ বাঁচাতে। এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে স্থলে উঠে গেল সাপ। দেখে কী, কড়ি নিয়ে বেশ ব্যবসা জমিয়ে বসেছে ব্যাঙ। দেখে সাপের আর বুঝতে বাকি রইলো না ব্যাঙের কু-কর্মের কথা। সাপকে দেখতে পেয়ে ঘটনা বুঝে লাফিয়ে পালাতে লাগলো ব্যাঙ-ও। সাপ বললো, ‘ব্যাঙ, তোকে আমি ছাড়ব না। তুই আমাদের সাথে বেঈমানী করেছিস।’ একথা শুনে ব্যাঙও প্রাণ বাঁচাতে লাফিয়ে লাফিয়ে পালাতে লাগলো আরও দ্রুত। সেই থেকে কুমীর মাছ খেতে শুরু করলো। আর সাপও শুরু করল ব্যাঙ খেতে। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত দূর্বল পেয়ে জলকীটদের খেতে লাগল মাছ আর ব্যাঙ। সেই থেকে জলরাজ্যে শুরু হয়ে গেলো অশান্তি।