প্রজাপতি হবো

এনায়েত রসুল

বাংলাদেশের এক গ্রামে সুরুজ নামে এক জেলে ছিলো। জেলেরা সাধারণত যতো গরিব হয়, সুরুজ জেলে তার চেয়েও গরিব ছিলো। তার জালটি ছিলো ছেঁড়া-ফাটা। তাই সব সময় সেই জালে মাছ ধরা পড়তো না বলে তেমন আয়-রোজগারও ছিলো না সুরুজ জেলের। দিন কাটাতে হতো খেয়ে-না খেয়ে।

সুরুজ জেলের একটি মেয়ে ছিলো। কাজলের মতো কালো ছিলো তার গায়ের রং। দেখতেও সুন্দর ছিলো না। যে একবার মেয়েটির দিকে তাকাতো, সে-ই চোখ ফিরিয়ে নিতো। তবে সুরুজ জেলে খুব ভালোবাসতো তার মেয়েকে। চাঁদ খুব সুন্দর। তাই সে মেয়ের নাম রেখেছিলো চন্দ্রমুখী।
চন্দ্রমুখী খুব শান্ত মেয়ে ছিলো। সব সময় মুখে হাসি লেগেই থাকতো। ওরা যে খুব গরিব ছিলো, খেতে-পরতে পারতো না, সে জন্যে কখনো মন খারাপ হতো না। চন্দ্রমুখী ভাবতো, ভাগ্যের চাকা একদিন ঘুরবেই।
ভাগ্যের চাকা ঘোরার আগেই নতুন এক বিপদ নেমে এলো শান্ত মেয়ে চন্দ্রমুখীর ওপর। এক ঝড়ের রাতে নৌকাডুবি হয়ে মারা গেলো সুরুজ জেলে। বিশাল এই পৃথিবীতে চন্দ্রমুখী একা হয়ে গেলো।
একা একা ঘরে বসে থেকে সময় আর কাটতেই চায় না চন্দ্রমুখীর। তাই চন্দ্রমুখী গেলো পাশের বাড়ির মেয়ে ছন্দার সাথে খেলতে। কিন্তু ছন্দা চন্দ্রমুখীকে দেখেই নাক কুঁচকালো। ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, ও মাগো! কী কালো মেয়ে তুমি! তোমার মতো কুৎসিত মেয়ের সঙ্গে আমরা কেউ খেলবো না। যাও চন্দ্র তুমি চলে যাও।
চন্দ্রমুখীর মনে কখনো কোনো দুঃখ ছিলো না। কিন্তু ছন্দা ওকে কুৎসিত বলে তাড়িয়ে দেয়ায় চন্দ্রমুখী খুব দুঃখ পেলো। সেটা ছিলো জীবনে প্রথম দুঃখ পাওয়া। দুঃখটা সূচের মতো চন্দ্রমুখীর বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধলো। তাই কান্না এলো চন্দ্রমুখীর। অঝোর ধারায় কেঁদে চললো সে।
কাঁদতে বসেছিলো বিকেলে। বিকেল শেষ হলো কিন্তু চন্দ্রমুখীর কান্না শেষ হলো না। রাত নেমে ঘর অন্ধকার হলো। চন্দ্রমুখী ঘরে আলো জ্বালবার প্রয়োজনও বোধ বোধ করলো না। বুক ভাসিয়ে, চোখ ভিজিয়ে কেঁদেই চললো সে।
এক সময় রাত আরো গভীর হলো। সারাটা গ্রাম নিঝুম হলো। সেই সময় এক অবাক করা ঘটনা ঘটলো চন্দ্রমুখীর অন্ধকার ঘরে। বলা নেই কওয়া নেই, ঘরটা আলোয় আলোয় ভরে গেলো। আর সারাটা ঘরে ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো।
এই অবাক করা ঘটনা দেখে বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেলো চন্দ্রমুখীর চোখ দুটো। ওর কান্না থেমে গেলো। চোখ মুছে তাকালো চন্দ্রমুখী। তখন সে দেখলো, ওর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে অপূর্ব সুন্দর একটি মেয়ে। তার চোখ দুটো টানা টানা। ঠোঁট দুটো গোলাপের পাপড়ির মতো লাল। হাঁটু ছুঁই ছুঁই মেঘবরণ চুল। পিঠে রয়েছে আয়নার মতো স্বচ্ছ দুটো পাখা।
সেই মেয়েটির গায়ের রং কেমন? দুধে-আলতায় মেশানো সেই রং। আর সারাটা শরীর থেকে ঠিকরে ঠিকরে আলো ছড়াচ্ছে। সেই আলোয় ঘর ঝলমল করছে। আর ছড়াচ্ছে মন মাতানো ফুলের গন্ধ।
অবাক হয়ে যাওয়া চন্দ্রমুখী দেখলো, চোখ জুড়ানো রূপবতী মেয়েটি ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে- হাসছে আর চোখের তারা নাচিয়ে ওকে যেনো কি বলতে চাইছে।
চন্দ্রমুখী জিজ্ঞেস করলো, তুমি কে ভাই?
সেই রূপবতী মেয়েটি মিষ্টি স্বরে বললো, আমার নাম জোছনা পরী। এদিক দিয়ে উড়ে উড়ে মেঘের দেশে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখ পড়লো তোমার ওপর। দেখতে পেলাম তুমি কাঁদছো। তাই নেমে এলাম। তুমি কাঁদছিলে কেন চন্দ্রমুখী?
চন্দ্রমুখী বললো, সব বলবো। তার আগে বলো তুমি আমার নাম জানলে কেমন করে?
জোছনা পরী বললো, আমি সবার নাম জানি। শুধু জানি না তুমি কাঁদছো কেন? কেন কাঁদছো চন্দ্রমুখী?
চন্দ্রমুখী বললো, জানো তো আমার বাবা-মা নেই। দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতে হয়। আমার গায়ের রং পিচের মতো কালো। কিন্তু এসব নিয়ে কোনো দুঃখ নেই আমার।
জোছনা পরী বললো, আমরা তা জানি। এজন্য তোমাকে আমরা খুব ভালোবাসি। কিন্তু আজ এমন করে কাঁদছিলে কেনো?
চন্দ্রমুখী বললো, আমার চেহারা সুন্দর নয়, দেখতে কালো, গরিবের মেয়ে। এসব কারণে কেউ আমার সঙ্গে খেলতে চায় না। আজ ছন্দা আমাকে কুৎসিত মেয়ে বলেছে। দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমি খুব দুঃখ পেয়েছি ছন্দার কথা শুনে। তাই অমন করে কেঁদেছি।

জোছনা পরী বললো, তোমাকে এসব বলে কষ্ট দেয়া ছন্দার উচিত হয়নি। তোমাকে কেন, কাউকেই অপমান করে কথা বলা উচিত নয়। সে যাক, এখন আমি এসেছি। আমি তোমার মন থেকে সব দুঃখ মুছে দেবো। বলো তোমার কি চাই?
চন্দ্রমুখী বললো, অসুন্দরী বলে কোনো দুঃখ ছিলো না আমার। কিন্তু এ নিয়ে কেউ ঘৃণা করবে, তাও সইতে পারছি না। তাই আমার মাঝে এমন সৌন্দর্য দাও, সবাই যেন আমাকে সুন্দর বলে।
জোছনা পরী বললো, তুমি যদি সত্যি সত্যিই সুন্দর হতে চাও, তাহলে তোমাকে আমি দুটি রঙিন পাখা দেবো। লাল, নীল, হলুদ রংয়ের কারুকাজ থাকবে সেই পাখায়। ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়াবে তুমি। ফুলের মধু খাবে আর ফুলের রেণু গায়ে মেখে হুটোপুটি খেলবে।
চন্দ্রমুখী হাততালি দিয়ে নেচে উঠে বললো, বাহ! তাহলে খুব মজা হবে। কিন্তু পাখা নিয়ে আমি মানুষের মাঝে ঘুরে বেড়াবো কেমন করে?
জোছনা পরী বললো, ঘুরে ঘুরে বেড়াবে না- তুমি মানুষের মাঝে উড়ে উড়ে বেড়াবে। তোমার নাম হবে প্রজাপতি। কিন্তু...
কিন্তু কি জোছনা পরী? যা বলার মন খুলে বলো। বললো চন্দ্রমুখী।
তখন জোছনা পরী বললো, প্রজাপতি হলে তোমার পাখা দুটোই সুন্দর হবে। শরীরটা কিন্তু কালোই থাকবে। আর তুমি কোনোদিনও মানুষ হতে পারবে না। প্রজাপতি হয়েই জীবন কাটাতে হবে। বলো, এরপরও কি তুমি প্রজাপতি হবে?
চন্দ্রমুখী বললো, হ্যাঁ, হবো। আমি প্রজাপতিই হবো। তুমি জানো তো, এ পৃথিবীতে ভাই-বোন, মা-বাবা কেউ নেই আমার। দু’বেলা খাবার মতো রোজগারও নেই। কেউ আমাকে সাহায্য করে না। ভালোবাসে না। মানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে আমার। সে জন্যই আমি প্রজাপতি হতে চাই।
জোছনা পরী বললো, বেশ, তুমি প্রজাপতি হও।
যেই না এ কথা বলা, অমনি চন্দ্রমুখী রঙিন পাখাঅলা প্রজাপতি হয়ে গেলো। তার সুন্দর পাখা দেখে সবাই মুগ্ধ হলো। এমন কি যে ছন্দা চন্দ্রমুখীকে কালো কুৎসিত বলেছিল, সেও বলতে বাধ্য হলো প্রজাপতির চেয়ে সুন্দর কিছু হতেই পারে না।
ব্যস, সেই থেকে শুরু। আজো সবাই প্রজাপতির রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়।