মতির মাথায় গাব

ধ্রুব নীল

‘রবি’দা, বাংলাদেশে আপেল গাছ নাই?’
‘নাই মনে হয়। কমলা গাছ আছে। তাও সিলেটে।’
‘না না সে অনেক দূর। আচ্ছা, আপেলের মতো দেখতে একটা ফলের নাম বলেন তো।’
‘আমড়া।’

‘হুম, মিঠুন’দাদের বাড়ির পিছনে একটা আছে না?’
‘খবরদার, ঘোড়া ডিঙ্গিয়ে ঘাস খেতে যাস নে! ঢিল ছুড়লে মিঠুনের বাপ তোকে পিটিয়ে ফার্নিচার বানাবে।’
‘না না! ঢিল ছুড়বো না। গাছের তলায় বসে থাকবো কিছুক্ষণ।’
‘কেন রে?’
‘নিউটন আপেল গাছের নিচে বসেছিলেন। এদিকে তো আপেল গাছ নাই। তাই আমড়া গাছের তলায় বসবো।’
‘ও আচ্ছা, যা তাহলে। দুইটা আমড়া পড়লে আমাকে একটা দিস।’
রবি নামের কলেজ পড়–য়া ছেলেটা পাত্তাই দিল না ক্লাশ টেনের মেধাবী ছাত্র মতির কথা। ক্রিকেট ব্যাট বগলদাবা করে হনহন করে চলে গেল মাঠের দিকে। নাক সিঁটকে মতিও হাঁটতে লাগলো মিঠুনদের বাড়ির দিকে।
বিকেলে বাড়ির উঠোনে বসে মুড়ি চিবুতে থাকেন মিঠুনের বাবা। আজও তাই করছেন। তার লুঙ্গি আঁকড়ে মুড়ির বাটিটা ধরতে চাইছে মিঠুনের ছোট ভাই। বয়স এক দেড় বছর হবে। মিঠুনের বাবাকে দেখেই কাঁচুমাচু হয়ে গেল মতি। ভেবেছিল বিকেলের সময় তিনি হাটে থাকবেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়লো আজ তো হাটের দিন নয়।
‘স্ল্যামালিকুম।’
‘ওয়ালাইকুম সালাম।’
‘জ্বি চাচা, মিঠুনদা বাসায় নাই?’
‘শয়তানের হাড্ডিটা তো বাসায় থাকে না। তার তো ঘরবাড়ি নাই। তা তুমি তো পড়াশোনা করো বাবা। ওরে কী দরকার?’
মিঠুন’দার বাবার মেজাজ এতটা চড়ে আছে জানলে মতি সোজা রাজুদের জাম্বুরা গাছের তলায় গিয়ে বসতো।
‘জ্বি চাচা, আমার আসলে একটু বাড়ির পেছনটায় যেতে হবে। ওইখানে একটা আমড়া গাছ আছে না?’
মিঠুনের বাবা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন না। তিনি চোখ কুঁচকে মতির দিকে তাকালেন। মতি এখনো চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকিয়ে আছে।
‘কি কইলা? আমড়া পাড়বা? আমড়া তোমার কাছে আমি বেইচা দিসি?’
‘না না! চাচা আমি একটু.. ইয়ে মানে...’
‘একটু কি শুনি? এই শিখসো স্কুলে গিয়া!’
‘না চাচা আমি আমড়া গাছের তলায় একটু বসতে চাই। নিউটন বসেছিলেন আপেল গাছের তলায়, আর আমি..।’
‘আমাকে দেখে কি মনে হয়? মূর্খ? আমি বিএ পাশ করসি এমনে এমনে!’
‘জ্বি না চাচা। আমি সত্যি বলছি।’
‘সত্যি কোনটা? আমড়া গাছের তলায় বসলে নিউটন হইবা? তুমি হইবা আমড়া গাছের ঢেঁকি। এর মানে বুঝো?’
‘জ্বি চাচা, এর মানে হলো যাকে দিয়ে কোনো কাজ হয় না। কিন্তু..।’
‘কোনো কিন্তু না! আমড়া পাড়ার বুদ্ধি! ভাবসো আমি বুঝি না! যাও!’
‘জ্বি যাচ্ছি।’

মেজাজ খারাপ হয়ে গেল মতির। কেউ তাকে বুঝতে পারলো না। অথচ আজই তার মাথা থেকে কত বড়ো একটা আইডিয়া বের হতে গিয়েও হয়নি। আজ সে...। আরে! সঞ্জয়দের গাব গাছ আছে না! গাব আর আপেল তো প্রায় একই রকম। সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ ভাল হয়ে গেল মতির। এক দৌড়ে খালের ওপারে চলে গেল।

সাঁকো পার হলেই ছোটখাট জঙ্গল। সারি সারি সুপারি গাছ। তাই গাব গাছ খুঁজে পেতে সমস্যা হলো না মতির। ওপরে তাকিয়ে দেখল গাবও ধরেছে বেশ। নিচে পড়লে দু’চারটে খেতেও পারবে। সঞ্জয়রা কিছু বলবেও না।
লম্বা দেখে একটা গাব গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়াল মতি। গাছে অনেক গাব ধরেছে। কয়েকটা পেকেও গেছে। একটা দুটো নিচে পড়বেই পড়বে। কিন্তু কখন পড়বে ঠিক নেই। গাছের গোড়াটা একটু পরিষ্কার করে নিল, এরপর পা ছড়িয়ে বসে পড়লো মতি। বুক পকেটের ভেতর থেকে লবণ আর বরই বের করলো। বসে বসে বরই না খেলে মাথা খোলে না তার।

টানা পাঁচ মিনিট বসে রইলো মতি। পকেটের বরই সব শেষ। এখনো কোনো বুদ্ধি এল না মাথায়। আর একটু পর বেলা পড়ে যাবে। জলদি করে বাসায় না গেলে মায়ের বকুনিতে আইডিয়া গায়েব হতে যেতে পারে। চিন্তায় পড়ে গেল মতি। এমন সময় সরসর একটা শব্দ শুনতে পেল। ঝট করে উপরে তাকাতেই খুশিতে চকচক করে উঠলো মতির চোখ। একটা গাব পড়ছে! কিন্তু একি! গাবটা এত আস্তে আস্তে পড়ছে কেন! মতি হা করে তাকিয়ে আছে। উপর থেকে ছেড়ে দেওয়া হলে যে গতিতে পড়ার কথা তারচেয়ে অনেক আস্তে পড়ছে গাবটা। নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির হিসাবটা মনে মনে মেলাবার চেষ্টা করলো মতি। প্রতি সেকেন্ডে গাবটার গতি প্রায় দশ মিটার করে বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ঘটনা ঘটছে উল্টোটা। গাবটা ধীরে ধীরে স্লো হয়ে আসছে! মতির মাথার ঠিক দুই ফুট উপরে থাকতে একেবারে থেমে গেল! আর পড়লোই না নিচে!

মতির মেজাজ বিগড়ে গেল। এদিক ওদিক তাকিয়ে কয়েকটা ঢিল কুড়িয়ে নিল। গাবটাকে লক্ষ্য করে ছুঁড়লো। কিন্তু লাগলো না। গাব যদি নিচে না’ই পড়লো তবে এতক্ষণ গাছের গোড়ায় বসে কী লাভ হলো! গাবটা না পড়লে তো বুদ্ধিও আসবে না। এর চেয়ে বরই গাছের গোড়ায় বসলেই ভাল হতো, বরই খাওয়া যেত।
গাবটা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। মতি খানিকটা সরে এল। একি! গাবটাও তার সঙ্গে সঙ্গে সরে এল! মতি ঝট করে ডান দিকে দুই কদম সরে গেল। গাবটাও ঝট করে ডান দিকে সরে এল। মতির ঠিক মাথা বরাবর শূন্যে ঝুলছে ওটা। ভয় পেয়ে গেল মতি। গাবটার মধ্যে ভ‚তের আছর হয়নি তো! নিউটন হওয়ার ইচ্ছে চলে গেল সঙ্গে সঙ্গে। আপাতত মাথার ওপর থেকে গাবটাকে তাড়াতে পারলেই বেঁচে যায় মতি। ঝেড়ে দৌড় দেবে নাকি? কিন্তু গাবটার মতিগতি দেখে মনে হচ্ছে বেশ চালাক ওটা। মতির মনের কথা বুঝতে পেরে শূন্যের মধ্যেই কেমন যেন কাঁপতে শুরু করলো। মনে হলো দৌড় শুরুর আগে হাত-পা ঝেড়ে নিচ্ছে!
রেডি ওয়ান... টু... বলেই দৌড় দিল মতি। চালাকি করে থ্রি পর্যন্ত গোনেনি। এতেই কাজ হয়েছে। গাবটা এক সেকেন্ড পর দৌড়াতে শুরু করেছে। সামনে রবিকে দেখতে পাচ্ছে। আপাতত তার কাছেই যাবে ঠিক করলো। জঙ্গল খাল পেরিয়ে দুদ্দাড় করে ছুটছে মতি। পেছন পেছন শূন্যে ভেসে ছুটছে আস্ত একটা পাকা গাব!

‘কীরে অমন মরিচ খাওয়া গরুর মতো ছুটছিস কেন?’
‘রবি’দা...। উফফ। দাঁড়াও আগে দম নিই। গাব! রবি’দা মাথার উপর গাব!’
‘বলছিস কি এসব! মাথায় তো বেল পড়ে জানি, গাব পড়বে কেন?’
‘আরে না। ওই যে..।’
উপরে তাকাতেই চমকে উঠলো মতি। গাবটা নেই। হুট করে গায়েব হয়ে গেল!
‘তোকে ভ‚তে ধরেনি তো?’
‘আরে আমার মাথার উপর একটা গাব ঘুরলো এতক্ষণ। এখন আবার চলে গেল!’
‘কী আবোলতাবোল বকছিস!’
‘বিশ্বাস কর, গাবটা মাথার উপরই ছিল। এখন নেই।’
খেলাধূলা করে রবি তখন ক্লান্ত। তাই আর কথা না বাড়িয়ে বাড়ির পথ ধরলো। তার পিছু নিল মতি। বারবার মাথার ওপর তাকাচ্ছে। কিন্তু গাবটা নেই। মতি ভাবল, ওটা চোখের ভুলও হতে পারে। কিন্তু একি! মতির মনের কথা টের পেয়ে গেছে গাবটা! কোত্থেকে আবার ধুম করে উড়ে এসে জুড়ে বসলো মাথার ওপর।
‘রবি’দা! দেখ দেখ!’
‘আরে ধুর। গাব আমি খাই না। মাথার উপর নারকেল উড়লে বলিস।’
রবি পেছনে তাকালই না। মতির মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। চোখ গরম করে উপরে তাকালো। গাবটা কেমন যেন দুলছে। মনে হচ্ছে যেন মতির দিকে তাকিয়ে হাসছে ওটা। সাহস করে ওটাকে জিজ্ঞেস করেই বসলো।
‘অ্যাই তুই কে রে!’
গাবটা তির তির করে কেঁপে উঠলো। কিছু বলতে চাইলো মনে হয়। মতি উত্তরের জন্য অপেক্ষা করলো না। সোজা হাঁটা দিল মিঠুনদের বাড়ির দিকে। মিঠুনের বাবা এখনো উঠোনে বসে আছেন। মুড়ি চাবানো শেষ করে তিনি এখন খুব আয়েশ করে চা খাচ্ছেন। মতিকে দেখে চোখ কুঁচকে তাকালেন। কিন্তু কিছু বললেন না। মতি উসখুশ করতে লাগলো। উপরেও তাকাচ্ছে না। গাবটা নেই বোধহয়। থাকলে মিঠুনের বাবা দেখতে পেতেন।
‘মাথার উপর গাব নিয়া ঘুরতাসো ক্যান? মাথার উপর রাখবা কাঁঠাল। সবাই যেন তোমার মাথায় কাঁঠাল ভাইঙ্গা খাইতে পারে।’
অন্যসময় হলে খেপে যেত মতি। কিন্তু এখন ভয় পেয়ে গেল। জলদি মাথায় হাত দিতেই বুঝতে পারলো ঘটনা। গাবটা মাথার সঙ্গে এমনভাবে লেগে আছে দেখে মনে হবে মতি মাথায় ওটা নিয়ে ঘুরছে। সঙ্গে সঙ্গে সামনের দিকে মাথা ঝোঁকালো মতি। গাবটা লেগেই রইল। কিন্তু সেটা মিঠুনের বাবা খেয়াল করলেন না। তিনি অন্যদিকে তাকিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘মিঠুন বাসায় নাই। বাজারে পাডাইসি।’
মতি একবার ভাবলো গাবের ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবে। কিন্তু ইচ্ছে করলো না। থাক, মাথার উপর একটা গাব উড়লে এমন কী ক্ষতি! কিছু হয়নি, এমন একটা ভাব নিয়ে মতি তার বাড়ির দিকে এগিয়ে চললো। বাড়িতে ঢুকলেই গাবের আছর কেটে যাবে।
দুই পা এগোতেই পিঠে গুঁতো খেল মতি। গাবটাই গুঁতো দিয়েছে।
‘কীরে! গুঁতো দিলি কেন?’
গাবটা আবার কাঁপতে লাগলো। কয়েকবার পিছুও হটে গেল। মতিকে ইশারায় উল্টো দিকে যেতে বলছে যেন। মতি ঘুরে হাঁটা দিতেই গাবটা চলতে শুরু করলো। তবে এবার আর মাথার উপর নেই। মতির একটু সামনে আছে গাবটা। মতিই ওটার পিছু নিয়েছে।
উড়তে উড়তে আবার সেই খালের কাছে চলে এলো গাবটা। উড়ে উড়ে চলে গেল সেই গাছের গোড়ায়, প্রথমে যেখানে বসেছিল মতি। গাবটা এবার নাচতে শুরু করে দিল। দ্রুত উপরে-নিচে ওঠানামা করছে। মতিকে বসতে বলছে যেন। মতি মেজাজ খারাপ ভাব করে গাছের গোড়ায় বসে পড়লো। গাবটাকে দেখলো ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাচ্ছে। ঠিক যতটুকু পড়ার পর ওটা আটকে গিয়েছিল, ততটুকু উপরে উঠলো গাবটা। মতি নিচের দিকে তাকাতেই- ধুপ! সোজা মাথায় এসে পড়ল গাবটা।
‘উফ! শয়তান গাব, তোকে আজ খাবই।’
হাত বাড়িয়ে গাবটা নিল মতি। ভাল করে তাকাতেই রাগ উবে গেল তার। গাবটা সাধারণ গাব নয়। ওটার গায়ে একটা সিলের মতো আছে। স্পষ্ট না হলেও মোটামুটি পড়া যায় লেখাটা। ইংরেজি লেখাটা বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘মহামতি স্যার আইজ্যাক নিউটনের মাথায় পতন : সন ১৬৬০।’
মতির চোখ চকচক করে উঠলো। তারমানে নিউটনের মাথায় আপেল পড়েনি, পড়েছিল গাব! তাও আবার এই গাবটাই! মতির মনে হলো সে মস্ত বড় একটা রহস্যের সমাধান পেয়ে গেছে। নিউটনের মতো সেও নিশ্চয়ই মহাবিজ্ঞানী হতে চলেছে। তা না হলে সেই গাবটা বাংলাদেশে উড়ে এসে তার পিছে ঘুরঘুর করতো না। কিন্তু প্রথমেই গাবটা নিচে পড়েনি কেন? আর ওটা উড়লোই বা কী করে? তারচেয়েও বড় কথা হলো, গাব তো মাথায় পড়লো, এখন মতি কী আবিষ্কার করবে?
ঘুড়ুম ঘুড়ুম... চিঁ চিঁ... শোশশশ...
বিচিত্র কিছু শব্দ করে দু’ভাগ হয়ে গেল গাবটা। আরেকটু হলে ছুঁড়েই ফেলে দিত, কিন্তু কী মনে করে তা করেনি মতি। গাবটা খাওয়ার চিন্তাও মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললো। কেননা, গাবের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো অদ্ভুত এক পোকা, ওটার দুটো পাখাও আছে। গাবের ভেতর ছোট ছোট একগাদা যন্ত্রপাতি। ভিনগ্রহের গাব না তো, যার ভেতর থাকে এলিয়েন পোকা!
‘হেই! ইক্কিরি মিচকা?’
মতি চমকে উঠলেও প্রকাশ করলো না। এতটুকু একটা পোকাকে ভয় পাওয়ার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু কথা বললো কী করে?
‘চিমকা নুমিয়া?’
কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নিল মতি। কোনো মতে বললো, ‘তুমি কী বলছ বুঝতে পারছি না। তুমি ইংলিশ জানো? আই নো ইংলিশ, মাই নেম ইজ মতি।’
‘ওহ, তুমি বাংলা জানো, বললেই পার। তার আগে বল আমি কোথায়?’
‘তুমি আছ বাংলাদেশের আনন্দপুর গ্রামে। তুমি কি এলিয়েন? কোন গ্রহ থেকে এসেছ?’
পোকাটা পাখা ঝাপটে খানিকটা উড়ে নিল। তারমানে এতক্ষণ সে-ই গাবটাকে নিয়ে উড়েছে। ভাব দেখে মনে হচ্ছে মতির প্রশ্নের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছে না সে।
‘আমার নাম মিক্কু। এসেছি অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির কুড়–ক্কু গ্রহের হাহাহা গ্রাম থেকে।’
‘কবে এসেছ?’  
‘১৬৫৬ সালে এসেছিলাম। এখন কত সাল চলছে?’
‘বল কি! এখন তো ২০১২! এত্তো বছর কোথায় ছিলে?’
‘হুম। তা নিউটন চাচা কেমন আছে? আর বোলো না, মাথার উপর পড়েছিলাম দেখে তার সেকি রাগ! শেষে..।’
‘এক মিনিট! নিউটনের মাথায় তুমিই পড়েছিলে?’
‘উনার মাথায় আমি না পড়লে কি আর এতবড় বিজ্ঞানী হতেন? মাধ্যাকর্ষণসহ কত কি শিখিয়ে দিলাম তাকে। তা তোমাকেও একটা নকশা দিয়ে যাবো। ওটা আবিষ্কার করলে মস্তবড় বিজ্ঞানী হবে।’
‘আমরা তো জানি উনার মাথায় আপেল পড়েছিল।’
‘ওই তো, তখন স্পেসশিপটা ছিল আপেলের মতো, এই দিকে এসে দেখি আপেল গাছ নেই। তাই গাবের মতো রং করে নিলাম।’
‘হুম, আমাকে কী দেবে শুনি?’
‘এই নাও।’
ছোট্ট একটা কাগজের টুকরো বাড়িয়ে দিল মিক্কু নামের পোকাটা। মতি বেশ যত্ন করে ধরল ওটা। হাতে নিয়েই ধীরে ধীরে খুলতে লাগলো ভাঁজ করা কাগজটা। পুরোটা খুলতেই বেরিয়ে এলো একটা নকশা।  
‘আজই চলে যাব। আগামীকাল আবার শনির চাঁদে মিটিং আছে। সামনে আন্তঃগ্যালাক্টিক নির্বাচন। আমিও দাঁড়িয়েছি। দেখা যাক, জিতে গেলে সব গ্রহে বিনামূল্যে তাজা মাটি পৌঁছে দেব। এটা আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। অবশ্য তোমাদের গ্রহ এমনিতেই মাটিতে ভর্তি। আর তোমাকে বলেও লাভ নেই, তুমি তো আর ভোটার নও। তারপরও বলে রাখি, আমি দাঁড়িয়েছি নিহারীকা মার্কা নিয়ে।’
‘হুমম। অনেক ব্যস্ত তাহলে। তা নির্বাচন হবে কবে?’
‘পৃথিবীর সময়ে ৩০৩২ সালের ৬ জুলাই।’
‘হে হে হে। বেশ ভাল। এখন আমাকে দুটো গাব পেড়ে দাও।’
শোঁ করে উপরে উঠে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দুটো গাব নিয়ে এলো মিক্কু। ছোট হলেও গায়ে তার অনেক জোর। মতি কিছু বলার আগেই ভোঁ করে আবার উপরে উঠে গেল। খালের পাড়ে রবি’দাকে দেখে মতি আর মিক্কুকে ডাকাডাকি করলো না, যদি আবার পাগল ভাবে!
‘ওই মতি, এদিকে আয়। গাব দিয়ে যা।’
এগিয়ে গেল মতি। পেছনে তাকালো না।
‘কীরে তোর হাতে ওটা কী? দেখি তো।’
নকশাটা বাড়িয়ে দিল রবির দিকে। ওটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রবি বলল, ‘দেখে তো মনে হচ্ছে একটা জেনারেটরের নকশা। এতক্ষণ বসে বসে এটাই বানালি! আমাকে বললেই পারতি, হরিপদের ইলেকট্রনিক্সের দোকানে চল, শুধু হাতেকলমে নয়, হাতেযন্ত্রেও শিখিয়ে দেব।’
মতির ভীষণ মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। উবু হয়ে দুটো ঢিল তুলে নিল। একছুটে গাব গাছের তলায় গিয়ে সজোরে ছুড়ে মারলো উপরে।
‘শয়তান গাব! নিচে আয় খালি। ওই মিক্কু! কই গেলি! নিচে আয়! তোকে টিপে মারবো আজ! তুই আমাকে এটা কী দিয়ে গেলি! আমি মহাবিজ্ঞানী মতি তোকে দেখে নেব বলছি!’