ঠাকুরমার ঝুলি এবং ইবু

আহমেদ ফারুক

ঠাকুরমার ঝুলি বইটা একবারেই পড়ে শেষ করে ফেলল ইবু। গল্পগুলো অদ্ভুত। ব্যাঙ রাজকুমার প্রথমে ব্যাঙ থাকে, পরে খোলস ছেড়ে বের হয়ে আসে। ডালিম রাজকুমারও তাই। সেও ডালিমের ভেতরে লুকিয়ে থাকে। তবে এসব গল্পের চেয়েও শেওড়া গাছের ভূত গল্পটা তার সবচেয়ে ভালো লেগেছে।

ভূত নাকি তিন প্রকার- একচোখা ভূত, শিংওয়ালা ভূত আর শেওড়া গাছের বোকা ভূত। বোকা ভূতের কাণ্ডজ্ঞান কম। এরা বুদ্ধি করে কিছুই করতে পারে না।

 

golpo_1_44.jpgআয়না দেখিয়ে যদি বলা হয়, দেখেছ তোমার মতো এক ভূতকে কেমন খাঁচায় তুলে রেখেছি তাহলে ওরা কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। আসলে আয়নার মাঝে যে ওকেই দেখা যায়, ওটা যে খাঁচা না তা ওরা বোঝে না। কত্তো বোকা!

একবার এমন এক বোকা ভূত শেওড়া গাছে বসে ছিল, এমন সময় এক দুষ্টু ছেলে শেওড়া গাছের নিচে যায়। ভূত তো লাফ দিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বলল, তোর ঘাড় মটকাব।
কিন্তু দুষ্ট ছেলেটা বলল, “কি তুই আমার ঘাড় মটকাবি? জানিস আমি কে?”
“কে তুই?”
“আমি ভূতের বাপ টুত।”
“তাই নাকি? তুই টুত। তোর কী আছে যে তুই আমাকে ভয় দেখাস?”
“কারণ আমি যা খেতে পারি তা তুই খেতে পারবি না। তাই নাকি, দেখা তো?”

golpo_2_44.jpg দুষ্ট ছেলেটা তার পোটলা থেকে দুটো মাটির পাতিল বের করল। এক পাতিলে ছিল দই, আর এক পাতিলে চুন। দুষ্ট ছেলেটা দইয়ের পাতিল থেকে এক চামচ দই খেল। আর চুনের পাতিলটা বোকা ভূতের হাতে দিয়ে বলল, “এবার তুই খা।”
বোকা ভূত তো আর এত কিছু বোঝেনি। সে যেই এক চামচ মুখে দিয়েছে অমনি ওরে বাবা গো ওরে মা গো, বাঁচাও গো বলে চিৎকার করে দুষ্ট ছেলেটার পায়ে পড়ে গেল। এবার ছেলেটা অট্টহাসি দিয়ে বলল, “হীরা জহরত যা আছে বের কর।”

বোকা ভূত তো আর এত কিছু বোঝেনি। সে সব দুষ্ট ছেলেটাকে দিয়ে দিল। গল্পটা পড়ে ইবু কিছুটা থমকে দাঁড়াল। আজ রাতেই তার শেওড়া গাছের ভূত দেখতে হবে। তবে সে ভূতের কাছে কী চাইবে তা ঠিক করতে পারছে না। অঙ্ক করার সহজ উপায়ের মন্ত্রটা কী জানতে চাইবে? না, না, এটা না। বরং চকোলেট আইসক্রিম চাওয়া যেতে পারে। মা আইসক্রিম খেলেই বকা দেয়।

সারাটা বিকাল ইবু বসে বসে ভাবল। সন্ধ্যার পর সে একটা কালো চাদর জোগাড় করল। ওটা পরে খালি পায়ে শেওড়া গাছের নিচে যেতে হবে। কিন্তু একটা সমস্যা রয়েই গেল। আজ অমাবস্যা কি না সেটা সে জানে না। তাছাড়া অমাবস্যা- পূর্ণিমা কিভাবে হয় তাও সে জানে না। অমাবস্যার রাত ছাড়া সে কি বোকা ভূতের দেখা পাবে?

golpo_3_44.jpg শেওড়া গাছ নিয়েও একটা সমস্যা ছিল। গাছটা কেমন দেখতে তা সে জানে না। পরে রহমান চাচার কাছে জানতে পেরেছে। বিকেলে তাকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, “শেওড়া গাছ এ পাড়ায় নেই। তবে ঝিলের ধারে যে ঝোপ আছে ওখানে একটা আছে।”

রাতে লক্ষ্মী ছেলের মতো ইবু সকাল সকাল বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিন্তু শুয়ে পড়লে কী হবে! সে কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ল না। চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করে রইল।

রাত ১২টার দিকে বাড়ির সবাই যখন ঘুমিয়ে তখন ইবু বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। পা টিপে টিপে সে বের হয়ে এলো উঠানে। বাড়ির সামনের তালগাছটা কেমন ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে ইবু রওনা দিল ঝিল পাড়ে।
ঝিল পাড়ের জঙ্গলটা কেমন জানি ঘুমিয়ে আছে। কাছে যেতেই গা ছমছম করে উঠল ইবুর। অদ্ভুত শব্দ করে পোকারা ডাকছে।

golpo_4_44.jpg সামনের সরু পথ দিয়ে ইবু এগিয়ে যায়। তার গায়ে কালো চাদর। সাথে একটা ব্যাগ। ব্যাগের ভেতর নীলু আপার আয়না আর দুটো আইসক্রিমের বাক্সে দই আর চুন। ফ্রিজে দই ছিল। দই নিয়ে সমস্যা হয়নি। কিন্তু চুন জোগাড় করতে সমস্যা হয়েছে। মোড়ের দোকানে গিয়ে চুন চাইতে বলল, “কোন চুন? ঝিনাই চুন না পাথর চুন।”

ইবু পরে জানতে পারে যে, চুন দুই প্রকার। এক প্রকার চুন পাথর থেকে তৈরি হয়। অন্যটা হয় ঝিনুক থেকে। ঝিনুক পুড়ে ঝিনাই চুন পাওয়া যায়। এই চুনটা দেখতে কালো কালো।

হুট করে উষ্ঠা খেয়ে পড়ে গেল ইবু। ঠিক সে সময়ই একটা বাদুর উড়ে গেল। ভয়ে ইবুর জান শুকিয়ে গেল। একবার ভাবল দৌড়ে বাড়ি চলে যায়। কিন্তু বোকা ভূত যে তার দেখতেই হবে।
উঠে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে শেওড়া গাছের নিচে দাঁড়াল সে। গাছটার নিচে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এদিক-ওদিক তাকালো সে। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে। সে কি বোকা ভূত, বোকা ভূত বলে ডাকবে। নাকি চুপ থাকবে। বুঝতে পেল না।

golpo_5_44.jpg একটা টর্চ লাইট এনেছিল সে। সেটা জ্বালিয়ে এদিক-ওদিক দেখল। গাছটা বুড়ো মানুষের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। হালকা বাতাসেই পাতাগুলো শাঁ শাঁ শব্দ করছে। টর্চ লাইট নিভিয়ে দেখল সে। ভুতেরা নাকি আলো সহ্য করতে পারে না।
শাঁ শাঁ শব্দ বাড়ছে। মনে হচ্ছে কে যেন এগিয়ে আসছে। ভয় পেয়ে গেল ইবু। আস্তে করে ঝোপের মধ্যে বসে পড়ল সে। ঝিঝি পোকাগুলো আরো জোরে জোরে ডাকছে। ইবু ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। শব্দ বাড়ছে। সে গুটিশুটি হয়ে বসে আছে ঝোপের ভেতর। তারপর কি হলো সে আর বলতে পারে না।

golpo_6_44.jpg সকালে ইবুর ঘুম ভাঙে। সূর্যের আলো এসে পড়েছিল ওর চোখে। লাফিয়ে উঠে সে। তার ব্যাগটা পাশে পড়ে আছে। দই আর চুন মাটিতে পড়ে আছে। ইবু অবাক হয়ে দেখল ওর পায়ের ওপর দিয়ে একদল পিঁপড়া সারি বেঁধে যাচ্ছে। কিন' ওকে কামড় দিচ্ছে না। আসলে ওদের কোনো ক্ষতি না করলে ওরাও ক্ষতি করে না। কিন্তু মানুষ যত বাড়ছে, ততই আমরা ওদের থাকার জায়গা কমিয়ে দিচ্ছি। অকারণে ওদের মারছি।

ইবু আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। ব্যাগটা কাঁধে নিল। শেওড়া গাছের দিকে তাকালো। মনে মনে বলল, ভূত বলে আসলেই কিছু নেই। ছোট কাকা বলেছিল। তখন বিশ্বাস করিনি। এখন হাতেনাতে প্রমাণ পেলাম। নইলে আজ রাতে বোকা ভূতের দেখা পেতামই।





আহমেদ ফারুক/এবি/এমআইআর/১১ আগস্ট