কাকদের পুরীষ উৎসব!

মহিউদ্দীন আহ্মেদ

আমার মাথার উপর কিছু একটা পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে মাথায় উঠে গেলো বাম হাত। নিশ্চিত হলাম, পাখির ইয়ে, মানে কি-না পুরীষ বা বিষ্ঠা! উপরের দিকে তাকিয়ে আরো নিশ্চিত হওয়া গেলো, জিনিসটা পাতি কাকের। কারণ মাথার উপর আম গাছের ডালে আনন্দিত একটি কাক কা কা করছিলো। হয়তো আমার মাথায় ইয়ে করতে পেরে সে খুব আনন্দ পেয়েছে।

আমি ক্ষিপ্ত হয়ে এমন কিছু খুঁজতে লাগলাম যা দিয়ে ওটাকে শায়েস্তা করা যায়। সঙ্গে সঙ্গে পেয়েও গেলাম। একটি ভাঙা ইটের টুকরা। যাকে বলে একেবারে মোক্ষম সময়ে মোক্ষম জিনিস পেয়ে গেলাম। হাতে তুলে নিলাম সেটি। ছোটবেলা থেকে আমার হাতের নিশানা ভালো। গুলতি দিয়ে আম পাড়তে গ্রামে আমার জুড়ি ছিল না। কিন্তু আজকে খালি হাত। হোক। আজ এই হাতই আমার গুলতি। কাকটিকে লক্ষ্য করে ইটের টুকরোটি ছুঁড়লাম। আমার নিশানা একটুও লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো না। ইটের টুকরোটি সোজা গিয়ে লাগলো হতচ্ছাড়া কাকটির গায়ে। সঙ্গে সঙ্গে কাকটি আমার সামনে লুটিয়ে পড়লো। আমি বীরদর্পে মৃত কাকটির দিকে কতোক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। তারপর আবার বাসার দিকে হাঁটা শুরু করলাম।

কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনা অন্য দিকে মোড় নিলো।  
কাকের জ্ঞাতি-গোষ্ঠি-বন্ধু-বান্ধব-সাঙ্গপাঙ্গরা প্রতিশোধ নিতে উড়ে এলো নিমেষেই। দলে তারা প্রায় শতাধিক। আমার তো চক্ষু ছানাবড়া! একি দেখছি আমি! কাকেরা জোটবদ্ধ থাকে, তা জানতাম; কিন্তু তাদের সে জোট যে এতো শক্তিশালী, তা কে জানতো? কাকেরা আমার দিকে তাকিয়ে দুয়োধ্বনির মতো করে একযোগে কর্কশ কণ্ঠে কা কা করে উঠলো। খুব ভয় পেয়ে গেলাম আমি। একটি সিনেমার কথা মনে পড়লো। সিনেমার নাম দি বার্ড, আলফ্রেড হিচককের সিনেমা। ওই সিনেমায় পাখিরাও মানুষের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এরকম মারমুখী হয়ে উঠেছিলো। দখল করে নিয়েছিল গোটা একটা শহর। সেই পাখিগুলোর মতো এই কাকগুলোর মতিগতিও ভালো ঠেকছে না। যে কোনো সময় যে কোনো কিছু করে বসতে পারে।

এবং তাই করলো। আমাকে লক্ষ্য করে সবাই মিলে ইয়ে বৃষ্টি শুরু করলো। আমি একদম  নাস্তানাবুদ হয়ে গেলাম। উপায়ান্তর না দেখে শেষে ভোঁ দৌড় দিলাম বাসার উদ্দেশ্যে।

বাসার দারোয়ান আজগর আমাকে চিনতে পারলো না। বলল, ‘এই মিয়া দাঁড়ান। আপনার পরিচয় কি?’
আমি ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললাম, ‘পরিচয় পাবে। আগে সালাম দাও।’
সে ভরকে গিয়ে পা ঠুকে বিশাল সালাম দিয়ে বসলো।
কিন্তু কাকের বিষ্ঠাতে আমার পুরো দেহ আবৃত, সে কোনোভাবেই আমাকে চিনতে পারল না। সুতরাং আজগরকে আমার কণ্ঠ চেনানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু হাঁদারাম আজগর আমার কণ্ঠও চিনতে পারল না। আবশেষে একটা বুদ্ধি বের করলাম। তার দিকে তাকিয়ে হাসির অভিনয় বললাম। যাতে আমার দাঁত দেখে অন্তত চিনতে পারে। কিন্তু আজগর বুঝলো উল্টো। বললো, ‘না, দাঁতে ভরেনাই। দাঁত ঠিক আছে।’
আমি বললাম, ‘আরে বেকুব আমি সাদমান কবির। আমার হাসি দেখে চেনো না?’

আজগর সঙ্গে সঙ্গে আমাকে চিনতে পেরে লজ্জিত ভঙ্গিতে আরেকটা লম্বা স্যালুট দিলো। বললো, ‘কোন পাখিতে আপনার এ অবস্থা করেছে স্যার?’
আজগরের ভাবখানা এমন, যেন নাম শোনামাত্র সে পাখিটাকে ধরে নিয়ে আসবে। পাখিটাকে বাধ্য করবে আমার কাছে মাফ চাইতে।
কিন্তু আমি আজগরের অতি আগ্রহভাবটা গায়ে না মেখে বললাম, ‘পাতি কাক।’ ছোট্ট জবাব দিয়ে আমি আমার ফ্ল্যাটে চলে গেলাম। মাথা ধুয়ে পরিস্কার করলাম। পুরোপুরি ফ্রেশ হতে প্রায় মিনিট বিশেক লেগে গেলো।

হঠাৎ অসংখ্য কাকের কা কা শব্দ ভেসে এলো। যেন সব কাক মিলে মিছিল- মিটিং করছে। সচকিত হয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে যা দেখলাম, তাতে আমার নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো।   

আলমগীর সাহেব অফিস থেকে ফিরছিলেন। পরনে শাদা শার্ট, কালো প্যান্ট ও লাল টাই। তিনি আমাদের বিল্ডিং-এর চারতলার বাসিন্দা। কাকেরা তাকে দেখে ভাবলো, সে আমি-ই। একযোগে সবাই তাকে লক্ষ্য করে ইয়ে ত্যাগ করতে লাগলো। আমি জিভে কামড় দিয়ে জানালার পর্দা নামিয়ে দিলাম। কিঞ্চিৎ ভয়ও পেলাম। মনে মনে কাকদের বললাম, তোমরা আলমগীর সাহেবকে শাস্তি দিচ্ছো কেন? তিনি তো নির্দোষ।

কিন্তু তাতে কোনো কাজ হলো না। তার শরীরে বৃষ্টিফোঁটার মতো মুহুর্মুহু কাকদের বিষ্ঠা পড়তে লাগলো।

কলিংবেল বেজে উঠলো। দরজা খুলবো কি খুলবো না ভাবতে লাগলাম। ভাবতে ভাবতে আরও একবার কলিংবেল বাজলো। ভয়ে ভয়ে দরজা খুলতেই দেখতে পেলাম হাস্যরত আজগরকে। সে হাসি চেপে রাখতে পারছে না। দু’ঠোঁটের কোণা দিয়ে যেন উপচে পড়ছে হাসির ধারা। আমার দিকে সে এমনভাবে তাকালো, যেন সে আমার বাল্যকালের বন্ধু। হাসতে হাসতে বললো, ‘স্যার, অল্পের লিগা আমি বাঁইচা গেছি।’

আমি কিছুই জানি না এমন ভঙ্গি করে বললাম, ‘কেন, কী হয়েছে? তুমি মরতে গেছিলে কেন?’

আজগর বললো, ‘স্যার মরতে- টরতে যাইনি। ঘটনা অন্যরকম। পাতিকাকে আলমগীর স্যারের অবস্থা কাহিল করে দিছে। তার অবস্থা আপনার চাইতেও খারাপ। আমি দৌড়ে ভাইগা বাঁচছি। আর একটু হলে আমাকেও কাহিল করে দিতো।’

আমি বললাম, ‘ও আচ্ছা। কিন্তু কালা সাহেব কী করেছিলেন, জানো তুমি?’

‘আপনি যা করেছিলেন কালা স্যার নিশ্চয়ই তাই করেছিলেন।’ কথাটা বলেই সে ফিক করে হেসে ফেললো, ‘স্যার, আপনি কি করেছিলেন?’

আমার বিরক্তি ধরে গেলো। বললাম, ‘তুমি এখন যাও তো আজগর।’

‘কেমনে যাই স্যার। আমার ভয় করছে। মনে হচ্ছে নিচে যাওয়ামাত্র কাকেরা আমাকে পেয়ে উৎসব শুরু করবে। আমি খুব বিপদে পড়ে যাব স্যার।’

ঘটনা সত্যি। মনে মনে বললাম কথাটা। কিন্তু প্রকাশ্যে বললাম, ‘তারপরও তুমি যাও। কর্তব্যে অবহেলা করা ঠিক নয়। ’
‘ওকে স্যার যাচ্ছি।’  

কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই আজগর মিয়া আবার ফিরে এলো। এবার সে আরো বেশি আনন্দিত। হাসি ধরে রাখতে পারছে না। আমি কিঞ্চিৎ ধমকের স্বরে বললাম, ‘অ্যাই মিয়া! মাথা খারাপ হলো নাকি তোমার?’

আমার ধমকে কাজ হলো। কিন্তু হাসি থামিয়ে সে যা বললো তাতে আমারও হাসি পেলো।

আলমগীর সাহেব পাতিকাকের ইয়ে সমেত বাসায় গিয়ে কলিংবেল বাজিয়েছেন। তার মেয়ে লিপিকা দরজা খুলেই ভূত ভূত বলে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। তারপর এসেছে তার স্ত্রী, মানে আমাদের মরিয়ম ভাবী। ভাবীরও একই দশা হয়েছে। আলমগীর সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন দরজার সামনে। চিন্তা করছেন কীভাবে বাসায় ঢোকা যায়। পাশের ফ্ল্যাটের কলিংবেলে চাপ দিয়েছেন। দরজা খুলেছে রহিমার মা। এক পলক দেখে মনে করেছে ভিক্ষুক। বলেছে, ‘মাফ করেন!’

অবশেষে তিনি আজগরের সহায়তায় নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকতে পেরেছেন।

আজগরের কাছ থেকে আলমগীর সাহেবের ঘটনা সবিস্তারে শুনছি, ঠিক তখনই কয়েকটি কাক আমার বারান্দার গ্রিলে এসে আছড়ে পড়লো। ভয় পেয়ে হাউমাউ করে উঠতেই আমার তন্দ্রাভাব কেটে গেল। আমি উঠে পড়লাম। শরীরে চিমটি কাটলাম। বুঝলাম ঘটনাটা ছিলো নিছকই স্বপ্ন। স্বপ্ন জগতে আমার উপর কাকেরা ইয়ে করলেও বাস্তবে আমি বহাল তবিয়তেই আছি। বেশ আহ্লাদিত বোধ করলাম, কারণ- পুরীষ-উৎসবের ঘটনাটি তো আর বাস্তব নয়!