বর্ণান্ধ

মারিয়া হোসেন

হাসান সাহেবের বাড়িতে আজ উৎসব। সবাই খুব খুশি আজ। কারণ আজ সকালে হাসান সাহেবের ছেলে হয়েছে। অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে ফুটফুটে বাবুটির নাম রাখা হলো সায়েম হাসান।

আকিকায় সে এক এলাহি কাণ্ড। উপহারের ডালায় বাসা ভরে গেলো। সবার আদরে আর যত্নে দিন দিন বেড়ে উঠতে লাগলো সায়েম। টোল পড়া হাসি আর আধো আধো বুলিতে সে সবার মন ভরিয়ে দেয়। এমনি করে পেরিয়ে যায় দুটি বছর।

সুখের জীবনটাতে কে যেন একটু দুখপাথরের ছোঁয়া দিয়ে দেয়। সায়েম প্রায়ই হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। কারণ খুঁজতে গিয়ে ডাক্তারি রিপোর্টে আসে, সায়েম অন্ধ। কিন্তু সায়েম তো সবই দেখতে পায়। তাহলে এটা কেমন ধরনের অন্ধ? সে বর্ণান্ধ। কিছু বর্ণের, মানে রঙের পার্থক্য তার চোখে ধরা পড়ে না। রঙ থেকে আলো তার চোখে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় না। আর সে কারণেই হালকা রঙের জিনিস সে দেখতে পায় না, ধাক্কা খেয়ে পরে যায়। বর্ণান্ধরা সাধারণত লাল, সবুজ আর বেগুনি রঙের পার্থক্য বুঝতে পারে না।

কিন্তু সায়েমের নিষ্পাপ চেহারা আর মায়াবী হাসি মা বাবার মনে আনন্দ জিইয়ে রাখে। চিকিৎসা শুরু হয় সায়েমের। বিত্তশালী বাবা বিদেশে নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্তও করতে থাকেন। বর্ণান্ধতা না ঘুচলেও পাঁচ বছর পেরুলে সায়েমের লেখাপড়ায় হাতেখড়ি হয়। লেখাপড়ায় উৎসাহের কমতি নেই ওর। টুকটাক পড়ালেখা চলতে থাকে নিজস্ব গতিতে। আর তার প্রতিভাও দিন দিন প্রকাশ পেতে শুরু করে। নানা অভিনব প্রশ্নে সে বড়দেরও মাঝেমাঝেই বিপদে ফেলে দেয়। মা বাবার দুশ্চিন্তাও কিছুটা কমে এই ভেবে যে, আমাদের ছেলেটা মেধাবী। আর সেই সাথে চিকিৎসাও চলতে থাকে।

কদিন ধরেই সায়েম খেয়াল করছে যে, বাবা আর আগের মত অফিসে যায় না। গেলেও খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসে। সপ্তাহের বেশিরভাগ সময়ই বাসায় থাকে আর চিন্তিত চেহারায় বাড়ির ভেতর পায়চারি করে। রাতের বেলা বসে বসে রেডিও শোনে। অনেকেই আসে রেডিও শুনতে। কী হয়েছে ভেবে পায় না সায়েম। মা-বাবা কারো কাছেই কোনো উত্তর নেই। ‘কিছু না বাবা, তুমি বুঝবে না’ এই বলে তাকে সবাই নিরাশ করে।

সবাই ভীত- সন্ত্রস্ত হয়ে চলাফেরা করে। সবার চেহারায় দুশ্চিন্তা আর আতঙ্ক। বাবা বাড়ির বাইরে খুব কম যায়। চারপাশের পরিবেশটা কেমন যেন গুমোট হয়ে থাকে। রাস্তায় তেমন গাড়িঘোড়াও নেই। তার খেলার সাথী আরিফ, অয়ন, মঞ্জুকে ওদের মা বাবা বেরুতে দেয় না। তাকে তো নয়ই। সবার কথাবার্তায় সে ধরে নেয়, ভয়ংকর কিছু ঘটছে। একদিন পাশের বাসার এক আপু তাকে বলে যে, দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কিন্তু ছয় বছরের সায়েমের কাছে যুদ্ধ শব্দটির অর্থ পরিষ্কার না।

কিছুদিন পর রাতের বেলা তাদের বাসায় একটি ছেলে আসে। প্রথমে সায়েম তাকে চিনতে পারে না। পরে চিনতে পারে, তার চাচাতো ভাই কাদের। কাদের ভাই দাড়ি রেখে মুখ ভরিয়ে ফেলেছে, মাথায় তরকারির ঝুড়ি। বাবা তার সাথে নিচুস্বরে কথা বলতে থাকে। কাদের ভাইকে খেতে দিয়ে মা রান্নাঘরে যায় আর বাবা ভেতরের রুমে গিয়ে কী যেন বের করতে থাকে।

একা পেয়ে সে কাদের ভাইকে জিজ্ঞাসা করে, ‘ভাইয়া, তুমি তরকারির ঝুড়ি নিয়ে এসেছো কেনো?’  কাদের ভাই বলে, ‘এর ভেতর স্টেনগান আছে, রাস্তায় মানুষ দেখলে সমস্যা হবে। তাই তরকারির নিচে লুকিয়ে এনেছি যাতে সবাই মনে করে আমি তরকারি বিক্রি করি।’
সায়েম প্রশ্ন করে, ‘স্টেনগান? এটা আবার কী?’
- ‘বন্দুক, এটা দিয়ে গুলি করে।’
- ‘কাকে গুলি করে?’
- ‘মানুষকে, পাকিস্তানি হানাদারদের।’
- ‘তুমি করো?’
- ‘হুম, আমি করি।’
- ‘কেন করো? গুলি করলে ওরা মারা যায় না?’
- ‘ওদেরকে মারার জন্যই তো গুলি করি।’
- ‘কেন? তুমি ওদেরকে মারতে চাও কেন?’
- ‘কারণ ওরা আমাদেরকে স্বাধীনভাবে বাঁচতে দিতে চায় না। ওরা আমাদের দেশটাকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায়।‘
- ‘পূর্ব পাকিস্তানকে?’
- ‘পূর্ব পাকিস্তান না, বলো বাংলাদেশকে।‘
- ‘কেন বাংলাদেশ বলবো কেন?’
- ‘কারণ আমরা যে দেশের জন্য যুদ্ধ করছি, সে দেশের নাম হবে বাংলাদেশ। পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হবে।‘
- ‘বাংলাদেশ নামটা কে দিয়েছে?’
- ‘বঙ্গবন্ধু।’
- ‘বঙ্গবন্ধু কে?’
- ‘শেখ মুজিবুর রহমান।’
- ‘ও,’
- ‘তুমি পূর্ব পাকিস্তানের পতাকা দেখেছো না?’

- ‘হু, আমার বইয়ে আছে। সাদা আর কালো কিন্তু বাবা বলে সেটা সাদা আর সবুজ। আমি তো সবুজ রঙ দেখিনা। মাঝখানে চাঁদ-তারা।’
- ‘বাহ। কিন্তু স্বাধীন বাংলার পতাকা দেখেছো?’
- ‘নাতো, তোমার কাছে আছে? আমাকে দেখাবে?’
- ‘হুম, আছে।‘
এই বলে কাদের ভাই গেঞ্জির ভেতর থেকে লাল-সবুজের পতাকাটি বের করে দেয়। চারকোনা সবুজের মাঝে লাল বৃত্তে হলুদ রঙ দিয়ে কি যেন একটা আঁকা। সায়েম জিজ্ঞাসা করে, ‘ভাইয়া হলুদ এটা কী?’
কাদের ভাই বলে, ‘এটা বাংলাদেশের মানচিত্র।’
- ‘বাবাকে একটু দেখিয়ে আনি?’ এই বলে সায়েম আর উত্তরের অপেক্ষি না করে দৌড়িয়ে ভেতরে চলে যায়। বাবা ট্রাঙ্ক থেকে কী যেন বের করে গোছাচ্ছিলেন। সায়েম তার কাছে গিয়ে বলে, ‘বাবা, দেখো, পতাকাটা কী সুন্দর না?’

- ‘এটা তুই কোথায় পেলি?’
- ‘কাদের ভাইয়ার কাছে।’
- ‘হুম, সুন্দর।’ বলে বাবা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
পতাকাটির দিকে তাকিয়ে সায়েম আনমনে বলতে থাকে, ‘লাল, সবুজ আর হলুদ, কী সুন্দর তিনটি রঙের একটি পতাকা।’
বাবা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেন না, ‘কোন তিনটি রঙ?’
- ‘কেন, এই যে দেখছো না, লাল, সবুজ আর হলুদ।’
- ‘সায়েম, তুই লাল আর সবুজ রঙ দেখতে পারিস?’
- ‘হ্যাঁ বাবা, মাত্র দেখতে পেলাম।স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকায় দেখতে পেলাম।’
খুশিতে বাবার চোখের কোণে চিকচিক করলো কয়েক ফোঁটা অশ্রু। এ অশ্রু আনন্দের, বাঁধভাঙা আনন্দের। চিৎকার করে মাকে ডাকলো সায়েম। ‘মা, দেখে যাও, স্বাধীন বাংলার পতাকা দেখে যাও।’

কে জানে, হয়তো এই পতাকায় দেখবে বলেই সায়েম এতদিন লাল-সবুজ রঙ দেখেনি।