ভাষা

জাহিদুল আলম

জামাল সাহেবের স্ত্রীর নাম অহনা। খুব মিশুক। চমৎকার করে কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর অনেকদিন দেশের বাইরে ছিলেন। তাই তার বিদেশী বন্ধু-বান্ধবও অনেক।

এমনই একজন বিদেশি বান্ধবী এক ছুটির দিন সকালে হঠাৎ করে অহনাদের বাসায় চলে এলেন। ছুটির দিন, অফিস বন্ধ থাকায় জামাল সাহেব বাসায় বসে পত্রিকা পড়ছিলেন।

হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ। জামাল সাহেব উঠে দরজা খুলে দেখেন বিদেশি এক মহিলা দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। জামাল সাহেব প্রথমটায়  অবাক হলেন, কিছু বলতে পারলেন না। বিদেশি মহিলাই খুব সহজ ভঙ্গিতে বললেন, এক্সকিউজ মি, আই অ্যাম লুকিং ফর অহনা। ইজ ইট হার হোম? (আমি অহনাকে খুঁজছিলাম, এটা কি তার বাসা?)

জামাল সাহেব ইংরেজি খুব একটা বোঝেন না। কিন্তু মহিলার এই কথাগুলো উনি বুঝতে পারলেন। ভাঙ্গাভাঙ্গা ইংরেজিতে বললেন, ইয়েস, আই এম হাজবেন্ড, হার হাজবেন্ড। শি ইজ অ্যাট হোম।

বিদেশী মহিলা প্রথমে উচ্চারণটা বুঝতে পারলেন না। কিন্তু জামাল সাহেবের অঙ্গভঙ্গী আর হাত নাড়াতে বুঝতে পারলেন, উনি বোধহয় ঠিক জায়গাতেই এসেছেন। মহিলাকে সোফায় বসিয়ে উনি ভেতরে যান অহনাকে খবর দিতে। অহনা ঢুকতেই মহিলা ওকে জড়িয়ে ধরলেন। হাউমাউ করে আবেগের বশে অনেক কথা বললেন। (কথাগুলো এখানে বাংলায় বলা হলো)

আরে মেরি! কেমন আছো? আমাকে তো তুমি অবাক করে দিলে। কোনো খবর না দিয়েই হুট করে!

মেরি বললেন, ই-মেইলে তোমার ঠিকানা নিয়েছিলাম মনে আছে? অফিসের একটা কাজে ঢাকা এলাম। ভাবলাম তোমাকে চমকে দেই। ইস, কতোদিন পরে দেখা!

মেরির পাশে তার ছোট্ট ফুটফুটে ছেলে। বয়স অহনার মেয়ের মতোই হবে। তিন কি চার বছর। চমৎকার রঙের একটা জ্যাকেট পরে আছে। চুলগুলো বাদামী; মার্বেলের মতো ছোট নীল চোখ।

অহনা বললেন, মেরি এটা তোমার বাচ্চা?

হ্যাঁ, আমার ছেলে।

অহনা কাছে গিয়ে বাচ্চার মাথায় হাত বুলালেন। আদর করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কেন জানি বাচ্চাটা এতে খুব বিরক্ত হলো। মাম্মি মাম্মি করে চিৎকার করে উঠলো। মা’র কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে কি যেন বলতে বলতে ভয়ে ভয়ে ঘরের চারপাশে তাকাতে লাগলো। মেরি বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ডোন্ট ওরি হানি, ইটস ইওর হোম। বাচ্চাটা এই কথাতে খুব একটা ভরসা পেলো বলে মনে হলো না। মুখ বাঁকিয়ে বসে রইলো।

অহনা বললেন, কোনো সমস্যা?

মেরি হেসে বললেন, না না, কোনো সমস্যা নয়। নতুন জায়গাতো, তাই। মেরি বললেন, আচ্ছা অহনা তোমার মেয়ে কোথায়?

অহনা বললেন, মেয়ে ভেতরের ঘরে খেলা করছে।

মেরি উৎসুক হয়ে বললেন, চলো দেখে আসি।

হুম, চলো। বাচ্চা মেয়েটিকে দেখে মেরি যতোটা খুশি হলো, তার চেয়ে তিনগুণ খুশি হলো মাইকেল। মাইকেলের সব রকমের ভয় আর জড়তা সঙ্গে সঙ্গে কেটে গেলো। ও মেয়েটির পাশে গিয়ে বসলো।

অহনা বললেন, ওর নাম তিতলি, এই বছরেই স্কুলে ভর্তি হয়েছে। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অহনা আরও বললেন, মেরি জানো, আমার মেয়ে না দারুণ ছবি আঁকে। মেরি খুব উৎসুক হয়ে বললেন, ও তাই বুঝি, দারুণ ব্যাপার তো! কই দেখি দেখি।

অহনা মেয়েকে বললেন, তিতলি উঠে গিয়ে ড্রয়িংয়ের খাতা বের করে ওর মায়ের হাতে দিলো। অহনা বললেন, আমাকে নয় তোমার আন্টিকে দেখাও। তিতলি আড়চোখে বিদেশী মহিলার দিকে তাকালো, তারপর ধীরে ধীরে খাতাটা বাড়িয়ে দিলো। মেরি খাতাটা উল্টেই সুন্দর সুন্দর বলতে লাগলেন।

মাইকেলও ওর মায়ের পাশে বসে চোখ বড় বড় করে ড্রয়িং খাতাটার দিকে তাকিয়ে রইলো। দেখা শেষ হলে মেরি খাতাটা তিতলির হাতে দিলো। মাইকেল তখন ওর মায়ের পাশ থেকে সরে এসে খাতাটার লোভে আবার তিতলির পাশে গিয়ে বসলো। মাইকেল আকার ইংগিতে তিতলিকে কি যেন বললো। তিতলিও হয়তো বুঝতে পারলো। খাতাটা খুলে আবার প্রথম থেকে পাতা উল্টোতে লাগলো। দুজনে খুব মজা করে ছবি দেখতে লাগলো।

অহনা তার বান্ধবীকে নিয়ে আবার ড্রয়িং রুমে এসে বললেন। জামাল সাহেব টিভি দেখছিলেন।

মেরিই প্রথমে কথা বললেন। টিভির দিকে তাকিয়ে বললেন, হোয়াট কাইন্ড অব প্রোগাম ইট ইজ? (কি ধরনের অনুষ্ঠান এটা?) জামাল সাহেব বুঝলেন। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে বললেন, ইট ইজ এ ডিসকাশন প্রোগাম। দে আর ডিসকাসিং এবাউট আওয়ার প্রব্লেমস। (এটা একটা আলোচনা অনুষ্ঠান। তারা আমাদের সমস্যা নিয়ে কথা বলছেন।)

মেরি বললেন, ওয়াও! কুল। (চমৎকার)

জামাল সাহেব কথাটা এবার অন্যভাবে বুঝলেন। বললেন, নো নো ভেরি হট। নাউ ইজ সামার। নো ইলেক্ট্রিসিটি। ভেরি ভেরি হট ওয়েদার। দে আর টকিং আবাউট দিস। (না না গরম। এখন গ্রীষ্মকাল। বিদ্যুৎ নেই। গরম আবহাওয়া। তারা এসব নিয়েই আলোচনা করছেন)

এবার মেরি কিছু বুঝলেন না। তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। জামাল সাহেবও তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর জামাল সাহেবও কি যেন জিজ্ঞাসা করলেন, কিন্তু মেরি তা বুঝতে পারলেন না। জামাল সাহেব আবারো কথাটা বললেন। মেরি এবার অল্প অল্প বুঝলেন। কিন্তু যা উত্তর দিলেন, তা আবার জামাল সাহেব বুঝলেন না। মহা সমস্যা, এভাবে খুব একটা চালানো যায় না।

কিছুক্ষণ পর মেরি উঠে দাঁড়ালেন। বললেন যে ওকে এখন যেতে হবে। মেরি মাইকেলের নাম ধরে ডাকতে লাগলেন। কিন্তু মাইকেলের কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না।

তিতলির ঘরে গিয়ে দেখেন ওরা তখন সেখানে নেই। ঘর ফাঁকা। ড্রয়িংয়ের খাতা, রং পেন্সিল আর বিভিন্ন খেলনা এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। অহনা সঙ্গে সঙ্গে ছাদে চলে গেলেন। পিছু পিছু মেরি আর জলিল সাহেব।

গিয়ে দেখা গেল, মাইকেল আর তিতলি ছাদের বাগানে প্রজাপতি উড়িয়ে বেড়াচ্ছে। চমৎকার রঙের সব ফুল ফুটেছে বাগানে। সে ফুলের উপর খেলা করছে বাহারি রঙয়ের প্রজাপতি। একটা প্রজাপতি ফুলের উপর বসে, তিতলি চুপ করে পেছনে গিয়ে ফুঁ দেয়। প্রজাপতিটা বাহারি ডানা মেলে উড়াল দেয়। আবার আরেকটা বসে। মাইকেলও তিতলির দেখাদেখি একই কাজ করে। ব্যাপারটাতে অনেক মজা পেয়ে গেছে মাইকেল।

মেরি বললেন, মাইকেল চলো যেতে হবে। মাইকেল যেন কোন কথাই শুনতেই পেলো না। বাতাসে মুখ ফুলিয়ে আরেকটা প্রজাপতির পিছু পিছু ধাওয়া করতে লাগলো। মেরি আবারো ডাকলেন। মাইকেল এবার বললো, ওয়ান মিনিট মাম্মি। কিছুক্ষণ পরে মাইকেল বেশ মন খারাপ করে ওর মায়ের পাশে এসে দাঁড়ালো। আসার আগে তিতলিকে জড়িয়ে ধরে কি যেন বললো।

বাসা থেকে ঠিক বের হবার সময় মেরি জামাল সাহেবকে বললেন, ধন্যবাদ মি. জামাল। ঠিক ভদ্রতার খাতিরে যতোটুকু বলা দরকার। জামাল সাহেবও বললেন, ইয়েস, থ্যাংক ইউ।

মহিলা চলে যাবার পর জামাল সাহেবের মুখে বেশ বিরক্তির একটা ভাব ফুটে উঠলো। অহনা তা লক্ষ্য করলেন। হয়তো কারণটাও ধরতে পারলেন। কারণ ভাষাগত সমস্যা। বিভিন্ন কথায়, জামাল সাহেব মেরিকে কিছু জিজ্ঞাসা করলে তার উত্তর তিনি বুঝতে পারেন নি। ঠিক একই ব্যাপার ঘটেছে মেরির ক্ষেত্রেও।

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর জামাল সাহেব স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা আমাদের মেয়েতো ইংরেজি জানে না। তো ওরা এতোক্ষণ থাকলো কিভাবে, কথা বললো কিভাবে? একে অন্যের কথা বুঝলো কিভাবে?

স্বামীর এই কথায় অহনার খুব হাসি পেলো। বললেন, কি যে বলো না তুমি! বাচ্চাদের আবার ভাষা কি! ওদের কি আলাদা কোনো ভাষা আছে! সব বাচ্চার ভাষাতো একই।

ও তাই বুঝি? এই বলে জামাল সাহেব আবার চুপ করে যান।