অপু আর তপু

আশরাফুল আলম পিন্টু

ওরা দুই ভাই।
অপু আর তপু।
অপু বড়। তপু ছোট।
গলির শেষ মাথার বাড়িটা ওদের। সাজানো গোছানো বাড়ি। চমৎকার বাড়ির সামনে ছোট বাগান। ঘাসের মাঠ। নরম নরম ঘাস। শহর হলেও শান্ত গলি। সব বাড়িতেই গাছপালা। ফলের গাছ। ফুলের গাছ। আম। কাঁঠাল। নারিকেল। গোলাপ। হাসনুহেনা। পাতাবাহার। আরো কত কী! কত পাখির আনাগোনা। ডাকাডাকি।

আনন্দে দিন কাটে অপু আর তপুর। হেসেখেলে কাটিয়ে দেয় সারাবেলা।

কখনো খেলে বাড়ির বাগানে। কখনো বারান্দায়। কখনো ঘরে। অনেক খেলনা ওদের। কখনো চলে যায় খালার বাড়ি। গলি পেরুলে বড় রাস্তা। সেই রাস্তায় রাজ্যের ভিড়। বাস। মিনিবাস। রিকশা। সাইকেল।
বড় রাস্তার ওপারে একটা গলি। সেই গলি ধরে গেলে তেমাথা। তেমাথার ডানদিকের গলিতে খালার বাড়ি। খালাবাড়ি মানে দেদার মজা।

আনন্দে দিন কাটে ওদের। কিন্তু অপুর একটা দুঃখ আছে। ভীষণ দুঃখ। মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়ে যায়।

Opu_topu_1দুঃখটা হল তপুকে নিয়ে। তপু ওর কাছে একটা সাক্ষাৎ সমস্যা। বিরক্তিকর। অপু ভাবে- আরে, তুই হচ্ছিস ছোট। আমার ছোটভাই। ছোটর মতো থাকবি। আমি বড়ভাই। একটু মান্যিগণ্যি করবি। তা নয় শুধু বেয়াদবি। আদব-কায়দার ধার ধারবি না! তাহলে আর কীসের ছোটভাই তুই!

অপু কী করবে ভেবে পায় না।
তপুকে নিয়ে খুব সমস্যায় থাকে অপু। একটা না একটা সমস্যা বাঁধাবেই বাঁধাবে।

Opu_topu_2অপুর একটা ছোট সাইকেল আছে। তপু পারে না তবু সাইকেল চালাতে চায়। চালানো শিখতে চায়। বায়না ধরে। কাঁদে।
অপু বলে, তুই ছোট। চালাতে পারবি না তো!
তাহলে তুমি চালাও। আমাকে নিয়ে চালাও।
চড় খাবি কিন্তু।
অপুর কথা শেষ না হতেই ভ্যাঁ। তপুর কান্না শুনে মা ছুটে আসেন। কী রে, কী হয়েছে।
তপু নালিশ জানায়।

মা বলেন, অপু, তুই বড়ভাই। ওকে নিয়ে সাইকেল চালালে কী হয়! যা, একটু চড়িয়ে নিয়ে আয়।
রাগ জমে অপুর। করার কিছু নেই। তপু ততক্ষণে চড়ে বসেছে সাইকেলের সামনের রডে। ওকে নিয়ে বেরুতেই হয়। গলিপথে অনিচ্ছায় সাইকেল চালায়।

শুধু কি সাইকেল চড়া। অপু যেখানে যাবে পিছু নেবে তপু। পিছু পিছু যাবে সেখানেই। লুকিয়ে যাওয়ারও উপায় নেই। ঠিকই পিছু নেবে। এমনই নাছোড় একটা।
বিকেলে অপু ফুটবল নিয়ে বেরুলে পেছনে তপু। বন্ধুদের সঙ্গে অপু ফুটবল খেলে। মাঠে নেমে পড়ে তপুও। ছুটে গিয়ে ফুটবল ধরে। লাথি মারতে পারে না। খালি খালি ছুটোছুটি। পড়ে গিয়ে কাঁদে। ভন্ডুল হয় খেলা।

Opu_topu_3 বাবা তপুকেও একটা বল কিনে দিয়েছেন। ছোট বল। সেটা ধরবে না। অপুর ফুটবলটা নিয়েই কাড়াকাড়ি।
কী যে সমস্যা! কী যে বিপদ!
অপু যা করবে, তপুরও তা করা চাই।
অপু যেভাবে হাঁটে- সেভাবে হাঁটবে তপু।
অপু যেটা খেলবে- সেটাই খেলবে তপু।
অপু যেভাবে কথা বলে- সেভাবে কথা বলার চেষ্টা করবে তপু।
অপু যেটা খাবে- সেটাই খাবে তপু।

মোটকথা অপুর সব কিছু নকল করে তপু। বড়ভাই যা করে, ছোটভাইও সেটাই করে। পারুক আর না পারুক। বড়ভাইকে তার অনুকরণ করা চা-ই চাই।
তপুকে নিয়ে তাই মহাঝামেলায় আছে অপু।
ঠিকমতো খেলতে পারে না বন্ধুদের সঙ্গে।
শান্তিমতো কোথাও যেতে পারে না। বেড়াতে পারে না প্রাণখুলে। খেতে পারে না মন ভরে। কথা বলতে পারে না। হাসতেও পারে না।
ছোটভাইকে তাই ওর মোটেও পছন্দ নয়।
পছন্দ হবে কী করে! এভাবে পিছু লেগে থাকলে কাহাতক সহ্য হয়! নাকি ভালো লাগে? মন ভার হয়ে থাকে অপুর। মাঝে মাঝে রেগেও যায়। বকাঝকা করে।

Opu_topu_4 আমি যা করি তুই তা করিস কেন?
আমার ভালো লাগে।
ভালো লাগলেও অমন করবি না। বুঝলি! ধমক দেয় অপু।
আমার ইচ্ছে। নিলাজের মতো জবাব দেয় তপু।
আমাকে নকল করতে তোর লজ্জা করে না?
না। করে না।
আমি যা করি- তুই তা-ই করিস। তুই তো একটা নকলবাজ।
মোটেও না। আমিও তোমার মতোই। বড় হয়ে তোমার মতো হব।
বাজে বকবি না। এখন থেকে আমার পিছু নিবি না আর। সব কিছু তোর নিজের মতো করবি।

অপুর কথায় কোনো কাজ হয় না। বড়ভাইকে পাত্তাই দেয় না তপু। চালচলন তার আগের মতোই। অপুর পিছু নেয়। অপুর সব কাজ নকল করে। অপু ছবি আঁকতে বসলে তপুও বসে পড়ে পাশে। কাগজ আর রংতুলি টানাটানি করে। পাতা জুড়ে কী সব আঁকে। হিজিবিজি। অপুর মতো পারে না। তবু আঁকে। অপুর মতো হতে চায়। সবার নজর কাড়তে চায় তপু। অপুর মনের দুঃখ বুঝতে চায় না। রেগে মারতে গেলে মা তেড়ে আসেন। বলেন, তোরই তো ছোটভাই।
বাবা বলেন, মিলেমিশে থাকলেই তো ঝামেলা হয় না।

Opu_topu_5.jpg বাবা-মাকে বোঝাতে পারে না অপু। তারা ওর সমস্যাটা বুঝতে চান না। সব দোষ যেন ওরই। শুধু মা-বাবাই নন- সবাই কেবল তপুর দিকটা দেখেন। ছোট বলে সবাই কদর করে ওরই। বড়ভাই হয়ে অপু যেন অন্যায় করে ফেলেছে। মহা অন্যায়। অপুর দিকে কেউ নজর দেয় না।

এই যে অপু অত চমৎকার গান গাইতে পারে। হারমোনিয়াম বাজাতে পারে। সবাই তা জানেও। কিন্তু ক’জন ওর গানের তারিফ করে!  অথচ দেখো, তপু গান গাইতে পারে না, খালি খালি হারমোনিয়ামের রিড চেপে বেসুরো গায়। তা দেখে সবার কেমন আনন্দ। তপুকে ঘিরে বাজানো দেখে। গান শোনে মজা করে। হাসে। আবার হাততালিও দেয়। বাহ্বা দিয়ে বলে ওঠে, চমৎকার! চমৎকার!

চমৎকার না ছাই! মনে মনে গজর গজর করে অপু। আমাকে নকল করা হচ্ছে! আবার বাহ্বাও পাচ্ছে পুরোটা। যেন দুনিয়ার সেরা গায়ক!

অপুর দুঃখ কী একটা দুটো! অনেক।   অনেক।

Opu_topu_6.jpg সব অপুর কপাল। মন্দ কপাল, নচ্ছার ছোটভাইটা ওকে জ্বালিয়ে মারছে। জীবনটা ভাজা ভাজা হয়ে যাচ্ছে। তপুকে ছেড়ে সে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে পারে না। খালার বাড়িতে যেতে পারে না একা। তপু পিছু নেবেই। কোনো দিন একা যেতে চাইলে তপু কান্না জুড়ে দেয়। সে কী কান্না!
চিৎকার করে ডাকে, ভাইয়া, দাঁড়াও-   দাঁড়াও। আমাকে নিয়ে যাও। আমিও যাব। দাঁড়াও। দাঁড়াও।

না দাঁড়িয়ে উপায় নেই অপুর। না দাঁড়ালে মা ডেকে থামান। থমথমে গলায় বলেন, অপু, ওকে নিয়ে যা। ছোটভাইটা কাঁদছে। আর তুই ঢ্যাঙ ঢ্যাঙ করে চললি খালাবাড়ি। দিন দিন স্বার্থপর হচ্ছিস দেখছি!

কী আর করবে অপু! দাঁড়াতে হয় তপুর জন্যে। তপু সেজেগুজে আসে। নিয়ে যেতে হয় খালার বাড়িতে। রাগে গা জ্বলতে থাকে অপুর। সেই রাগ থাকে সারাদিন। কিন্তু ওর রাগ যেন কোনো ব্যাপারই নয় তপুর কাছে। বড়ভাইকে অনুকরণ ওর থেমে থাকে না।

একদিন খালার বাড়ি যাচ্ছিল অপু। যথারীতি ওর পিছু নিয়েছে তপু। পিছু পিছু সেও হাঁটছিল। রাগে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল অপু।

থামো। থামো। আসে- হাঁটো। অত জোরে হাঁটছ কেন? পেছন থেকে ডাকল তপু। ওর ডাকে অপু থামল না। পিছু ফিরে দেখলও না।

দাঁড়াও না! আমি জোরে হাঁটতে পারছি না। পিছিয়ে পড়ছি। দাঁড়াও। দাঁড়াও। আবার চিৎকার করল তপু।

অপু দাঁড়াল না। হনহন করে হেঁটে চলল গলিপথ ধরে। বড় রাস্তাও পার হয়ে গেল ঢুকে। পড়ল খালাবাড়ির গলিপথে। কিছুদূর  যাওয়ার পর পিছু ফিরল। দেখল, তপু নেই। পিছিয়ে পড়েছে নিশ্চয়। ব্যস্ত রাস্তা। একা পার হতে পারবে কি? পথ হারিয়ে যায় নি তো? চিন্তা করল অপু। ছোটভাই হারিয়ে যাক তা চায় নি। জব্দ করার জন্য একটু জোরে হেঁটেছে এই যা! তাতে পথ হারানোর কথা নয়। বাড়ি ফিরে যাওয়ার ছেলেও নয় তপু। তাহলে!

ওর জন্য পাগল হয়ে যাব! মনে মনে ভাবল অপু। থামল না। তবে হাঁটার গতি কমিয়ে দিল। ভাবল, তপু ঠিকই ধরে ফেলবে ওকে। ঠিকই হাজির হবে পেছনে। হাঁটতে হাঁটতে খালাবাড়ি পৌঁছল অপু। তখন তপুর কোনো পাত্তা নেই। পেছনে কোথাও দেখা গেল না ওকে।

খালা অপুকে একা দেখে জানতে চাইলেন, তপু কোথায়? আসে নি তোমার সঙ্গে? অসুখ করে নি তো?

অপু বলল, না। তপু ভালোই আছে। এসে যাবে এখনই। পিছিয়ে পড়েছে একটু। আমার মতো জোরে হাঁটতে পারে না তো!

খালা হেসে বললেন, তপু তাহলে ঠিকই বলে। তুমি নাকি পৃথিবীর সেরা জোরে হাঁটা মানুষ। হাঁটা প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হবে!

শুনে গর্ব হল অপুর। বলল, হ্যাঁ আমি খুব জোরে হাঁটতে পারি। দৌড়াতেও পারি জোরে। ইশকুলে ফার্স্ট হয়েছি।

খালা আবার হাসলেন, তপু তাহলে মিথ্যে বলে নি। সবার চেয়ে সেরা দৌড়বিদ তুমি- তপু এ কথা বলেছে আমাকে।

তপু বলেছে? খালার কথা শুনে অবাক অপু।

হ্যাঁ। তপু বলেছে। তুমি সুন্দর ছবি আঁকো। সাইকেল চালাতে পারো। ভালো ফুটবল খেলো- সবই তো তপুর কাছে শুনেছি।

বলো কী খালা!

কেন, তুমি জানো না- তপু তোমার মতো ভাইকে নিয়ে গর্ব করে।

তপু ওকে নিয়ে গর্ব করে- এমন কথা  ভাবতেই পারে না অপু। খালার কথা বিশ্বাসই করতে পারছে না।
অপু বলল, তা কী করে হয়! তপু সব সময় আমার পিছু লেগে থাকে। আমি যা করি সেও তা-ই করে। জ্বালিয়ে মারে আমাকে। আস্ত নকলবাজ একটা। হয়তো তাই। তুমি যা করো, তপুও তা-ই করার চেষ্টা করে। খালা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আবার বললেন, এতে দোষের কিছু নেই। ছোটরা তো বড়দের দেখেই শেখে। তুমি ওর বড়ভাই। ও তো তোমার কাছেই শিখবে। তপু তোমার মতো হতে চায়। তার কাছে তুমিই সেরা।

ভুল ভাঙল অপুর। ছোটভাই ওকে কত বড় মনে করে। অপু কি আসলেই সেরা? লজ্জায় পড়ে গেল অপু। তপুকে সে কতই না গালমন্দ করেছে! দূরে দূরে থাকতে চেয়েছে। অপছন্দ করেছে। অথচ তপু ওর কাছে কাছে থাকে। ওকে পছন্দ করে। ভালোবাসে, ওকে নিয়ে গর্ব করে। আর সেই ছোটভাইকে কিনা ফেলে এসেছে গলিপথে?
আর দাঁড়াল না অপু। বেরিয়ে এল দরজার বাইরে। খালা বললেন, কী হল! চললে যে?
তপুকে খুঁজতে যাচ্ছি। বলে তাড়াতাড়ি গলিপথ ধরে ছুটে গেল অপু। অর্ধেক পথ যেতেই তপুকে দেখতে পেল। গলির তেমাথায় দাঁড়িয়ে আছে। কোনদিকে যাবে বুঝতে পারে নি।

অপুকে দেখেই এগিয়ে এল তপু। বলল, তুমি নিতে আসবে আমি জানতাম।

তাই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস বুঝি? ছোটভাইয়ের হাত ধরে অপু।

না, আমি রাস্তা চিনি না তো। এখানে এসে বুঝতে পারি নি কোনদিকে যাব।

আয়। ছোটভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসল অপু। পিঠ চাপড়ে আদর করল। বলল, তুই খুব ভালো, আয় আমার সঙ্গে।

দুইভাই খালাবাড়ি গেল। পুরো পথ বড়ভাইয়ের আঙুল ধরে হাঁটল তপু। যেন পথ হারিয়ে না যায়।
তারপর?
বাড়ি ফিরল ওরা। বাড়ি ফিরে হারমোনিয়াম নিয়ে বসল অপু। তপুকে শেখাল কীভাবে বাজাতে হয়। গান গাইতে হয়।
অপু মনে মনে ঠিক করল, ছোটভাইকে  শিখিয়ে দেবে কীভাবে সাইকেল চালাতে হয়। কীভাবে ফুটবল খেলতে হয়। কীভাবে আঁকতে হয় সুন্দর ছবি।
তারপর?
সেই থেকে দুইভাইয়ে খুব মিল।