প্রকৃতি কন্যার দোলনা ঘর

শোহেইল মতাহির চৌধুরী

তিনদিনের বন্ধ পুরোটা মাটি করে দিয়েছেন ছবি-আপা। ছবি-আপা মানে আমাদের স্কুলে যে আপা ছবি-আঁকা শেখান। বন্ধে নানুমনিকে দেখতে গ্রামে যাওয়ার কথা। পুকুরঘাটে পিছলে পড়ে ব্যথা পেয়েছেন নানু। বিছানায় শুয়ে আছেন। হাঁটাহাঁটি করতে পারেন না। মা-বাবারা গিয়ে দেখে এসেছে। স্কুল খোলা বলে আমাকে নেয়নি। বন্ধের সময় যাওয়ার কথা। নানুমনি বারবার ফোন করছেন। সবকিছু মোটামুটি ঠিকঠাক। কিন্তু ছবি-আপার জন্য সব ভন্ডুল হয়ে গেলো। আমি বুঝিয়ে বললাম ছবি-আপাকে। কিন্তু তার ঐ একই কথা, যেখানে ইচ্ছা যাও কিন্তু ‌‍যেদিন স্কুল খুলবে সেদিনই ছবি প্রতিযোগিতা

আমাদের শ্রেণী, মানে তৃতীয় শ্রেণীতে, সবচে ভালো ছবি আঁকে আলিভা - একটা এক নম্বরের হিংসুটে। ও মনে করে ওর মতো ভালো ছবি আর কেউ আঁকতে পারে না। গতবার ‌‌‌‍ফুলের টব ছবি এঁকে আমি দ্বিতীয় হলাম। তবু আমার ছবি নিয়ে কত হাসাহাসি আলিভার। নানারকম ভুল ধরে ক্লাশের বন্ধুদের দেখালো। আমি কাউকে কিছু বলিনি। শুধু কষ্টে বাথরুমে গিয়ে কিছুক্ষণ কেঁদেছি।। তখনই মনে মনে ঠিক করেছি, পরেরবার আমি প্রথম হবোই হবো। এখন নানুবাড়ি গেলে আমি ছবি আঁকবো কখন? যত্ন করে আঁকতে গেলে অন্তত: দুইদিন তো লাগবেই। বাবাকে বিষয়টা বলতেই বাবা নানুবাড়ি যাওয়াটা পিছিয়ে দিলো। দারুণ একটা বুদ্ধিও দিলো বাবা। এই বন্ধে ছবি আঁকবো। তারপর আমার ছবি প্রথম হলে সেটা পরের সপ্তায় গিয়ে নানুকে উপহার দিয়ে আসবো।

ছবির বিষয়টা অবশ্য একেবারে পঁচা; আমার ঘর। কতো কতো ভালো ভালো বিষয় আছে, তা না ঘর-বাড়ি নিয়ে ছবি। ছোটদের কি ঘর-বাড়ি নিয়ে আমার-আমার করা ঠিক? বড়রা যে কত কিছু ভুল-ভাল শেখায়। ছোটদের একদম বুঝতে পারে না তারা।

মৌটুসি! মধু টস টস করে পড়ে যার গাল থেকে সেই মধুবন্তী মেয়েটা আমার কই?

এই রে, বাবা চলে এসেছে। এতো তাড়াতাড়ি! ছবিটা তো অর্ধেকও আঁকা হয়নি। বাবা এখনও দরজার বাইরে। বাসার দরজা খোলার আগেই বাবা ডাকাডাকি শুরু করে। আমি অবশ্য দরজা খুলি না। দরজা খুলে মা। তবে মাকে না ডেকে আমাকেই ডাকে বাবা। বাবার ডাকটা আমার ভালোই লাগে। কিন্তু আজকে ভালো লাগছে না।

মৌটুসি! মধু টস টস করে পড়ে যার গাল থেকে সেই মধুবন্তী মেয়েটা আমার কই?

বাবার এই এক স্বভাব। একই কথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলে। বাচ্চাদের ছড়া-কবিতা পড়ার মতো সুর করে। আচ্ছা মধুবন্তী শব্দটার মানে কি? বাবা বানায়নি তো শব্দটা? বানাতেই পারে, বাবা যা পাজি!

তবে বাবা কথা বলে মিস্টি করে। শিশু বিশেষজ্ঞ তো! মিস্টি মিস্টি কথা বলে বাচ্চাদের ইনজেকশন দিতে হয়।

যাই হোক, বাবার মধুমাখা কথায় ভুললে চলবে না। ঝটপট সব ঠিক-ঠাক করে ফেলতে হবে। বাবার রুটিনতো জানি। মাত্র দরজা দিয়ে ঢুকলো। মা এখন বাবার হাত থেকে বাজারের ব্যাগ নিয়ে বুয়াকে দেবে। তারপর টুক-টাক গল্প হবে মা-বাবার। গল্প শেষ হলে বাবা আসবে এদিকে। ইস, হাতে একদম সময় নেই।

মৌটুসি, মামণি, দেখো বাবা আজ তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। তাইতো! ঘড়িতে মাত্র সাড়ে সাতটা বাজে। তাড়াতাড়ি তো অবশ্যই। সাড়ে আট-টার আগে বাবা চেম্বার থেকে আসে না। তাড়াতাড়ি আসাতেই তো সব গোলমাল লেগে গেলো। নতুবা খাতা-পেন্সিল গুছিয়ে এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়তাম আমি।

মৌটুসি, বাবা ডাকছে মা আবার ডাকাডাকি শুরু করলো কেন? নাহ্, মায়ের ডাকে এখন জবাব দিতে গেলে সব প্যাঁচ লেগে যাবে।

আছে ওই ঘরে। ছবি আঁকছে। ছোট মাছ আনতে বলেছিলাম, এনেছো? যাও, হাত-মুখ ধুয়ে আসো। টেবিল লাগাতে বলছি

PK_1_26মায়ের সাথে এখন গল্প করছে বাবা। নাহ্, একে বোধহয় গল্প বলে না। গল্প হোক আর যাই হোক, যত বেশিক্ষণ এটা চলবে ততোই আমার লাভ।

রঙ, রংয়ের বাক্স গোছানো হয়ে গেছে। আধা-আঁকা ছবিটা কোথায় রাখবো? এই কাপবোর্ডের উপরে থাকুক। খাবার টেবিলে রং-টং লেগে নাই তো? মা ভীষণ ক্ষেপে যাবে। স্কুলের ব্যাগটা এখbI এখানে? কাপবোর্ড আর দেয়ালের ফাঁকে ওটাকে ছুঁড়ে দেয়া যাক। নাহ্ শব্দ হয়নি। আর কী, আর কী? জামাটা বদলে শোবার পোষাক পড়তে হবে। এই পোষাকে ঘুমালে মা ঘুম থেকে উঠিয়ে দিতে পারে। কিন্তু পোষাক বদলানোর সময় কই?

মধুস্বরা, মধুগন্ধী, মামণি, দেখো বাবা আজ তোমার জন্য কী নিয়ে এসেছে? ইস্ রে, বাবার কথা শেষ - এখন আসছে এদিকে। এক দৌড়ে শোবার ঘর। আমার বালিশটা গেল কই? ব্যস, ঝপ্পাস বিছানার মাঝে। মাঝে, মানে বিছানার মাঝেই শুতে হবে। মা একপাশে, বাবা একপাশে; আর মাঝে শোবে - মৌটুসি

বড়রা ঘুমানোর ভান করলে নাক ডাকায়। ছোটদের উপায় কী? আহা মাথাটা কাজ করছে না। বাবা শোবার ঘরে ঢোকার আগেই গভীর ঘুমের ভানে চলে যেতে হবে। আয় ঘুম আয়, চোখে মুখে আয়

 

ওহ্ মামণি! বাবা আসার আগেই তুমি ঘুমিয়ে পড়েছো?

(হি হি হি। বাবা ভাবছে আমি ঘুমে অচেতন। যাক, বাবাকে ঠকানো গেছে। এখন মা-কে না ডাকলেই হয়।)

চন্দ্রা! চন্দ্রা! মৌটুসি-তো ঘুমিয়ে পড়েছে। রাতে খেয়েছে তো?

(মায়ের নাম মোটেও চন্দ্রা না; মায়ের নাম আনোয়ারা খাতুন। চন্দ্রাটা বাবা বানিয়েছে। বিয়ের আগে মা-কে নিয়ে কবিতা লিখতো বাবা। তখন চন্দ্রা নামটা বানিয়েছে। মা মোটেও চাঁদের মত সুন্দরী না। তবে ভীষণ চালাক। ধরে ফেলবে নাতো? টেনশনে বুকটা ঢিপঢিপ করছে।)

একটু আগেই তো ছবি আঁকছিলো। ঘুমালো কখন? রাতে কিছু খায়ও নি। আমার মনে হয় ভান করছে। তোমার মেয়ে তো

(এ্যাu! মা কি বুঝে ফেলেছে? তোমার মেয়ে মানে কি? আমি কি শুধু বাবার মেয়ে হতে পারি? মা বেশি কথা বলে তো, যুক্তি ঠিক রাখতে পারে না।)

আমার মধুস্বভাবা মেয়েটাকে এতো অবহেলা? একটা মেয়েকে দেখে রাখতে তোমার কত কষ্ট। অথচ আiI iI বাচ্চা চাও

(শুধু মা চায় নাকি? আমিও চাই। বাসায় আমিই ছোট, এটা একদম ভালো লাগে না। একটা ছোট ভাই, নাহ্ একটা বোন হলে ভালো হতো। দেখে-শুনে, বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে বড় করতাম। মা-বাবা তো অনেক আগে বড় হয়ে গেছে। ওরা বড় হওয়ার বিষয়গুলো ভুলে গেছে।)

চাইলেই কি আর বাচ্চা মেলে? তোমার মেয়ের জ্বালায় রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেই পারছি না। এইটুকy বিছানায় তিনজন শোয়া যায়? বললাম একটা বড় বিছানা কেনো। না হয় মিস্ত্রি ডেকে বিছানাটা একপাশে বাড়িয়ে নাও।

 

(এই রে, মা মনে হয় ক্ষেপে যাচ্ছে। কিসব উল্টাপাল্টা বকা শুরু করেছে।)

তোমার যা বুদ্ধি। বিছানা বড় করলে কী লাভ? তখন দেখবে বিয়ে না দেয়া পh©š— তোমার মেয়ে আর আমাদের বিছানা ছাড়ছে না।

(এ্যাu! তোমার মেয়ে। এবার দেখি বাবা বলছে মাকে। নাহ্ বাবার বুদ্ধিটা কমেই যাচ্ছে। আমি কি কখনও বিয়ে করবো? প্রশ্নই ওঠে না। মা-বাবার সাথেই সারাটা জীবন এক বিছানায় কাটিয়ে দিতে হবে। মা-বাবাকে ছেড়ে অন্য জায়গায় যাওয়ার কি মানে? অন্য মানুষ কি মা-বাবার মতো হয়?)।

তা হতে পারে। তোমার মেয়ে তো। তুমি তো কলেজে পড়া পh©š— মায়ের সাথে ঘুমাতে

(হি হি হি। জোরে হাসা যাবে না। বাবা দেখছি আমার চেয়েও বাবু ছিলো।)

আরে না। আম্মার গল্প শুনে তুমি বিশ্বাস করলে? আম্মাই ভয় পেতো। আব্বা যখন কয়েকদিনের জন্য মফস্বলে যেতো, তখন মায়ের বিছানায় গিয়ে ঘুমাতাম

(বাবা নিশ্চয়ই লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। মা যা দুষ্টু। কায়দা করে মানুষকে লজ্জায় ফেলে দেয়।)

খামোখাই টাকা খরচ করে যাচ্ছো। ওই ঘরে ও ঘুমাবে মনে করো? তিনমাস ধরে পরে আছে। আজকে আবার কী কিনে এনেছো?

(থাকুক পরে। আমি কখনো ওই ঘরে ঢুকছি না। আমি ছোট না? আমি কি আর একা একটা ঘরে ঘুমাতে পারি? আমি ঘুমাবো মা-বাবার মাঝখানে।)

আড়ং-এ এই বালিশটা দেখে ভাল্লাগলো। দেখো একেবারে একটা কাছিমের মতো। এখন না বাচ্চাদের খুব সুন্দর সুন্দর জিনিস পাওয়া যায়। আমাদের সময় এসব ছিল না। আচ্ছা খাবার দাও, ক্ষুধা লেগেছে।

PK_2_26যাক, আজকের মত বিপদটা কাটলো। মা-বাবা চলে গেছে। মা-টা একটু রাগী। কিন্তু বাবাটা বাবু বাবু আছে। কাছিমের মতো বালিশ কিনে এনেছে। আচ্ছা, এটাতো আমার মাথায় আসেনি। আমার ঘর ছবিটায় বালিশটা থাকতে পারে। কাছিমের মতো বালিশ। কোলবালিশটা তরমুজের মতো। বিছানাটা কলাগাছের ভেলার মতো। বুনো লতা দিয়ে ঘেরা মশারি। ছাদে ওড়াওড়ি করছে নানা রকম পাখি। মেঝেতে গোল কার্পেটের জলাশয়ে পানি খেতে এসেছে হরিণ ও বাঘ। রোদ পোহাচ্ছে কুমির। আর ঐ যে মশারির ধার দিয়ে বুনো লতা। তাতে ঝুলছে শিম্পাঞ্জি।

নতুন করে ছবিটা আঁকতে হবে। কী নাম দেয়া যায়? টারজান-কন্যা মৌটুসির পালকি ঘর। নাহ্, বাবাতো টারজান না? আমি তাহলে কি করে টারজান কন্যা হবো? জঙ্গল-কন্যা লেখা যায়। নাহ্, এটা কেমন জংলি জংলি শোনাচ্ছে। হুম, পেয়েছি; প্রকৃতি-কন্যাপ্রকৃতি-কন্যা মৌটুসির পালকি-ঘর

পালকি-ঘর শুনতে মজা লাগছে। ঘরটা যদি পালকির মত দুলতো তবে আরো মজা হতো। কিন্তু, পালকি শুনলে কেমন বউ-বউ মনে হয় না? মৌটুসিতো কখনো বিয়ে করবে না। সুতরাং, পালকি বাদ। পালকি বদলে কী হতে পারে? দোলনা, দোলনা হতে পারে; পালকি ঘর-এর বদলে দোলনা-ঘর। বাহ, সবকিছুই মাথার মধ্যেই থাকে। চিন্তা করলেই পাওয়া যায়।

ছবির নামটা বেশ মজার হয়েছে তো! প্রকৃতি-কন্যা মৌটুসির দোলনা-ঘর। ঘরে একটা বড় দোলনা আঁকতে হবে। বিছানাটাই দোলনার মতো হতে পারে, তাই না? ছবিটা এখন আঁকলেই ভালো হতো। ঘুম থেকে ওঠার পর যদি সবকিছু মনে না থাকে? না, এখন বিছানা থেকে নামার ঝুঁকি নেয়া যাবে না। বরং ঘুমিয়ে যাওয়াই ভালো। ...আয় ঘুম ঝেঁপে...স্বপ্ন দেবো মেপে...

 

আমাদের ছবি-আপাটা ভীষণ দুষ্টু। আজকে আমাকে কী লজ্জাটা না দিলেন। আমি ভালো মানুষের মত টিচার্স কমনরুমে গেলাম আপার সঙ্গে দেখা করতে। আপাকে বললাম, আপা আমি অন্য কোনো ছবি আঁকি। আমার ঘর নিয়ে ছবি আঁকতে ভালো লাগছে না। আপা সাথে সাথে জেরা করা শুরু করলেন।

কেনো তোমার ভালো লাগছে না মৌটুসি। তোমার ঘরটা কি তোমার অপছন্দ?

এসব প্রশ্নের কি আর তাড়াতাড়ি জবাব দেয়া যায়। আমি আমতা আমতা করি আর ছবি-আপা মুচকি মুচকি হাসেন। বাসায় তো আমার জন্য একটা ঘর আছে। কিন্তু আমি তো সে ঘরে থাকি না। থাকবো কেন? আমার ভালো লাগে মা-বাবার সাথে ঘুমাতে। আর ডাইনিং টেবিল তো অনেক বড়ো। ওখানেই পড়ালেখা, ছবি আঁকা সব করা যায়। আমি ছাড়া বাসায় তো আর ছোট কেউ নাই। তাহলে, আলাদা ঘরের কি দরকার?

কিন্তু এত কথা তো আর আপাকে বলা যায় না। বললাম, আমি আসলে মা-বাবার সাথে ঘুমাই

আমার কথা শুনেই ছবি আপা হেসে উঠলেন। একেবারে সব দাঁত বের করে হাসি। আর কি যে খুশি। হাসিতে আপা ভেঙে ভেঙে পড়ছেন।

তাই নাকি মৌটুসি? তুমি মা-বাবার সাথে শোও

আপার হাসি দেখে নিজেকে বোকা বোকা লাগছিলো। কি করবো, কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। এর মাঝে ছবি-আপা বাকী সব আপাদেরকেও ডেকে জড়ো করে বললেন, জানেন আপারা, মৌটুসি না এখনো মা-বাবার সাথে এক বিছানায় ঘুমায় এই কথা শুনে সবাই হা হা করে হাসতে লাগলেন।

আচ্ছা কার পাশে তুমি শোও মৌটুসি? মায়ের পাশে না বাবার পাশে? প্রশ্নটা করলেন ইংরেজি-আপা। এই আপাটা মহাদুষ্টু। চোখ দেখলে বুঝা যায় ছোটো থাকতে আরো দুষ্টু ছিলেন।

হাহ্ এটা একটা প্রশ্ন হলো? তাদের হাসাহাসি দেখে আমার ভীষণ রাগ হচ্ছিল। কিন্তু বাইরে বুঝতে দিচ্ছিলাম না।

আমি মা ও বাবার মাঝখানে শুই। রাগ আটকে রেখে আমি বললাম।

হাহ, হাহ, হাহ। আমার কথা শুনেই কমনরুম কাঁপিয়ে হাসতে শুরু করলো আপারা। রাগের বদলে আমার লজ্জা পেতে লাগলো। জোরে এক দৌড় দিয়ে বেরিয়ে এলাম। বুঝলাম, আমার ঘর ছবিটাই আঁকতে হবে। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে আরো হাসাহাসি করবে আপারা। তারচেয়েও খারাপ হবে যদি ক্লাশে এসে আপা এ কথা সবাইকে বলে দেয়। খুব লজ্জার হবে। তখন ক্লাশের সবাই আমাকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করবে। আলিভা যা মিচকে, হয়তো কার্টুন আঁকবে আমাকে নিয়ে। কার্টুনে দেখা যাবে; বিছানার দুই পাশে মা-বাবা বসে রাতভর ঝিমাচ্ছে, দেয়াল ঘড়িতে রাত তিনটা। আর মাঝখানে মৌটুসি গাধার মত নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। নাকের পাশে বুদ্বুদ আঁকবে, আর ভেতরে লেখে দেবে- গররর, গররর।

PK_3_26নাহ্, এরচেয়েও খারাপ কিছু আঁকবে ও। মাইশা হয়তো ওর বাবার অফিস থেকে সেই কার্টুন ফটোকপি করে আনবে। তারপর সারা স্কুলে বিলি করবে দুই ফাজিল মিলে।

আগডুম বাগডুম ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম টের পাইনি। ঘুমের মধ্যে শুনি গুড় গুড় করে ঢাক বাজছেঘুমটা গেলো ভেঙে; ক্ষুধার কারণে? নাকি বাবার নাক ডাকার শব্দ শুনে? পেটের ভেতরেই শব্দটা হচ্ছে। অন্যদিনতো ঘুমের মধ্যেই মা খাইয়ে দেয়আজ দিলো না কেন? মা-টা দুষ্টু হয়ে যাচ্ছেভীষণ রাগ হচ্ছে মায়ের ওপরএত ছোট বাবুর কি এত ক্ষুধা সহ্য হয়?

ঘরে হালকা নীল আলোডিমলাইট জ্বলছেকিন্তু আমার পাশে শুধু মা শুয়ে কেন? বাবা কই? একি! আমি-তো একেবারে বিছানার পাশেবাবাতো শুয়ে আছে মায়ের ওইপাশেবিছানার মাঝখান থেকে আমাকে সরালো কে?

নিশ্চই মায়ের কাজমা-টা যে কি? এখন আরাম করে ঘুমাচ্ছে। আমাকে বিছানার পাশে সরিয়ে দিয়ে, নিজে বিছানার মাঝে শুয়ে আছেকেমন বুদ্ধি এটা মায়ের? যদি আমি নীচে পড়ে যেতাম? পড়ে হাত-পা ভাঙতো? তাহলে স্কুলে যেতাম কি করে? আর প্রতিযোগিতার ছবি- আঁকাই হতো না।

রাতে না খেয়ে, ছবি আঁকা বন্ধ করে, বাবাকে ঠকিয়ে তাড়াতাড়ি করে ঘুমালাম আর সব কেমন বানচাল করে দিলো মা। নিজেই এখন ঘুমিয়ে আছে বিছানার মাঝখানে?

দেবো নাকি মা-কে একটা ধাক্কা

ইস, কি যে ক্ষুধা লেগেছে। ফ্রিজে খাবার আছে তো? ক্ষুধার কষ্টটা আগে কোনদিন বুঝিনি তো? খুব একটা ক্ষুধাতো আমার লাগে না!

কিন্তু মা কেন ঘুম থেকে তুলে খাওয়ালো নাএকথা মনে হলেই কান্না পাচ্ছে ওরদেবো নাকি ওদের আরামের ঘুম ভেঙে?

কেঁদে ফেলবো নাকি ভ্যাঁ করে?

চোখমুখ কুঁচকে, ঠোঁট উল্টে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। ভাবলাম।

নাহ্, কান্না করাটা ঠিক হবে নাএ নিয়ে পরেরদিন গল্প হবেহা হা করে হাসবে মা-বাবাবন্ধুদের রসিয়ে রসিয়ে এই গল্প শোনাবে

আমার কান্না নিয়ে মজা করতে দেয়া যাবে নামা-বাবার রাজনীতির কাছে এভাবে হেরে যাওয়া ঠিক হবে না

আস্তে আস্তে খাবার ঘরে ঢুকে বাতিটা জ্বালালাম। ফ্রিজে রাখা ভাত-তরকারি একেবারে ঠান্ডা বরফ হয়ে আছেধ্যাত্ এসব খাওয়া যায় নাকি? বিস্কুটের টিনতো রান্নাঘরেমা-টা যে কি! নাহ্, এই অন্ধকারে রান্নাঘরে যাওয়া যাবে নাকোকের বোতলটা ফ্রিজ থেকে বের করলামএক গ্লাস কোক খাওয়া যাকখুব ভোরে উঠে বেশি করে নাস্তা করতে হবেরাতে না খেয়ে আর ঘুমানো যাবে নাযাক, কোক গেলায় ক্ষুধা কিছুটা কমেছে এখনতো মজাই লাগছে। রাতে একা একা খাওয়াটাতো বেশ মজার!

কেউ দেখছে না যখন, আরো আধা গ্লাস কোক খাওয়া যায়

দেয়ালে টিকটিকিরা ছুটোছুটি করছে। এগুলো রাতে ঘুমায় না? বাথরুমে যাবো নাকি? না থাক, ওদিকে অন্ধকারক্ষুধার জন্য এতোক্ষণ ভয় লাগছিলো নাপেট ভরে যাওয়ার পর আবার ভয় লাগা শুরু হয়েছেতাড়াতাড়ি লাইট নিভিয়ে শোবার ঘরে চলে এলামআচ্ছা, এখন আমি ঘুমাবে কোথায়?

মা-বাবা কি সুন্দর ঘুমাচ্ছে। দেখে যা বিরক্ত লাগছে। মারও কি নাক ডাকছে? নাকি জোরে জোরে শ্বাস পড়ছেবাবা-তো এতো জোরে নাক ডাকাচ্ছে যে মনে হচ্ছে ঘরের মধ্যে চাল-ভাঙার মেশিন চলছে

কিন্তু আমি ঘুমাবে কোথায়? মায়ের পাশে ওইটুকু জায়গায় কি করে শোবো? নাহ্ মাঝখানেই শুতে হবেনিজের জায়গা ছাড়া যাবে নাছোটদেরও অধিকার আছেঅধিকার রক্ষা করতে হয়!

PK_4_26পেছন ফিরে কাত হয়ে শুয়ে আছে মা-বাবামাকে মাঝখান থেকে পাশের দিকে ঠেলে সরিয়ে দিতে হবেতবে ঘুম ভাঙানো যাবে নাভীষণ ক্ষেপে যাবেকোনোরকমে মা-বাবার মাঝে ঢুকে মায়ের পিঠে ধাক্কানো শুরু করলাম।

এ্যাই, ধাক্কাও কেনো

এই রে, মা ভাবছে বাবা ধাক্কাচ্ছেযদি বুঝতে পারে আমি, তাহলে খবর আছেহি হি হি, মা মনে হয় ঘুমের মধ্যে কথা বলে

 

এতো ছোট বিছানায় তিনজন ঘুমানো যায়?” ঘুমের মধ্যে কথা বলতে বলতে মা একটু সরে যায়আমার আর কট্টুক জায়গা লাগেযাক, জায়গাটা আবার উদ্ধার হলোবড়দের সাথে বুদ্ধিতে পারা খুব কঠিনতবে এইদফা সহজেই বিজয় পাওয়া গেছে। এবার মনে হয় ঘুমটা শান্তির হবে

দ্রুতই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমের মাঝে স্বপ্নও শুরু হয়ে গেছে

দেখি, সবুজ এক পাহাড়ি-পাহাড়ি বাগানে এসেছি আমিমা-বাবা কেউ সাথে নেইএকেবারে একা

বাগানটাতেও আর কেউ নেইবাগানের মাঝখানে গোল একটা লেকস্বচ্ছ পানির ওপর ভাসছে একজোড়া সাদা রাজহাঁসএকটা মাত্র বাচ্চা ওদের, সোনালী রংয়েরবাচ্চাটা সাঁতার কাটছে নাবসে আছে বড় একটা হাঁসের পিঠেবাবা হাঁস হবে হয়তো

লেকের পাশের গাছগুলোর দিকে চোখ যেতেই অবাক হয়ে গেলামওমা! এ কিরকম গাছ! লিচু গাছের মত যে গাছগুলো সেগুলোয় ঝুলে আছে নানারকম বোতল আর ক্যান; কোনোটায় কোক, কোনোটায় পেপসি, ফান্টা, মিরিন্ডা, আরসিকি দারুণ! আমগাছের মত গাছগুলোয় ঝুলছে জুসের রঙচঙে প্যাকেটআর ছোটো ঝোপগুলো চিনতে পারছি নাওগুলোতে ঝুলে আছে বার্গারচিকেন বার্গার আমার ভীষণ পছন্দ

খাবো নাকি একটা বার্গার? কিন্তু বার্গার খেলে পর পিপাসা পাবে যেওমা! বার্গার গাছটার নীচেই তো কি সুন্দর একটা বেসিনপানির কলও আছেনোংরা নাতো? আস্তে করে কলটা ছাড়লাম। বাহ্, পরিষ্কার ঝকঝকে পানি ঝর ঝর করে পড়ছে কল থেকেভারী সুন্দর! ঝর্নার মত পানি বয়ে যাচ্ছেঝর ঝর ঝর ঝরঝর ঝর ঝর ঝর

 

এ্যাই ওঠো ওঠোদেখো তোমার মেয়ের কান্ড

বাবাটা এমন বোকার মতো চ্যাঁচাচ্ছে কেন? ঘুমের মধ্যেই শুনতে পাচ্ছিযাহ, গেলো স্বপ্নটা কেটে

দাঁড়াও চাদর বদলে দিচ্ছিমা-ও উঠে পড়েছে দেখছিউফ, সব ভিজিয়ে দিয়েছে মেয়েটা

(এ্যা, বলে কি মা? স্বপ্নে পানির কলটা দেখা ঠিক হয়নিকোক খাওয়ার পর একটু সাহস করে বাথরুমে যাওয়াই ঠিক ছিলোইস, কি লজ্জার কথাএতো বড় মেয়ের কী কান্ড! নাহ্, চোখ খোলা যাবে নাঘুমের ভান করে পড়ে থাকতে হবে।)

এ্যাই মৌটুসি, উঠ, বাথরুমে যা। (মা-টা ভীষণ নাছোড়বান্দা।)

এখন আর বাথরুমে গিয়ে কি হবেঘুমাকতুমি ওর কাপড় বদলে দাও। (যাক, বাবাটা ভীষণ লক্ষ্মী।)

হুম, কেমন ঘুমাচ্ছে দেখোতুমি কই যাচ্ছো”?

আমি এখানে ঘুমাতে পারবো নাআমাকে একটা চাদর দাওআমি লিভিংরুমে যাই

লিভিংরুমে ঘুমাবে কি করে? চাদর পাল্টে দিচ্ছিসকালে তোষক রোদে দিতে হবে

না, গন্ধ লাগছে নাকেআমার ঘুম আসবে নাআমি লিভিংরুমে যাচ্ছি

(ধ্যাত্তেরি, খুব খারাপ হলো কাজটাবাবা ঘুমাবে কি করে এখন।)

মটকা মেরে শুয়ে থাকিমা চাদর পাল্টাচ্ছেআমার কাপড়ও বদলে দিলো যাক ঘুমের ভান করে রক্ষা পাওয়া গেছে

বাবা লিভিংরুমে শুয়েই নাক ডাকানো শুরু করেছেমাও ঘুমিয়ে একেবারে কাদা হয়ে গেছেকিন্তু আমারতো ঘুম আসছে নাএকদিকে লজ্জা লাগছে আরেকদিকে বাবার জন্য খারাপ লাগছেনিজের কাছেই নিজেকে কেমন খারাপ লাগছেবুঝতে পারছি না, কী করা যায়।

বিছানা থেকে নেমে উঁকি দিলাম লিভিংরুমেকার্পেটে চাদর পেতে শুয়ে আছে বাবাএকেবারে বাচ্চাদের মত হাত-পা ছড়িয়ে চিত্ হয়েআহা, বাবাটা বিছানায় এমন করে ঘুমাতে পায় নাসেখানে জায়গা কই এমন হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমানোর?

শব্দ না করে বাবার পাশে এসে বসলাম। নীচে একা একা শুয়ে আছে বাবা, ইশ্বাবাটাকে একদম বাবু বাবু লাগছেহাত বুলিয়ে দেবো নাকি বাবার মাথায়? বাবার জন্য খুব মায়া লাগছেনিজের কান্ডটার জন্য আরো খারাপ লাগছে। ধুর, আমার জন্য বাবার এই যন্ত্রণা হলো। বাবার মাথায় হাত রেখে আস্তে করে বললাম, “আই এ্যাম স্যরি, বাবা

PK_5_26বাবা ঘুমাচ্ছে। আমার কথা বাবা শুনতে পেলো না

আমি নিজের ঘরে ঘুমালে এসব কিছুই ঘটতো না। আমার ঘরে অবশ্য আমি কখনও ঢুকিনি। সবাই ঘুমাচ্ছে, এখন দেখা যায়। আস্তে করে বাতিটা জ্বালালাম। বাহ, কি সুন্দর!
বিছানাটা কি মিস্টি, রূপকথার বইয়ের প্রচ্ছদের মতআর কতো পুতুল বিছানায়! বালিশটা? একেবারে কাছিমের মতসবুজ কাছিমওমা! কোলবালিশটা একটা হাসি হাসিমুখ কুমিরের মতএত সুন্দর করে ঘরটা সাজিয়ে রেখেছে মা-বাবাতাও আমি মা-বাবার বিছানা ছাড়তে চাইতাম না? মা ঘুমাচ্ছেবাবাও ঘুমাচ্ছে লিভিংরুমেএখনো সকাল হয়নিনিজের বিছানায় উঠতে নিজেরই লজ্জা লাগছেএই প্রথমআহ্ কি নরোমকাছিম-বালিশটাতো ভীষণ নরোমটেডি বিয়ারটার গায়ে দুবার বিলি কাটতে কাটতে না কাটতেই আমার চোখ জুড়ে ঘুম নামলো।

কোথায় যেন তালি বাজছেএইতো এখানে, এই ঘরেমা-বাবা তালি দিচ্ছেবিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ওরাচোখ মেলে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করলাম

তালি দিচ্ছো কেন তোমরা

বাবা হো হো করে হাসেবলে, “মামণি, তালি দিচ্ছি সকাল হয়ে গেছে বলেতুমি ঘুম থেকে উঠবেনাস্তা করবে এখনআর তালি দিচ্ছি তোমার বিছানায় আজই তুমি প্রথম ঘুমালে সেজন্য

রাতে বিছানা ভেজানোর ঘটনাটা মনে পড়ে গেলো লজ্জা লাগছে। এখন চুপচাপ থাকাই ভালো। কিছু বলতে গেলেই লজ্জা দিতে পারে মা-বাবা।

যাও চট করে মুখ-হাত ধুয়ে এসোনাস্তা রেডিবলেই মা খাবার ঘরের দিকে চলে গেলো আমিও দৌড়ে বাথরুমে ঢুকলাম।

PK_6_26কোনোরকমে নাস্তা শেষ করে আবার দৌড় দিয়ে নিজের ঘরে। যাক মা-বাবা রাতের ঘটনা নিয়ে কিছু বলেনি। বুঝেছে বললে আমি লজ্জা পাবো। বাহ্, ঘরে একটা ছোটো পড়ার টেবিলও আছেএখানে বসেই তো ছবি আঁকা দেখা যায়। টেবিলে বসলে জানালা দিয়ে দূরের গাছ-পালাও দেখা যায়। ছবি আঁকার খাতাটা খুলে ঘরটাকে ভালো করে দেখলাম। কী সুন্দর ঘর! অভিমান করে এতোদিন ঢুকিনিযাহ্ নিজের বোকামিতে নিজেরই হাসি পাচ্ছে।

নামের জন্য সবুজ রং-টাই ভালো হবেপ্রথমে লিখলাম ছবির নাম : প্রকৃতি-কন্যা মৌটুসির দোলনা-ঘরএখন দোলনা দোলনা বিছানাটা আঁকতে হবেহাতে আছে মাত্র দুদিন। যত্ন করে আঁকতে হবে। প্রথম পুরষ্কারটা এবার আমার চাই-ই চাইএকটু একটু আঁকছি আর মনের ভেতর ছবি-আপার কথা শুনতে পাচ্ছি। ক্লাশে ছবি আপা সবাইকে শুনিয়ে ঘোষণা দিচ্ছেন, “প্রথম হয়েছে প্রকৃতি-কন্যা মৌটুসির দোলনা-ঘর

PK_7_26কে যেন আমার ভেতরে কথা বলছে। নিজের কথাই বোধ হয় শুনতে পাচ্ছি। আবছা একটা ছবিও দেখতে পাচ্ছি। নানুবাড়ির গেট। গেটের বাইয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমি। চিত্কার করে ডাকছি নানুমনি, নানুমনি আমি এসেছি। আমার হাতে ধরা আমার আঁকা ছবিটা।


শোহেইল মতাহির চৌধুরী/এবি/০৭ এপ্রিল