রবীন-মাহিনের মুক্তি...

আহসান হাবীব

ব্যাকরণ ক্লাশে স্যার ঢুকেই ঘোষণা দিলেন, “গরুর রচনা লিখতে হবে।”
“স্যার গরুর রচনা তো আগের ক্লাশেও লিখেছি আমরা।”, ফার্স্ট বয় সজিব সাহস করে বলেই ফেলল।
“আবার লিখতে হবে।”, মকবুল স্যার গম্ভীর।
“কেন স্যার ?”, ক্লাশ ক্যাপ্টেনও যথেষ্ট সাহসী, সে জানতে চাইল।
“কারণ তোরা সব কটা গরু। গরুদের সাইজ করতে গরুর রচনা বার বার লিখতে হবে। লেখ লেখ ...আত্মজীবনী লেখ।”

robin-1 কী আর করা! সবাই খাতা খুলে লিখতে বসল গরুর রচনা।

মাহিনও খাতা খুলল। আজ সে বসেছে ক্লাশের একমাত্র জানালাটার কাছে। জানালা দিয়ে দূরে একটা গরুও দেখা যাচ্ছে। গরুটা খুটিতে বাঁধা।
“স্যার, মাহিন নকল করছে!”, ক্লাশের সবচে ফাজিল বদরুল চেঁচিয়ে উঠল। মাহিন সহ সবাই চমকে উঠল। মাহিন এখনো খাতাই খুলেনি। নকল করছে মানে ?
স্যার পর্যন্ত অবাক হয়ে মাহিনের দিকে তাকালেন। কারণ সবাই জানে ক্লাশের সবচে ভাল ছেলে মাহিন। কোন ঝুট ঝামেলায় নেই।
“মাহিন ?”, স্যার চেঁচিয়ে ডাকলেন। মাহিন উঠে দাঁড়াল।
“স্যার আমি নকল করছি না। এখনোতো লেখাই শুরু করিনি।”
“স্যার ও জানালা দিয়ে বাইরে গরুর দিকে তাকিয়ে ছিল।”, ফাজিল বদরুল আবার বলে। এবার সবাই হেসে উঠে। স্যারের ঠোঁটেও মৃদু হাসি দেখা যায়। সবাই ভাবল, এবার বোধহয় বদরুলের পিঠে স্যার স্কেলের দু-এক ঘা বসাবেন। স্যার অবশ্য কিছু বললেন না। চশমা খুলে কাঁচ মুছতে লাগলেন।

মাহিন গরুর রচনা লিখতে লিখতে আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। গরুটা খুঁটিতে বাঁধা, চেষ্টা করছে দূরের ঘাসগুলো খেতে। তার দড়িটা টান টান হয়ে গেছে। robin-2গরুটা খুব বড়সড় শক্তিশালী। একটা গরু একটু জোরে দৌড় দিলেই কিন্তু সে ছুটে যেতে পারে। সেই বুদ্ধিটা তার নেই। দড়িটা ছিঁড়লেই মুক্তি... কিন্তু সে জানে না...
“তুমি যা ভাবছ আমিও তাই ভাবছি।”, মাহিন চমকে তার পাশের ছেলেটার দিকে তাকাল। কথাটা সেই বলেছে। পাশের ছেলেটা নতুন ভর্তি হয়েছে। অদ্ভূত ছেলে। কথাবার্তা কারো সঙ্গেই বলে না। নিজের মনে থাকে। নাম রবীন।
“আমি কি ভাবছি ?”
“ঐ যে দড়ি ছিঁড়লেই গরুটা মুক্ত!”, ভীষণ অবাক হল মাহিন।
“আমি থট রিডিং পারি। আমার বাবা আমাকে শিখিয়েছেন।”
“তোমার বাবা থট রিডিং পারেন ?”
“হ্যাঁ, উনি একজন ম্যাজিশিয়ান।”
“তাই নাকি ?”

ছুটির পর মাহিন আর রবীন দুজন এক সাথে বেরুল। দুজনের বেশ খাতির হয়ে গেছে। তারা দুজন গরুটা যেখানে বাঁধা আছে সেখানে গিয়ে হাজির হল। গরুটা তখনও robin-3গলার দড়িটা টান টান করে ঘাস খাওয়ার চেষ্টা করছে।
“গরুটা জানেনা তার কত শক্তি। সে জোড়ে ঘাড়টা নাড়ালেই দড়ির খুঁটিটা উপড়ে যাবে।”
“ঠিক বলেছ ।”
“আমার কী মনে হয় জান ?”, রবীন বলে।
“কী মনে হয় ?”
“ঐ যে স্যার বলল না আমরা সবাই গরু।”
“ওটাতো ঠাট্টা করে বলেছে।”
“তা বলেছে... তবে আমার মনে হয়। আমরা সব এই গরুটার মত বন্দী হয়ে আছি। কিছু একটা ছিঁড়লেই ... আমরা মুক্ত হয়ে যাব।”
“মানে ? কী বলছ ?”
“মানে ধর, এই আমাদের পৃথিবীটা কত বছর ধরে একটা নির্দিষ্ট অক্ষের উপর ঘুরছে ঘুরছে... বেরুতে পারছে না। বন্দী... যদি কোথাও দড়িটা ছেঁড়া যায়!”
মাহিন অবাক হয়ে রবীনের দিকে তাকায়। ছেলেটা কি বলে এসব। তবে রবীনের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর সে যেটা বোঝাতে সমর্থ হল। সেটা অবশ্য কম মজার না। বিষয়টা মাহিনেরও বেশ পছন্দ হল।

robin-4বিষযটা হচ্ছে রবীন মনে করে আমরা সবাই বন্দী। পৃথিবীটা বন্দী পৃথিবীর সব মানুষ বন্দী সবাই একই রকম কাজ করছে তার মানে অন্যরকম কাজ করার স্কোপ নেই বলেই করছে ... তাই সবাই বন্দী ঐ গরুটার মত। কোন একটা অদৃশ্য দড়ি দিয়ে আমরা বাঁধা। ঐ দড়িটা ছিঁড়লেই আমরা মুক্ত...
“কিন্তু ঐ দড়িটা কোথায় ?”
“আছে কোথাও। তবে...”
“তবে ?”, মাহিন কৌতুহলী হয়ে উঠে। রবীন তার বয়সী হলেও সে রবীনের বিশেষ ভক্ত হয়ে উঠেছে। রবীনকে তার খুব জ্ঞানী মনে হয় ইদানিং!
“তবে... ওটা যে একটা দড়িই হবে এমন নয়। অন্য কোন কিছু হতে পারে একটা চাবি... বা একটা তালা যেটা খুলতে হবে বা একটা ...”

robin-5তারপর থেকেই দুই বন্ধু ঐ দড়ি বা চাবি বা অন্য কিছু খুঁজে বেড়ায় ঝোপে জঙ্গলে লেকে ... সব খানে।
“তোমার কি ধারনা ঐ জিনিসটা এই কাছে পিঠেই হবে?”
“আমার তাই ধারণা।”
“কেন ?”
“আমার সিক্সথ সেন্স বলছে।”
“সিক্সথ সেন্স ?”, মাহিন অবাক হয়। এই শব্দটির সাথে তার পরিচয় নেই। রবীন তখন শুরু করে ... “মানুষের সিক্সথ সেন্স হচ্ছে ...” মাহিন মুগ্ধ হয়ে শুনে। রবীনের প্রতি তার শ্রদ্ধা বেড়ে যায়। ছেলেটা কত জানে।

robin-6খুঁজতে খুঁজতে তারা একদিন একটা মাটির ঢিবি খুঁজে পায়
“এটা কী ? এটা এখানে কেন ?”
“বোধহয় উঁই পোকার ঢিবি।”
“না।”
“তাহলে ?”
“উঁইপোকার ঢিবি আমি চিনি।”
“তাহলে ?”
“চল আমরা খুড়ে দেখি।”
“বেশ।”
রবীনের সাথে সবসময় একটা স্কাউট চাকু থাকে। সেটা দিয়ে সে খুড়তে শুরু করল। কিছুক্ষণ বাদেই তারা ছোট্ট একটা চাকার মত কিছু খুঁজে পেল।
“হুররে পেয়েছি!”
“কি এটা ?”
“আমার বিশ্বাস এটাই সেই চাবি।”
“এটা দিয়ে কী হবে ?”
“এটা ঘুরালেই একটা কিছু হবে।”
“কি হবে ?”
“জানি না।”
“তাহলে থাক ঘোরানোর দরকার নেই।”
“কেন ?”
“যদি ভয়ঙ্কর কিছু হয়।”
“ভয়ঙ্কর কিছু হবে কেন ? ভাল কিছু হবে। গরুর দড়িটা ছেড়ে দিলে গরুটার মুক্তি পায়। সেরকম এই চাবিটা ঘুরালে আমাদের ... এই পৃথিবীর মুক্তি।”
“ভাল কিছু হলে ঘোরাও।”, কম্পিত গলায় বলে মাহিন।
চাকাটায় হাত দেয়। রবীন দু হাতে প্রচণ্ড শক্তিতে ঘোরানোর চেষ্টা করে পারে না। এবার মাহিন হাত লাগায় দুজনে মিলে প্রচণ্ড শক্তিতে ঘোরায়। মুহূর্তে ঘুরে যায় চাকাটা... !
“কই কিছুইতো হল না !”, ফিরে আসতে আসতে বলে মাহিন।
“কী জানি তাইতো দেখছি! কিছুই হল না। আসলে আমাদেরই কোন একটা ভূল হয়েছে হয়ত। এটা হয়ত অন্য কোন চাবি। আরো খুঁজতে হবে। চল সন্ধ্যা হয়ে আসছে।”

... কিন্তু ওরা কেউ খেয়াল করল না হঠাৎ করে পশ্চিম দিকের আকাশটা গাঢ় লাল হয়ে উঠছে ... ক্রমশ...!!!



আহসান হাবীব/এবি/এমআইআর/০৪ ডিসেম্বর