নূরী ও পরী

আহমেদ রিয়াজ

বাতি জ্বালিয়ে খাটের দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে গেল নূরী। ও কে? পা দুলিয়ে বসে আছে ওর খাটের ওপর।
নূরীরা গিয়েছিল বাইরে। সপ্তাহে একদিন বাবা ওদের নিয়ে বিকেলের দিকে বেরিয়ে যান। তারপর কোনো একটা রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়ে ওরা ঘরে ফেরে। আজ শুক্রবার। বেশ ঘুরল ওরা। আজ অবশ্য অনেক দূরের একটা রেস্টুরেন্টে গিয়েছিল। ঢাকা থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে- সাভার।

NR_1 নূরীর ঘরটা দুদিকে খোলা। দক্ষিণ ও পূর্ব দিক। দক্ষিণ দিকে একটা বারান্দা। আর পূর্ব দিকে বিশাল একটা জানালা। যদিও বারান্দায় খুব একটা যায় না ও। বেশিরভাগ সময় বন্ধই থাকে। আর ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ও বারান্দার দরজা বন্ধ করে যায়। আজও বন্ধ করে গিয়েছিল। এখনও বন্ধই আছে। আর জানালা তো বন্ধই থাকে। কেবল বিদ্যুত চলে গেলে ও জানালাটা খোলে। নয়ত বন্ধ থাকে। জানালায় গ্রিল দেয়া। মোটা কাঁচ লাগানো। সুতি কাপড়ের মোটা পর্দাও ঝুলছে। বোঝা যায় জানালা দিয়ে বা বারান্দা দিয়ে ওর ঘরে ও ঢোকেনি। বাকি থাকে দরজা। দরজাটা বাইরে থেকে লাগানো ছিল। তাহলে কেমন করে ঢুকল ও?

নূরী ভয় পেয়ে চিৎকারই দিয়ে ফেলত। কেমন করে যেন সেটা যেন ও বুঝতে পারল। ঠিক চিৎকার দেয়ার আগমূহুর্তে ও বলল, চেঁচামেচি করে লাভ নেই। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না। তোমার ঘরটা আমার পছন্দ হয়েছে। একটু বসেই চলে যাব। তোমাকে বিরক্ত করব না।

নূরী বলল, তুমি কে?
ও বলল, এখনও বুঝতে পারছ না? এই দ্যাখো, বলেই ওর দুটো পাখা দেখাল। নূরী বলল, তোমার কি পাখাও আছে নাকি?
ও হাসল। হাসতে হাসতে বলল, পরীদের পাখা থাকে জানো না?
নূরী বলল, ও। তুমি তাহলে পরী? তোমাকে প্রথমে দেখেই আমি সন্দেহ করেছিলাম। পরী ছাড়া এত সুন্দর কেউ কখনো হয়? তা তুমি পরী হও আর ভূত হও, এ ঘরে ঢুকলে কেমন করে?
পরী বলল, সেটা জানা কি খুব দরকার? আমাকে তোমার ভালো লাগেনি? আমার সাথে গল্প করতে ভালো লাগছে না?
নূরী বলল, তুমি কতক্ষণ গল্প করতে চাও?
পরী বলল, তুমি কি সময় মেপে গল্প করো নাকি?
নূরী বলল, হ্যাঁ। কারণ আমাকে আগামী কাল স্কুলে যেতে হবে। স্কুলের পড়াগুলোতে একটু চোখ বোলাতে হবে। সময় নেই।
পরী বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। তোমার যখন সময়ের অভাব, তখন আর কী করা। চলি।
নূরী বলল, কিন্তু তুমি এ ঘরে ঢুকলে কেমন করে?
পরী বলল, এটা শোনার সময় তোমার হবে?
নূরী বলল, এটুকু বলেই তুমি চলে যাবে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে।
পরী বলল, উঁহু। পাঁচ মিনিটের মধ্যে বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আসলে তোমরা সময় মেপে চলতে চলতে সবকিছুতেই সময়ের হিসাব করো। এটা ঠিক নয়। সবকিছু কি সময় মেপে করা যায়? তুমিই বলো। কী এমন পড়া তোমার?
নূরী বলল, আগামীকাল আমার দুটো ক্লাস টেস্ট আছে। ক্লাস টেস্ট বোঝো?
NR_2 পরী বলল, কেন বুঝব না? অবশ্যই বুঝি। আমাদেরও ক্লাস হয়।
নূরী অবাক হয়ে বলল, তোমাদেরও ক্লাস হয়! কী ক্লাস হয় তোমাদের?
পরী বলল, অনেক রকম ক্লাস। তোমাদের যেরকম ক্লাস, আমাদেরও সেরকম ক্লাস। যেমন ধরো তোমরা ভাষা শেখার ক্লাস করো। আমাদেরও ভাষা শেখার ক্লাস আছে। যে যত বেশি ভাষা জানবে, সে তত বেশি জায়গায় যেতে পারবে। বাংলা ভাষা শেখার ক্লাস আমার খুব ভালো লাগে। আমাদেরও ক্লাস টেস্ট হয়। ক্লাস টেস্টে আমি সবচেয়ে বেশি মার্ক পেয়েছি। সেজন্যই তোমার এখানে আসার অনুমতি পেয়েছি।
নূরী বলল, কোথাও যেতে হলে তোমাদেরও অনুমতি নিতে হয় নাকি?

পরী বলল, অবশ্যই নিতে হয়। আমরা তো পরী। কে কখন কী ভাবে বন্দি করে ফেলে, ঠিক আছে নাকি? তাই আগে থেকে জানিয়ে আসতে হয়। তারপর আমাদের ম্যাডাম যখন অনুমতি দেন, তখনই কেবল আমরা আসতে পারি।
নূরী বলল, না জানিয়ে আসতে পারো না?
পরী বলল, নাহ্‌! না জানিয়ে আসা যায় না। না জানিয়ে কেমন করে আসব?
নূরী বলল, এখন যেমন করে এসেছ?
পরী বলল, এখন তো পাখায় ভর করে এসেছি। উড়ে উড়ে এসেছি।
নূরী বলল, না জানিয়ে বুঝি আসা যায় না?
পরী বলল, পাখাই তো দেবে না।
নূরী অবাক হয়ে বলল, পাখা দেবে না মানে?
পরী বলল, ও তুমি তো জানো না। আমাদের পাখা দুটো কিন্তু খুলে রাখা যায়। আমাদের পাখা জমা থাকে আমাদের দলনেত্রীর কাছে। কোথাও যাওয়ার অনুমতি পেলেই তবে পাখা দুটো দেয়া হয়। তার আগে নয়।
নূরী বলল, ও এবার বুঝেছি। তা পাখা ওলট পালট হয়ে যায় না?
পরী বলল, হয় না আবার! এই যে দ্যাখো-
বলেই নিজের পাখা দুটো দেখিয়ে বলল, এই ডানপাশের পাখাটা আমার। আর বাম পাশের পাখাটা হলুদপরীর। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে হলুদপরীর পাখা নিয়ে বেরিয়ে এসেছি। এতক্ষণে নিশ্চয়ই হইচই শুরু হয়ে গেছে।
NR_3 নূরী ভালো মতো পাখা দুটো লক্ষ্য করল। বলল, কিন্তু আমার কাছে তো একই রকম মনে হচ্ছে।
পরী বলল, তোমার কাছে একই রকম মনে হতেই পারে। খুব সূক্ষ্ম পার্থক্য তোমাদের চোখে ধরা পড়বে না। কারণটা কী জানো?
নূরী বলল, না। কিন্তু তোমার মতো আমারও দুটো চোখ। অবশ্য তোমার চোখ দুটো আমার চেয়ে অনেক সুন্দর। সুন্দর চোখে মনে হয়, আরও ভালো দেখা যায়।
পরীটা হাসল। হাসতে হাসতে বলল, উঁহু। তোমাদের এখানে বড্ড ধুলোবালি। ধুলোবালি তো সবকিছু কেমন ঝাপসা দেখায়। আমি যদি সাতদিন তোমাদের এখানে আসি, তাহলে আমিও চোখে ঝাপসা দেখা শুরু করব।

নূরী সেই তখন থেকে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়েই গল্প করছে পরীর সাথে। এতক্ষণ ও দাঁড়িয়ে থাকে না। পা ব্যথা করে। নূরী বলল, আমি তোমার পাশে বসব?
পরী বলল, সে কী! তোমার নিজের বিছানায় বসতে তুমি আমার কাছে অনুমতি চাইছ? বসো বসো। আচ্ছা তোমার সময় আছে তো?
নূরী পরীর পাশে বসতে বসতে বলল, কেন?
পরী বলল, গল্প করার জন্য। তোমাদের সবকিছুই সময় মেপে। শুনেছি এখন নাকি তোমাদের রান্নাও হয় সময় মেপে?
নূরী বলল, তা হয়। আমাদের ক্লাস, পরীক্ষা, বাইরে যাওয়া, ঘুমুতে যাওয়া- সবকিছুই সময় মেপে। তোমাদের ক্লাস কি সময় মেপে হয় না?
পরী বলল, না। আমাদের ক্লাস কতক্ষণ ধরে হয় কেউ জানে না। যার যখন যে ক্লাস করতে ভালো লাগে সে তখন সেই ক্লাস করে। আমাদের ওখানে তো কোনো ঘড়ি নেই। আমরা সময় মেপে কিছুই করি না। সামান্য একটা গোল যন্ত্রের কাছে তোমরা কেমন অসহায়, বন্দি- ভাবতেই অবাক লাগে।
নূরী বলল, এটা হচ্ছে সময়ানুবর্তিতা- বুঝলে?
পরী জানতে চাইল, এটা কি তোমাদের নিজেদের তৈরি করা?
NR_4 নূরী বলল, নাহ্‌! একসময় ইংরেজ নামের একটা জাতি আমাদের দুশো বছর শাসন করেছিল। ওরাই আমাদের সময়ানুবর্তিতার শিক্ষা দিয়ে গেছে।
পরী বলল, বুঝেছি। ওই যন্ত্রটার বহুল ব্যবহারও ওরাই শিখিয়েছে?
নূরী বলল, হতে পারে। এটা নিয়ে কখনো ভাবিনি।
পরী বলল, তোমাদের কোনো না কোনোভাবে বন্দি করে রাখার চেষ্টা ওরা করেছিল। এবং পেরেছে। সত্যিই তোমরা বন্দি হয়ে আছো।
নূরী বলল, শুধু আমরা কেন? পুরো পৃথিবীই তো সময় মেনে চলে।
পরী বলল, তাহলে ওরা বেশ ভালো ব্যবসায়ী ছিল বলে মনে হয়।
নূরী বলল, সেটা ঠিক বলেছ। ওরা বেশ ভালো ব্যবসায়ীও ছিল। কিন্তু তুমি কেমন করে বুঝলে?


পরী বলল, আমাদের দর্শন ক্লাসও হয়, জানো? তবে অতো কঠিন কিছু নয়। তোমরা দর্শন বলতে যেটা বোঝো, সেরকম নয়। আমাদের দর্শন মানে হচ্ছে কোনো প্রাণী বা বস্তুকে দ্যাখো, তাকে উপলব্ধি করো, তাকে বুঝতে চেষ্টা করো। সেটাই মিলিয়ে নিলাম। পুরো দুনিয়া যখন সময় মেনে চলে, তখন কী পরিমাণ ঘড়ির দরকার একবার ভেবে দেখো। ঘড়ির ব্যবসা নিশ্চয়ই বেশ জমজমাট তোমাদের এখানে।
নূরী বলল, তোমাদের দর্শন ক্লাস মনে হচ্ছে বেশ ভালোই জমে। আর কী কী ক্লাস হয় তোমাদের?
পরী বলল, গণিত, বিজ্ঞান, জ্যোর্তিবিদ্যা, জাদুবিদ্যা-সব।
নূরী জানতে চাইল, গণিত শিখে কী করবে তোমরা? তোমাদের কি গণিত লাগে?
পরী বলল, এখনও জানি না গণিত আমাদের কী কাজে লাগে। তবে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো কাজে লাগবে। তা না হলে শেখানো হত না। দরকার ছাড়া কোনো জিনিস আমাদের শেখানো হয় না।
নূরী বলল, আমাদের শেখানো হয়। এই যেমন ধরো রান্না। আমার মা নিয়মিত রান্নার ক্লাস করেন। কিন্তু কখনো বাসায় তিনি রান্না করেন না।
পরী বলল, তাহলে তোমাদের রান্না কে করে?
নূরী বলল, কে আবার? বাবুর্চি।
NR_5 পরী জানতে চাইল, তোমাদের সব মানুষের রান্নাই কি বাবুর্চি করে?
নূরী বলল, না।
পরী জানতে চাইল, বাবুর্চিরা দেখতে কেমন? ওরা কি অন্য কোনো দেশ থেকে এসেছে?
পরীর কথা শুনে নূরী হাসতে লাগল। হাসতে হাসতে বলল, ওরা আমাদের মতোই মানুষ। ওদের কাজই হচ্ছে রান্না করা। যেমন ধোপা। ধোপাদের কাজ হচ্ছে কাপড় ধোয়া। তারপর ধরো দারোয়ান। ওর কাজ হচ্ছে পাহারা দেয়া। ক্লিনারের কাজ হচ্ছে ঘর-দোর পরিষ্কার রাখা। মালির কাজ হচ্ছে বাগানের গাছপালার যত্ন করা। ড্রাইভারের কাজ হচ্ছে গাড়ি চালানো। তোমাদের এমন নেই?

পরী বলল, নাহ্‌! আমাদের সব কাজ আমরাই করি। আমাদের সবকিছু শিখে রাখতে হয়। যে যখন যে কাজের সুযোগ পায়, সে সেই কাজ করে। আমরা সবাই আনন্দ নিয়েই কাজ করি।
নূরী বলল, আমাদের মধ্যে কিন্তু তা নেই। যে যত বেশি কাজ না করে থাকতে পারে-এটাই চেষ্টা করে প্রায় সবাই। আবার কিছু আলসে আছে, যারা কাজই করতে চায় না।
পরী বলল, আলসে কী?
নূরী বলল, ও মা! তুমি আলসে কী সেটাও জানো না? কোন দেশে থাকো তুমি?
পরী হেসে বলল, জানো না বুঝি? পরীর দেশে থাকি। আলসে কী বলো না?
নূরী বলল, যারা কাজ করতে ভয় পায় এবং কাজ করে না, তারাই হচ্ছে আলসে। তোমাদের মধ্যে কোনো আলসে নেই?
পরী বলল, নাহ্‌! নেই দেখেই তো জানি না আলসে কী। আজ জানলাম। তোমাদের মধ্যে কাজ না করেও অনেকে থাকতে চায়? বড্ড অবাক হলাম তোমার কথা শুনে। কেমন করে থাকে কাজ না করে?
নূরী বলল, তা ছাড়া সবাইকে কাজ করতে হবে-এমন তো কোনো কথা নেই। সবাই কেন কাজ করবে?
পরী বলল, তোমাদের দেশের নিয়ম কেমন, বুঝি না। আমরা জানি কাজ করলে ভালো থাকা যায়। সুন্দর থাকা যায়। তাই আমরা সবাই কাজ করি। তোমার মনে হয় ঘুমুনোর সময় হয়ে গেছে। তোমরা তো আমার সময় মেনে চলো। তুমি তাহলে ঘুমোও।
NR_6 নূরী বলল, তুমি কেমন করে যাবে?
পরী বলল, যেভাবে এসেছিলাম।
নূরী জানতে চাইল, কীভাবে এসেছিলে?
পরী বলল, সেটা আমাদের একটা গোপন রহস্য। এই রহস্য কোনো মানুষকে শেখানোর নিয়ম নেই। তবে তোমাকে আমি একটা সূত্র দিতে পারি। তোমাকে বলেছিলাম না আমাদের জ্যোর্তিবিদ্যা ও জাদুবিদ্যা শেখানো হয়, ওখান থেকেই গোপন রহস্যটা শেখানো হয়। চলি। ভালো থেকো।
তারপর হঠাৎ নেই। নূরীর মনে হল ঘরটা এতক্ষণ ভরা ভরা লাগছিল। হঠাৎ নূরীর মনে হল, ঘরটা শূন্য হয়ে গেছে। আবার কবে পরীটা আসে কে জানে?


আহমেদ রিয়াজ/এবি/এমআইআর/১৪ এপ্রিল