মরগানস উডসের ভূত

অনীশ দাস অপু

wood-1

গরমের এক বিকেলে, সূর্য তখন কাছের স্মোকি মাউন্টেইনসের চূড়ার আড়ালে ডুব দেয়ার প্রস'তি নিচ্ছে, ওয়েড হ্যাম্পটন আর তার ভাই স্কট ঘোড়ায় চড়ে চলল ভূতুড়ে জঙ্গল মরগানস উডসে।

জঙ্গলটা নিয়ে নানারকম ভৌতিক কাহিনী প্রচলিত। কেউ কেউ নাকি আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধের সময়কার এক সৈনিককে জঙ্গলটাতে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে। লোকটা নাকি তার হারানো সৈন্যদলকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। আবার কেউ বলেছে তারা গোঙানির শব্দ শুনেছে। ব্যথায় কাতরাচ্ছিল কে যেন। তবে সত্যিকারের ভূতুড়ে কাণ্ড ঘটতে দেখেনি কেউ- সে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলো হ্যাম্পটন ভাইয়েরা।
ওয়েডের বয়স ১৪, স্কট ১৩। ওরা পূর্ব টেনেসিতে চাচা-চাচীর র‌্যাঞ্চে এসেছে গরমের ছুটি কাটাতে। দু’ ভাইই পাকা ঘোড়সওয়ার, আর সুযোগ পেলেই চতুষ্পদ প্রাণীটার পিঠে চেপে বসে। এ মুহূর্তে ওয়েড চালাচ্ছে পপেই নামের একটা স্যাডল ঘোড়া। ওটার গায়ের রঙ গাঢ় বাদামী। আর স্কটও চড়েছে আরেকটা স্যাডল ঘোড়ার পিঠে, নাম রেবেল।

ছুটিতে এ পর্যন্ত কী কী মজা করেছে তা নিয়ে গল্প করতে করতে এগোচ্ছিল দুই ভাই। হঠাৎ পপেই আর রেবেল কেমন অসি'র হয়ে উঠল। চিঁহিহি ডাক ছাড়ল ওরা, সজোরে পা ঠুকল মাটিতে। বারবার মাথা ওপর-নিচ করতে লাগল।
“কোনো কারণে উত্তেজিত হয়ে পড়েছে ঘোড়াদুটো।”, মন্তব্য করল ওয়েড।
“বুনো শুয়োরের গন্ধ পেয়েছে বোধহয়”, বলল স্কট। “ওগুলো তো খুবই বদ জানোয়ার।”

ঘোড়াদুটোর কান খাড়া হয়ে গেল- দেখে মনে হলো ভয় পেয়েছে ওরা।

নিজের ঘোড়ার ঘাড়ের ওপর ঝুঁকে এল ওয়েড, নরম গলায় পপেইকে বলল, “শান্ত হও, বেটা। সব ঠিক আছে।” জঙ্গলের ওপর চোখ বুলাল সে, কোনো মানুষ বা প্রাণী চোখে পড়ল না যা দেখে ঘোড়াগুলো ভয় পেতে পারে। কিন্তু পপেইর চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল, আরো জোরে জোরে ডাক ছাড়ল ও, অশান্ত ভঙ্গিতে খুর ঠুকল মাটিতে।
তার পাশে রেবেলও অসি'র হয়ে পড়েছে, পিছিয়ে যেতে শুরু করেছে, তাকে শান্ত করতে হিমশিম খেতে হলো স্কটকে। “এ্যাই, রেব, থামো!”, খেঁকিয়ে উঠল সে।
“ওদিকে কিছু একটা আছে যা দেখে ভয় পাচ্ছে ঘোড়াগুলো।”, বলল ওয়েড।
“এখন কী করব?”, বড় ভাইয়ের কাছে জানতে চাইল স্কট।
ওয়েড জবাব দেয়ার আগেই চেঁচিয়ে উঠল স্কট। “ওই দ্যাখো। গাছ-গাছালির মধ্যে। কী ওটা?

ডান দিকে তাকাল ওয়েড। দুশো গজ দূরে উজ্জ্বল, সাদা রঙের একটা প্রাণীকে দেখল এক ঝলক। বিদ্যুৎ গতিতে অদৃশ্য হয়ে গেল জঙ্গলের মধ্যে। “কী ওটা?”, বিড়বিড় করল ও।
“জানি না। হরিণ-টরিণ হবে হয় তো।”
“ধবধবে সাদা রঙের হরিণ এ জঙ্গলে আছে বলে শুনিনি কখনো।”, বলল ওয়েড। “আর ওটাকে তো হরিণের চেয়েও আকারে অনেক বড় মনে হলো। চলো তো গিয়ে দেখি।”
কিন্তু জঙ্গলের ভেতরে যেতে রাজি নয় ঘোড়া দুটো। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নিজেদের জায়গায়। আগে বাড়বে না।
“পপেইকে তো আগে কখনো এরকম করতে দেখিনি!”, অবাক হলো ওয়েড।
“রেবেলও নড়তে চাইছে না। ওই প্রাণীটার জন্যে ভয় পেয়েছে বোধহয়। চলো ফিরে যাই।”
“যাবার আগে ও জায়গায় একটা চিহ্ন রেখে দেব। কাল এসে যাতে চিনতে কষ্ট না হয়। জিনিসটা কী দেখতেই হবে আমাকে।”
ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়ল ওয়েড, ছ’টা ডাল জোগাড় করল। ওগুলো একটার ওপর আরেকটা রাখল। কোমর সমান উঁচু হলো ডালগুলো। আবার এদিকে এলে রাস্তা চিনতে অসুবিধে হবে না।

পরদিন ঘরের টুকিটাকি কাজগুলো তাড়াতাড়ি সারল দুই ভাই, তারপর চেপে বসল ঘোড়ার পিঠে, ছুটল মরগানস উডসের দিকে। মার্কারটা দেখার পরে ওয়েড বলল, “আমরা গতকাল প্রাণীটাকে এখান থেকে দুশো গজ ডানে দেখেছিলাম। ওটার পায়ের চিহ্ন আছে কী না দেখব।”
এবার আর ঘোড়াগুলো কোনো রকম প্রতিবাদ করল না। দুই ভাই পৌঁছে গেল সে জায়গায় যেখানে ভৌতিক সাদা প্রাণীটিকে দেখেছিল। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়ল ওরা, পরীক্ষা করে দেখল মাটি। পায়ের ছাপ খুঁজল। রেকুন আর হরিণের পায়ের ছাপ দেখল, তবে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ল না।
“অ্যাই, ওয়েড, এদিকে, এদিকে দ্যাখো!”, ডাকল স্কট।

একটা ঝর্ণার ধারে, তীরের নরম মাটিতে ফুটে আছে ঘোড়ার খুরের ছাপ। “ঘোড়ার পায়ের ছাপ!”, বলল ওয়েড। “ঘোড়াটা বোধহয় খাঁড়ির দিকে যাচ্ছিল।”
“সেই উজ্জ্বল রঙের প্রাণীটা তাহলে ঘোড়া ছিল!” বলল স্কট। “অন্ধকারেও যেন জ্বলজ্বল করছিল।”
wood-2 ঝর্ণার মধ্যে পাথরের টুকরো ছড়ানো ছিটানো। ওরা পাথরে সাবধানে পা ফেলে চলে এল অপর তীরে। “এদিকে আরো কয়েকটা পায়ের ছাপ আছে।” বলল ওয়েড। ছাপ লক্ষ করে এগিয়ে চলল ও, হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, “ওয়াও! স্কট দেখ!”
ঝুঁকল স্কট, চোখ বুলাল জমিনে। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না।
“কই, কিছু দেখছি না তো।”, বলল সে।
“মজাটা তো ওখানেই।”, বলল ওয়েড। ঝর্ণার তীর ঘেঁষা ঘোড়ার খুরের ছাপের দিকে আঙুল তুলল ও। “খুরের ছাপগুলো সোজা দশ গজের মতো এগিয়ে গেছে। তারপর হঠাৎ অদৃশ্য। ঘোড়াটা বাঁক নিলে আমরা ডানে বা বামে ট্র্যাক বা ছাপগুলো দেখতে পেতাম। কারণ এদিকের মাটি নরম। অথচ কোথাও পায়ের ছাপ নেই।”
“তাহলে কি ঘোড়াটা বাতাসে মিলিয়ে গেল?”
“অমন কথা বললে হাসবে সবাই।”, বলল ওয়েড। “কিন্তু এ ছাড়া অন্য কোনো ব্যাখ্যাও তো আমার মাথায় খেলছে না।”
ঝর্ণার আরেক পাশে ফিরে চলল ছেলেরা। ছাপগুলো কোত্থেকে এসেছে দেখার চেষ্টা করল। অবাক হয়ে লক্ষ করল ঝর্ণা থেকে ২০ গজ দূর থেকে পায়ের ছাপ শুরু হয়েছে। তার আগে কিছুই নেই।
“দেখে মনে হচ্ছে ঘোড়াটা যেন বাতাস ফুঁড়ে বেরিয়েছে, আমাদের সামনে থেকে দৌড়ে গেছে খাঁড়ির দিকে, তারপর মিলিয়ে গেছে ভোজবাজির মতো।”, মাথা চুলকে বলল স্কট।
“তবে একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি”, বলল ওয়েড। “ঘোড়াটা বুনো নয়। ওটার পায়ে নাল পরানো। এর মানে ঘোড়াটার কোনো মালিক আছে।”

সে রাতে, ডিনারের সময় ওরা তাদের চাচা-চাচীকে অদ্ভুত সাদা ঘোড়ার খুরের ছাপের কথা খুলে বলল।
“এদিকে কারো সাদা ঘোড়া আছে বলে আমার জানা নেই।”, বললেন জেব চাচা। “তোদের গল্পটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে আমার কাছে। তাছাড়া তোরা গিয়েছিলি মরগানড উডসে।”
“জেব”, চোখ রাঙালেন চাচী। “বাচ্চাগুলোকে ভয় দেখিও না।”
“ভয় দেখাচ্ছি না, ফে। তবে লোকে নানা কথা বলে ওই জঙ্গল নিয়ে। বলে ওটা ভূতুড়ে বন। অবশ্য ও বনে কখনো ভূত চোখে পড়েনি আমার।”, হাসলেন চাচা।
ফে চাচী ওদেরকে বললেন, “তোরা বাপু ও জঙ্গলে যাসনে- বিশেষ করে রাতের বেলায়।”
মুচকি হাসল ওয়েড। “কেন চাচী, তুমি নিশ্চয়ই ভূত বিশ্বাস করো না। নাকি করো?”
হপ্তাখানেক পরে, হ্যাম্পটন ভাইয়েরা একদিন সকাল সকাল ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়ল জঙ্গলের উদ্দেশে। উপত্যকা ঘিরে আছে কুয়াশায়, পাহাড়ের পাদদেশে গড়িয়ে গড়িয়ে ঢুকছে বাষ্পের মেঘ।
সেই ঝর্ণার কাছে চলে এল ওরা যেখানে সাদা ঘোড়াটিকে দেখেছিল। ঠিক করল এখানে গাছ কেটে মাছ ধরার একটা টং ঘর বানাবে। কুড়োল নিয়ে একটা ডুমুর গাছের দিকে পা বাড়াল ওয়েড। ঠিক সেই মুহূর্তে, ওদের কাছ থেকে কয়েক গজ দূরে চরে বেড়ানো ঘোড়া দুটো সতর্ক গলায় ডেকে উঠল চিঁহিহি করে। পা ছুঁড়তে লাগল ওরা, লাফাচ্ছে অস্থিরভাবে।
“ঘোড়াগুলো বোধহয় কিছু একটা দেখতে পেয়েছে।”, বলল ওয়েড। “চলো তো যাই।”
কিন্তু ঘোড়াদের কাছে যাবার আগেই কিসের ভয়ে যেন ছুটতে শুরু করল জানোয়ার দুটো।
“অ্যাই, পপেই, ফিরে এসো!”
“রেবেল! ফিরে আয় বলছি!”
চেঁচামেচি করেও লাভ হলো না। ছুটতে ছুটতে ভোরের কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেল ঘোড়া দুটো। ঘটনা কী! অবাক হলো ওয়েড।
“ওয়েড, তোমার পেছনে!”
পাঁই করে ঘুরল ওয়েড। কুয়াশা ফুঁড়ে দুলকি চালে বেরিয়ে এল ধবধবে সাদা রঙের একটা স্ট্যালিয়ন ঘোড়া। লম্বা মাথাটা উঁচু করে রেখেছে সে রাজার মতো, বাতাসে উড়ছে ফোলানো পশম। বড় নাকের পাটা বিস্ফারিত। তার ঘাড়ের নীচে থেকে বেরিয়ে মোটা কালো একটা দাগ শক্তিশালী বুকের মাঝখান পর্যন্ত ছুঁয়েছে।
“সাবধান!” চেঁচিয়ে উঠল ওয়েড। “ওটা সোজা আমাদের দিকে তেড়ে আসছে!”
পড়িমড়ি করে ছুটল ওরা। স্কট পা পিছলে দড়াম করে পড়ে গেল মাটিতে। চট করে ঘুরল ওয়েড। ভয় পেল ঘোড়ার খুরের নীচে চাপা পড়ে ভর্তা না হয়ে যায় তার ভাই। স্কটকে উদ্ধার করতে ছুটল সে। জড়িয়ে ধরল ভাইকে। দু’জনেই মাথা আড়াল করল হাত দিয়ে, শরীর গুটিয়ে নিজেদেরকে পরিণত করল বল-এ। প্রতি মুহূর্তে আশঙ্কা করল এই বুঝি খুরের আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে উঠবে ওরা। ভয়ঙ্কর খুরের শব্দ শুনতে পাচ্ছে ওরা। কাছিয়ে আসছে। হঠাৎ করে থেমে গেল শব্দ। ভয়ে ভয়ে মাথা তুলল ওয়েড, তাকাল চারদিকে।
“ঘোড়াটা কই?”, জিজ্ঞেস করল স্কট।
“নেই তো!”
“কিন্তু আমাদের দিকেই তো ছুটে আসছিল। গেল কোথায়?”
কাঁপতে কাঁপতে সিধে হলো দুই ভাই, চোখ বুলাল চারপাশে।
“পায়ের ছাপ!” উত্তেজিত গলায় বলল ওয়েড, “পায়ের ছাপগুলো দেখ। আমাদের কাছ থেকে পাঁচ ফুট দূরে এসে যেন থেমে গিয়েছিল ঘোড়াটা।”
“ছাপ দেখে মনে হচ্ছে ঘোড়াটা দিক পরিবর্তন করেনি। স্রেফ যেন মিলিয়ে গেছে বাতাসে।” আঙুল মটকাতে মটকাতে বলল স্কট। “ব্যাপারটা কেমন গা ছমছমে না? চলো, এখান থেকে চলে যাই।”

শিস দিল ওরা। ঘোড়াগুলোকে ডাকছে। সিকি মাইল দূরে দেখতে পেল ওগুলোকে। বাড়ি ফিরে সাদা স্ট্যালিয়নের গল্প বলল ওরা পুরাবো র‌্যাঞ্চ হ্যান্ড উইলি পিকেটকে।
wood-3 উইলি ব্রাশ দিয়ে গা ঘষছিল তার ঘোড়ার। গল্প শুনে মাথার কাউবয় হ্যাটটা খুলে হাতে নিল। ফোলা চিবুক চুলকোতে চুলকোতে বলল, “ঘোড়াটার গলার নিচ থেকে বুক পর্যন্ত কালো রঙের মোটা দাগ আছে?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ আছে।”, বলল ওয়েড। “তুমি দেখেছ ঘোড়াটাকে?”
“মনে হচ্ছে ওটা আলবাস্টার।”
“কার ঘোড়া ওটা?”, জিজ্ঞেস করল স্কট।
“সম্ভবত উইনফিল্ড মরগানের।”
“মরগান উডসের সাথে উইনফিল্ড মরগানের কোনো সম্পর্ক আছে কি?”
মাথা ঝাঁকাল উইলি। “ওর নামেই জঙ্গলটা।”
“কিন্তু আমি শুনেছি মরগান নামের এক লোক ১৮০০ সালে মারা গেছে।”, বলল স্কট।
আবার মাথা দোলাল। “এটা সেই মরগানই।”
“দাঁড়াও! দাঁড়াও!”, বলল ওয়েড। “তুমি নিশ্চয়ই বলতে চাইছ না, যে ঘোড়াটাকে আমরা দেখেছি ওটার মালিক একশো বছর আগের কেউ?”
“আমি তাই বলতে চাইছি।”, বলল ওয়েড।
“আমাদেরকে বোকা পেয়েছ?”, মুখ বাঁকাল স্কট। “কোন ঘোড়া এত বছর বেঁচে থাকে, নাকি?”
“কে বলেছে ওটা বেঁচে আছে?”, একটা ভুরু উঁচিয়ে বলল উইলি।
“তুমি আসলে ঠাট্টা করছ, না?”, বলল ওয়েড।
“না। ঠাট্টা করছি না। আমার ধারণা, আজ তোমরা যে ঘোড়াটাকে দেখেছ ওটা আলবাস্টারের ভূত, উইনফিল্ড মরগানের সবচেয়ে প্রিয় এবং গর্বের প্রাণী।”

পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল ওরা। হাসছে। ওদের কোনো সন্দেহ নেই উইলি সুযোগ পেয়ে বানোয়াট একটা কেচ্ছা শোনাবার পাঁয়তারা কষছে। না শুনলে বুড়ো মনে দুঃখ পাবে ভেবে ওরা ঠিক করল বুড়োকে গল্পটা বলার সুযোগ দেবে।
উইলি আস্তাবলের দরজায় হেলান দিয়ে বসল, হাতে তৈরি একটা দাঁত খিলান নিয়ে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে শুরু করল গল্প।
“উইনফিল্ড মরগানের পরিচয় দিয়ে নিই আগে। ঊনবিংশ শতকে সে ছিল যথেষ্ট সম্পদশালী একজন মানুষ। এসব এলাকার বেশিরভাগের মালিক ছিল সে, এখানে গরু-ভেড়া আর ঘোড়ার খামার গড়ে তুলেছিল। আলবাস্টার নামে বিশালদেহী এক সাদা স্টালিয়ন ছিল তার। ওটার পিঠে চড়ে নিজের সাম্রাজ্য দেখতে বেরুত মরগান।
“মরগান আর আলবাস্টার ছিল যেন হরিহর আত্মা। দু’জনকে সবসময় একত্রে দেখা যেত। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত তৃণভূমি থাকলেও মরগান তার ঘোড়া নিয়ে জঙ্গলে সময় কাটাতে ভালবাসত। ওখানে বসে নানা পরিকল্পনা করত সে।”
“মরগানের টাকার অভাব ছিল না, শত শত মাইল জমি ছিল, ছিল হাজার হাজার গরু-ভেড়ার মালিক। তবে তার সবচেয়ে প্রিয় ছিল জঙ্গলের গাছপালা-বীচ, এলম, হিকোরি, ওক এবং ডুমুর। এসব গাছ কখনো কাটত না মরগান। শত শত একর জুড়ে তাই ঘন হয়ে জন্মাত বৃক্ষরাজি। মরগানের বৃক্ষপ্রীতি এতটাই প্রবল ছিল যে সে তার শ্রমিকদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছিল হুকুম ছাড়া একটা গাছও কাটা যাবে না। যদি বিশেষ প্রয়োজন হতো গাছ কাটার, আলবাস্টারের পিঠে চড়ে জঙ্গলে যেত মরগান। পরীক্ষা করে দেখত কোন গাছটা কাটার উপযোগী হয়েছে। তার কাছে প্রতিটি গাছের আলাদা ব্যক্তিত্ব ছিল। গাছগুলোকে সে মনে করত জীবন্ত প্রাণী যাদেরকে যত্ন করা এবং নিরাপত্তা প্রদান তার অবশ্য কর্তব্য। কেউ জ্বালানী কাঠের জন্যে গাছ কাটতে গেলেও তার ওপর হামলে পড়ত মরগান। ওই লোককে ঘাড় ধরে বের করে দিত জমি থেকে।”, পরস্পরের দিকে তাকাল দুই ভাই অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে। “উইলি,” বলল স্কট। “আমরা একটা গাছ কাটতে গেছি এমন সময় ভোজবাজির মতো হাজির হয়ে গিয়েছিল সাদা ঘোড়াটা!”
“দেখলে তো? আলবাস্টার ওই জঙ্গলে ঢুকলে সে একদম শান্ত হয়ে যেত। আর সে বনে ঢুকলে বনভূমি যেন আলো হয়ে যেত। তার সাদা চামড়ার দ্যুতিতে ভরে উঠত সারা জঙ্গল।”

“ঘোড়াটাকে দেখে মনে হচ্ছিল ওটার গা ফুটে আলো বেরুচ্ছে।”, মন্তব্য করল স্কট।
“কী যেন বলছিলাম?”, দাঁত খিলানটা মুখের এক কোণায় জিভ দিয়ে সরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করল উইলি। “ও, আচ্ছা, মরগানের কথা। ১৮৬৪ সালে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ wood-4চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে যাচ্ছিল। জীবনটা নিরস আর তেতো হয়ে ওঠে মরগানের কাছে। ইউনিয়ন ট্রুপস গ্রামের মাঝ দিয়ে এগোচ্ছিল, সামনে যা পাচ্ছিল সব ধ্বংস করে দিচ্ছিল। ইয়াংকিরা কৃষকদের বাড়িঘর লুট করে, খামারে আগুন দিয়ে নরম গুলজার করছিল।
“নীলকোটঅলারা যেবার এসে পৌঁছুল মরগানের প্রকাণ্ড র‌্যাঞ্চে, সে ওদেরকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল। ভেবেছিল আদর যত্ন করলে ওরা তাকে কিছু বলবে না। কিন্তু ধারণাটা ছিল ভুল। লোকগুলো কোত্থেকে শুনেছে মরগান বাড়িতে সোনার পাহাড় গড়ে তুলেছে। তারা সোনার ভাগ চেয়ে বসল। মরগান বলল তার কাছে কোনো সোনা নেই। ওরা তখন হুমকি দিল সোনা না দিলে মরগানের গোলাঘর পুড়িয়ে দেবে। কিন্তু ওদের সঙ্গে কথা বলতে ঘেন্না লাগছিল মরগানের। চুপ করে রইল। ওরা মরগানের গোলায় আগুন লাগিয়ে দিল।
“গোলা জ্বলছে দাউ দাউ করে, সৈন্যরা ছুটল জঙ্গলের দিকে। সেই পথ ধরে যে রাস্তা দিয়ে ঘুরে বেড়াত মরগান আলবাস্টারকে নিয়ে। বেয়োনেট দিয়ে জমিন খুঁড়ে ফালাফালা করে ফেলল ওরা সোনার খোঁজে, কিন্তু পেল না কিছুই।
“জঙ্গলের গভীরে ঢুকে গেল সৈন্যরা, হঠাৎ ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি শুনতে পেল। ডাক শুনে সেদিকে চলল তারা, চলে এল জঙ্গলের প্রত্যন্ত এলাকায়। ওখানে অপূর্ব সুন্দর একটা ঘোড়া দেখতে পেল ওরা। আলবাস্টার। গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে। মরগানই খাবার আর পানি দিয়ে ওকে লুকিয়ে রেখেছিল ইয়াংকিদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে।
“সৈন্যদের ঘোড়ার ডাক শুনে প্রত্যুত্তরে আলবাস্টারও ডেকে ফেলেছিল। প্রকাশ করে ফেলেছিল তার লুকানো আস্তানার অস্তিত্ব। আর ওখানেই, খড়ের একটা গাদার নীচে তার সোনা লুকিয়ে রেখেছিল মরগান। সোনা লুটে নিল সৈন্যরা, আলবাসটারকে ধরে নিয়ে ফিরে চলল র‌্যাঞ্চে।’
“মরগান সৈন্যদের কাতর অনুরোধ করল। বলল সোনা তারা নিয়ে যাক, কিন্তু আলবাস্টারকে যেন ছেড়ে দেয়। ঘোড়াটাকে প্রচণ্ড ভালবাসত সে। কিন্তু এত সুন্দর একটা ঘোড়ার লোভ সামলানো কঠিন। সৈন্যরা আলবাস্টারকে নিয়ে চলে গেল। যাবার মুহূর্তে শেষবারের মতো মরগানের দিকে ঘুরে তাকাল আলবাস্টার। বড় বড় চোখে করুণ দৃষ্টি। মালিকের সাথে আর দেখা হবে না যেন জানত সে।
“আলবাস্টারকে হারাতে যাচ্ছে দেখে এতই ক্রুদ্ধ হয়ে পড়ল মরগান যে পর্চের ফ্লোরবোর্ডের নীচে রাখা পিস্তল বের করে গুলি করে বসল তার প্রিয় ঘোড়ার পিঠে বসা ঘোড়সওয়ারকে। সাথে সাথে সৈন্যরা গুলি করে মেরে ফেলল মরগানকে।”
“আর আলবাস্টারের কী হলো?”, জিজ্ঞেস করল স্কট।
“শোনা যায় মরগানের মৃত্যুর কয়েকদিন পরেই মারা যায় আলবাস্টার। মালিকের শোক সইতে না পেরেই হয়তো। তারপর তার প্রেতাত্মা ফিরে আসে জঙ্গলে। তখন থেকে সে জঙ্গল পাহারা দিচ্ছে আর খুঁজে বেড়াচ্ছে তার প্রভুকে।”
গল্প শেষ হবার পরে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বসে রইল দুই ভাই। তারপর ওয়েড মন্তব্য করল, “দারুণ একটা গল্প, উইলি।”
“এটা গল্প নয়, খোকা। সত্য ঘটনা।”
“তুমি কখনো আলবাস্টারের ভূতকে দেখেছ?”, জিজ্ঞেস করল স্কট।
“নাহ্‌। কেউ দেখেছে বলেও শুনিনি। আজ শুনলাম তোমরা নাকি দেখেছ।”

ছুটির শেষ মাসটাতে ওরা আরো বার কয়েক মরগানস উডসে গেল। তবে একবারের জন্যেও দেখা পেল না সাদা ঘোড়াটার। ছুটি শেষ হবার দিন দুই আগে, ওয়েড পপেইকে নিয়ে একাই বেরুল। চাচীকে বলে গেল কাছে লেকে যাচ্ছে। ফেরার পথে একটা ঈগল চোখে পড়ল ওর, ওটার পিছু নিল ওয়েড। ঈগলটা উড়ে এসে বসল মরগানস উডসের জঙ্গলের একটা গাছের ওপর।

হঠাৎ চিঁচিহি ডাক ছাড়ল পপেই। সাথে সাথে ওয়েডের কানে ভেসে এল র‌্যাটল স্নেকের লেজের ঝুমঝুমির শব্দ। নীচে তাকাল ও। দেখল ভয়ঙ্কর সরীসৃপটা কামড়ে wood-5দিয়েছে পপেইর সামনের ডান পা। প্রচণ্ড যন্ত্রণা আর ভয়ে পাগলের মতো লাফিয়ে উঠল পপেই। ধাক্কার চোটে ওর পিঠ থেকে ছিটকে গেল ওয়েড, দড়াম করে আছড়ে পড়ল একটা পাথরের ওপর। বাম পা খানায় কট করে শব্দ হলো। তীব্র ব্যথায় মুখ নীল হয়ে গেল ওয়েডের। পা ভেঙে গেছে ওর। পরে অবশ্য এক্সরে করে দেখা গেছে শুধু পা-ই ভাঙেনি ওয়েডের, পতনের চোটে তার কলারবোন এবং পাঁজরের কয়েকটা হাড়ও ভেঙেছে। ব্যথার তীব্রতায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলল ও।

কতক্ষণ পরে জ্ঞান ফিরে পেয়েছে জানে না ওয়েড, উঠে বসার চেষ্টা করল। ভয়ানক ব্যথায় কাতরে উঠল। ভাগ্য ভাল, সাপটা চলে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ওয়েডের, গোঙাতে শুরু করল। ভাবল এত বেশি লেগেছে আমার যে হাঁটা দূরে থাক, উঠেই দাঁড়াতে পারব না। চিৎকার করার শক্তিও নেই। কেউ জানে না আমি এখানে। ফে চাচীকে বলেছি লেকে যাচ্ছি বেড়াতে। তারা আমার দেরি দেখলে জঙ্গলে খুঁজতে আসবে না নিশ্চয়ই। পপেই হয়তো গোলা ঘরে ফিরে যাবে। ঘোড়সওয়ার না থাকলে ঘোড়ারা তাই করে। পপেইকে একা ফিরতে দেখলে তখন হয়তো ওরা বুঝতে পারবে কোথাও একটা গোলমাল হয়েছে। খুঁজতে বেরুবে আমাকে। কিন্তু মরগানস উডসে আমি পা ভেঙে পড়ে আছি তা তো কেউ জানে না। এখানে ওরা খুঁজতে আসবে সে ভরসাও কম। শুধু আশাই করতে পারি।

এমন সময় ঘোঁত করে উঠল কিছু একটা। ঘোড়ার শব্দ! পপেই নাকি? নাকি কেউ খুঁজতে বেরিয়েছে ওকে। দুর্বল শরীর নিয়ে আবার উঠে বসার চেষ্টা করল ওয়েড। কাঁধ আর পাঁজরের প্রচণ্ড ব্যথা সয়েও পাথরের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারল ও।
পপেই-ই বটে! কিন্তু বেশ কয়েক গজ দূরে মাটিতে শুয়ে আছে ঘোড়াটা। হাঁপাচ্ছে বেদম। ওর ডান পা ফুলে ঢোল।

আবার শুয়ে পড়ল ওয়েড। ভাবল রাত নামার আগে কেউ আমার জন্যে চিন্তাই করবে না। কেউ কল্পনাই করবে না আমি হারিয়ে গেছি। তার মানে কাল সকালের আগে কেউ আমাকে খুঁজতে বেরুবে না। ওহ্‌, এর মধ্যে ব্যথায় তো আমি মরেই যাব।

মাথা ঝিমঝিম করছে ওয়েডের, আবার জ্ঞান হারাতে চলেছে। এমন সময় আবার ঘোড়ার নাক দিয়ে ‘ঘোঁত’ শব্দ করতে শুনল ও, চিঁহিহি করে ডেকে উঠল ঘোড়াটা। অনেক কষ্টে মাথা উঁচু করে পপেই’র দিকে তাকাল ওয়েড। পপেই ডাকছে না। চিঁহিহি শব্দ করছে সেই রহস্যময় সাদা ঘোড়া, সামনের পা জোড়া উঁচু করে ডাকছে।
“আলবাস্টার?”, বলল ওয়েড। তারপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল ও।

“উইলি, এদিকে এসো!”, ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলেন জেব চাচা।
“ওই যে পপেই। ও বোধহয় আহত হয়েছে। ওয়েড নিশ্চয়ই কাছে পিঠে কোথাও রয়েছে। ওয়েড? ওয়েড, কোথায় তুমি?”
wood-6 জ্ঞান ফিরেছে ওয়েডের, কিন্তু মাথায় ভীষণ যন্ত্রণা, তবু ক্ষীণ গলায় জানান দিল, “আমি এখানে! পাথরের পেছনে।”
ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নামলেন জেব চাচা, দৌড়ে গেলেন আহত ছেলেটার কাছে। “ওয়েড! তুমি ঠিক আছ তো?”
“জেব চাচা, তোমাকে দেখে কী যে ভাল্লাগছে আমার! আমার পা ভেঙেছে, পাঁজরের হাড়ও সম্ভবত।”
“কী হয়েছে?”
“একটা র‌্যাটলস্নেক কামড়ে দিয়েছিল পপেইকে। ও যন্ত্রণায় লাফিয়ে ওঠে। আমি ওর পিঠ থেকে একটা পাথরের ওপর ছিটকে পড়ে যাই। পপেই কি মারা গেছে?”
“না। তবে ওর অবস্থা খুবই খারাপ।” উইলির দিকে ফিরে চেঁচিয়ে উঠলেন চাচা। “এখুনি র‌্যাঞ্চে ফিরে যাও। ডাক্তার আর স্ট্রেচার নিয়ে এসো। ওয়েড সাংঘাতিক আহত হয়েছে। পশু হাসপাতালের ডক্টর স্যান্ডার্স আছেন। ওনাকেও খবর দেবে। বলবে সাপে কাটা একটা ঘোড়ার চিকিৎসা করতে হবে। জলদি যাও!”
“জেব চাচা,” গোঙাতে গোঙাতে বলল ওয়েড। “এখন কি সকাল?”
“না। এখন বিকেল পাঁচটা বাজে। কেন?”
“এত তাড়াতাড়ি আমার খোঁজ পেলে কী করে? কেউ জানে না আমি এদিকে এসেছি।”
“আধঘণ্টা আগে আমি আর উইলি ঘোড়ায় চলে আসছিলাম গরুর পাল নিয়ে। হঠাৎ দেখি মরগানড উডস থেকে ছুটে বেরিয়ে এল একটা সাদা স্ট্যালিয়ন। সোজা আমাদের দিকে আসতে লাগল। ঘোড়াটাকে দেখে ভয় পেয়ে গেল গরু আর ঘোড়াগুলো। আমরাও ওটাকে দেখে অবাক। কারণ এত বড় স্ট্যারিয়ন এদিকে আগে কখনো দেখেনি।
“ঘোড়াটা ঘোঁত ঘোঁত করতে করতে ছুটতে লাগল। একবার এদিকে যাচ্ছে, আরেকবার ওদিকে। আমরা দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছিলাম ওটাকে। হঠাৎ মনে হলো রেগে গেছে ঘোড়াটা। বেড়ার গায়ে লাথি মারতে লাগল। লাথির চোটে বেড়ার একটা অংশ ভেঙেই ফেলল। তখন খুব রাগ হলো আমাদের। ওটাকে তাড়া করলাম। মরগানস উডস লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল স্ট্যালিয়ন। অদ্ভুত ব্যাপার হলো ঘোড়াটা কিন' আমাদের কাছ থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না। তারপরও ওটাকে ধরতে পারছিলাম না আমরা। মনে হচ্ছিল ওটা একবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে আবার দৃশ্যমান হচ্ছে। শেষবার ওকে দেখতে পাই পপেই’র কাছে। এখানে আসার পরে আর দেখতে পাইনি স্ট্যালিয়নকে। তারপর তোমাকে খুঁজে পেলাম।”
“ঘোড়াটার বুকে কি কালো, লম্বা দাগ ছিল?”
“হ্যাঁ, ছিল।”
“তাহলে ওই ঘোড়াটাকেই আমি এবং স্কট দেখেছি। ওর নাম আলবাস্টার, আমাকে আজ রক্ষা করেছে সাদা স্ট্যালিয়নটার ভূত!”



অনীশ দাস অপু/এবি/এমআইআর/০৬ ডিসেম্বর