অদ্ভূতুড়ে কিন্তু ভূতুড়ে নয়

বিজয় মজুমদার

odvuture-1.jpgযে বাসাটা পছন্দ হয়েছে, সেটা একদম শহরের প্রান্তে। একতলা বাড়ী। বাগান আর গাছগাছলা আছে বেশ। আশেপাশে আর কোন বাড়ী নেই। বাড়ী থেকে বাজারটাও বেশ দুরে। আমি লেখালেখির কাজ করি। কাজেই এ রকম একটা বাড়ী দরকার। রান্নার ভার মাকু মিয়ার উপর। আমার সংসারে আমি ছাড়া সেই দ্বিতীয় ব্যক্তি। আশেপাশের লোকজন বাড়ীটার ব্যাপারে কেমন যেন এড়িয়ে যাচ্ছে। শুধু এতটুকু জানা গেল বাসাটা খালি।
বাড়ীঅলার বাস শহরের মাঝে। সেখানেই পরিবার পরিজন নিয়ে থাকেন। ভারী সজ্জন মানুষ। তবে বাড়ী ভাড়া চাইতেই কেমন চমকে গেলেন। বললেন, “ও বাসা এখন ভূতুড়ে। তিন মাস ধরে ওরা যাচ্ছে আসছে।” বাড়াবাড়ী না করেই বলে ফেললেন বাড়ীঅলা।
“কারা! ভূত!” , আমার প্রশ্নে বাড়ীঅলা বিচলিত।
“ভাড়াটিয়ারা। আসছে আর যাচ্ছে। এসেই পালিয়ে যায়। ভূতের ভয়ে। এ রকম ভূতুড়ে বাসা পড়ে থাকাই ভাল। ভাড়া দিলেও ভাড়াটিয়ারা পালিয়ে যাবে, এটা বরদাস্ত করার নয়।”, বাড়ীয়ালার সাফ জবাব।
“আপনার বাসাটা দিব্যি খাসা।”, আমার জবাব । “তাছাড়া এমন সুন্দর নির্জন বাসা আমি আর দেখিনি। ভূতও দেখিনি, বাইরে থেকে অবশ্য যতটুকু দেখা যায়।”
“ভূত কি দেখা যায়? ওরা যদি সমাজে ঘুরে বেড়াতো, তাহলে তো ওরা মানুষ বলেই গণ্য হত। ভারী অসামাজিক ওরা।”, বাড়ীঅলার তৈরি জবাব ।
“তা বটে! শুনেছি ভূতেরা অশরীরী আত্মা।”, আমি বলি। “তবে ব্যাপারাটা কেমন যেন ধোঁয়াটে!”
“ভূত দেখা! ও আমি এখনও দেখে উঠতে পারি না। তবে যা অনুভব করেছি। ওতেই ভিরমি খেয়েছি।”, বাড়ীঅলা বললেন।

আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি। “আপনি ভূত দেখেননি, কারণ ভূত থাকে শুধু মানুষের কল্পনায়। ভূত থাকে কোন পোড়ো বাড়ীতে, জঙ্গলের ধারে, নির্জন জায়গায়, বুড়ো বটগাছের উপর, তেঁতুল গাছ এর মাথায়। খেয়াল করে দেখবেন, ভূতেরা থাকে নির্জন জায়গায়। যেখানে মানুষের বসতি নেই, সেখানেই ভূতের বাস। ভূত নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছি আমি। আমার ধারণা, ভূতেরাও মানুষকে ভয় পায়। পদার্থবিদ্যা বলে, কোন কিছু দেখার জন্য আলো দরকার। মানুষ ভূত দেখে কোথায়? অন্ধকারে, কোন রকম আলো ছাড়াই। আসলে ভূতকে না দেখেই মানুষ ভূত দেখে। মানুষ অন্ধকারকে ভয় পায়। অন্ধকারই- হল ভূত। দেখেন, শহরে ভূত আর প্রায় নেই। তারা গিয়ে সব গ্রামের শ্যাওড়া তলায় আশ্রয় নিয়েছে”, আমি এমনভাবে কথাটা শেষ করি যেন আমি কোন ভূত বিশেষজ্ঞ।
“আপনি বলতে চাচ্ছেন ভূত বলতে কোন কিছু নেই!”, বাড়ীয়ালা ভূতদের এমনভাবে উড়িয়ে দেয়াকে সহ্য করতে পারেননি বোধহয়?
“না না!”, আমি বলি, “অবশ্যই ভূত আছে। ভূত আছে কল্পনায়, ভূত আছে সাহিত্যে। ভূত আছে নানা জটিলতায়।”
“আহ! আপনার কথা শুনে বেশ ভালো লাগছে। কিন্তু আপনি আমাকে বলুন, ভূত দেখার লক্ষণ কী কী?”, বাড়ীঅলা জিজ্ঞেস করলেন।
“যেমন ধরুন একটা ফাঁকা বাড়ী। মানুষ নেই। সে বাসার সবকিছু শূন্যে উড়ছে। ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলার আওয়াজ। যেন চাপা কান্না। উড়ছে নানা জিনিষ, কিন্তু কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ পায়ের আওয়াজ, মনে হবে বিড়ালের। অথচ ঘরে কোন বিড়ালের উপস্থিতি চোখে পড়ছে না। অবশ্য এসবই শহুরে ব্যাপার-স্যাপার। গ্রামের ব্যাপারটা ভিন্ন।”

odvuture-2.jpgআমার কথা শেষ হবার আগেই বাড়ীঅলা বলেন, “তাহলে আমার বাসায় অবশ্যই ভূত আছে। সব লক্ষণ মিলে যাচ্ছে। তিন মাসে আমার ভাড়াটিয়া, আর আমি নিজেই এই রকম হতে দেখেছি।”
“আপনি নিজের চোখে দেখেছেন!”, আমার প্রশ্নটা বোকার মত হয়ে যায়।
“নিজের চোখেই তো দেখে মশাই। তবে ভূত নয় ভূতের কাণ্ডকারখানা।”, বাড়ীয়ালা আমার প্রশ্নের একটা দাঁত ভাঙ্গা জবাব দেন। “যা যা বলেছেন সবাই মিলে যাচ্ছে। প্রথম প্রথম আমিও বিশ্বাসই করিনি। দুষ্ট লোক নানা ফন্দি-ফিকিরে থাকে। কেউ বাড়ীটাকে দখল করতে চায়, এ রকম ব্যাপার ভেবে ভূতকে উড়িয়ে দিয়েছি। শেষে নিজেই উড়ে যাচ্ছিলাম আরেকটু হলে। ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ করছে হরদম। নিজের বাসায় দেখি শূন্যে উড়ছে সব। আমি নিজেই ভিরমি খাবার জোগাড়।
“গত তিনমাসে ছটি ভাড়াটে বাড়ী ছেড়ে পালিয়েছে। ছোটখাট ভূতাংক রোগ স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধেছে দুজনের। সব কিছুতেই ভূত দেখছে তারা। এমনকি দেশের রাজনৈতিক সংকটও, ওটাও নাকি ভৌতিক ব্যাপার। দেখেন না দেশের রাজনীতির অনেক সংকট সমাধান হচ্ছে। ভূত সংকটের কোন সমাধান হয়?
“দু’জন সাহসী যুবক থেকেছে একরাত । পরদিন সকালে তাদের উদ্ধার করা হয়, পাশের এঁদো ডোবা থেকে। তাদের কাঁপুনি শীতে না ভূতের ভয়ে, বোঝা মুশকিল। এক ভবঘুরে রাত কাটাতে গিয়েছিল। এরপর তার লোটা কম্বল রেখেই পালিয়েছে। দুটি ভিক্ষুক খালি বাসা দেখে ঢুকে পড়েছিল। রাত পোহাবার আগেই কেটে পড়েছে। এমনকি আগের দিন পাওয়া ভিক্ষার চাল রেখেই। চোর সিঁদ কাটতে গিয়ে সাধু হয়ে গেছে। বলতে গেলে সারাদিন পার হয়ে যাবে। এরপর মানুষ আর ও বাড়ীমূখো হয় না।”, একটু দম নেন বাড়ীঅলা।

odvuture-3.jpgতারপর আবার বলতে শুরু করেন, “আপনি যা বলেছেন, তার সঙ্গে মিলে গেছে। যদি ও বাড়ীতে থাকতে চান, তবে দেখবেন, এমনি এমনি দরজা খুলে গেছে। ঘাড়ের কাছে কেউ কিছু বলার চেষ্টা করছে। ঘাড় ঘোরালেই বাতাস। শুনবেন, আরশোলার উড়ে যাওয়ার শব্দ। বাঁদুড় বা চামচিকে না পাওয়া গেলেও চিকা আছে বিস্তর। দেখা যাবে না, শুধু তাদের কিচ কিচ আওয়াজ শুনে বুঝে নিতে হবে। বেড়াল আছে, ভূতুড়ে। তার সঙ্গে হরদম চিকাদের খটমট লেগেই আছে। সবকিছুই লোক চক্ষুর আড়ালে। এসবই তো ভৌতিক ব্যাপার নয় কি?”

আমি হা হয়ে বাড়িঅলার কথা শুনছিলাম। দম ছেড়ে আবার শুরু করেন বাড়ীঅলা, “আমিও শূন্যে প্লেট ছুড়ে দেখেছি। কে যেন লুফে নেয়, আবার ছুঁড়ে মারে। আমারই দিকে। ভূতেরা মনে হয় লোফালুফি খেলা পছন্দ করে। পরে কে যেন আমার পিঠে এমন কিল বসিয়ে দিল! ভূতের কিল। আজও পিঠ সোজা হয়নি আমার। ভূতের কিল আর খেতে চাই না। খাওয়াতেও চাই না ভাড়াটিয়াদের। মোটেও উপদেয় নয় সেটা। বেশ বোঝা যায়। তারচেয়ে বাড়ীটা পড়ে থাকুক।”, বাড়ীঅলা একটা নিঃশ্বাস ছাড়ে, ওটা দীর্ঘ হতে হতে বেশ ভূতুড়ে শোনায়।

“নিশ্চয় সবসময় বাড়ীটা এমন ভূতুড়ে ছিল না।”, আমার কথায় বাড়ীঅলা সম্বিত ফিরে পান।

odvuture-4.jpgআবার শুরু করেন তিনি, “এখন থেকে তিনমাস আগে যখন ? প্রফেসার ভূলোমন আমার বাসা থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রফেসার ভূলোমন, বাসা ভাড়া নিতে আসেন। এসে উনার পরিচয় দিতে উনি ভূলে যান। শুধু বলেন বাসাটা তার ভারী পছন্দ। পরের দিন উনি আবার এলেন। কী কারণে এলেন আবার তা ভূলে গেলেন।

“শেষে এলো তার সহযোগী। নাম চিন্টু। তার কাছেই জানলাম, প্রফেসার ভূলোমনের প্রকৃত নাম গনি আদম। একজন গবেষক। বাবা অনেক টাকা রেখে গেছেন। এই শহরে আলাদা বাসায় গবেষণা করতে চান।

“মানুষটাকে দেখে সজ্জন মনে হল। আর বড় কথা উনি অনেক টাকা দিয়ে বাসাটা নিতে চাইছেন, তাও নগদে। টাকার কারণেই তেমন খোঁজখবর করিনি। দিয়ে দিলাম বাসাটা ভাড়া।

“মাসের প্রথম দিনই ভাড়া পেয়ে যেতাম। তবে দেখতাম, বাসাটায় কেমন যেন সব রহস্যময় জিনিসপত্র। গোলটা বাঁধল মাস তিনেক আগে, যখন প্রথম তারিখে বাসা ভাড়া এলো না। ভাবলাম দু একদিন দেরি হতেই পারে। মাসের দশ তারিখ পার হয়ে গেল, কারো কোন দেখা নেই। ভাবলাম, এবার একটু খোঁজ নিই। গয়ে দেখলাম, বাসাটার সব কিছুই ঠিকঠাক আছে, শুধু লোকজন নেই। মানুষ তো দুরে থাক কোন প্রাণীও নেই সেখানে। সব যেন অন্য কোন জগতে চলে গেছে।”

odvuture-5.jpg“বারমুড়া ট্রায়াঙ্গলের মতো ব্যাপার স্যাপার।”, বাড়ীঅলার ছেলে যে কোন ফাঁকে এসে দাড়িয়েছে টের পাই নি।
“বইতে পড়েছি। পৃথিবীর কোন কোন এলাকায় নাকি এ রকম ব্যাপার ঘটে। জাহাজ আছে লোক নেই। প্লেন আছে পাইলট নেই। বাসা আছে লোক নেই। তারা যেন অন্যলোকে হারিয়ে গেছে। আবার কখনও তো শুনি আস্ত একটা হ্রদই হারিয়ে যায়। ওহ কি হৃদয় বিদারক। আমাদের বাসাটাই বারমুডা ট্রায়াঙ্গল হয়ে গেল শেষ পর্যন্ত।”, ছেলে কোন এ্যঙ্গেলে কথা বলছে বোঝা মুশকিল।
“না না ওটা ভূতুড়ে ব্যাপার।”, বাবা ওরফে বাড়ীঅলা রহস্যময় ট্রায়াঙ্গলে গেলেন না।
“থানায় কোন খবর দেননি?” আমার প্রশ্নে তাদের আবার বিচলিত করে ফেলে।
“হ্যাঁ দিয়েছিলাম?”, বাড়ীঅলার হয়ে তার ছেলে উত্তর দেয়।

“পুলিশ প্রথমে সন্দেহ করে প্রফেসার খুন হয়েছেন। হত্যাকারী হলো তার সহকারী চিন্টু। কিন্তু প্রফেসারের লাশ বা চিন্টু কারোরই কোন খোঁজ তারা পেল না। সে বাসায় যে কোন খুন হয়েছে এমন কোন লক্ষণ নেই। বাসায় টাকা পয়সায় বহাল তবিয়তে আছে। তারা সেই বাসায় দুজন পুলিশ রেখে গেল পাহারায়।

“একদিন পুলিশ এসে বললো তারা চলে যাচ্ছে। যাবার আগে বলে গেল খুনী ধরা আমাদের কাজ, ভূত ধরা নয়। বোঝা গেল পুলিশও ভূতকে ভয় পায়। সারা বাড়ী খুঁজেও পাওয়া গেল না প্রফেসারের কোন আত্মীয়র ঠিকানা। এর পরে আমরা যখনই ভাড়া দেই, দুদিন পরে ভাড়াটিয়া এসে বলে ও বাড়ীতে ভূত আছে। তারপর থেকে বাসা খালি। তবে প্রফেসারের জিনিসপত্র বাসাতেই আছে। স্রেফ যেগুলো চোরে নিয়ে যেতে পারে সেগুলোই আমরা এখানে এনে রেখেছি। আমরা অবশ্য ভয়ে ছিলাম। ভূতের নয় চোরের। কিন্তু দেখা গেল ভূতেরাই তাদের বাসা ভালোমতো পাহারা দিচ্ছে।”
“কিন্তু আমি বাসা ভাড়া নিতে চাই।”, একগুয়ে হয়ে উঠি আমি।
বাড়িঅলা আবার মুখ খুললেন, “ও বাড়ীটা দেখেছেন?”
“অবশ্যই।”, সাথে সাথে জবাব দেই আমি।
“কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়েনি?”, বাড়ীঅলার জিজ্ঞেস করেন।
“না তো।”
“পাখির ডাক শুনেছেন?”
“অবশ্যই!”
“কোন পাখি চোখে পড়েছে?”
“না তো! তেমন করে অবশ্য দেখিনি।”
“তাহলে বুঝুন, পাখিগুলো পর্যন্ত ভূতুড়ে হয়ে গেছে! ভূতদের উপর বিশ্বাস নেই। মানে আমি বোঝাতে চাইছি, ওরা ঘাড় মটকে দিতে পারে।”

ভূতদের উপর আমার রাগ নেই। লেখলেখি, বিশেষ করে ভূতের গল্প লেখার জন্য ওই রকম বাড়ী একটা দরকার।
এরপর বাড়ীয়ালার আর কোন আপত্তি থাকতে পারে না। তবে আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না (ভূত হলেও হতে পারে)- এ রকম কিছু লিখে দিলে তিনি খুশী হতেন বোধহয়।

odvuture-6.jpgকয়েকদিন পরেই উঠে এলাম ভূতুড়ের বাড়ীটাতে।
বাড়ীটায় মোটেও ভূতুড়ে নির্জনতায় ভরা নয়। বরঞ্চ হরহামেশাই ইঁদুর আর বেড়ালের চিৎকার চেঁচামেচিতে সরগরম। অবশ্য তাদের দেখা এখন পাই নি। মাকু বেছে নিয়েছে প্রাক্তন বৈজ্ঞানিকের সহকারীর ঘর। ঘুম কেমন হয়েছে জিজ্ঞেস করতে বললো, “মাঝরাত্তিরে কে যেন তার গায়ের লেপ টেনে নিয়েছিল।”
আমার ঘরেই প্রথম দিনই থেকেই মাঝরাত্তিরে আমি শুনেছি কে যেন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলছে।

“বাসাটায় কী যেন একটা আছে।”, মাকুর বক্তব্য
মাঝে মাঝে লেখার পাতাগুলো এদিক ওদিক হয়ে থাকে। বেড়াল আরশোলা ছাড়াও মনে হয়, মানুষ ভূতও আছে? মাঝে মাঝে জিনিসপত্র এলোমেলো হয়ে যেতে দেখে মনে হয়, তারা যেন কিছু একটা খুঁজছে। মাঝরাতে বিষন্ন দীর্ঘশ্বাসের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। কোন দুষ্ট লোকের কাণ্ড? ভূত? ভয় করতে লাগলো আমার।
“যদি সাহসী হোন সামনে আসুন।”, আমার মুখ থেকে বের হয়ে গেল।
“আমি আপনার সামনেই।”, একটা কণ্ঠস্বর।
“তাহলে কি এটা সত্যিই ভূতের কাণ্ড!”, বলেই আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম।

কিছুক্ষণ পরই আবার জ্ঞান ফিরলো। দেখি শূন্যে থেকে কিছু পানি এসে আমার চোখে মুখে পড়ছে।
“দয়া করে অজ্ঞান হবেন না।”, ভূতটাই আমাকে ভরসা দেবার জন্য বলে, “যদিও আপনি আমায় দেখতে পাচ্ছেন না। তবু অমি ভূত নই।”
ভুত নিজেই বলছে সে ভূত না। তাহলে, সে কে? আবার অজ্ঞান হয়ে গেলাম আমি। আবার পানির ছিটায় জ্ঞান ফিরে আসে।

“আমি ভূত নই। আমার নাম প্রফেসার গনি আদম। অবশ্য সবাই আমাকে ভুলোমন প্রফেসার বলেই ডাকতো।”

“তবে কি আপনি মরে গিয়েও বেঁচে আছেন?”, আমি আমতা আমতা করে বলি, “নাকি আপনি ভূত হয়ে বেঁচে আছেন?”
“ভূত হলেই বোধহয় ভালো হত? আমি মরিও নি, আমি ভূতও হইনি। স্রেফ অদৃশ্য হয়ে গেছি। অবশ্য অদৃশ্য হয়ে দেখছি, অদৃশ্য হওয়া আর ভূত হয়ে যাওয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।”
“অদৃশ্য হয়ে গেলেন, কিন্তু কীভাবে?”, আমার প্রশ্ন করি আমি। তবে কাকে করছি বুঝে উঠতে পারছি না।
“এইচ জি ওয়েলসের ‘অদৃশ্য মানব’ বইটা পড়ে।”, একটা অদৃশ্য উত্তর আসে।

প্রফেসার ভুলোমন বলতে শুরু করছেন তার কাহিনী। আমি সে ভাবেই লিখছি। যদিও গল্পটা হাওয়া থেকে পাওয়া।

“যখন থেকে আমি ‘অদৃশ্য মানব’ বইটা পড়ি, তখন থেকে আমি বের করার চেষ্টা করি, কীভাবে অদৃশ্য হওয়া যায়। এই গবেষণা করতে গিয়ে বেশ কয়েকবার বিপদে পড়ি। শেষে চিন্টু মানে আমার সহকারী নানা জায়গা ঘুরে এই শহরের এই বাড়ীটা খুঁজে বের করে। যদি তাকে এই মুহুর্তে আপনি দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু সেও এখানে আছে। আমার বা পাশে। বাড়ীর মালিক সরল সোজা মানুষ। আমার বৈজ্ঞানিক গবেষণা নিয়ে তার আপত্তি ছিল, ভাড়া নিয়ে নয়। ভাড়া দিতে রাজী হন বাড়ীয়ালা।

“আমার বাবা আমার জন্য অনেক টাকা রেখে গেছে, তাই টাকা নিয়ে আমার কোন সমস্যা ছিল। সব চিন্টুই দেখাশুনা করে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এখন ওকেই কেউ দেখতে পারছে না। আমার সব কাজ ওই করে দেয়। এই বাসায় আসার পরই আমি একদিন আবিস্কার করে ফেললাম অদৃশ্য হয়ে যাবার ফর্মূলা। জিনিসটা দেখতে অনেকটা সবুজ রঙের তরল পানীয়। সরবতের মত।

“কারো উপর পরীক্ষা করার আগে আমি নিজেই ওর থেকে খানিকটা খেয়ে ফেললাম। ফল হলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, নিজের চোখের সামনেই আমি নিজে অদৃশ্য হয়ে গেলাম। আমাকে দেখতে বিড়ালটা এসে ওই তরল খানিকটা আনমনে খেয়ে ফেললো। আমার সহকারী চিন্টু বাইরে গিয়েছিল, গরমে ক্লান্ত হয়ে এসেছে। সেও শরবত মনে করে অদৃশ্য হবার পানীয়টা খানিকটা খেয়ে ফেললো। এ ভাবে আমরা তিনজন অদৃশ্য হয়ে গেলাম।

“অদৃশ্য হবার পর, আমরা আমাদের দেখতে পেলেও অন্যরা আমাদের দেখতে পাচ্ছিল না। ঘরে ইঁদুর এলো। কারণ বেড়ালটা তখন ওদের চোখের সামনে নেই। কিন্তু বিড়ালটা তাদের ধরতে শূন্যে লাফ দিল। এতে ইঁদুরগুলো ভয় পেয়ে পালায়। ভূতুড়ে বেড়ালের ভয়েই হয়তো।

“যে কাঁচের জেগে ওই অদৃশ্য হবার সরবত রাখা ছিল, জগটা পড়ে ভেঙ্গে ও ঔষধটা সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়লো। ইঁদুরগুলো দলে দলে এসে ওই অদৃশ্য হবার ঔষধ খানিকটা, চেটে খেল, আর পালে পালে অদৃশ্য হল। বাড়িতে কাউকে না দেখে সাহস পেয়ে তারপরে এলো আশেপাশের পাখিরা, এলো আরশোলা, সরবত খেল এবং অদৃশ্য হল। সেই থেকে এই দৃশ্যমান বাড়ীতে আমরা সবাই অদৃশ্য হয়ে বসবাস করছি।

“এতে প্রথমে আমাদের তেমন কোন অসুবিধা হত না। বাড়ীঅলা এলো, পুলিশ এলো। তারা চিন্টুকে সন্দেহ করলো আমার খুনী হিসাবে। এতে চিন্টুর দারুণ রাগ হয়েছিল। যখনই তারা বলতো চিন্টুই প্রফেসারের খুনী। চিন্টু তাদের কানের কাছে ফিসফিস করে বলতে, ‘এটা ঠিক নয়। প্রফেসার এখনও বেঁচে আছে।’ পুলিশরা ভূতের বাড়ী ভেবে আর এ মুখো হয়নি।
“বাড়ীঅলাকে আমরা বোঝানোর চেষ্টা করেছি। সে বললো, ‘বাড়ীটা ভাড়া দিয়ে দেবে।’ আমরা ভাড়াটিয়া আসলেই তাদের বলার চেষ্টা করতাম, আমরা কীভাবে বেঁচে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছি। তাতে লাভ হল, এই ভাড়াটিয়ারা পালালো। আর চারপাশে রটিয়ে দিল এই বাসাটা ভূতের বাসা। বাড়ীঅলা একবার আমাদের প্লেট ছুঁড়ে মারে। ওগুলো শূন্যে ধরে ফেললো চিন্টু। আসলে বাড়ীঅলা ভূত আছে কিনা সেই লক্ষণ টেস্ট করছিল। চিন্টু খেপে গিয়ে তার দিকে প্লেট ছুঁড়ে মারতেই সে পড়িমড়ি করে পালিয়েছে।

“কাছে গিয়ে শুধু বলার চেষ্টা করেছি, আমি ভূত নই? অমনি ভূত দেখার মতো ভয় পেয়ে কিছু না দেখেই সবাই পড়িমড়ি করে পালিয়েছে। একমাত্র আপনিই দেখলাম, না পালিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছেন। সাহসী মানুষ। এখন আপনিই আমাদের সাহায্য করতে পারেন।”

যদিও আমি ভয় এবং ভরসা কোনটাই পাচ্ছি না, তবু সেই অদৃশ্য থেকে আসা কন্ঠস্বরকে বললাম, “বলেন আপনার জন্য আমি কী করতে পারি?”

“অদৃশ্য হয়ে যাবার পর আমার একটাই লাভ হয়েছে। এখন আমি সব মনে রাখতে পারি ।”, প্রফেসার ভূলোমন জানালেন। “কী করে আবার দৃশ্যমান হতে হবে সেই ফর্মূলাও আমি আবিস্কার করেছিলাম। একমাত্র সেটাই আমি মনে করতে পারছি না, ওই ফর্মুলা আমি কোথায় রেখেছি। এখন তা মনে করতে পারছি না। তিনমাস ধরে সেই ফর্মূলা খুঁজছি।”

ভূতের ভয় একেবারে দূর হয়নি। প্রফেসার, চিন্টু বা অন্যদের কাজকর্ম দেখি। তাদের দেখি না। তারা অদৃশ্য না ভূত এটা নিয়ে এখনও আমার সন্দেহ আছে। কারণ আমি প্রমাণে বিশ্বাসী। এ কারণেই আমিও প্রফেসারের দৃশ্যমান হবার ফর্মূলা খুঁজছি। যদি খুঁজে পাই তবে তোমাদের জানাবো। তোমরাও একটা ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হবে।
এতদিন শুনেছ মানুষ ভূত হয়ে যায় । এবার দেখবে ভূতকে মানুষ হতে। সেটাও তো একটা ভৌতিক ব্যাপারের মতই।


বিজয় মজুমদার/এবি/০৪ ডিসেম্বর