ড্রাগনের যম ইভান

মূল : ভ্লাদিমির বাইকো
অনুবাদ: হাসান খুরশীদ রুমি

ইউক্রেনের লোক কথা

অনেক অনেক কাল আগের কথা। ভয়ঙ্কর এক ড্রাগন এক গ্রামে হানা দিয়ে একে একে সকলকেই খেয়ে ফেলল। শেষে একদিন দেখা গেল এক বুড়ো ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই।
golpo_64_1.jpgড্রাগন নিজেকে বলল, “একে আমি আগামীকাল সকালের নাস্তায় খাব।”
ঠিক এই সময় এক গরীব ছেলে গ্রামের ভিতর দিয়ে যাচ্ছিল। সে গিয়ে সেই বুড়োর কুড়ের দরজায় টোকা দিল আর বলল রাতটা কাটাতে চায় তারে কুড়েঘরে।
“তোমার কি জীবনের ওপর বিরক্ত লেগে গেল নাকি?”, বুড়ো তাকে জিজ্ঞেস করল।
“এমন কথা বলছ কেন?”, ছেলেটা জিজ্ঞস করল।
বুড়ো তখন ড্রাগনের কথা বলল যে, গ্রামের সবাইকে খেয়ে ফেলেছে, সেই শুধু বাকি আছে। আগামীকাল তাকেও খেয়ে ফেলবে।

সব শুনে ছেলেটা বলল, “সে তোমাকে খেতে পারবেনা, গলায় আটকে যাবে!”
golpo_64_2.jpgপরদিন সকালে ড্রাগন গ্রামে ফিরে এল। বলল, “বাহ বেশ! গতকাল রেখে গেলাম একজন, আজ হয়ে গেল দুইজন!”
“সাবধান, গলায় আটকে মরো না আবার!”, ছেলেটা বলল।
ড্রাগন তার দিকে আশ্চর্য হয়ে তাকাল। “তার মানে, আমার চেয়ে তুমি নিজেকে বেশি শক্তিশালী মনে করো নাকি?”, ড্রাগন জিজ্ঞেস করল।
“আমি মনে করছি না, আমি তাই-ই !”
“তুমি - শক্তিশালী ? বিশ্বাস হচ্ছে না। আমার শক্তি দেখ !”

golpo_64_3.jpgএকটা পাথর তুলে ড্রাগন সেটাকে এমন চাপ দিল যে একেবারে গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে ধুলো হয়ে মিলিয়ে গেল।
“ও তেমন কিছু না !”, ছেলেটা বলল। “এমন করে চাপ দাও যাতে ওটা থেকে পানি বের হয়।”
বলেই সে একটা পনির তুলে নিল, যা কাপড় দিয়ে পেঁচান রয়েছে শুকানোর জন্য। ওটা একটা পাথর এমন ভাব করে সে চাপ দিতে লাগল। আর তারপরই ওটা থেকে যেন পানি বেরিয়ে আসতে লাগল।
“এইভাবেই চাপতে হয়!”, বলল ছেলেটা।
“হ্যাঁ, বুঝতে পারছি তুমি আমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী !”, ড্রাগন বলল। “চল আমরা বন্ধু হয়ে যাই।”
“ঠিক আছে, তুমি যখন বলছ !”, ওরা ড্রাগনের জন্য ঘর বানাল। ড্রাগন তাকে তার নাম জিজ্ঞেস করল।
“সবাই আমাকে ইভান দি ড্রাগন কিলার নামে ডাকে!”, ছেলেটা জবাবে বলল।

golpo_64_4.jpgএই কথাটা শুনে ড্রাগন ভয় পেয়ে গেল। “ও আবার না আমাকে মেরে ফেলে! ভাবল সে।
খাবারের সময় ড্রাগন বলল, “ইভান, যাও রান্নার জন্য একটা ষাঁড় ধরে নিয়ে এস!”
ইভান ষাঁড় আনতে গেল, পালের ষাঁড়গুলোর লেজে লেজে বাঁধতে শুরু করল সে।
ড্রাগন ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগল, শেষ পর্যন্ত নিজেই গেল ব্যাপারটা দেখতে।
“কী করছ, ইভান?”, জিজ্ঞেস করল সে।
“আমি একটা ষাঁড় নিয়ে যাব না। সবচাইতে সুবিধে হবে একসঙ্গে সবগুলো ষাঁড় নিয়ে যেতে পারলে!”, জবাবে ইভান বলল।
“তোমার প্লেগ হোক! এভাবে তো তুমি আমার পুরো পালটাকে শেষ করে দিবে দেখছি!”
একটা ষাঁড় মেরে, ওটার চামড়া চড়িয়ে ওটাকে টেনে হিচঁড়ে বাসায় নিয়ে গেল। চামড়াটা ইভানকে দিয়ে বলল, “এই যে চামড়াটা নাও আর পানি ভর্তি করে নিয়ে এস!”
ইভান চামড়টা নিয়ে কোনো রকমে টেনে নিয়ে গেল। একটা কুয়োয় ওটা ফেলল, কিন্তু ওটা আর তুলতে পারল না। শেষে একটা কোদাল বানাল সে। তারপর কুয়োর চারধারের মাটি খুঁড়ে তুলতে লাগল।

ওদিকে ড্রাগন কী ঘটছে দেখার জন্য ছুটে এল।
“কী করছ, ইভান ?”, জিজ্ঞেস করল সে।
golpo_64_5.jpg“আমি চামড়ায় করে পানি নিতে চাইছি না। কুয়োটাই তুলে নিয়ে যাই তাহলে ঝামেলা কম হয় !”
“প্লেগ হোক তোমার !” ড্রাগন চেঁচিয়ে বলল। ইভানের শক্তির কথা ভেবে ভয় পেয়েছে সে, নিজেই চামড়ায় পানি ভরে নিয়ে গেল।
“যাও, কিছু শুকনো কাঠ নিয়ে এস।” ইভানকে বলল সে। “একটা শুকনো ওক গাছ উপড়ে নিও, তাতেই হবে।”
ইভান রাগ করার ভান করল।
“আমি না ! আমি একটা ওক গাছ নিয়ে মাথা ঘামাতে চাই না!” বলল সে। “অন্তত বিশটি ওক গাছ তুলে আনতে বল আমাকে।”
ড্রাগন রান্না করে গিলতে শুরু করে দিল, কিন্তু ইভান, খেল না। খেলে ড্রাগন দেখবে সে কম খাচ্ছে। তখনই বুঝে ফেলবে ওর গায়ে জোর নেই। যখন ড্রাগন বেশিরভাগ খাবার খেয়ে ফেলল, বলতে গেলে তেমন খাবার ছিল না, তখন ছেলেটা খেতে বসল। মাত্র কয়েক চামচ খাবার ছিল, তাই খেতে বসল ও টেবিলে। চামচ দিয়ে খেল।

“পেট ভরল না !”, বলল সে।
“চল আমার মায়ের কাছে, সে আমাদের জন্য কিছু পিঠা বানিয়ে দিবে !”, ড্রাগন বলল।
“চল !”, বলল ইভান। মনে মনে সে ভাবল, “এবার আমি শেষ !”

golpo_64_6.jpgওরা ড্রাগনের মায়ের বাসায়, বিশ ব্যারেল পিঠা খাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে রইল।
ইভান এবং ড্রাগন টেবিলে বসল খেতে। ড্রাগন একের পর এক পিঠা গিলতে লাগল, ইভান ভান করল পিঠা খাওয়ার। সে তার জামার আস্তিন এবং পকেটে ঢোকাতে লাগল। বিশ ব্যারেল পিঠা দ্রুত সাবাড় হয়ে গেল। ড্রাগন খাওয়া শেষে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “চল পাথর চিপে দেখি কে কত শক্তিশালী।
“চল !” ইভান বলল। মাঠে একটা পাথর পেল ওরা, ড্রাগন ওটাকে এমন এক চাপ দিল যে ধুলো হয়ে উড়ে গেল।
“এ্যাঁ! আর এমন কি!”, ইভান বলল। “তুমি এমনভাবে চাপ দাও যাতে পানি বের হয়।”
সে একটা পাথর তুলে নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে চাপ দিল, এর ফলে জামার ভেতরে রাখা পিঠাগুলো থেকে রস বের হতে থাকল।
“দেখ ? এইভাবে করতে হবে!”, বলল ইভান।
ড্রাগন ভয় পেল ব্যাপারটা দেখে।
“ঠিক আছে, ইভান, চল দেখি কে কত জোরে শিস দিতে পারে!”, বলল ড্রাগন। সে এত জোরে শিস দিল যে গাছ নুইয়ে পড়ল মাটিতে।
“এবার আমি কি করব ?”, ইভান নিজেকে প্রশ্ন করল। এদিক ওদিক তাকায় সে, দেখল এক টুকরো লোহা পড়ে আছে। বলল, “চোখ বন্ধ করো, ড্রাগন, আমি এত জোরে শিস দিব যে তোমার চোখ উপড়ে আসবে !”
ড্রাগন চোখ বন্ধ করল। ইভান লোহাটা তুলে নিয়ে এমন আঘাত করল ড্রাগনকে যে চোখ মুখ কুঁচকে গেল ব্যাথায়।
তুমি ঠিক বলেছ, আমার চোখ সত্যি সত্যি উপরে আসছিল!”, ড্রাগন বলল।

এত ভয় পেল সে যে ইভানের সঙ্গে এক জায়গায় থাকতে ভয় পেল। তাই সে গ্রামের আরেক কোনায় ইভানের জন্য একটা ঘর বানিয়ে দিল। তারপর ড্রাগন মা এবং ড্রাগন মাথা ঘামাতে লাগল কী করে ইভানকে মেরে ফেলা যায়।
“ওর বাড়িসহ ওকে পুড়িয়ে মেরে ফেলি !”, বলল ওরা।
কিন্তু ইভান ওদের আলাপ শুনে ফেলল এবং ঘরে বাইরে লুকিয়ে থাকল।
ওরা ইভানের বাড়ি পুড়িয়ে ফেলল, এক সময় সে ওর বাড়ির জায়গায় এসে দাঁড়াল। ওখানে দাঁড়িয়ে সে গা ঝাড়তে লাগল যেন ছাই ঝাড়ছে সে।
ড্রাগন এসে দেখল ওকে এবং হতভম্ব হয়ে গেল।
“তুমি বেঁচে আছ, ইভান !”, চেঁচিয়ে বলল ড্রাগন।
“কেন বাঁচব না !”, ইভান বলল। “তবে রাতে আরাম পাচ্ছিলাম না, খালি মনে হচ্ছিল মাছি কামড়াচ্ছে আমাকে।”
“ইভানের কাছ থেকে আমার সরে পড়াটাই ভালো, যাকে আগুন কিছু করতে পারেনি, ওরে বাপরে !” ড্রাগন নিজে নিজে বলল। এই ভেবে সে এলাকা ছেড়ে চলে, আর কখনোই দেখা যায় নি।

ইভান দ্য ড্রাগন কিলার। মূল রুশ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদঃ ইরিনা ঝালেজনোভা



বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/হাসান খুরশীদ রুমী/এবি/ জানুয়ারি ২০০৯