জিন্নাহ'র না জানা গল্প

আহমেদ রিয়াজ

ভীষণ চেঁচামেচি, ভীষণ হইহল্লা। কেউ কারো কথা শুনছে না। সবার এক কথা আমার ভাষা-ই সেরা। পুরো বনে আমার চেয়ে সুন্দর ভাষায় আর কেউ কথা বলে না।

বানর চেঁচাল, হুপ হুপ।
কাক বলল, ক্বা ক্বা।
কুকুর বলল, ঘেউ ঘেউ-উ-উ-উ।
golpo-67-1.jpg গরু ডাকল, হাম্বা।
গাধা বলল, ইঁয়া-ও।
ঘোড়া ডাকল, চিঁ-ই-হি।
বাঘ হাঁক দিল, হু-উ-ম।
সিংহ গর্জন করল, হা-লু-উ-ম।
মোরগ ডাকল, কুক-কুরুক-কুক।
শেয়াল ডাকল, হুয়া হুক-হুক্কা।

হাতি, জেব্রা, জিরাফ, উল্লুক, মহিষ, ময়না পাখি, টিয়ে পাখি- মোট কথা যত্তরকম পাখি ছিল আর যত্তরকম পশু ছিল সবাই ডাকল। আকাশে, মাটিতে, মাটির নিচে যারাgolpo-67-2.jpg ছিল তারাও ডাকল। কিন্তু কোন ভাষাটা সেরা কেউ ঠিক করতে পারল না। বনের রাজা সিংহ বললেন, এখন কী হবে? আমরা তো সেরা ভাষা কোনটা এখনও ঠিক করতে পারিনি। তবে আমার মনে হয় আমার ভাষাই সেরা। আমি তোদের রাজা। রাজা মানেই সেরা। রাজার ভাষাই সেরা ভাষা। কাজেই রাজার ভাষার ওপর আর কোনো ভাষা হয় না। তোদের কারো কোনো আপত্তি আছে?

এ ওর মুখের দিকে তাকাল। আপত্তি আছে মানে? প্রত্যেকেরই আপত্তি আছে। কিন্তু সাহস করে কেউ যে কোনো কথা বলবে, বলতে পারছে না। বাঘের কিন্তু মোটেই ভালো লাগল না এই একতরফা কথাবার্তা। বাঘ বলল, এটা তো আপনি ঠিক কথা বললেন না মাহামান্য রাজা। সবার কাছেই তার নিজের ভাষা সেরা।

গাধা জানতে চাইল, সেরা ভাষা ঠিক করে কী হবে?

সিংহ বলল, ওই ভাষায় বনের সবাই কথা বলবে। বনের সবার একটাই ভাষা হওয়ার দরকার। বনে যে

স্কুল হবে, সেই স্কুলে ওই ভাষা শেখানো হবে। আমাদের বনের সুনাম আরো ছড়িয়ে পড়বে।

golpo-67-3 শেয়াল বলল, কিন্তু হুজুর রাজভাষায় একটা নেংটি ইঁদুর কথা বলবে, কেমন লাগবে তখন?

সিংহ তখন কী যেন ভাবল। আর ভেবে নেংটি ইঁদুরকে বলল, দেখি আমার মতো বল তো- হা-লু-ম।
নেংটি রাজভাষায় কথা বলতে পেরে তো মহাখুশি। খুশি খুশি হয়ে বলল, হা-উ-ম।

গরু বলল, হুজুর ও তো ঠিক মতো বলতেই পারল না।

কাক বলল, সবাই কি আর রাজভাষা বলতে পারবে ঠিক মতো?

সিংহ বলল, কেন পারবে না? সবাইকে পারতে হবে। ঠিক আছে আমি রাজভাষা শেখানোর জন্য স্কুল দিচ্ছি। শেয়াল, তুমি হবে ওই স্কুলের টিচার। পারবে না সবাইকে রাজভাষা শেখাতে?

শেয়াল সামনের দুটো থাবা জোড় করে বলল, পারবো হুজুর।

বাঘ বলল, তাহলে সেরা ভাষার কী হবে?

golpo-67-4 সিংহ মনে মনে বলল, নাহ্‌! বাঘটা দেখছি বড্ড ঝামেলা পাকাচ্ছে। চেয়েছিল কৌশলে নিজের ভাষাকেই সেরা ভাষা করে নিতে, পারল না।

সিংহ বলল, সেটা পরে হবে। আগে সবাই রাজভাষা শিখে আসুক।

কাজেই সকাল দুপুর সন্ধে পর্যন্ত শেয়ালের পাঠশালায় রাজভাষা শেখার ক্লাস চলতে থাকল। শেয়ালকে সাহায্য করতে আশপাশের বন-জঙ্গল থেকে আরো কিছু শেয়াল এল। যার যখন সুবিধা ভাষা শিখতে আসছে সবাই। খুব কঠিন কিছু না। কেবল একটি শব্দ- হালুম। কিন্তু এই হালুম শেখাতেই শেয়ালের মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগল। যতই শেয়াল হালুম বলুক, কেউ সেটা বলতে পারে না ঠিক মতো। মনের ভুলে নিজের ভাষাই বলে। তবু অনেক কষ্টে সবাইকে শেখাতে পেরেছে। সবার শেখানো শেষ হলে পর, একদিন বনের রাজা নিজেই এলেন কার কেমন শেখা হল শোনার জন্য। রাজা একে একে সবাইকে রাজভাষায় ডাকার জন্য বললেন।

হাতি বলল, হুয়া-আ-আ-লুম।

golpo-67-5 গাধা বলল, হুয়া-লু-উ-উম।

ঘোড়া বলল, হু-উ-উ-য়ালুম।

বানর বলল, হু-হু-লুম।

গরু বলল, হাম-উয়ালুম।

কাক ডাকল, কাউয়ালুম।

কুকুর বলল, ঘেউ-উ-উলুম।
golpo-67-6 নাহ্‌! আর সহ্য করা যায় না। রাজভাষার এমন বিকৃত রূপ, কোন রাজা মেনে নেবে? তার ওপর কারো কথাই রাজা কিছুই বুঝতে পারলেন না। রাজা হতাশ কণ্ঠে বললেন, ওরা কোন ভাষায় কথা বলছে শেয়াল পন্ডিত?

পণ্ডিত শেয়াল বলল, কেন হুজুর রাজভাষায়!

রাজা বললেন, রাজভাষা কী এমন? ওরা তো একেকজন একেকভাষায় কথা বলল। তুমি কি আমার ভাষাটা ঠিক মতো খেয়াল করোনি? হালুম। হ আকার হা, ল হ্রস্ব উকার লু আর ম। কী হলো? হালুম। বুঝেছ?

বাঘ বলল, হুজুর নিজের ভাষা অন্য কারো উপর চাপিয়ে দিতে চাইলে এমনই হবে। যার যার ভাষার উচ্চারণ সে-ই ঠিক মতো করতে পারে। আপনি কাকের মতো করে ডাকতে পারবেন? কিংবা কুকুরের মতো? পারবেন না। নিজে যেটা পারবেন না, সেটা অন্য কাউকে দিয়ে করানোর চেষ্টা না করাই ভালো।
সিংহ কী যেন ভাবলেন। বাঘ কথাটা মন্দ বলেনি। কিন্তু কোনো বদমতলবে বলেনি তো? কারণ বনের রাজা হওয়ার লোভ ওর আছে। রাজা আরো কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। আমি বাঘের কথাটা নিয়ে ভাববো। তারপর জানাবো।

সত্যি সত্যি বনের রাজা এরপর এটা নিয়ে অনেক ভেবেছেন। সকাল, দুপুর, সন্ধে, রাত- সকল সময় ভেবেছেন। ভাবতে ভাবতে তার নাওয়া খাওয়াই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল প্রায়। তারপর তিনি ঘোষণা দিলেন, সবাই যার যার ভাষাতেই কথা বলবে। রাজভাষা বলতে আর কিছু থাকবে না।
রাজার এ ঘোষণায় পুরো বনে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল। সবাই যার যার ভাষায় আনন্দ প্রকাশ করল। প্রজাদের আনন্দ দেথে রাজাও খুশি।

বনের রাজার এই গল্পটা কিন্তু লিয়াকত আলী জিন্নাহ জানতেন না। জানলে কি আর মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের জন্য আমাদের রক্ত দিতে হয়?


বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/ওএফএস/ফেব্রুয়ারি ১৬