যুদ্ধের গল্প

ফরহাদ সাফায়েতুল কবীর

বড় মামা বললেন , আমি একটা গল্প বলবো।
সবাই চুপ করে বসলো।
golpo-73-1.jpgবড় মামা অনেক গল্প জানে। তাই সবাই বললো কিসের গল্প? মামা বললেন মুক্তিযুদ্ধের গল্প।  বিল্টু বললো কাল না তুমি আমাদের বললে তুমি আমাদের রূপকথার গল্প বলবে।
মামা বললো আরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধটাই তো একটা রুপকথা। সেদিনও এমন চাঁদের আলো ছিল। সেই আলোয় যখন আকাশ থেকে একটা পরী নেমে এলো। 
বাবলু বললো, ‘আরে মুক্তিযুদ্ধে বুঝি পরী ছিল? তারা কাদের হয়ে যুদ্ধ করেছিল?’
মিনি বললো, ‘আরে ধুৎ পরীরা বুঝি যুদ্ধ করে?’


মামা বললো, ‘তা ঠিক পরীরা যুদ্ধ করে না। কিন্তু তারা যুদ্ধ থামিয়ে দেয়। পরীদের আগমনে কি হলো জানো?’
সবাই বললো, ‘কি হলো?’
‘পাকিস্তানী সৈন্যরা  সব ঘুমিয়ে পড়লো।’
সবাই বললো- তারপর?
‘তারপর সবাই সকালে উঠে দেখলো তারা সব বন্দী হয়ে পড়েছে।
তারা অবশ্য বারবার বলছিল পরীরা তাদের ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল।’
পাপ্পু বললো, গল্পটা যে অনেক ছোট। আরেকটা বল। 

মামা বললেন , তাহলে শোন ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘাঘরা নদীর পারে এসে গুড়ি খান নামের এক পাকিস্তানী সৈনিক আর তার দলবল ঘাটি গাড়লো। গুড়ি খান নদীর পাড়ে স্কুলে এসে বললো, আমি গুড়ি খান , আমার ভয়ে সবাই খান খান। যা সবাই মুক্তি ধরে আন।
কিন্তু কোথায় পাবে মুক্তি। সে সময় সৈন্যরা সামনে পেল পাতলা মিয়াকে।
পাতালা মিয়াকে পেয়ে অবশ্য সৈন্যরা একেবারে খুশী হলো না। কারন পাতালা মিয়ার স্বাস্থ্য, তাকে দেখে মনে হতো এই বুঝি বাতাসে উড়ে যাবে। কিন্তু তারপরেও তাকে ধরলো কেন জানো? কারন সেখানে আর কাউকে পাওয়া গেল না।
পাতলা খানকে ধরে নিয়ে এলো সৈন্যরা। তাকে দেখে গুড়ি খান হুঙ্কার  দিয়ে বললো, ‘এই বল এখানে মুক্তি আছে। গ্রামের লোকরা সবাই কোথায়?’ 

golpo-73-2.jpgপাতলা খান বললো, ‘হুজুর এই গ্রামের সব লোক পালিয়েছে।’
গুড়ি খান বললো, ‘দেখেছিস এই গ্রামের লোকেরা সব ভীতু। তারা আমার ভয়ে পালিয়েছে।’
- হুজুর যদি অভয় দেন, তাহলে একটা কথা বলি।
- বলরে ভীরু বল।
- হুজুর কি বলবো, এই গ্রামে কোন লোক নেই , কারন সবাই ভুত হয়ে গেছে।
- ভুত কি জিনিস? দেখাও , ভুতকে আমি ভয় পাই না।
- মানুষ মরে গেলে ভুত হয়। ভুত দেখা যায়, তবে তাদের ভয় না পেলে তারা রাগ করে । তারপর হাওয়া হয়ে যায়। এই না বলে পাতলা খান যেন হাওয়া মিশে গেল।
আ- আ করে গুড়ি খান অজ্ঞান হয়ে গেল। তারপর যখন তার জ্ঞান ফিরলো তখন সে যে এমন এক দৌড় লাগালো আর ফিরে এলো না, তার পিছে পিছে সব সৈন্য পালিয়ে গেল।
টিংকু বললো: মামা তুমি সব বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছো।

মুক্তিযুদ্ধে বুঝি এ রকম হয়েছিল? তুমি একটা সত্যিকারের গল্প বল।
মামা বললো আচ্ছা ঠিক আছে বলছি শোন,
তখন আমরা ছোটতো। যদি আমাদের নিয়ে বাবা মা সবাই পালিয়ে চাড়াল বাড়ীর জঙ্গলে আশ্রয় নিল, আমরা কিন্তু জানতাম মুক্তিযুদ্ধ কি। মুক্তিবাহিনী কি। আমরা দিনের বেলায় মুক্তি আর সৈন্য খেলতাম। তাতে বারবার সৈন্যদের হারিয়ে দিতাম।
একদিন আমরা ওই বাড়ীর পিছনে গিয়ে শুনলাম। কালকে রাতে আমাদের গ্রামের বড় ভাইরা স্কুলে  অভিযান চালাবে। স্কুলে ছিল পাকিস্তানী সৈন্যদের ক্যাম্প। আমরা যারা ছোটরা মিলে একটা দল তৈরী করেছিলাম। আমরাও ঠিক করলাম যুদ্ধ করবো। কিন্তু আমরা যুদ্ধ করবো কি ভাবে আমাদের কাছে তো হাতিয়ার নেই।

তাতে কি আমাদের মধ্যে ভন্ডুল ছিল নেতা। সে বললো, যখন মুক্তিযোদ্ধারা বড় ব্রীজের উপর উঠবে তার আগেই আমরা  ওখানকার পাকিস্তানী সৈন্যদের তাড়িয়ে দেব।  
কিন্তু বললেই তো আর হবে না। ব্রীজের উপর চারটে সৈন্য পাহারা দেয়। এর মধ্যে আবার রাতের বেলায় চারটে আসে। যখন ওই চারটে আসে দিনের সৈন্যরা তখন চলে যায়।

এখন আমরা ঠিক করলাম ওই চারটে সৈন্যকে আমরা ব্রীজের উপর থেকে সরিয়ে দেব।  

আমরা এও জানতাম যদি আমরা বড়দের বলি তাহলে তারা আমাদের কখনওই এই কাজ করতে দেবে না। আমাদের এই কাজটি করতে হবে চুপচাপ।
আমাদের গ্রামটা ছিল একেবারে ভারত সীমান্তের কাছে। সীমান্ত এলাকার ওপাশে ছিল পাহাড়। আর সেই পাহাড় থেকে একটা নদী নেমে এসেছে। সেই নদীর উপর একটা ব্রীজ ছিল। পাছে এই ব্রীজ দিয়ে মুক্তিবাহিনী ঢুকে তাই তারা সেই ব্রীজটা সবসময় পাহারা দিত।

golpo-73-3.jpgসেই ব্রীজের এ মাথায় কয়েকটি গাছ ছিল। তারা ঠিক গাছের নীচে বসে থাকতো যদি কেউ আসে। সাধারন মানুষ সেই নদী পার হতে চাইলে তারা তাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করতো পছন্দ না হলে ধরে নিয়ে যেত ।
যদিও আমাদের কাছে গোলা বারুদ ছিল না। কিন্তু আমরা গুলতি নিয়েই রাওনা দিলাম। তখন সন্ধ্যা প্রায় শেষ হয়ে গেছে। আমরা খুব চুপচুপ করে সেই ব্রীজের কাছে নীচে এসে পৌছলাম। অন্ধকারে নদীর পারে তারা নিজেদের মধ্যে গল্প করছিল। আমাদের সবার মধ্যে একটা ভয় ঢুকে গিয়েছিল। কারন যদিও গুল্টুর হাতের সই খুব ভালো কিন্তু অন্ধকারে ঠিক মতো লাগাতে পারবো তো।
সত্যি বলতে কি আমাদের গুল্টু একেবারে অব্যর্থভাবে কাজটি করতে সমর্থ হলো। এক গুলতির আঘাতে চারটি সৈন্য পালিয়ে গেল। মুক্তিযোদ্ধারা ব্রীজের কাছে এসে কাউকে না দেখে অবাক হয়েছিল খুব।
টিংকু বললো, মামা তুমি আবার বানিয়ে বললে, একটি গুলতি দিয়ে কি চারজন সৈন্য ঘায়েল করা যায়।

মামা বললো, আমি একটুও বানিয়ে বলছি না। সেই ব্রীজের পাশে একটা ঝোপের মধ্যে খুদে মৌমাছি বাসা বেধেছিল। আমাদের ভন্ডুল একদিন মাছ ধারার নাম করে ব্রীজের পাশে এসে ওই মৌচাক দেখে গিয়েছিল। তারপর তার মাথায় এসেছিল যে যদি, মৌচাকে একটা ঢিল ছোড়া যায় তাহলেই মৌমাছিরা এসে হুল ফুটিয়ে দেবে।
গুল্টু বলেছিল সে গুলতি দিয়ে একেবারে মৌচাকে আঘাত করতে পারবে। একবারে সে প্রায় অন্ধকারেই ঢিলটা মেরেছিল। আর তাতে একঝাক মৌমাছি এসে সৈন্যদের ছেকে ধরে আর কামড় বসিয়ে দিতে থাকে। তখন তারা জান বাচাতে পালিয়ে যায় ব্রীজ থেকে।
এরপর কয়েকদিন অবশ্যই গুল্টু সবাইকে বলে বেড়াত, এক ঢিলে চারটি হাওয়া।