পাঠশালা

আহমেদ রিয়াজ

golpo-76-1.jpg গাধুর খুব মন খারাপ। বাবা ওকে ডানে যেতে বললে বামে যায়। মা বামে যেতে বললে ডানে যায়। কেন যে যায়, নিজেও জানে না। কেবলই উল্টো কাজ করে। গাধুটাকে নিয়ে মায়ের যেমন দুঃখ। বাবারও। বাবা মাকে বললেন, নিশ্চয়ই তুমি ছোটবেলায় ওর মতো ছিলে। তোমাকে ডানে যেতে বললে বামে যেতে।
গাধাও মা-ও কম যায় না। তারস্বরে চেঁচিয়ে বললেন, তুমি মনে হয় খুব কথা শুনতে। তুমিও তো ছোটবেলায় বামে যেতে বললে ডানে যেতে। যেতে না?
বাবা গাধা বললেন, কে বলেছে তোমাকে?
মা গাধা বললেন, আমি জানি।
বাবা গাধা বললেন, কেমন করে জানো?

মা গাধা বললেন, আমাদের গাধুটাকে দেখলেই বোঝা যায়। ও ঠিক তোমার মতো হয়েছে।
বাবা গাধা একটা কাশি দিয়ে বললেন, সে যাক। নিজেদের ছোটবেলা নিয়ে এই বয়সে এসে ঝগড়াঝাটি করে লাভ নেই। তারচেয়ে আমাদের গাধুটাকে কীভাবে ঠিকঠাক মতো চালানো যায়, সেটাই ভাবি।
মা গাধা বললেন, রক্তের ডাক এড়ানো যায় না। ওর রক্তের মধ্যেই মিশে আছে গাধামি। ও গাধাই হবে।
বাবা গাধা বললেন, তোমার কথা ঠিক নয়। শুনেছি ঠিক মতো লেখা পড়া করলে নাকি গাধাও ঠিক হয়ে যায়।
মা গাধা অবাক হয়ে বললেন, সত্যি!
বাবা গাধা বললেন, তবে আর বলছি কী! একেবারেই ঠিক কথা।
মা গাধা বললেন, কিন্তু গাধাদের লেখাপড়া করার জায়গা কোথায়? গাধাদের জন্য তো আর স্কুল নেই। আছে?
বাবা গাধা বললেন, নেই কে বলল। আছে। মানুষের স্কুলেই গাধাদের জন্য আলাদা বসার জায়গা আছে।

মা গাধা বললেন, কী যা তা বলছ। মানুষের স্কুলে গাধাদের কি ঢুকতে দেয়?
বাবা গাধা বললেন, দেয়। একদিন আমি নিজের কানেই শুনেছি। এক টিচার তার এক ছাত্রকে চেঁচিয়ে বলছেন গাধা কোথাকার! কাকে গাধা বলেছে টিচার জানো?
মা গাধা অবাক হয়ে বললেন, কাকে?
বাবা গাধা বললেন, কাকে বলেছে তা-ও বুঝতে পারোনি? আসলেই তুমি একটা গাধি।
ব্যস। ওতেই রেগে গেলেন মা গাধা। আবারও তারস্বরে চেঁচিয়ে বললেন, শোনো গাধি হয়ে জন্মেছি বলে বার বার মনে করিয়ে দিও না। তুমি গাধা হয়ে জন্মেছ বলেই আমি গাধি হয়ে জন্মেছি। তুমি আর আমি সমান। বুঝেছ? তুমি নিজেই তো একটা গাধা। আমাদের গাধু তো এজন্যই এখনও গাধা রয়ে গেল।
বাবা গাধা বললেন, তুমিও তো বার বার নিজের দোষ ঢাকার জন্য আমার ছোটবেলা টেনে আনছ। ছোটবেলায় আমরা কে কী ছিলাম সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে আমরা বড় হয়ে কে কী করছি।

মা গাধা বললেন, খুব বড় বড় কথা হচ্ছে। ছোটবেলায় যেমন পিঠের উপর বোঝা বয়ে বেড়াতে, এখনও তো তা-ই করতে হচ্ছে তোমায়।
বাবা গাধা বললেন, তুমি তো বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছ।
মা গাধা বললেন, গাধা হয়ে জন্মলে এমন বোঝা বয়েই বেড়াতে হবে। ওটাই গাধাদের কাজ।
বাবা গাধা বললেন, কিন্তু আমি চাইনা আমাদের গাধুও বোঝা বয়ে বেড়াক। তুমি চাও?
মা গাধা বললেন, আমিও চাই না।
বাবা গাধা বললেন, এ জন্যই তো আমাদের গাধুকে একটা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে চাই। মানুষের স্কুলে।
মা গাধা বললেন, মানুষের স্কুলে কি আমাদের গাধুকে নেবে?
বাবা গাধা বললেন, কেন নেবে না? অবশ্যই নেবে। ওই যে বললাম একদিন আমি এক টিচারকে বলতে শুনেছিলাম গাধা কোথাকার! ওটা কাকে বলেছে জানো?
মা গাধা জানতে চাইলেন, কাকে বলেছে?
বাবা গাধা বললেন, একটা গাধাকে বলেছে। কেন বলেছে জানো?

মা গাধা আবারও জানতে চাইলেন, কেন বলেছে?
বাবা গাধা বললেন, ওর ঠিকানা জানার জন্য বলেছে। টিচার আসলে জানতে চেয়েছিলেন ও কোন জঙ্গলের গাধা। মনে হয় ওর স্কুলের বেতন বাকি পড়ে গিয়েছিল। স্কুলের বেতন বাকি পড়ে গেলে টিচারদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। ঘন ঘন নোটিশ পাঠায় ছাত্রদের বাবা-মার কাছে। অনেক সময় পরীক্ষাও দিতে দেয় না।
মা গাধা বললেন, উঁহ্‌! তুমি ঠিক কথা বলছ না। টিচাররা এমন হতেই পারেন না। টিচাররা তো আর তোমার আমার মতো গাধা নন।
বাবা বললেন, তুমি আসলেই একটা গাধি। টিচারদের সম্পর্কে তুমি কী জানো শুনি? কিছুই জানো না।
মা বললেন, তুমি মনে হয় খুব জানো!
বাবা গাধা বললেন, জানিই তো।
মা গাধা বললেন, কী কী জানো শুনি?
বাবা গাধা বললেন, টিচারদের হাতে একটা লাঠি থাকবে। ইয়া বড়।
মা গাধা অবাক হয়ে বললেন, লাঠি আবার কেন? লাঠি তো শুনেছি পুলিশের হাতে থাকে। চোর-ডাকাত পেটানোর জন্য। ছাত্ররা কি চোর না ডাকাত যে ওদের শায়েস্তা করতে লাঠি লাগবে?
বাবা গাধা বললেন, কী জানি। সেটা জানি। টিচারদের রকম সকম বুঝি না।

মা গাধা জানতে চাইলেন, টিচারদের মাথা বুঝি সবসময় গরম থাকে?
বাবা গাধা বললেন, থাকতেই পারে। গাধা, গরু, ছাগল, মানুষ-সবাইকে এক সাথে পড়াতে গেলে মাথা তো গরম হতেই পারে।
মা গাধা বললেন, সবাইকে এক সাথে পড়ান নাকি টিচাররা?
বাবা গাধা বললেন, পড়ানই তো। আমি নিজের কানেই শুনেছি- এক টিচার বলছেন এই গাধা এদিকে আয়। আবার আরেকজনকে বলছেন, এই গরু তুমি পড়া শিখে আসিসনি কেন? অন্য এক ছাত্রকে বলছেন, তুই একটা ছাগল, এটা কী লিখেছিস?
মা গাধা চমকে ওঠলেন। বললেন, বলো কী! গাধা, গরু, ছাগল, মানুষ- সবাইকে এক সাথে পড়ান? সবার ভাষা তিনি বুঝতে পারেন?
বাবা গাধা বললেন, মনে হয় পারেন। না পারলে সবার সাথে কথা বলেন কী করে?
মা গাধা বললেন, আর কেউ পড়ে না? মানে বাঘ, সিংহ, শেয়াল, সাপ- এরা কেউ পড়তে যায় না?

বাবা গাধা বললেন, মনে হয় ওদের লেখা পড়া করার ইচ্ছে নেই। কিংবা টিচাররা ওদের স্কুলে ভর্তি নেন না।
মা গাধা বললেন, তাহলে ভালোই হয়েছে। তুমি ভাবো একবার আমাদের গাধু একটা সিংহের পাশে বসে লেখাপড়া করছে!
বাবা গাধা বললেন, সিংহের পাশে বসে লেখাপড়া করলে কী হবে?
মা গাধা বললেন, কী হবে মানে? লেখাপড়া করতে করতে যদি সিংহটার খিদে পেয়ে যায় তখন তো আমাদের গাধুকেই খাবার বানিয়ে খেয়ে ফেলবে।
বাবা গাধা বললেন, তুমি আসলেই একটা গাধি। খিদে পেলে এক ছাত্র কি অন্য ছাত্রকে খেয়ে ফেলে নাকি?
মা গাধা বললেন, সিংহের বেলায় সেটা বলা যায় না। দেখা গেল টিচারকেই গিলে খেয়ে ফেলল। তখন? তখন কে ওদের লেখাপড়া শেখাবে? খিদে পেলে সিংহদের কি হুঁশ থাকে?

বাবা গাধা এবার কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, তাহলে তো মানুষের স্কুলে আমাদের গাধুকে ভর্তি করানোয় বেশ বিপদ আছে দেখছি।
মা গাধা বললেন, মানুষের স্কুলে ছাড়া আর কোনো স্কুল নেই?
বাবা গাধার তখনই মনে পড়ল একটা স্কুলের কথা। আর মনে পড়তেই চার পায়ে তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে বললেন, পেয়েছি!
মা গাধা বললেন, কী পেয়েছ?
বাবা গাধা বললেন, খড় পেয়েছি।
মা গাধা কিছুই বুঝতে পারলেন না। হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন বাবা গাধার দিকে। বেশ কিছুক্ষণ। তারপর এক সময় হাঁ বন্ধ করে বললেন, খড় দিয়ে কী হবে?
বাবা গাধা বললেন, ওটা তুমি বুঝবে না। আমি এখনই আমাদের গাধুর স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করছি।
বলেই আর দেরি করলেন না বাবা গাধা। চারপায়ে ছুটতে লাগলেন। বনের ঠিক মাঝামাঝি শেয়াল পন্ডিতের একটা পাঠশালা আছে। ওখানে বনের পশুরা লেখাপড়া শিখতে যায়। ওখানেই গাধুকে ভর্তি করিয়ে দেবেন।

golpo-76-2.jpg পণ্ডিত শেয়ালের পাঠশালা। বনের নানান পশুরা লেখাপড়া শিখতে এসেছে এখানে। সজারু, সাপ, গণ্ডার, জিরাফ, উল্লুক, বানর-সবাই। একটু পর গাধুও হাজির হলো।
গাধুকে দেখে পণ্ডিত শেয়াল জানতে চাইলেন, এসেছিস তাহলে? তোর ভর্তির দরখাস্ত পেয়েছি।
তারপর একটা জায়গা দেখিয়ে বললেন, ওই ওখানে গিয়ে বস।
গাধু বসতে বসতে পাঠশালার দিকে নজর বোলালো। আটচালার একটা ঘরকেই পাঠশালা বানিয়েছেন শেয়াল পণ্ডিত। ঘরটা খড়ের তৈরি। বনের মধ্যে ইট-বালু সিমেন্টের ঘর পাবে কোথায় ওরা? ঘরের মেঝেটাও খড় দিয়ে বিছানো। খড়ের উপরই বসে পড়ল গাধু। মেঝেতে বিছানো খড়ের দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো চক চক করে ওঠল গাধুর। আহ! কী সুন্দর খড়। এমন খড় দেখলে কেবল চিবোতেই ইচ্ছে করে। আনমনে দুটো খড় তুলে মুখেও পুরে দিল ও।

গাধু ভেবেছিল পণ্ডিত মশাই হয়ত দেখেনি। কিন্তু পণ্ডিত বলে কথা! আর সে পণ্ডিত যদি শেয়াল হয় তাহলে তো কথাই নেই, তার চোখ ফাঁকি দেয় কার সাধ্যি? গাধুকে খড় চিবোতে ঠিকই দেখে ফেলেছেন পণ্ডিত শেয়াল। আর দেখেই খেঁকিয়ে ওঠলেন, খড় খাসত?
গাধু বলল, জ্বি স্যার খাই।
পণ্ডিত শেয়াল বললেন, তাহলে তো বড় চিন্তার কথা। নাহ্‌! তোকে তো এই স্কুলে রাখা যাবে না।
গাধুরও কিন্তু খুব ইচ্ছে লেখাপড়া শিখবে। বাবা-মার মুখ উজ্জল করবে। এর মধ্যেই ওরা বাবা-মা বনের সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে- আমাদের গাধু লেখাপড়া শিখতে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ও ঠিক প্রথম হবে। কিন্তু টিচার শেয়াল যদি ওকে স্কুলে না রাখেন তাহলে ও প্রথম হবে কেমন করে?

গাধু জানতে চাইল, কেন স্যার?
পণ্ডিত শেয়াল বললেন, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে তোরা গাধারা খড় খাস। তোর মুখে দুটো খড়ের টুকরো আটকে আছে। আমি তোকে বরখাস্ত করলাম। তোর আর স্কুলে আসার দরকার নেই।
গাধু আবারও জানতে চাইল, কেন স্যার?
পণ্ডিত শেয়াল বললেন, কেন আবার? পড়তে এসে শেষে আমার পাঠশালাটাই গিলে খাবি। তারচেয়ে ঘরে ফিরে যা। যেদিন খড় খাওয়া ভুলতে পারবি, সেদিন থেকে স্কুলে আসবি।
গাধু আর কী করে। পাঠশালা থেকে বেরিয়ে এল।
তারপর?

তারপর কী হলো সেটা আর বলা যাবে না। কারণ সুকুমার বড়ুয়া এ পর্যন্তই লিখেছেন। কী লিখেছেন সুকুমার বড়ুয়া?
নেপাল খুড়োর আটচালায়
শেয়াল গুরুর পাঠশালায়
গাধায় দিলো দরখাস্ত
খড় বিছানো মেঝের পরে
শেয়াল বসে তারস্বরে
প্রশ্ন করেন : খড় খাসত?
থাকরে বাবা পড়তে এসে
পাঠশালাটাই গিলবি শেষে
করছি তোকে বরখাস্ত।

কাজেই এরপর কী হলো সেটা যদি সুকুমার বড়ুয়ার পাঠশালা নামের ছড়ায় না থাকে, এই পাঠশালা নামের গল্পটায় কেমন করে থাকবে। কারণ এই গল্পটা তো সুকুমার বড়ুয়ার পাঠশালা নামের ছড়া থেকেই লেখা হয়েছে।