মেছোভূত

ইকবাল খন্দকার

আমাদের গ্রামটা তখন বেশ ফাঁকা ছিল। পুরো গ্রামে বিশটা বাড়ি ছিল কিনা সন্দেহ। যেহেতু বাড়ি কম, অতএব মানুষও কম। কোন কোলাহল নেই, নিরব নিস্তব্ধ চারদিক। দিনে দুপুরে হাঁটাচলা করতেই কেমন যেন ভয় ভয় করত। বিশেষ করে আমাদের গ্রামে বড় বড় কয়েকটা গাছ ছিল- গাব গাছ আর বট গাছ। আমরা এসব গাছের ধারে-কাছে যেতাম না। কারণ মা বাবা সব সময় আমাদের সতর্ক করে দিতেন, এই সব গাছে নাকি ভুত থাকে। সুযোগ পেলেই ঘাড় মটকাবে।

মা বাবার কথা যে সত্য, সেটা বোঝা যেত গাছগুলোর ডাল পালার দিকে তাকালেই। কী বড় বড় ডাল! এক একটা ডালে রাজ্যের ঝোপ। প্রতি ডালে যদি দশটা করে ভূত বসে থাকে, গল্পগুজব করে তবু কেউ টের পাবে না।

আমাদের পাশের বাড়িতে একটা ছেলে বেড়াতে আসত প্রায়ই। ছেলেটার নাম ছিল করিম। বয়সে আমার চেয়ে দুতিন বছরের বড় ছিল। তবে সে আমার সাথে এমন ভাবে মিশত, আমার মনেই হতোনা আমি তার ছোট। আমরা নানা রকম পরিকল্পনা করতাম একসঙ্গে। কোথায় মাছ ধরতে যাবো, কখন পাখির বাসা খুঁজতে যাবো, কার গাছের ফল পেড়ে খাবো- সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে যেত করিম আসার সঙ্গে সঙ্গেই। তবে এসব পরিকল্পনা আমরা যেখানে সেখানে বসে করতাম না। কারণ মা বাবা শুনে ফেললে পিঠে যে শুধু লাঠি ভাঙবেন তা-ইনা, দুএক বেলা খাবারও বন্ধ রাখতে পারেন। এজন্য আমরা চুপচাপ চলে যেতাম বাড়ির বাইরে। মন খুলে বুদ্ধি পরামর্শ করে দুজন দুদিক দিয়ে ঢুকতাম বাড়িতে। কেউ যদি কিছু টের পেয়ে যায়, সেই ভয়ে।

একবার এক ছুটিতে বেড়াতে এলো করিম। এসেই দৌড়ে চলে এলো আমাদের বাড়িতে। আমি তখন ঘুমাচ্ছিলাম। করিমের ধাক্কায় ঘুম ভেঙে গেলো। সে কিছু না বলে ইশারা দিলো বাইরে যাওয়ার জন্য। আমি কোন কথা বাড়ালাম না। বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা গিয়ে দাঁড়ালাম গোয়াল ঘরের পেছনের চিকন পথটায়। তারপর দুজনে কুশল বিনিময় করতে করতে চলে গেলাম বিলপাড়। এরই মধ্যে করিম জানাল এবার সে পুরো এক সপ্তাহ থাকবে। পরীক্ষা শেষ, তাই স্কুল বন্ধ। শুনে আমি লাফিয়ে উঠলাম আনন্দে। এক সপ্তাহ দুজন এক সাথে থাকার সৌভাগ্য এর আগে কখনও হয়নি। করিম বলল, “সারা সপ্তাহের পরিকল্পনাটা এখনই করে ফেলতে চাই।”

কিন্তু বসবো কোথায়? বিলপাড়ে অনেক মানুষ। সবাই বিল পাহারা দিচ্ছে। প্রায় শুকিয়ে যাওয়া বিল থেকে পাশের পাড়ার ছেলেরা মাছ চুরি করতে আসে তো, তাই। কোন নির্জন জায়গা নেই। আশে পাশে তাকিয়ে দেখলাম একমাত্র বটতলাটাই ফাঁকা আছে। কিন্তু বটতলায় গিয়ে বসার মতো সাহস আমার নেই। কে জানে কখন ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে ভূত। করিম খুব করে বোঝাল। বলল, “এতো ভয় পেলে জীবন চলে না। এছাড়া কেউ তো আমাদের বেঁধে রাখবে না। ভুতের আনাগোনা পেলে ঝেড়ে দৌড় দেব। দৌড় আমরা কম জানি না। বরাবরই ফার্স্ট হই। সবচেয়ে বড় কথা হল আর কোথাও নির্জন জায়গা নেই।” অতএব আমরা গিয়ে বসলাম বটতলায়। ভয়ে আমার বুক কাঁপতে শুরু করলেও করিমকে সেটা বুঝতে দিলাম না লজ্জায়।

করিম নানা রকম পরিকল্পনা করতে শুরু করল। আমি তেমন কোন কথা না বলে শুধু হ্যাঁ হ্যাঁ করে যেতে লাগলাম। আর বারবার তাকাতে লাগলাম বটগাছের ডালের ঝোঁপগুলোর দিকে। করিমের অনেকগুলো পরিকল্পনার মধ্যে একটা পরিকল্পনা ছিল- পরের দিন খুব ভোরে আমরা বিলে মাছ ধরতে নামব। চুরি করব না, আমাদের জমি থেকেই ধরব। নিজ হাতে বড় মাছ ধরার মধ্যে একটা আনন্দ আছে। এছাড়া সকাল বেলা সবাইকে মাছ দিয়ে চমকে দেওয়ার ব্যাপারটা তো আছেই। আমি একমত প্রকাশ করলাম করিমের সাথে। সিদ্ধান্ত হলো- ফজরের আজান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে এসে আমাকে ডাক দেবে। আমি তখন বেরিয়ে যাবো আস্তে করে। কথাবার্তা শেষ করে আমরা উঠে দাঁড়ালাম বসা থেকে। বাড়ির দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে আরো বেশ ক’বার তাকালাম ডালের দিকে। করিমকে জিজ্ঞাসা করলাম,“আচ্ছা, আমাদের সব পরামর্শ ভুত শুনে ফেলেনি তো? ” করিম হেসে বলল, “তুই কীযে বলিস না! ভূতের খেয়ে দেয়ে আর কাজ নেই, আমাদের কথা শুনতে আসবে। শোন, মাথা থেকে এসব আজগুবি চিন্তা দূর কর।”

বাড়ি আসলাম। রাতে একটু পড়াশোনা করে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু কোনভাবেই ঘুম আসছিল না। শুধু মনে হচ্ছিল- কখন আজান দেবে, আর কখন বিলে যাব। এপাশ ওপাশ করছিলাম। শোয়া থেকে উঠে-বসেও ছিলাম তিন চার বার। তারপর হঠাৎ কখন ঘুমিয়ে পড়ি, টের পাইনি। ঠকঠক করে আওয়াজ হলো দরজায়। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে গেল আমার। ঘাড় উঁচু করে তাকালাম পাশের খাটে। যদিও অন্ধকারের জন্য দেখা যাচ্ছে না, তবু নাক ডাকানো শুনে বুঝতে পারলাম ভাইয়া গভীর ঘুমে। অতএব নিশ্চিন্তে বেরিয়ে পড়লাম ঘর থেকে। বাইরে এসেই দেখি করিম দাঁড়িয়ে আছে মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে। অন্ধকারে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু এতো অন্ধকার কেন ঠিক বুঝলাম না। আযানের সময় তো প্রায়ই উঠি। অন্যদিন তো এতো অন্ধকার থাকে না। মনে হয় আজ আকাশে অনেক মেঘ। আমি কয়েকবার বাবার ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে হাঁটতে লাগলাম করিমের পিছুপিছু। দেড় মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম বিলপাড়। অন্ধকারের জন্য তখনও করিমের মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “এতো অন্ধকারে মাছ ধরতে নামাটা কি ঠিক হবে?” সে বলল, “আরে কিছু হবে না। দেরি করলে লোকজন চলে আসতে পারে।”

করিমের গলার আওয়াজ কেমন যেন অন্য রকম মনে হল। মনে হল অন্য কেউ কথা বলছে। আমি অবাক হলাম না। কারণ ঘুম থেকে উঠলে গলার স্বর একটু অন্য রকমই লাগে। করিম এতো তাড়াহুড়ো করতে লাগলো যে আমি আর আপত্তি করার সুযোগ পেলাম না। জামাকাপড় গুটিয়ে নেমে পড়লাম বিলে। করিমও গুটালো জামাকাপড়। তবে নামার আগে কিসের যেন একটা পুটলি লুকিয়ে রাখলো ঝোঁপের মধ্যে। আমি সে দিকে তাকাতেই ধমকে উঠল সে, “যে কাজ করতে এসেছিস, সে কাজ কর। এতো কথা বলিস না।”

এবার করিমের গলাটা শুধু অন্যরকমই না, একেবারে অদ্ভূত শোনা গেল। আমি তার দিকে ভাল করে তাকালাম। সঙ্গে সঙ্গে সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তারপর লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল খাদের দিকে। এমনিতে বিলে তেমন পানি না থাকলেও খাদে তখন অনেক পানি। যে কেউ ডুবে যাবে। কিন্তু করিম এক লাফে নেমে পড়ল খাদে। নেমেই ডাকতে লাগল আমাকে,“ আয় আয়। বেশি পানি নেই, ডুববি না।” আমি জোর গলায় বললাম,“না,আসব না। খাদে অনেক পানি। ডুবে যাব।” করিম রেগেমেগে বলতে লাগল, “কে বলেছে অনেক পানি! দেখতে পাচ্ছিস না আমার মাত্র হাঁটু পানি?” যদিও অন্ধকারের জন্য তেমন দেখা যাচ্ছে না, তবু আমি ভালভাবে তাকিয়ে দেখলাম সত্যি সত্যি হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে আছে করিম। দেখে আমি তো একেবারে থ। যে খাদে কম পক্ষে পাঁচ হাত পানি হবে, সেখানে কিনা তার হাঁটুপানি হচ্ছে!

হঠাৎ করিম আমার হাত ধরে টানতে লাগল। কিন্তু খাদ থেকে কীভাবে সে এতো তাড়াতাড়ি আমার কাছে এলো, হাত ধরলো- বুঝতে পারছিলাম না। আমি হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য যেই তার হাতের দিকে তাকালাম, দেখি সে দাঁড়িয়ে আছে খাদেই। তার হাত দুটি লম্বা হয়ে এসে আমার হাত ধরেছে। শুধু তাই নয়,তখনও আমাকে টানছে খাদে নামানোর জন্য। আর আমি প্রাণপণে চেষ্টা করছি হাত ছাড়িয়ে নিতে। একসময় টের পেলাম কে যেন আমার গলা চেপে ধরেছে। তারপর আর কিছু বলতে পারব না।

কে যেন আমার চোখেমুখে ঠাণ্ডা পানি ছিটিয়ে দিল। চোখ খুলে দেখি মা-বাবা ভাইয়াসহ গ্রামের শতশত মানুষ ঘিরে রেখেছে আমাকে। এতো মানুষ কেন? জিজ্ঞাসা করতেই জানতে পারলাম, রাতে আমি ভূতের খপ্পরে পড়েছিলাম। ওটা আসলে করিম ছিল না, ছিল ভূত। আর তখনও রাত পোহাতে ঘণ্টা তিনেক বাকি ছিল। করিম এসেছিল সময় মতই। বারবার দরজায় নক করার পরও যখন সাড়া শব্দ পাচ্ছিল না, তখন সে ডাক দিয়েছিল আমাকে। এতে ঘুম ভেঙে যায় ভাইয়ার। আমাকে ঘরে না দেখে তারা খুঁজতে থাকে এদিক সেদিক। এক সময় আমাকে তারা উদ্ধার করে বিল থেকে। সবাই নিশ্চিত,আর কিছুক্ষন পরে গেলে আমাকে আর জীবিত পাওয়া যেত না।