বিড়ালের বন্ধুত্ব

রূপান্তর : আবুল বাসার

জার্মানীর রূপকথা

অনেক অনেককাল আগের কথা। যখন তোমাদের জন্মই হয়নি তারও অনেক অনেক আগের এক দেশে ছিলো এক বিড়াল আর একটি ইঁদুর। মজার বিষয় হচ্ছে আজকালের অন্যান্য ইঁদুর বিড়ালের মতো তারা মারামারি বা ঝগড়া করতো না, বরং বেশ ভালোই মিল ছিলো দুজনার।

cat.jpgতো, একদিন তারা ভাবলো, দুজনে একসাথে এক বাড়িতেই থাকবে। যেই ভাবা সেই কাজ! ভালো একটি বাসা দেখে তারা একদিন একসাথে উঠে পড়লো বাড়িতে। সামনেই শীত আসছে। শীতে তাদের প্রতিবারই খাবারের সমস্যা হয়। তাই তারা শীতের জন্য আগাম এক কৌটো চর্বির খাবার কিনে ফেললো। কিন্তু তাদের বাসায় চর্বির সেই টিন রাখার মতোন নিরাপদ কোনো জায়গাই ছিলো না। সেজন্যই চর্বির টিনটা এক গির্জার নিচের এক নিরাপদ জায়গায় লুকিয়ে রেখে আসলো তারা।

আসলে দেখতে ভালোমানুষ মনে হলে কি হবে, বিড়ালটা কিন' আদতে ছিলো খুব লোভী আর চালাক কিসিমের। সে শুরু থেকেই ভাবছিলো কিভাবে চুরি করে এই চর্বিটুকু খাওয়া যায়।

একদিন এক শয়তানি বুদ্ধি এঁটে সে তাই ইঁদুরকে বললো- শোনো বন্ধু, আমার চাচাতো বোনের তো বাদামী আর সাদা ছোপ ছোপ দুটি ছেলে হয়েছে। ওদের আজ নাম রাখার অনুষ্ঠান হবে। আমার আবার ওখানে দাওয়াত। তুমি কি একা একা ঘরদোর সামলাতে পারবে? তাহলে আমি একটু নিশ্চিন্তে ঘুরে আসতে পারি।
সব শুনে ইঁদুর বললো- আরে, যাবে না কেনো! অবশ্যই যাবে। তবে শোনো, ওরা যদি তোমাকে ভালো কিছু খেতে দেয় আমার কথাও একটু ভেবো। অনেক দিন তো ভালো খাবার টাবার মুখে দিই না!

বিড়াল কিন্তু বাড়ি থেকে বের হয়েই সোজা চলে গেল গির্জার দিকে, যেখানে চর্বির টিনটা রাখা ছিলো। বিড়াল চর্বির টিন থেকে চর্বির মাথার দিকটা খেয়ে প্রায় শেষ করে ফেললো। তারপর মুখ টুখ মুছে ভালোমানুষের মতো লুকিয়ে লুকিয়ে শহরের দিকে গেলো। সন্ধার আগে আর বাসার দিকটাই মাড়ালো না!

বাসায় ফিরতেই ইঁদুর বিড়ালকে বললো- খুব সুন্দর সময় কাটালে তাই না? ওরা বাচ্চার নাম কি রাখলো?
বিড়াল দুষ্টু হেসে উত্তর দিলো- মাথা শেষ।
ইঁদুর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো- মাথা শেষ? এরকম নাম তো জীবনেও শুনিনি।

কিছুদিন যেতে না যেতেই বিড়াল আবারো ফন্দি আটলো চর্বি চুরি করে খাওয়ার। আবারো একদিন বিড়াল বললো- কি যে ঝামেলা! আরেক চাচাতো বোন আবার দাওয়াত দিয়েছে বলো দেখি! ওরও বাচ্চা হয়েছে, বাচ্চার শরীরে চারপাশে নাকি সাদা,গোল গোল রিংও হয়েছে। মুখের উপর না বলতে পারলাম কই! এদিকে আবার তোমাকে বাসায় একা রেখে কি করে যে যাই?

ইঁদুর সাথে সাথেই বললো- কোনো সমস্যা নেই, তুমি যাও না! ঘুরে আসো। আমি বাড়িঘর দেখে শুনে রাখতে পারবো।

সেদিন বিড়াল বাড়িতে ফিরে এলে ইঁদুর তাকে জিজ্ঞেস করলো- এই বাচ্চার কি নাম রাখলো?
বিড়াল বললো- অর্ধেক শেষ।
নাম শুনে তো ইঁদুর ভীষণ রকম অবাক! সে বললো- অর্ধেক শেষ! এরকম নাম কেউ রাখে বলে তো কখনো শুনিনি।

কয়েকদিন পর বিড়াল আবার চর্বি চুরির মতলব আঁটতে থাকে। আরেকদিন সকালে সে ইঁদুরকে বলতে থাকে- কি কাণ্ড! আবারো আরেক চাচাতো বোনের বাচ্চা হয়েছে। আমাকে দাওয়াতে যেতেই হবে নাকি! কি যে ঝামেলায় পড়া গেল। বন্ধু! আমি কি যাবো ?

ইঁদুর একটু মনে মনে ভাবলো হুম, ‘মাথা শেষ’, ‘অর্ধেক শেষ’... নামগুলো আমার কৌতুহল আর সন্দেহ বাড়িয়ে তুলছে। মুখে বললো- ঠিক আছে, যাও না, তুমি ঘুরে আসো। যাও।

বিড়াল বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলে, ইঁদুর বাড়ির সবকিছু একাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করলো। ও দিকে বিড়াল টিনের চর্বি শেষ না হওয়া পর্যন্ত টানা খেয়ে চেটেপুটে সব শেষ করে তারপর বাড়ি ফিরলো গভীর রাতে। বাড়ি ফিরলে ইঁদুর তাকে জিজ্ঞেস করলো- তো তোমার এই বোন তার ছেলের নাম কি রাখলো?

বিড়াল বললো- ‘সব শেষ’।
ইঁদুর চমকে উঠে বললো- আরে! এটাতো ভয়ংকর নাম। ‘সবশেষ’ এর অর্থ কি? আমি কখনোই তো এমন অদ্ভুত নামের কথা শুনিনি। একথা বলে ইঁদুর তার বিছানায় ঘুমাতে চলে গেলো।

এরপর অবশ্য বিড়ালকে আর কেউই নিমন্ত্রণ করেনি। এদিকে শীত চলে এলো। শুরু হলো খাবারের কষ্ট! কোথাও খুঁজে একদানা খাবারও পাওয়া গেল না। ইঁদুর বিড়ালকে বললো- চলো এবার আমরা গির্জার নীচে রাখা চর্বিটুকু খাওয়া শুরু করি।
তারা গির্জার নীচে খাবারের জন্য গেল। কিন্তু গিয়ে দেখলো চর্বির টিন পুরোটাই খালি! পুরোটাই শূন্য। ইঁদুর বললো- এবার আমি বুঝেছি তুমি প্রথমবার নিমন্ত্রণের কথা বলে টিনের চর্বির মাথার অংশটা শেষ করেছো, তারপর একে একে অর্ধেক শেষ এবং ...
বিড়াল বললো- চুপ! একদম চুপ। আরেকটা কথা বললে আমি এবার তোমাকেই খেয়ে ফেলবো।
ইঁদুর আর কোন কথা বলতে পারলো না, তার মুখের কথা মুখেই রয়ে গেলো। বিড়াল তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে টপ করে গিলে ফেললো ইঁদুরকে।

সেই থেকেই সব ইঁদুর আর বিড়ালের সম্পর্ক খুব খারাপ হয়ে গেছে।

বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম/আবুল বাসার/আরএইচকিউ/এইচআর/০৯ জুলাই/০৯